মাত্র একুশ বছরের জীবন নিয়ে এসেছিলেন কবি সুকান্ত। তাঁর জন্ম ১৫ আগস্ট, ১৯২৬ এবং অকালে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া ১৩ মে, ১৯৪৭। এই স্বল্পকালীন জীবনেই তাঁর কবি-কীর্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল বাংলার সাহিত্য জগৎ। আরও আশ্চর্যের দিক হলো, তাঁর একুশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে কাব্যসৃষ্টির সময়সীমা ছিল মাত্র আট বছরের - ১৯৩৯-এর মাঝামাঝি থেকে ১৯৪৭-এর মে মাসের প্রথম ক'দিন। তাঁর এই স্বল্পকালের সৃষ্টিই সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে অপার বিস্ময়ের সঞ্চার করেছিল। এই সীমিত জীবনকালেই তাঁর মধ্যে যে বিশ্বচৈতন্যের উদ্ভাস ঘটেছিল এবং মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য লড়াই-আন্দোলনে যে দৃঢ়তায় তাঁর লেখনীকে তিনি ধারণ করেছিলেন তা একদিকে যেমন ব্যতিক্রমী, আবার অন্যদিকে অসীম বিস্ময়ের। সুকান্ত বাংলা কবিতার ভুবনে অবিনাশী যৌবন নিয়ে এসেছিলেন। আজ কবির জন্মশতবর্ষেও তাঁর সেই বিস্ময়কর কবিপ্রতিভার বিচ্ছুরণ তীব্রভাবে বাংলা সাহিত্যের জগৎকে প্রদীপ্ত করছে।
এই সূত্রে এখানে আমরা অতীত ইতিহাসকে একটু স্মরণ করতে পারি। সুকান্তর মতোই আরেক অসামান্য তরুণ প্রতিভাধর সাহিত্যিককে বাংলা সাহিত্য জগৎ অকালে হারিয়েছে। তিনি হলেন তরুণ কমিউনিস্ট, শ্রমিক নেতা ও বিপুল সম্ভাবনাময় লেখক সোমেন চন্দ (২৪ মে, ১৯২০ - ৮ মার্চ, ১৯৪২)। মাত্র বাইশ বছর বয়সে ঢাকার রাজপথে ফ্যাসিস্ট সমর্থকেরা তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তরুণ লেখক সোমেন চন্দর শহিদ হবার ঘটনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়। সোমেন ও সুকান্ত দু'জনেরই অকালে চলে যাওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বাংলা সাহিত্যের।

কবিচেতনার উদ্ভাস
তিরিশ ও চল্লিশের দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছিল নানা ঘটনার আবর্তে অস্থির - উত্তাল। এই সময়কালে দেশে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার আন্দোলন যেমন তীব্র হয়ে উঠেছিল, আবার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের উত্থান ও হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি বাহিনীর আগ্রাসী যুদ্ধোন্মাদনা পৃথিবীর বুকে গভীর সংকট তৈরি করেছিল। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের প্রগতিকামী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিবেকবান লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের সংঘবদ্ধ হবার প্রয়াসও লক্ষ করা যায়। আবার ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার সূত্রে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে শ্রেণি চেতনার বিকাশ ও সমাজতন্ত্রের যুগান্ত সৃষ্টিকারী বার্তা রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক আঙিনায় নতুন ভাবনার সঞ্চার করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা তখন তাঁদের সীমিত শক্তি নিয়েই শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের দাবি ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেশকে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করার কঠিন সংকল্প নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। লক্ষণীয় দিক হলো, এই সময়েই বাংলার বুকে হানা দিয়েছিল ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ ও লাখো লাখো দরিদ্র মানুষের প্রাণঘাতী মন্বন্তরের ভয়াবহতা (১৯৪৩)। সেই সঙ্গে ১৯৪৬-এর কুখ্যাত ভাতৃঘাতী দাঙ্গা বাংলার বুকে ভয়াবহ মৃত্যুর বিভীষিকা তৈরি করেছিল। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি সমকালীন সৃষ্টির জগৎকেও ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল। অন্যান্য সমস্ত ক্ষেত্রের মতো সাহিত্য জগতেও তখন উঠে এসেছিলেন বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক, বিষ্ণু, সুভাষ, সোমেন চন্দর মতো সাহিত্যিক ও কবিরা। তখন সুকান্তর বয়স মাত্র চোদ্দ-পনেরো। এই কালপর্বেই সুকান্তর কবি চেতনার উন্মেষ। তবে একথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন, পরিবারের সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহ শৈশবেই সুকান্তর মধ্যে কাব্য-সাহিত্যের বীজ অঙ্কুরিত হতে সাহায্য করেছিল। তাই আমরা লক্ষ করি সুকান্তর যখন মাত্র আট-নয় বছর তখনই লিখে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি ছড়া। তারপরআমরা দেখব আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে নানা ঘটনাবলি,বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা, সমকালীন আন্দোলন-সংগ্রাম সবকিছুই উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়।

