শীতের সন্ধ্যায় হাইওয়েতে শুধু ভারি ট্রাকের শব্দ। সারি সারি ট্রাক চলেছে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তগুলিতে। সুরজ সিং অভিজ্ঞ ট্রাক ড্রাইভার হলেও হাইওয়েতে খুব জোরে ট্রাক চালানো পছন্দ করে না। ইঞ্জিন সেকেন্ড গিয়ারে রেখে বড়োজোর পঁচিশ তিরিশ স্পিডে গাড়ি টানে। বজবজ থেকে মাল লোড করে গাড়ি ছেড়েছিল বিকাল চারটের দিকে। আসানসোলের একটা ধাবায় রাতের খাওয়া সেরে নিল সুরজ হেল্পার শংকরকে নিয়ে। শংকরের ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু সুরজ চেয়েছিল আরও ঘণ্টা দুয়েক গাড়ি টেনে দিতে। অগত্যা শংকর গিয়ে বসল ওস্তাদের পাশের সিটে। শংকর বকবক করে বকে চলেছে আর স্টিয়ারিং হাতে সুরজ ভাবে,
- এ শালা গাড়ি চালাব কী, চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধুলো। নাক গলা যেন বন্ধ হয়ে আসে। এ দিকটায় আগে কত জঙ্গল ছিল, রাস্তা চওড়া করতে আর কারখানা বানাতে সব কেটে ফেলেছে। মানুষ শালা নিজের মরণ নিজে ডেকে আনছে। পৃথিবীটা একদিন বিলকুল অন্ধকার হয়ে যাবে আর মানুষগুলো সব আদাড়ে-বাদাড়ে মরে পড়ে থাকবে।
এই সুরজ বাঙালি নয়, কিন্তু ওর জন্ম বাঙলায়, বড়ো হওয়াও এখানেই। পারিবারিক জগতে ভিন্ন ভাষার চল থাকলেও সুরজ বাঙলাটা খুব ভালোই জানে। মানুষটা খুব সহজ সরল আর ধর্মভীরু। উঠতে বসতে শংকর বাবা অর্থাৎ মহাদেব ছাড়া কোনও ঠাকুর দেবতার নাম নিতে কেউ কোনোদিন শোনেনি। সুরজের স্টিয়ারিং-এর ঠিক সামনে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর মাঝারি মাপের ফ্রেমে বাঁধানো শংকর বাবার ছবি রাখা। জটাজুটধারী মহাদেবের মোটা গোঁফ-এর দু'প্রান্ত সরু করে পাকানো। সুরজ বলে, মরদ দেওতা তো একজনই, শংকরবাবা।
হঠাৎ খেয়াল করে পাশের শংকর চুপচাপ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ব্যাটা ঢুলে ঢুলে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোবে নাই বা কেন – বয়স তো ষোল কি আঠারো। সারাদিনের খাটুনির পর বেশি রাত অবধি টানতে পারে না। তাঁর উপর ঠান্ডাটাও জমিয়ে পড়েছে। সুরজের লরিতে সিটের পিছনে একজনের শোয়ার মতো একটা ব্যবস্থা আছে, আর কেবিনের উপর দিকে বাঙ্ক মতো করা আছে। সেখানেও একজন শুতে পারে।
