গল্প

কালো ডায়েরি



চিরঞ্জিত মাণ্ডি


(১)

"ধর, ধর ব্যাটাকে ধর, ধর ব্যাটাকে তোকে এই তল্লাটের আশেপাশে দেখতে পেলে ঘাড় মটকে রেখে দেব"।

জোরে একটা হাঁফ ছেড়ে গিরিধর হাতের লাঠিটা দূরে সরিয়ে রেখে একটা উঁচু মতন ঢিপিতে বসে, বড়ো করে নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তারপর নিজের মনেই বকবক করতে শুরু করলেন। গিরিধর এই তল্লাটের খুব নামীদামী মানুষ। সবাই তাকে সমীহ করে চলে। বয়স আনুমানিক পঞ্চান্ন বা ষাট হবে। ছিপছিপে গড়ন, মাথার চুল প্রায় নেই বললেই চলে, দূর থেকে টাকটা সূর্যের মতো আলো বিকিরণ করে। মুখের দুই চোয়ালে বসন্তের দাগ রয়েছে, গোঁফ জোড়া একবার তা দিলে সিংহের মত মূর্তি ধারণ করে। বেশ কিছু বছর আগে হার্ট প্লানটেশনের ফলে খানিকটা অকেজো হয়ে পড়েছেন। গিরিধর একটা বিড়ি ধরিয়ে চারপাশটা একটু চোখ বুলিয়ে নিলেন এবং সুখটান দিতে শুরু করলেন। কিন্তু হঠাৎ কার আগমনে চোখ মেলে তাকালেন। রমানাথ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গিরিধর তখনও সুখটানে মত্ত! গিরিধরকে এইভাবে বসে থাকতে দেখে রমানাথ জিজ্ঞেস করলেন, "কি হে, গিরিধর খবর ভালো তো? ব্যবসাপত্র কেমন চলছে"?

গিরিধর বিড়ির চোঙাটা পায়ের নীচে মুলিয়ে নিয়ে খক্ খক্ করতে করতে বললেন, "ভালো নয় ভায়া। গিন্নি গত হওয়ার পর থেকে ব্যবসায় কেমন যেন মন্দা দেখা দিয়েছে"।

গিরিধরের ধানের ব্যবসা আছে। ইদানিং ব্যবসা আর আগের মতন করে চলছে না। রমানাথ গিরিধরের কথায় কি জানি কি মনে করলেন। তার পাশটাতে বেশ জাঁকিয়ে বসলেন। তারপর ইঙ্গিতে বিড়ির আদেশ করলেন! বিড়িতে দুইটান দিয়ে মুখ ও নাক থেকে গলগল করে ধোঁয়া ত্যাগ করে বললেন, "বলব আর কি গিরিধর! পাশের নিশ্চিন্তপুরের হরেনের নাতিটা একটা পাষণ্ড জন্মেছে। ব্যাটা একটা ফেরেক্কেবাজ! জীবনটাকে একেবারের নরক বানিয়ে দিল"। রমানাথের এই কথায় গিরিধর উত্তেজিত হয়ে বললেন, "ব্যাটা একেবারে বাবার মতন হয়েছে। বাবার একটা দিকও হারায়নি। ব্যাটাকে একবার বাগে পাই ওর ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেব"।

গ্রামের এই ছোঁড়াটাকে নিয়ে সবাই চিন্তিত। নিশ্চিন্তপুর, কলিডোবা, সামডা তিন গ্রামের সবাই আজ তাকে নিয়ে খুবই ব্যতিব্যস্ত। গিরিধর বললেন, "শুনলাম, রমানাথ কলিডোবা গ্রামে দু'দিন আগে ডাকাত পড়েছিল। খবরটা কি রমানাথ"?

রমানাথ আরো দু’বার বিড়িটাতে টান দিয়ে বলতে শুরু করলেন, "একদম ঠিকই শুনেছ! যা দিনকাল পড়েছে আর কি বলি তোমায়। এক বিন্দু শান্তিতে নেই মানুষ। শালা! চোর, বাটপারদের আড্ডা হয়ে উঠেছে এই বঙ্গভূমি। আর সেই সুখের দিন নেই গিরিধর। খুব চোখ কান খুলে পা ফেলতে হবে"।

গিরিধর কি যেন ভাবছিলেন হ্যাঁ... বলেই চুপ করে গেলেন। গিরিধরবাবুর কাশিটা ইদানিং খুব বেড়েছে। কাশির সঙ্গে একটা ফ্যাস ফ্যাস ধ্বনি প্রবাহিত হচ্ছে। গিরিধর এইভাবে চুপ করে থাকতে দেখে রমানাথই বললেন, "এইবার উঠি গিরিধর গরুটা ক’দিন ধরে খুবই অসুস্থ, ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করছে না, গরুটার খাওয়ার কিছু ব্যবস্থা করতে হবে"।