কবি সুকান্ত - শিল্পী: দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
মার্কসবাদ: কাব্যসৃজনের দিশারি
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সুকান্ত ছিলেন আদ্যন্ত একজন রাজনৈতিক কবি। মার্কসবাদী দর্শন তাঁর চেতনাকে সজীব ও সমৃদ্ধ করেছে। এই চেতনার আলোকেই তিনি সমসাময়িক বিশ্ব, দেশ, সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষকে দেখেছেন, ইতিহাসের গতিধারাকে বিশ্লেষণ করতে শিখেছেন। এই চেতনাই তাঁর কাব্যসৃজনের পথকে আলোকিত করেছে। আজও তাঁর বিভিন্ন কবিতার পঙ্ক্তি নানা অন্যায়-অপহ্নবের বিরুদ্ধে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে, রাজপথের মিছিলে হয়ে ওঠে দৃপ্ত স্লোগান, লড়াই-আন্দোলনের শানিত অস্ত্র।
এর সমর্থন মেলে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়-এর বক্তব্যে। তিনি 'সুকান্ত সমগ্র'-র ভূমিকায় এক জায়গায় লিখেছেন:
"আজ যাঁরা সুকান্তর কবি প্রতিভাকে এই ব'লে উড়িয়ে দিতে চান যে, সুকান্তর কবিতায় স্লোগান ছিল - তাঁদের বলতে চাই,সুকান্তর কবিতায় স্লোগান নিশ্চয়ই ছিল। কবিতার জাত যাওয়ার ভয়ে স্লোগানগুলোকে রেখে ঢেকে সে ব্যবহার করে নি। হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত যে ভাষা হাজার হাজার মানুষের নানা আবেগের তরঙ্গ তুলেছে তাকে কবিতায় সাদরে গ্রহণ করতে পেরেছিল বলেই সুকান্ত সার্থক কবি।"
এই লেখারই আরেকটি অংশে গুরুত্বপূর্ণ কথার উল্লেখ পাই,যেখানে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলছেন, "কবিতাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে আমাদের যেমন রাজনীতির আসরে ঢুকতে হয়েছিল, সুকান্তর বেলায় তা হয়নি। সুকান্তর সাহিত্যিক গুণগুলোকে আন্দোলনের কাজে লাগানোর ব্যাপারে অন্নদারও (তৎকালীন ছাত্রনেতা অন্নদাশংকর ভট্টাচার্য) যথেষ্ট হাতযশ ছিল। সুকান্তর আগের যুগের লোক ব'লে আমি পার্টিতে এসেছিলাম কবিতা ছেড়ে দিয়ে; আর সুকান্ত এসেছিল কবিতা নিয়ে। ফলে, কবিতাকে সে সহজেই রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে পেরেছিল।"
কবি সুকান্ত স্বল্পায়ু জীবন নিয়ে এসেও বাংলা সাহিত্যের জগতে গরিমার আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি যেমন তাঁর কাব্যের ঝংকারে সাহিত্যের জগৎকে আলোড়িত করেছিলেন, তেমনি তাঁকে নিয়েও বাংলার শ্রেষ্ঠতম কবি-লেখকেরা কবিতা রচনা করে তাঁর কবিপ্রতিভাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সংক্ষেপে সেই কবিতাগুলোর উল্লেখই এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।

'রেড এড হোমে সুকান্ত', শিল্পী: সোমনাথ হোর
কবি-কীর্তি
মূল প্রসঙ্গে যাবার আগে সুকান্তর কবিপ্রতিভার চিহ্ন মেলে ধরতে তাঁর রচিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা এখানে তুলে ধরা হলো। তার মধ্যে 'ছাড়পত্র' কবিতার অনবদ্য পঙ্ক্তি:
"এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;/ জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে/ চলে যেতে হবে আমাদের।/ চলে যাব - তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/ এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক'রে যাব আমি-/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"
আবার 'রবীন্দ্রনাথের প্রতি' কবিতায় ফুটে উঠেছে দুর্ভিক্ষপীড়িত সময়ের মর্মন্তুদ ছবি:
"আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি,/ প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।/ আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,/ আমার বিনিদ্ররাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,"...