ধানবাদ সবে পার হলো। একটা ধাবার কাছাকাছি বাই লেনে সুরজ গাড়িটাকে সাইড করে দাঁড় করায়। স্টার্ট বন্ধ করে শংকরকে ডেকে উপরের বাঙ্কে শুতে পাঠায়। কিছুক্ষণ পর স্টিয়ারিং থেকে নেমে হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখে। কপাল কুঁচকে যায় সুরজের – দু'শো ফুট দূরের গাড়ির হেডলাইটও যেন জোনাকি পোকা। আরও দূরে তাকিয়ে বুঝতে পারে খাদান এলাকা। দূরে দূরে খাদান মুখে আগুন জ্বলছে। চারদিকে ঘন ধোঁয়া, ভালো করে চোখ চলে না। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। কেমন যেন শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। কেবিনে উঠে পড়ে সুরজ। জলের বোতল থেকে জল নিয়ে মুখ চোখটা ধুয়ে নেয় তারপর অনেকখানি জল খেয়ে সিটের পিছনের বিছানাটায় শুয়ে পড়ে। তারও শরীর জুড়ে ক্লান্তি।
এক অলৌকিক ক্ষমতা পেয়েছে সুরজ। শুধুমাত্র চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে হবে কোথায় থাকতে চায় সে – জলে, স্থলে কিংবা আকাশে। সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যাবে সেখানে। যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারবে। যেখানে যতদূরে ইচ্ছা ঘুরতে পারবে। মনে মনে ভীষণ খুশি সে। প্রথমেই তাঁর মনে পড়ে হোশিয়ারপুরে তাদের আদি বাড়ির পিছনে সে একটা তেঁতুল গাছের চারা পুঁতেছিল বহুকাল আগে। বছর পাঁচেক বাদে দেখেছিল গাছটা বেশ বড়ো হয়েছে। চোখ বন্ধ করে সবুজ চলে গেল সেখানে।
- একি! গাছটা কই? এখানে তো চাচার কোঠাবাড়ি। পুরো তল্লাটে শুধু বাড়ি আর বাড়ি। ক্যানালের পশ্চিমপাড়ে বড়ো জঙ্গল ছিল সেটা কই? ওই তো, নাঃ, - এ যে বিরাট কারখানা। কারখানার গা ঘেঁষে বিরাট কলোনি। কিন্তু কেন? এরা গাছগুলো কেটে ফেলেছে কেন? তার বুকের মধ্যেটা মুচড়ে উঠল। চারিদিকে শুধু কারখানা, বাজার, লোকবসতি, নানান আলোর ঝলকানি। আর ক্যানেলটা হয়েছে শহরের মূল নালা, যার পাশ দিয়ে হাঁটতে গেলে দুর্গন্ধে বমি এসে যায়। বড়ো ধাক্কা খেল সুরজ। চোখ বন্ধ করতেই তার মনে পড়ল অম্বিকার কথা। অসম ফরেস্টের রেঞ্জার সাহেবের বাড়িতে কাজ করত মেয়েটা। তখন সুরজের বয়স কতই বা হবে, ছাব্বিশ খুব জোর। মেয়েটার সঙ্গে জোর দোস্তি হয়েছিল। অলৌকিক ক্ষমতায় সুরজ পৌঁছে গেল তার কাছে। থমকে গেল সে,
- লেকিন, অম্বিকা তো বুঢ্ঢী বন গয়ী।
সুরজ তাকিয়ে থাকে তার দিকে, অম্বিকা চিনতে পারে না। সমস্ত শরীরে অকাল বার্ধক্যের ছোঁয়া। তার মাথার চুলগুলো সব উঠে গেছে। পাশাপাশি তাকিয়ে দেখে অনেকেরই অবস্থা তাই। অনেক দূরের এক কেমিক্যাল ফ্যাক্টরির জল নাকি এসে পড়ে ওদের স্নানের দিঘিতে…। সুরজ সহ্য করতে পারে না, ছুটে চলে যায় ফরেস্টের দিকে।
- একি! শহরটা বড়ো হতে হতে তো ফরেস্টকে গ্রাস করছে! শুধু রাস্তা, বাড়ি, হোটেল, দোকানপাট, - গাছ, গাছ কই?