রমানাথ চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই গিরিধর উঠে দাঁড়ালেন। তারপর লাঠিটা হাতে নিয়ে বললেন, "চলো ভায়া আমিও যাই। বাড়িতে আবার সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে"।

গিরিধরের ইদানিং মনটা ভালো নেই, গিন্নি গত হওয়ার পর কেমন যেন মনমরা হয়ে পড়েছেন মানুষটা। হাঁটাচলার শক্তিও তেমন নেই। দশ মিনিট হাঁটলেই হাঁপিয়ে পড়েন। গিরিধর যখন বাড়ি পৌঁছলেন তখন প্রায় সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুব দিতে শুরু করেছে। পাখিরা ডানা মেলে নিজেদের কুটিরে ফিরতে শুরু করেছে। ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁ পোকা অনবরত ডেকে চলেছে। গিরিধরের মনে হল হল আজ সন্ধ্যায় বৃষ্টি হবে। মনটা তার কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠল। হঠাৎই তার স্ত্রী গিরিবালার কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল মেঘ ভাঙা বৃষ্টির দিনই গিরিবালা সংসারের সমস্ত মায়া ত্যাগ করে, দূর দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। স্ত্রী বিয়োগের স্মৃতি গিরিধরবাবুকে ভারাক্রান্ত করে তুলল।

(২)

সন্ধ্যে নামতেই বৃষ্টি শুরু হল। দূরের মন্দিরে শুরু হয়েছে সন্ধ্যা আরতি। ক্রমাগত কাঁসর, ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করেছে। গিরিধর পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে একটা বই নিয়ে বসে পড়লেন। অবসর সময়ে বই’ই তার সঙ্গী। শরৎচন্দ্র তার প্রিয় লেখক। এই অবসর সময়গুলিতে তিনি শরৎচন্দ্রের সব বই’ই প্রায় শেষ করে দিয়েছেন। হঠাৎই তার কানে ভেসে আসে কিছু মানুষের চিৎকার। তারা অনবরত উচ্চৈস্বরে চিৎকার করে চলেছে। গিরিধর বিষয়টা প্রথমটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু যত সময় গড়াতে লাগল কোলাহলটা বাড়তে শুরু করল। গিরিধর আর থাকতে পারলেন না, টর্চটা সঙ্গে করে বাইরে বেরিয়ে এলেন। কিছু মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেছে। গিরিধর বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করলেন। কলিডোবা গ্রামের নিতাইকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "কি হয়েছে রে নিতাই এত ছোটাছুটি করছিস কেন"? নিতাই তখনও হাঁপাচ্ছে! কিছুটা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আর বলবেন না জ্যাঠা, নাসির কাকার বাড়িতে ডাকাত পড়েছে গো! বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে তার সমস্ত কিছু লুঠ হয়ে গেছে"।

অগত্যা আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না রওনা দিলেন নাসিরের বাড়ির দিকে। কলিডোবার শেষ প্রান্তে তার বাড়ি। দোতলা বিশিষ্ট, প্রকাণ্ড এক বাড়ি। বাড়ির আঙিনায় একটি পুকুর আছে। বাড়ির দুই পাশে রয়েছে শিমুল আর বনপলাশ গাছ। কলাগাছের বুক চিরে পথটি চলে গিয়েছে তার বাড়িতে। ডাকাতির খবর পেয়ে নাসিরের পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছে। বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া! নাসিরের বউ, মা, দুই ছেলে মেয়ে দেওয়ালের একটা কোণে জুবুথবু অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ঘরের চারিদিকে এলোমেলো অবস্থা। জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। এরই মাঝে একটা জিনিস তাকে আশ্চর্য করল। নিশ্চিন্তপুরের সেই ছোকরাটা, দক্ষিণ দিকের একটা পাঁচিলের দিকে দাঁড়িয়ে কি যেন তদারকি করছে! ছোকরার চালচলন গিরিধরকে কিছুটা অবাক করল। তিনি বুঝতে পারলেন ছোকরাটা কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু ছোকরাটা এই রাতদুপুরে কি খোঁজার চেষ্টা করছে? গিরিধরের কৌতূহল বেড়ে গেল। ভাবলেন, ব্যাটাকে গিয়ে পাকড়াও করি। কিন্তু পেছনে কার ডাকাডাকিতে গিরিধরকে সেই ইচ্ছা ত্যাগ করতে হল। ঘাড় বেঁকিয়ে দেখলেন রমানাথ এসেছে ডাকাতির খবর শুনে। নিশ্চিন্তপুরের কালুর জামাই তাকে খবর দিয়েছে। দূর থেকেই শোনা গেল রমানাথের কণ্ঠস্বর, সে যেন নাসিরকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছে। নাসিরের মনঃপূত না হওয়ায় খানিকটা তর্কের ভঙ্গীতেই বকে চলেছে। গিরিধর কাছে পৌছতেই রমানাথ বলল, "গিরিধর তুমি বল আমার সন্দেহটা কি ভুল! নাসির আমার কথা বিশ্বাস করতেই চায় না"। রমানাথের সন্দেহ ওই ছোকরার দিকে, ছোকরাই নাকি ডাকাত দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই পুরো কাণ্ডটা ঘটিয়েছে। গিরিধর মনে মনে ভাবলেন কিন্তু ছোকরার দ্বারা এই কাজ কোনভাবেই কি সম্ভব? নিশ্চয়ই এর পেছনে অন্য কারোর হাত আছে? ইত্যাদি নানান চিন্তা তার মাথায় ভর করে এলো। নাসিরের কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গীতে বললেন, "নাসির পুলিশে খবর দিয়েছিস"?