১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলারের নাৎসি বাহিনী সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করলে বিশ্বযুদ্ধের প্রকৃতি যায় পালটে। এই সময়ের অভিঘাত বছর পনেরোর তরুণ সুকান্তর চিত্তকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রতিক্রিয়ায় তিনি লেখেন:
"দূর পূর্বকাশে,/ বিহ্বল বিষাণ উঠে বেজে/ মরনের শিরায় শিরায়।/ মুমূর্ষু বিবর্ণ যত রক্তহীন প্রাণ-/ বিস্ফারিত হিংস্র বেদনায়।"...('পূর্বাভাস')
এই পটভূমিতেই তিনি রচনা করেন 'জাগবার দিন আজ', 'ছুরি', 'জনযুদ্ধের গান', 'চট্টগ্রাম: ১৯৪৩' প্রভৃতি কবিতা। এর মধ্যে 'ছুরি' কবিতাটি তিনি রচনা করেছিলেন তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায়। সেখানে তিনি লিখেন:
"শঙ্কাকুল শিল্পী প্রাণ শঙ্কাকুল কৃষ্টি,/ দুর্দিনের অন্ধকারে ক্রমশ খোলে দৃষ্টি। হত্যা চলে শিল্পীদের, শিল্প আক্রান্ত/ দেশকে যারা অস্ত্রহানে তারা তো নয় ভ্রান্ত।/ বিদেশী-চর ছুরিকা তোলে দেশের হৃদ-বৃন্তে/ সংস্কৃতির শত্রুদের পেরেছি তাই চিনতে।/... শহীদ্-খুন আগুন জলে শপথ অক্ষুণ্ণ:/ এদেশ অতি শীঘ্র হবে বিদেশী-চর শূন্য।"
তাঁর রচিত 'লেনিন' কবিতায় বাঙ্ময় হয়েছে লেনিনের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দুরন্ত ঘোষণা:
"লেনিন ভেঙেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,/ অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।/ আজকেও রুশিয়ার গ্রামে ও নগরে/ হাজার লেলিন যুদ্ধ করে,/ মুক্তির সীমান্ত ঘিরে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে।"...
ওই সময়ে কিশোর বয়সেই তিনি লেনিন-এর বিপ্লবী সত্তাকে ধারণ করেছিলেন নিজের অনুভবে। তাই মূর্ত হয়েছে তাঁর 'লেনিন' কবিতার শেষ দুটি পঙ্ক্তিতে -
"লেনিন ভূমিষ্ট রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,/ বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন।"
সুকান্ত তাঁর চিন্তা-চেতনা, আদর্শবোধ অনুপম আঙ্গিকে প্রতিফলিত করেছেন তাঁরই রচিত বিভিন্ন কবিতায়। এর মধ্যে 'রানার', 'একটি মোরগের কাহিনী', 'সিঁড়ি', 'কলম', 'সিগারেট', 'চারাগাছ', 'দেশলাই কাঠি', 'চিল' প্রভৃতি প্রতীকী কবিতায় মার্কসবাদী শ্রেণি চেতনাকে যেভাবে তিনি প্রোথিত করেছেন, তার নজির বাংলা সাহিত্যে প্রায় বিরল।

সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত 'প্রার্থী' কবিতার পোস্টার। শিল্পী: দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
অগ্রজ কবি-সাহিত্যিকের রচনায়
আগেই বলা হয়েছে, সুকান্ত তাঁর সৃষ্টির মধ্যদিয়ে বাংলা সাহিত্য জগতের স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর অগ্রজ কবি-সাহিত্যিকেরা তাঁদের রচনার মধ্য দিয়ে কবিকৃতিকে বরণ করে নিয়েছিলেন। মিহির আচার্য সম্পাদিত 'সুকান্তনামা' গ্রন্থটি (প্রথম প্রকাশ - বৈশাখ, ১৩৫৭) তারই উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করছে। এর দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় (২৯ বৈশাখ, ১৩৭৫) এক জায়গায় মিহির আচার্য যে কথার উল্লেখ করেছিলেন, তা সংক্ষিপ্ত হলেও এই গ্রন্থ প্রকাশের উদ্দেশ্য, সুকান্তর কবিমানস, তাঁর জীবনবোধকেই প্রতিভাত করে। তিনি লিখেছেন:
"সুকান্তনামা আনুষ্ঠানিক অর্থে প্রিয় কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়। বরং বলা যায় এ যেন আমাদের নিজেদের প্রতিই শ্রদ্ধাবোধ জাগানো।আমাদের যা কিছু সামাজিক অঙ্গীকার তারই প্রত্যয়ী ঘোষণা দৃপ্ত হয়ে উঠেছে এই গ্রন্থে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে জাতীয় স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্রায়ম্ভ পর্যন্ত যে-যুগ কবিমানসে বিধৃত আমরা সে-কালেরই সহযোদ্ধা। সুকান্ত এই কারণেই আমাদের কাছে প্রিয় যা আমরা পারিনি সে একক চেষ্টায় তা প্রতিবিম্বিত করেছে। সুকান্ত সর্বকালের তারুণ্যের প্রতিনিধি। যেখানে আশা-উদ্দীপনা-সাহস-সংগ্রাম সেখানেই সুকান্ত তার কবিহৃদয়ে বিস্তৃত। এমনভাবে মানুষকে ভালোবাসার ইতিহাসও পৃথিবীতে তুলনারহিত।"
এই গ্রন্থে 'সুকান্ত-জীবন ও কাব্য' শিরোনামে মুখবন্ধ লিখেছিলেন সুকান্তর স্কুলজীবনের সাথি কবি ও সাহিত্যিক অরুণাচল বসু। সেই মুখবন্ধের কয়েকটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। তারই এক জায়গায় তিনি সুকান্ত সম্পর্কে লিখেছেন: ..."কবিতাকেও সে উৎসর্গ করেছিল মানুষের মহত্তর জীবন আনবার কাজে, সমাজ বদলাবার কাজে।" আবার আরেকটি জায়গায় তিনি লিখছেন: "অনেকে আপত্তি তোলেন তার প্রথম দিকের কবিতায় রাজনৈতিক স্লোগান সম্পর্কে। বিয়াল্লিশ সালে তার রাজনীতির অনেক স্লোগান সাজানো আছে 'বিবৃতি', 'বোধন' কি অন্যান্য কবিতায়। কিন্তু 'বিবৃতি', 'চট্টগ্রাম' কি 'মণিপুর' না লিখলে লেখা হতো কি 'রানার'? আর 'রানার' না লিখতে জানলে কী করে লিখতো 'আগ্নেয়গিরি' 'ছাড়পত্র' 'চিল' কি 'প্রার্থী'র মতো কবিতা, – যা বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে স্থান পাবে? এ জাতের কবিতা লিখতে গেলে চাই ঘনিষ্ঠ জনসংস্রব,আর পরিষ্কার রাজনৈতিক দৃষ্টি। তাই বলতে হয় রাজনীতি করতে গিয়ে 'সে কবি হ'তে পারল না' নয়, রাজনীতি করেই সে সার্থক কবি হলো।"
এই গ্রন্থটির প্রচ্ছদ একেঁছিলেন সুকান্তর অতি ঘনিষ্ঠ অগ্রজ চিত্রশিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। গ্রন্থটিতে বাংলার তিরিশ জন অগ্রগণ্য লেখক ও কবির কবিতা সংযোজিত হয়েছে। সেখান থেকে কয়েকটি কবিতার অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো, যার মধ্য দিয়ে কবিদের নিজস্ব অনুভূতির পাশাপাশি সুকান্তর কবি-জীবনের চিত্রউদ্ভাসিত হয়েছে।
প্রথম কবিতাটি বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সুকান্তর অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি 'স্বাধীনতা' পত্রিকায় 'সুকান্ত ভট্টাচার্য' শিরোনামে কবিতাটি লিখেছিলেন। সেটিই এখানে সংযোজিতহয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছেন:
..."তোমার যক্ষ্মা হয়েছে?/ এও বুঝি ষড়যন্ত্র রাত্রির মেঘের,/...তোমার বুক কুরে খাচ্ছে টিবি কীট।/ দুর্যোগের ঘন কালো মেঘ ছিঁড়ে কেটে/ আমরা রোদ এনে দেব ছেলেটার গায়ে,/আমরা চাঁদা তুলে মারব সব কীট।/ কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা।/ বুলেটের রক্তিম পঞ্চমে কে চিরবে/ ঘাতকের মিথ্যা আকাশ?/ কে গাইবে জয়গান?"...