চোখ বন্ধ করে সে চলে যায় আকাশে। উপর থেকে সে অবাক হয়ে দেখে ফরেস্টটা তো ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, গাছগুলোকে এমন লাগছে কেন? যেন প্রাণ নেই। প্লাস্টিকের গাছ – কেমন শুকনো শুকনো – সবুজ রঙটাও কেমন যেন ফ্যাকাসে ধরনের। চারিদিকটা কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া – চোখ জ্বালা করে, বুকের মধ্যে কষ্ট হয়। এমন ভাবেই চোখ বন্ধ করে সে ছুটে চলে যায় কখনও কোডারমার জঙ্গলে, কখনও মধুমালাই জঙ্গলে কিংবা ত্রিপুরার সিপাহিঝোরায়। এক, এক চিত্র নজরে পড়ে তার। মানুষ যেন জোর করে পৃথিবী থেকে সবুজ রঙটা মুছে দিতে চাইছে। সে কত মানুষের সঙ্গে আলাপ করেছে, তাদের হাহাকার শুনেছে। বৃষ্টির জন্য হাহাকার, শুদ্ধ বাতাসের জন্য হাহাকার, নরম উর্বর মাটির জন্য হাহাকার। মানুষ আর পারছে না পৃথিবীর তাপ সহ্য করতে। জ্বলে যাওয়া মাটি, জ্বলে যাওয়া ফসল তাদের চোখের জলও শুকিয়ে দিয়েছে। সাগর থেকে পাহাড় – কোথাও তার ব্যাতিক্রম নেই।
সুরজের চোখের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পায়ের নিচের জলে। বিশেষ ক্ষমতায় জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে ঘুরে বেড়ায় নদীর উৎস থেকে মোহনায়। বিষিয়ে গেছে সব। জড়িয়ে রয়েছে সর্বগ্রাসী বিপন্নতা। বিলুপ্তির অশনি সংকেত কালো থাবা নিয়ে এগিয়ে আসছে। বিষের নদীর বুক ছুঁয়ে তার এগিয়ে চলা শত শত শহর আর জনপদকে দুপাশে রেখে। সুরজ ভাবে, মায়ের বুকের দুধ বিষিয়ে গেলে তো শিশুর মৃত্যু অনিবার্য। দুপাশের মানুষগুলো, আগামীর মানুষগুলো কতদিন টিকে থাকবে এই বিষমাখা জলকে জীবন নামে গ্রহণ করে।
জলের মাছগুলোও যেন ঝাঁক বেঁধে জল থেকে উঠে আসতে চাইছে শুদ্ধ বাতাসের সন্ধানে – জলের তল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঊর্ধ্বমুখে ভেসে চলেছে তারা। কাকে দায়ী করবে সুরজ – মানুষ, মানুষই নিজের শত্রু।
আবার চোখ বন্ধ করে সুরজ ভাবে – আকাশে উঠে অনেক উঁচু থেকে দেখব পৃথিবীটাকে। মুহূর্তের মধ্যে আবহমণ্ডলের বেশ কটা স্তর পেরিয়ে গিয়ে ভাসতে থাকে সুরজ।
কিন্তু পৃথিবী, সেই মাটির পৃথিবী কই? কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না – না পাহাড়, না নদী, না সমুদ্র কোনও কিছু দেখা যাচ্ছে না – এ আমি কোথায় এলাম? এত ধোঁয়া এত ধুলো – কিছুতেই চোখ চলে না। সমস্ত শরীরটা এত ভারি লাগছে কেন!
সুরজ হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। চিৎকার করে, কে, কে দেবে এই বিষ থেকে মুক্তি – কে বাঁচাবে মানুষকে? হঠাৎ তার মনে পড়ে ছোটোবেলার শোনা সেই গল্পটা – সমুদ্র মন্থনে অমৃত উঠলে দেবতারা কাড়াকাড়ি করে সেই অমৃত খেয়েছিলেন অমর হবার জন্য। কিন্তু যখন গরল বা বিষ উঠল সবাই পাশ কাটিয়ে গেলেন – ব্রহ্মাণ্ড রক্ষার দায়িত্ব কেউ নেয়নি, শুধু শংকরবাবা এগিয়ে এসে কণ্ঠে ধরেছিলেন সেই বিষ। তাহলে এবার? তিনিই পারবেন। সবুজ পাগলের মতো ডাকতে থাকে –
শংকরবাবা - শংকরবাবা - শংকর...
হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে সুরজের ঘুম ভেঙে যায়। হেল্পার শংকর তার গা ঝাঁকুনি দিচ্ছে,
- কি হলো ওস্তাদ, ওরকম পাগলের মতো ডাকছ কেন?
সুরজ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শংকরের দিকে। শংকর বকবক করে কত কথা বলে চলেছে। কোনো কথাই তার কানে ঢোকে না। আবার একটা দিনের শুরু। হাইওয়ে দিয়ে অবিরাম গাড়ি চলার শব্দ, পৃথিবীতে আরও কিছুটা বিষ যুক্ত হবে। কী, কী করবে মানুষ – ভেবে উঠতে পারে না। ইশারায় শংকরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় জলের বোতলটার জন্য।

পরিচিতি: গল্পকার, সম্পাদক - 'গ্রুপ থিয়েটার' পত্রিকা।