- না কাকামশাই!

- সে কি! এত বড়ো কাণ্ড ঘটে গেল, এখনও পুলিশকে খবর দেওয়া হয়নি।

- আমার কি হবে কাকামশাই, আমি যে পথে বসব।

- চিন্তা কোরোনা নাসির। আগে পুলিশকে খবর দাও। তারা নিশ্চয় এর একটা বিহিত করবে।

- হ্যাঁ! এক্ষুনি খবর দিচ্ছি... বলে নাসির ঘরের পথে অগ্রসর হলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের একটা জিপগাড়ি, বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়ির উঠোনে এসে উপস্থিত হল জনা কতক পুলিশ, একজন তদন্তকারী অফিসার, দু’জন হাবিলদার। টর্চ দিয়ে তারা প্রথমে বাড়ির চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখে নিল। তারপর পুলিশের দলটি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। ঘরের আসবাবপত্র, আলমারি, ড্রয়ার, বিছানার বিভিন্ন অংশ একবার ভালো করে পরীক্ষা করে নিয়ে পুলিশের দল বাইরে বেরিয়ে এলো। তদন্তকারী অফিসার নীতিনবাবু কাকনবাড়ি থানার মস্ত অফিসার। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ হবে। চোখে চশমা, শরীরটা মোটা, পেটখানি শরীর থেকে একহাত বেরিয়ে পড়েছে। মাথায় দু-চারটি চুল শর্কির মতো করে দাঁড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। ক্রিমিনালরা তার ভয়ে সিটিয়ে থাকে। নীতিনবাবু একজন হাবিলদারকে কিছু একটা নির্দেশ করে, "নাসিরবাবু কে আছেন..." বলে, একটা ডাক দিলেন। নাসির, গিরিধরের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, নীতিনবাবু ডাক দিতেই সে তৎক্ষণাৎ এসে হাজির হল।

- আপনি কি নাসিরবাবু? বলে, নাসিরকে আগাপাশতলা পরীক্ষা করে নিলেন নিতিনবাবু।

- আমি’ই নাসির। বলুন, অফিসার।

- আচ্ছা, নাসিরবাবু বলুন তো, চুরিটা ঠিক কোন সময়ের মধ্যে হয়েছে?

- অফিসার! রাত ন'টা নাগাদ।

- আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

- আমি আর পরিবার পাশের গ্রামে গিয়েছিলাম, নিমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য।

- আচ্ছা, আচ্ছা।

- আপনার বাড়িতে ক’জন সদস্য?

- অফিসার! আমি, মা, স্ত্রী আর দুই ছেলে মেয়ে।

- ও! ভালো, ভালো। বলে নীতিনবাবু মস্ত হাঁক দিয়ে হাবিলদার নৃপেন চক্রবর্তীকে ডাকলেন। 
হাবিলদার নৃপেন একটা ডায়েরি নিয়ে তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হলেন। নীতিনবাবু বললেন, "নৃপেনদা নাসিরবাবু যা-যা বলছেন সেগুলি সব নোট করে গাড়িতে আসুন"।