এর পরের কবিতাটি কবি বিষ্ণু দের। তিনি 'কাসান্ড্রা' কবিতায় লিখছেন:
"ভোরের সূর্যে রক্তের স্বাদ লাগে/ সে কার রক্ত/ বীরের রক্ত স্রোতে কেন জাগে মাতার অশ্রুজলে/ মাতার রক্তে পথের ধূলায় জাগে/ সূর্যোদয়ের রাঙা!/ শক্ত আলোয় পাঙাশ দিনের চুরমার হাহাকার/ হে নবজীবন আলো যৌবন নীল আকাশ জ্বলজ্বলে।"...
কবি অরুণ মিত্র তাঁর 'কি ভেবেছিল সুকান্ত?' নামের কবিতায় লিখেছেন:
"মৃত্যুর আগের দিন পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে কি ভেবেছিল/ সুকান্ত? যে ছোট্ট বুকটা আর ছোট্ট মাথাটা অনবরত কবিতায়/ উথলে উঠত তাদের নিঃশব্দ শেষ ডাক শুনতে পাওয়া গেল না।/ আমি নিশ্চিত জানি, তা একদিন হঠাৎ চিৎকার করে উঠবে।/ যাদবপুর হাসপাতালের মাঠ বাড়ী পুকুর তার আওয়াজে গমগম/ করতে থাকবে। ভালোবাসার, আশার, নৈরাশ্যের, মৃত্যুর/ আরোগ্যের, সংগ্রামের সেই তীব্র হারানো ভাষা যাদবপুরের/ রোগীদের বিছানা ছাড়িয়ে আমাদের সকলের ঘরে এসে/ তোলপাড় বাধিয়ে দেবে।/ কিন্তু ততদিন আমার মাঝে মাঝে/ মনে হবে, মৃত্যুর আগের দিন পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে কি/ ভেবেছিল আমাদের সুকান্ত?/ রোদের একটা ঝলক যদি/ সুকান্তর অন্ধকার অন্ত্র আর ফুসফুসের মধ্যে ঢুকতে পারত!"
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ যেন বিলাপ করেছেন তাঁর 'সুকান্ত-স্মরণে' কবিতায়। তিনি প্রথম স্তবকে লিখেছেন:
"ভিখারী গাছের ডাল পালা নড়ে/ শুষ্ক জীর্ণ পাতা ঝরে পড়ে/ মঞ্জরী কচি কিশলয় শুধু/ নির্ভীক নিরাসক্ত,/ একী সত্য? একী সত্য?"...
আর শেষ স্তবকে ফুটে উঠেছে নিদারুণ বেদনার ছবি -
"আহা নবযুগে নওল কিশোর!/ কেঁদে ফিরে গেল সারা নিশিভোর/ মুছে গেল কাল-বৈশাখী মেঘে/ শিশু-সূর্যের রক্ত;/ এ যে নিদারুণ সত্য!"