নাসিরের বিবরণ অনুযায়ী নগদ দশ লাখ টাকা, পাঁচ ভরি সোনা, জরুরি সব নথিপত্র, দুটি ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস, একটি কালো ডায়েরি তার চুরি গেছে। হাবিলদার নৃপেন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সেগুলি ডাইরিতে তুলে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। গিরিধর হাতের সোনালি রঙের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল রাত প্রায় এগারোটা বাজে। কিছুটা দূরে পঞ্চানন্দদের বাগান বাড়িতে শিয়ালদের দল রাত ঘোষণা করে গেল। ক্রমাগত হুক্কা হুয়া শব্দে সারা বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠল। একটি ভুঁড়িওয়ালা ব্যাঙ খাবি খেতে খেতে দূরের পাতকুয়োর সামনে নিজেকে আড়াল করে নিল। তিনি খানিকক্ষণ ছবির মতো স্থির দাঁড়িয়ে ব্যাঙটির যাত্রাপথ আবিষ্কার করছিলেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ল প্লাস্টার খসে যাওয়া দেওয়ালটার দিকে। সেই ছোকরাটা যে এতক্ষণ বেপাত্তা ছিল, তার হঠাৎ করে আগমন হয়েছে। ব্যাপারটা সন্দেহজনক ভেবে, গিরিধর নাসিরকে ডাকল। গিরিধরের ডাকাডাকিতে নাসির অনেকটা হন্তদন্ত করেই ছুটে এলো। গিরিধর খুক্ করে কাশির আওয়াজ করে বললেন, "নাসির, ওই ব্যাটা হরেনের নাতি না"! নাসির ছেলেটির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, "হ্যাঁ, কাকামশাই"। গিরিধর দেখল, টিংটিঙে চেহারার কিশোর। বুকের পাঁজরের হাড়গুলো বুক চিরে উঠে আসতে চাইছে। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে মুখে একরাশ ক্ষোভ ঝলকে উঠেছে। বয়স বারো কি চোদ্দ হবে! নামটি তার রতন। বখাটে ছেলে হিসেবে গ্রামে তার কদর আছে। সারাদিন টো-টো করে ঘুরে বেড়ায়। খাল-বিল, মাঠ-ঘাট তার একমাত্র পছন্দের জায়গা। শৈশবেই বাবা-মা'কে হারিয়ে কেমন যেন ভবঘুরে হয়ে গেছে। আজ এই বাগানের ফল কাল ওই পুকুরে মাছ চুরি করাই, তার একমাত্র নেশা।

"ব্যাটা একটা চোর..." বলে অস্ফুটে চেঁচিয়ে উঠল গিরিধর। গিরিধরের 'চোর' শব্দ শুনে নাসির বলল, "কাকামশাই রতনের চুরি করা নেশা হলেও মনটা তার সৎ, উদার। মানুষের বিপদে-আপদে তার জুড়ি মেলা ভার! জুতো পালিশ থেকে চণ্ডী পাঠ সব কাজই তার নখদর্পণে। একবার নিশ্চিন্তপুরের বুদো সামন্তর বাড়িতে পাগলা ষাঁড় ঢুকে তাণ্ডব শুরু করলে। বাড়ির সবাই এবং প্রতিবেশীরা হাজার চেষ্টার পরেও ষাঁড়টিকে বাইরে বার করতে বিফল হচ্ছিল। ষাঁড়ের আক্রমণে সামন্ত বাড়ির গিন্নি আহত হন। রীতিমত বাড়ির সবাই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে। চারিদিকে হুলুস্থুলু কাণ্ড। আতঙ্কে বাড়ির সবাই ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের কবল থেকে সামন্ত বাড়ির গিন্নিকে উদ্ধার করার আস্পর্ধা কেউ দেখাতে পারছিল না। খবরটা যখন রতনের কানে খবরটা পৌছোয়, সে তখন বিলের ধারে বসে মাছ ধরছিল। পাশের বাড়ির হোঁতকা মতন ছেলে বিল্টু তাকে খবর দেয়। খবরটা শোনামাত্রই বিল্টুকে সঙ্গে নিয়েই সে সামন্ত বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। এখনও সামন্ত গিন্নি একই অবস্থায় পড়ে আছে আর গোঁঙাচ্ছে। মুখের একপাশ দিয়ে ফেনা কাটছে! কথা বলার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছে। মাঝে মাঝে হেঁচকি তোলার মতো কিছু একটা করছে আর "বাঁচা, বাঁচা..." করে অস্পষ্ট ইঙ্গিত করছে। এই দৃশ্য দেখে নিজের প্রাণের চিন্তা না করে, আটচালার সামনে থেকে হাতে একটা বাঁশের লাঠি নিয়ে রতন ষাঁড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই চলে, শেষ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করে সেই ষাঁড় বাড়ির পশ্চিমের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। সেই যাত্রায় সকলে রক্ষা পায়। রতনের এই অপরিসীম সাহস, বীরত্বয় গ্রামের সবাই মুগ্ধ হয়। পিঠ চাপড়ে সবাই তাকে বাহবা দিয়েছিল। নাসিরের মুখ থেকে রতনের বীরত্বের কথা শুনে মনে মনে অবাকই হল গিরিধর। তার মনে রতন সম্পর্কে নানান ধরনের কল্পনা ভর করে এলো। রতন সম্পর্কে সব ঘটনাই কি সত্যি? রতন কি এত বড়ো ঘটনা পরিণতি দিতে পারে? নানাবিধ ঘটনা তার কল্পনার জানালাকে বদ্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করল। গিরিধর লক্ষ্য করলেন তখনও রতন কিছু একটার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তার দু-চোখে আগ্রাসনের ঝলকবিন্দু। কারোর প্রতি তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কোনো এক নেশায় মেতে উঠেছে সে। গিরিধর শুধুই অবাক হচ্ছিলেন! তিনি এক দৃষ্টিতে রতনের মনের অগণিত জলরাশির বিন্দুগুলি ধরার চেষ্টা করে চলেছেন অবিরত। এক রহস্যময়তা তাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে।

দূর থেকে রমানাথ সবই লক্ষ্য করছিলেন। গিরিধরবাবুর নিষ্প্রভতা তাকে অবাক করছিল। দূর থেকেই ডেকে উঠলেন, "কি হে, গিরিধর এইভাবে নিষ্প্রাণ স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? দেখেছ ছোকরাকে দেখেছ? কীভাবে বোকা বানাচ্ছে? যেন মনে হচ্ছে কিছুই ঘটেনি! ব্যাটা মনে হয় ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না"? অনবরত রমানাথের বকবকানি শোনা গেল এবং তা আকাশের বুক চিরে আকাশ-বাতাস বিদ্ধ করতে লাগল। গিরিধর রতনের অজস্র কেশরাশির মধ্যে যেন খুঁজে চলেছে হাজার বছরের হারিয়ে যাওয়া অমূল্য রতন। মনে হয় এখনও তার বাসনা সিদ্ধ হয়নি। তখনও বকে চলেছেন রমানাথ, "চোরের আবার ভাবভঙ্গী দেখনা"? গিরিধর তখনও রতনের গতিপ্রকৃতি একটু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।

"কোথায় নাসির পুলিশকে একটু খবর দে? চোর ধরা পড়ে গেছে"। অনবরত বলে চলেছে রমানাথ।

যত সময় অতিবাহিত হচ্ছে ততই রহস্যের মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না গিরিধর। ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন রতনের দিকে। রতন তখনও খুবই সন্তর্পণে নিজের কাজ করে চলেছে। কোনোরকম দোলাচল তার মধ্যে লক্ষ্য করা গেল না। রতনের কাছে পৌঁছেই গিরিধর ডেকে উঠলেন, "রতন"! হঠাৎ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কণ্ঠস্বরে রতন খানিকটা চমকে উঠল। ভূত দেখার মতন কিছু একটা অনুভব করল সে।

"রতন, ফাজিল কোথাকার তোর মতলব কি বল তো? এত রাতে কি করছিস এখানে? তাড়াতাড়ি বল, না হলে পুলিশে দেব তোকে"!

রতন নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল গিরিধরবাবুর দিকে। এই প্রশ্নের সে কি উত্তর দেবে ভাবতে লাগল? তার চোখে তখন একরাশ চিন্তা। কারোর অপ্রত্যাশিত আগমনে সে অখুশি। কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল! আগত ব্যক্তির প্রতি তার একরাশ ক্ষোভ। প্রায় পাঁচ মিনিট অতিবাহিত রতন ও গিরিধরবাবু দু-জনেই চুপচাপ। সমগ্র বাড়ি জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা! সবাই কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে পারে না। বনপলাশ ডানা ঝাপটাতে থাকে! নিস্তব্ধতার বিরতি ঘটল রমানাথের আগমনে। রমানাথের দু’চোখে আগুন ঠিকরে পড়ছে।

"বল বজ্জাত তুই চুরি করেছিস? তোর মতিগতি আমার ভালো ঠেকছে না। গিরিধর তুমি পুলিশকে খবর দাও"!

রমানাথের এই প্রস্তাবেও রতন কেমন যেন নীরব হয়ে গেল। তার মুখ থেকে একটি শব্দও নির্গত হল না। শুধু একরাশ ক্ষোভ আর নীরবতা তার দু’চোখ-মুখ দিয়ে ঝলকে ওঠল। গিরিধর হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে দেখল রাত তখন প্রায় বারোটা বেজে সাত মিনিট। বৃষ্টিটা এক পশলা, দু'পশলা করে পড়তে শুরু করেছে। গিরিধর স্পষ্ট অনুভব করল তারা তিনজন ছাড়া আর একটি অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি সেখানে রয়েছে। কিন্তু তাকে ঠাহর করত পারলেন না। সেই কি এই মূল কাণ্ডের নায়ক? মনে নানান প্রশ্ন তৈরি হল তার।

(৩)

পরের দিন সকালে নীতিনবাবু আবার এলেন নাসিরের বাড়ি, বয়ান রেকর্ডের জন্য। একে একে পরিবারের সকলের বয়ান রেকর্ড করলেন। নাসিরের স্ত্রী সুলতানা বেগম। বেশ স্বাস্থ্যবান একজন মহিলা। খুবই রসিক মানুষ। বয়ান রেকর্ডের সময় সেই রসিকভাবনার পরিচয় পাওয়া গেল।

"ধনসম্পত্তি সে গেল যাক, কিন্তু পরানটা তো রক্ষা হল কি বলেন পুলিশ সাহেব"?