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর 'উজ্জীবন' কবিতার শেষাংশে উচ্চারণ করেছেন:
"একটি কিশোরের আশ্চর্য কণ্ঠের কাকলি স্তব্ধ ক'রে দিয়ে/ মাটির বুকে টেনে আনে এক ঝলক রক্ত/ তারপর সমস্ত শরীর জুড়ে শাদা কাপড় বিছিয়ে/ মৃত্যুর গুণকীর্তন করে-/ সুকান্ত তোমার সেই আততায়ীকে/ পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দিয়ে/ তোমাকে বাঁচাবো।"
কবি মণীন্দ্র রায় তাঁর রচিত 'সুকান্ত-কে' কবিতায় সুকান্তর চিরঞ্জীব স্মৃতিকে তুলে ধরেছেন অসাধারণ আঙ্গিকে -
"দেহ তো, সবাই জানে,/ কালের আহার;/ সময় চিবোয় নিত্য/ মেদমজ্জা যতো উপচার/ কিন্তু কেউ কেউ থাকে/ খায় যে সময়;/ কালের গরল বুকে/ চিরায়ু সে, স্মৃতির সঞ্চয়।/ তেমনি, সুকান্ত, তুমি/ আমাদেরও ঘরে/ চোখের আড়ালে চোখ,/ স্পর্ধা তুমি মৃত্যুর শিয়রে।"
এই গ্রন্থে কবি বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের 'সুকান্ত' শিরোনামে একটি অসামান্য কবিতার সন্ধান পাই আমরা। যেখানে রোগ-জরায় দীর্ণ শরীর নিয়েও সুকান্ত যে স্বপ্ন, বিশ্বাস ও আদর্শকে লালন করে গেছেন তারই উল্লেখ পাই শব্দ-ছন্দের মিলনে কাব্যিক অবয়বে -
"সুকান্ত! তোমার গলা দিয়ে/ রক্ত উঠতো। বুকের পাঁজর/ মনে হ'তো ভেঙ্গে যাচ্ছে। গায়ে/ দিনরাত লেগে থাকতো জ্বর,/ নির্মম যক্ষ্মার মার। তবু/ কোনোদিন তুমি অপ্রেমের,/ ঈর্ষার জ্বালায় অচেতন/ প্রলাপ বকো নি। আদর্শের/ স্বপ্ন, সাধ, বিশ্বাস তোমাকে/ প্রচণ্ড অসুখে নিরাময়/ মনুষ্যত্ব দিয়েছিলো। তাই/মৃত্যুর হিংসা-কে তুমি জয়/ করেছো কবিতা দিয়ে।"...
বিশিষ্ট গণশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস 'সুকান্ত স্মরণে' কবিতায় উল্লেখ করেছেন, তাঁর সংগ্রামী অভিযাত্রায় বিভিন্ন পর্যায়ে প্রিয়সাথি কয়েকজনকে অকালে হারানোয় যন্ত্রণাদগ্ধ হলেও 'ব্যর্থ আপশোস' ব্যক্ত করেননি। সুকান্তকে অকালে হারানোর দুর্বিষহ অভিঘাত সত্ত্বেও তাঁর কবিতা যে তাঁকে ঋজু থাকতে প্রাণিত করেছে এই কবিতায় সেটাই তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন:
"এ জীবনে দেখিলাম ভগ্নডানা কতো ভ্রষ্টনীড়/ পালক-কোমল বুক বিঁধে গেলো কত বিষতীর,/ মৃত্যুকীট কেটে খেলো তপ্ততাজা কত ফুসফুস/ সয়ে গেছি ক্ষয়ক্ষতি করিনিতো ব্যর্থ আপসোস।/ তবু যদি দুর্বিষহ দুঃখভারে নুয়ে গেছে মাথা/ ন্যুব্জ-দেহ ঋজু করে দিয়ে গেছে তোমার কবিতা।/ কিন্তু কবি তুমি নেই মানবতার এই দুর্বিপাক/ আজ তা কেমনে সই পাঞ্চজন্য নিজে স্তব্ধবাক।"...
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর রচিত 'সুকান্ত-কে' কবিতায় তুলে ধরেছেন কবির ঘুমভাঙানিয়া চেতনার কথা -
"ঘুমন্ত এই প্রান্তরে কেউ গান/ শোনায়নি, তাই বিষণ্ণ নিঃঝুম/ সবাই যেন ঘুমিয়েছিলাম; ঘুম/ ভাঙলে তুমি গানের ঢেউয়ে প্রাণ/ ছড়িয়ে দিয়ে। আমরা সবাই শোক/ ভুলতে গিয়ে ঘুমিয়েছিলাম; আজ/ চোখের থেকে ঘুমের সে নির্মোক/ খসিয়ে দিলে সুকান্ত ভট্চাজ।"...
কবি সিদ্ধেশ্বর সেন তাঁর 'সুকান্তকে: কবিকে সাথীকে' কবিতায় সুকান্তর আদর্শের তীব্রতার, তাঁর প্রতিজ্ঞার শরিক হবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে লিখেছেন:
"যে তীব্রতায় জ্বলে উঠেছিলে তুমি সুকান্ত,/ সে তীব্রতা আমারো।/ যে প্রতিজ্ঞায় আজো বাঁচো তুমি, সুকান্ত,/ সে প্রতিজ্ঞা আমারো,/ সুকান্ত আমাকে তোমার সাথী করো,"...
কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'কবির মৃত্যু' কবিতায় বলেছেন:
"যাই।/ সূর্যঝরা আকাশ যদি, চোখে অগাধ অন্ধকার/ যাই।/ আলোয় আলো দিন পিছনে, গান রইলো, গান।"...
কবি কৃষ্ণ ধরসুকান্তকে স্মরণ করে প্রত্যয়ী বার্তা দিয়েছেন তাঁর 'কোন লোকান্তরিত কবি-কে' শীর্ষক কবিতায় -
"আজকে তোমার নামে/ আমি এক অখ্যাতের কবি/ নিরন্ন কলমে আঁকি ফসলের ভাবি প্রতিচ্ছবি।"...
কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সুকান্ত স্মরণে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের পীঠস্থান কাকদ্বীপসহ বড়া কমলাপুর, চন্দনপিঁড়ির দুর্বার লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর 'বুধাখালি (সুকান্ত-কে)' কবিতায় -
"সুকান্ত, আমারো চোখে ঘুম নেই আজ/ কাকদ্বীপে কান্না শুনি নবজাতকের:/ পিশাচেরা কেড়ে নেয় মুঠি মুঠি ধান-/ বুলেটে হয়েছে বিদ্ধ তাজা তাজা প্রাণ/ মাটি হয়ে ওঠে লাল রক্তে রক্তে মৃত শহীদের/ সেখানে হাজারো তুমি, কার্তিক-শিশির-ভরদ্বাজ।"...
কবি ও শিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রীর 'প্রাতঃস্মরণ' কবিতার উল্লেখ করে এ প্রসঙ্গের আলোচনা বেঁধে রাখছি। তিনি প্রথম স্তবকে লিখছেন:
"আগুনে খাক্ আকাশ/ গুমোট বাতাস/ ক্ষ্যাপা ঝড়;/ কবি! ঘর কোথায়? ভাঙলো ঘর।/ ভাঙা কবাট,/ খাঁ খাঁ মাঠ/ শুধু আল ভাঙা অথৈ জল;/ কবি! ফসল কই? সব লুট ফসল।"...
এই নিবন্ধের সীমিত পরিসরের কথা ভেবে বাদ রয়ে গেল আরও সব বিশিষ্ট কবির রচনা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি রাম বসু ('যখন অনেক রাত'), যুগান্তর চক্রবর্তী ('২৯-এ বৈশাখের কবিতা'), বিমল ভৌমিক ('সুকান্ত-কে'), তরুণ সান্যাল ('দুঃখে ইতিহাসে, সুকান্তকে মনে করে') এবং অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় ('সনেট ও তিনটি লাইন' সুকান্ত ভট্টাচার্যকে নিবেদিত) প্রমুখ।
এই সমস্ত কবিতার মধ্য দিয়ে এটাই প্রতিভাত হয় যে, কবি সুকান্ত অকালে চলে গেলেও তাঁর জীবন ও সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের জগতে আজও সজীব এবং প্রগতির লড়াইয়ের অন্যতম ভাষ্যকার।
তাঁর মতো কবির লেখনীতেই তো সৃষ্টি হতে পারে শব্দ-ছন্দে এবং গভীর বিষয়-ভাবনার সমারোহে অনন্যসাধারণ কাব্যিক ঝংকার -
"হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোরগদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!
প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা--
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়:
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।"
('হে মহাজীবন')
প্রাসঙ্গিক তথ্য:
* 'সুকান্ত সমগ্র' , সুকান্ত ভট্টাচার্য, সারস্বত লাইব্রেরি, ২০৬ বিধান সরণী,কলিকাতা-৭০০০৬।
* 'সুকান্তনামা', সারস্বত লাইব্রেরি, ২০৬ বিধান সরণি, কলকাতা-৭০০০৬
* 'রাজনীতির কবি-বিপ্লবের কবি সুকান্ত', প্রবন্ধ, সন্দীপ দে, দেশহিতৈষী, শারদ সংখ্যা, ২০২৫।

পরিচিতি: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী।