নিতিনবাবু মুচকি হেসে উঠলেন। নাসিরবাবুর মা এবং দুই সন্তানকে নানান প্রশ্ন করা হল, তাদের উত্তর প্রায় একই ধরনের। নীতিনবাবু কোনোভাবেই চুরির যোগসূত্র মেলাতে পারছেন না।

তিনি আবার নাসিরকে ডেকে বললেন, "আচ্ছা, নাসিরবাবু এই বাড়িতে আপনার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত অথবা সম্পর্কিত মানুষ কেউ কি আছে"?

- হ্যাঁ, অফিসার। আমার চাকর ভোলা আছে, বললেন নাসির।

- তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না।

- অফিসার, সে একটু দেশের বাড়ি গেছে।

- কেন? হঠাৎ করে তার সেখানে যাওয়ার কারণ কি?

- অফিসার, তার বাবা অসুস্থ। তাই দু'দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে।

- কবে সে গিয়েছে?

- এই দিন-চারেক আগে, অফিসার।

- তাকে একবার খবর দিতে হবে, নাসিরবাবু।

- নাসির মাথা নেড়ে। হ্যাঁ, বলে সম্মতি জানাল।

- আমি আগামীকাল আবার আসবো। তদন্তের বিষয়ে তাকে আমার জেরা করা প্রয়োজন।

এই বলে নীতিনবাবু বেরিয়ে গেলেন। নীতিনবাবু চলে যেতেই নাসির স্ত্রী কাছে এসে বসল।

"সুলতানা আমাদের ভোলা কি, এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত? তোমার মন কি বলে"?

সুলতানা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, "আ মলো যা, আমাদের ভোলা কখনও একাজ করতে পারবে না। আমাদের কোথাও ভুল হচ্ছে"।

নাসিরও ঘটনাটা মেলাতে পারছেন না। না-না ভোলার দ্বারা কখনও এই কাজ করা সম্ভব না!

"আচ্ছা, সুলতানা সেই কালো ডায়েরিটার কথা কি তোমার স্মরণ আছে? সেটাও রীতিমতো উধাও"।

ডাকাতরা ডায়েরি নিয়ে গিয়ে কি করবে সেটা সুলতানার মাথায় ঢোকে না। সে হাঁ করে ভাবে ডায়েরিটার কথা। নাসিরের মনে পড়ে এক ভরা বাদলের রাতে তার একনিষ্ঠ বন্ধু মহম্মদ করিমুল হক তাকে এই ডায়েরি দিয়েছিল। নাসির সুলতানার চোখের দিকে চেয়ে থাকে। কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু পারে না।

(৪)

সকালেই নাসির খবর পাঠালেন ভোলার বাড়িতে। ভোলার বাবা হরিনাথ এখন কিছুটা সুস্থ। তার কিডনির অসুখটা অনেকটা সেরে গেছে। ভোলার আসতে বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। নীতিনবাবু সকাল দশটা থেকে তার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। ভোলা নীতিনবাবুকে হটাৎ বসে থাকতে দেখে একটু ঘাবড়ে গেল। এই রকম ডাকাবুকো মানুষকে দেখে একটু ঘাবড়ে যাওয়ারই কথা। নীতিনবাবু ভোলাকে দেখেই বললেন, "এসো, এসো ভোলা, তোমার অপেক্ষাতেই রয়েছি"।

- আজ্ঞে! সাহেব বলেন আমি আপনারে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? খানিকটা হাঁপিয়ে, হাঁপিয়ে কথাটা বলল ভোলা।

- ভোলা, নিশ্চয় খবর পেয়েছ তোমার মালিক অর্থাৎ নাসিরবাবুর বাড়িতে চুরি হয়েছে।

- আজ্ঞে! হ্যাঁ, সাহেব। চুরি হওয়ার পরের দিনেই আমি ঘটনাটা জানতে পেরেছি। আমি তো সাহেব খুবই ভেঙে পড়েছিলাম খবরটা শোনার পর। আমার দাদাবাবু খুব ভালো মানুষ, কে এমন ক্ষতি করল আমার দাদাবাবুর!

এই কথার পরে ভোলাকে কিছুটা বিধ্বস্ত দেখাল।

- তোমার এই ব্যাপারে কাউকে সন্দেহ হয়?

- আজ্ঞে! তেমন কাউকে সন্দেহ হয়না। তবে আমার দারোয়ানের ওপর সন্দেহ হয়। ওই লোকটি মোটেই সহজ মানুষ নয় সাহেব। তার দৃষ্টিভঙ্গি ভালো নয় সাহেব। বাড়ির জিনিসের প্রতি তার কু-নজর আছে। আমার তো মনে হয় ও-ই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত।

নীতিনবাবু একটা রহস্যের জালে আটকে পড়ছেন। ক্রমশ জটিলতার জট পাকিয়ে যাচ্ছে। রহস্য ভেদ করাটা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। একটা যদি সূত্র পাওয়া যেত, তাহলে তার পক্ষে রহস্য উদ্ ঘাটন করা অনেক সহজ হয়ে যেত।

- নাসিরবাবু আপনার দারোয়ানের নাম কি?

- শক্তিপদ দাস অফিসার। বলল নাসির।

- ও! আচ্ছা, আচ্ছা... বলে নীতিনবাবু চুপ করে গেলেন।

দারোয়ান শক্তিপদ একজন রাশভারী মানুষ। একটি কথা দু’বার বলেন না। কাজের মধ্য দিয়ে তাকে চেনা যায়। মন তার সদা চঞ্চল থাকে। এই মানুষ যে চুরি করতে পারে, নাসিরের তা সহজে বোধগম্য হয় না। সে উদ্ভ্রান্তের মতো ভাবতে থাকে।

নীতিনবাবু দারোয়ান শক্তিপদকে ডেকে পাঠালেন। তখন ঘড়িতে একটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। সূর্যের তীব্র প্রভা সমগ্র আকাশ জুড়ে বিকশিত হয়েছে। অনবরত বাতাসের গান শোনানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। এক প্রকার হন্তদন্ত হয়েই ছুটে এলো শক্তিপদ। বলিষ্ঠ শরীর, গায়ের রং শ্যামলা, একগাল লাল দাড়ি, পরনে নীল ও সাদা রঙের প্যান্ট-জামা সাথে একটা লাঠি। শক্তিপদ আসতেই নীতিনবাবু ভারী গলায় বললেন, "যেদিন চুরির ঘটনা ঘটে তুমি তখন কোথায় ছিলে"?

- আমি, সাহেব মানে আমি তো সন্ধ্যের পরে বাড়ি চলে যাই। আমার ডিউটি তো দিনের বেলায়। দাদাবাবুরা যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, আমিও তখন গেট বন্ধ করে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম সাহেব। আমি কিছু জানিনা সাহেব! যত নষ্টের গোড়া ওই ভোলা, ওই তো বাড়ির ভালো চায় না সাহেব।

"আচ্ছা, আচ্ছা বুঝেছি..." বলে, নীতিনবাবু একবার তাকালেন নাসিরের দিকে। নাসিরকে বেশ খানিকটা বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে। ডাকাতদল ধরা পড়বে কিনা, সে সন্দিহান! নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে নীতিনবাবুর দিকে। নীতিনবাবু রহস্য উদ্ ঘাটনের যোগসূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনি জেদ ধরেছেন যে, এই রহস্যের উদ্ ঘাটন করেই ছাড়বেন। নীতিনবাবুর জিজ্ঞাসাবাদের পর্ব শেষ করতে আরও ত্রিশ মিনিট লাগল। আরও কিছু প্রশ্ন উত্তর পর্ব শেষ করে তিনি বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার পূর্বে নাসিরকে আশ্বস্ত করে গেলেন। ডাকাতদল নিশ্চিত ধরা পড়বে।

(৫)

বেশ কিছুদিন হল রতনের কোনো খবর পাওয়া গেল না। তার হটাৎ করে এই অন্তর্ধান পুরো গ্রাম জুড়ে এক রহস্যময়তা তৈরি করেছিল। গ্রামের মোড়ে, হাটে-বাজারে, অলিতে-গলিতে শুধুই রতনকে নিয়ে চর্চায় মেতে উঠেছে মানুষ। সবার ধারণা রতন ব্যাটাই এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু হটাৎ করেই রতনের আগমন তাদের চকিত করে তোলে। তারা লক্ষ্য করে রতনের মধ্যে বখাটে, ভবঘুরে ভাবটা আগের মতো বিরাজমান নয়। সবাই রতনকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। রতনের আগমনের খবর পৌঁছে যায় গিরিধরের কাছে। গিরিধর ক’দিন যাবৎ রতনের সন্ধান করছিলেন। হটাৎ করেই তার আগমন তাকেও কিছুটা চমকে দেয়। গিরিধরের মনে শুধুই রতন এবং তার অনাবিষ্কৃত কর্মকাণ্ড। গিরিধর এক অনালোকিত পৃথিবীর দিকে অগ্রসর হয়। গিরিধর আর স্থির থাকতে পারলেন না, রতনের সন্ধানে বেরিয়ে গেলেন। গিরিধরের চোখে পড়ল রতনের বাল্যকালের বন্ধু বিল্টু দুলে’কে। বিল্টু রতনের সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছিল। রাস্তায় গিরিধরের ডাকাডাকিতে তাকে থামতে হয়। গিরিধরবাবু মুখটা বিকৃত করে বললেন, "কই রে ছোঁড়া রতনকে দেখেছিস? তার সন্ধান দিতে পারবি"? বিল্টু এই প্রশ্ন শোনামাত্রই বলল, "কেন বলুন তো? তার সঙ্গে আপনার কিসের দরকার"?

- তার সঙ্গে বিশেষ দরকার আছে। তুই শুধু বল সে কোথায় আছে?

বিল্টু আর কিছু বলে না, গিরিধরবাবুকে সঙ্গে নিয়ে সাঁতরাদের আমবাগানে গিয়ে উপস্থিত হয়। গিরিধরবাবু রতনকে দেখতে পেয়ে ডাকলেন, "রতন"! তখনও রতন কোনো একটা হিসাব মেলাতে চাইছে কিন্তু মেলাতে পারছে না। গিরিধরের ডাক শুনে সে চমকে উঠল।

"বল রতন নাসিরের বাড়ির চুরির ব্যাপারে তুই কি জানিস? আমি জানি তুই এই ব্যাপারে কিছু একটা জানিস"? ফুঁসে উঠলেন গিরিধর।

রতন একটি বাক্যও উচ্চারণ করল না। শুধু বলল, "আপনাকে সব ঘটনা পরে বলব জ্যেঠামশাই"।

গিরিধর ক্রমশ অবাক হচ্ছেন, আর ভাবছেন রতন যদি এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে কে এর মূল চক্রী? তার সন্দেহটাই ঠিক, রতন কোনওভাবেই এই কাজের সঙ্গে যুক্ত নয়। সেই রাতের রহস্যময় অদৃশ্য ছায়ার কথাটা তার মনে পড়ছিল। তার বিশ্বাস রতন’ই এই রহস্যের পরিসমাপ্তি ঘটাবে।

(৬)

ভোলা ধরা পড়েছে! তার সঙ্গে ডাকাতদলও ধরা পড়েছে। সে এই ঘটনার মূল চক্রী। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। রতনের প্রচণ্ড বুদ্ধিমত্তার কাছে সে হার মেনেছে। পুলিশ জানিয়েছে রতন না থাকলে এই ঘটনার রহস্য উদ্ ঘাটন কখনই সম্ভবপর ছিল না। তার অসীম সাহস আর দূরদৃষ্টি একটা বৃহৎ ডাকাতদল ধরতে সাহায্য করেছে। রতনের কুড়িয়ে পাওয়া কালো ডায়েরির পিতলের মলাটই ছিল রহস্যের চাবিকাঠি। নাসির অচ্ছেদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রত্যেকটি আলমারি ও সিন্দুকের জন্য পৃথক পৃথক কোডের ব্যবহার করেছিল। সে এই ডায়েরির ভিতরেই আলমারি ও সিন্দুকের লকের প্রতিটি কোড লিখে রেখেছিল। এই কালো ডায়েরির বিষয়টি নাসিরের পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও আর একটি মানুষ জানতো আর সে ছিল ভোলা। ঘরের চাকর হওয়ার সূত্রে সে ঘরের খুঁটিনাটি সব বিষয়ের প্রতি ওয়াকিবহাল ছিল। নাসির মাঝে মাঝে কালো ডায়েরি বের করলে, ভোলা দরজার কোণ থেকে সব বিষয়টা লক্ষ্য রাখত। যেদিন রাতে নাসিরের ঘরের আলমারি ভেঙে চুরি হয়, সেদিন রাতেও ভোলা ডাকাতদলের সঙ্গে উপস্থিত ছিল। সে ডাকাতদলকে দূর থেকে তথ্য চালান করছিল। রতনের দেওয়া কালো ডায়েরির পিতলের মলাট ভোলার উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। খসে পড়া মলাটের একটা কোণে ভোলার আংটি পাওয়া গেছে। ডায়েরি নিয়ে পালানোর সময় আংটির আঘাতে পিতলের একটি অংশের সঙ্গে সেটি খুলে পড়ে যায়। যে আংটির ভিতরের একটি অংশে লেখা ছিল ভোলা চাকলাদার। প্রথমে সে খেয়াল করেনি, কিছুক্ষণ পরে সে জানতে পারে তার হাতে আংটি নেই। আংটির সন্ধানে সেই রাতে এখানেই সে উপস্থিত ছিল। কিন্তু সেই আংটি রতনের হস্তগত হওয়ায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও, সে তার আংটি খুঁজে পায়নি। সে ভেবেছিল ধরা পড়ে যাবে তাই এক প্রকার পাগল হয়েই সে দারোয়ানের কাঁধে দোষ চাপাতে চাইছিল। এবং সমস্ত তদন্ত প্রক্রিয়ায় ধোঁয়াশা তৈরি করার চেষ্টা করছিল। যাতে যেনতেন প্রকারেণ এই যাত্রায় নিষ্কৃতি পায়।

গিরিধর অবাক হয়েছিল রতনের এই বুদ্ধিমত্তায়। একটা একরত্তি ছেলের দুঃসাহসিক কীর্তির জন্য গর্বে তার বুক ফুলে উঠেছিল। তিনি হিসাব মেলাতে চাইছেন কিন্তু মেলাতে পারছেন না। তার হিসাবের খাতা আজ শূন্য।

পরিচিতি: অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার।