প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

রাজ কাপুর: ভারতীয় সিনেমায় বলিউডে এক স্বপ্নের সওদাগর (শতবর্ষের শ্রদ্ধা)



সিদ্ধার্থ সেন


এ এক আশ্চর্য সমাপতন! অভিকরণ শিল্পের জগতে প্রথম মহাযুদ্ধ-অব্যবহিত প্রায় অর্ধদশকের মধ্যে এই দেশে অনেক গুণী ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছিল। যেমন সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২), দিলীপকুমার (১৯২২-২০২১), মৃণাল সেন (১৯২৩-২০১৮), দেব আনন্দ (১৯২৩-২০১১), রাজ কাপুর (১৯২৪-১৯৮৮), তপন সিংহ (১৯২৪-২০০৯), সলিল চৌধুরী (১৯২৫-১৯৯৫), ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬), তৃপ্তি মিত্র (১৯২৫-১৯৮৯), বাদল সরকার (১৯২৫-২০১১), উত্তমকুমার (১৯২৬-১৯৮০) প্রমুখ। এই সময়সীমায় আরও অনেক গুণীজন জন্মগ্রহণ করেছিলেন সন্দেহ নেই কিন্তু একটি তারার কথা আলোচনা করতে গিয়ে এই লেখায় বাকি তারারা থাকুন 'শব্দের আড়ালের গভীরে'।


সহধর্মিণী কৃষ্ণা-র সাথে রাজ কাপুর।

এই লেখার অভিমুখ ভারতীয় সিনেমার সর্বকালের সেরা এক শোম্যান 'বিগ ম্যান উইথ ব্লু আইজ' বলিউডের রাজ কাপুরকে নিয়ে, যিনি একাধারে অভিনেতা-চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। তাঁর জন্ম ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের পেশোয়ারে। তাঁর পিতা বিখ্যাত মঞ্চ ও সিনেমার বিখ্যাত অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুর ও মা রামসরনী দেবী। ছেলে হলে মা ভেবেছিলেন নাম দেবেন 'সৃষ্টিনাথ', ছেলেই হল কিন্তু প্রসবযন্ত্রণা উঠলে বাবা পৃথ্বীরাজ একটি চিরকুটে নাম লিখে বালিশের তলায় রেখে দেন। সেই নামটি ছিল 'রণবীররাজ'। পরবর্তীকালে এই নামের অপভ্রংশ 'রাজ' তাঁকে দেশে-বিদেশে প্রভূত খ্যাতি দান করে। জীবনে প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে দিশাহারা পৃথ্বীরাজ কাপুর ১৯২৭ সালে পেশোয়ার থেকে আইনজীবীর পেশা ত্যাগ করে ভারতে মুম্বইয়ে চলে আসেন। তিনি 'ভারতীয় গণনাট্য সংঘ'র অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। একসময় তিনি কলকাতায় 'নিউ থিয়েটার্স'-এর প্রাণপুরুষ বি. এন. সরকারের কাছে মাস মাইনের চাকরি করেছেন ,সপরিবার কলকাতায় থেকেছেন; ১৯৩৮ সালে কলকাতায় তাঁর ছোটো ছেলে শশী কাপুরের জন্ম হয়। চলচ্চিত্র তৈরিতে কলকাতার নিউ থিয়েটার্সের বাংলা ও হিন্দি ভাষায় তখন খুব সুনাম। হিন্দি সিনেমার নির্বাক যুগের নয়টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করার পর পৃথ্বীরাজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সবাক ছবি 'আলম আরা' (১৯৩১)-তে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। 'বিদ্যাপতি' (১৯৩৭) ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসা পাওয়ার পর তিনি বিখ্যাত হন সোরাব মোদির 'সিকান্দার' (১৯৪১) ছবিতে আলেকজান্দার চরিত্রে অভিনয় করে। পাশাপাশি মঞ্চাভিনয়ও চলছিল সাধ্যমতো। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই রাজের সামনে এই জীবনের নকশা ছড়ানো ছিল। জীবিকার টানে তখন পৃথ্বীরাজ কখনো দেহরাদুন, কখনো কলকাতা, আবার কখনো মুম্বই। এই ভ্রাম্যমাণ জীবনের ফলে রাজেরও বারবার স্কুল বদলাতে থাকে। ১৯৩০-এর দশকে তিনি দেহরাদুনের কর্নেল ব্রাউন কেমব্রিজ স্কুলে ও পরবর্তীকালে মুম্বইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভরতি হন। তিনি পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না। স্কুলে নিত্যদিন অভিযোগ, কখনো কখনো প্রহারও জুটত কপালে। এমনিতে বোকাসোকা, খেতে ভালবাসেন, মোটাসোটা চেহারা বলে দেহরাদুনে স্কুলের বন্ধুরা তাঁকে খেলায় অংশগ্রহণ করতে দিতনা। কিন্তু প্রতি বছর তিনি এলোকিউশনে পুরস্কার পেতেন। অথচ স্কুলের নাটকে অভিনয় করার তাঁর খুব শখ, কিন্তু ভারী চেহারার বালকটির সেই সুযোগ মেলে না। বাড়িতে ছিল তাঁর প্রিয় একটি ছোট্টো সিন্দুক যেটির চাবি তিনি খুব সাবধানে নিজের কাছে রাখতেন, তাঁর বাবা-মা ছোটো দুই ভাই শমশের (শাম্মি) ও বলবীর (শশী)-কে রাজের পিছনে গোয়েন্দার মতো লাগিয়েও সেই রহস্যময় সিন্দুকের গোপনীয়তা জানতে পারেননি। অনেক কষ্ট করে স্কুলের নাটকে একবার জনতার ভিড়ে সুযোগ পেলেও একটি দৃশ্যে মঞ্চে উঠতে গিয়ে পা জড়িয়ে পড়ে যাওয়ায় শিক্ষকের চরম অপমান তাঁকে চরম ব্যথিত করে। এই ঘটনায় দর্শক আসনে উপস্থিত থাকা মা রামসরনী শঙ্কিত হয়ে একদিন তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই গোপন সিন্দুকটি খুলে চক্ষু চড়কগাছ! তার ভিতরে দেশবিদেশের সিনেমার পত্রিকা এবং পেপার কাটিংয়ে ভরতি যার মধ্যে আছে অভিনয় সংক্রান্ত নানা প্রবন্ধ, আছে সিনেমা নির্মাণ বিষয়ে যাবতীয় তথ্যাদি। সেদিনই তাঁর মা বুঝে গিয়েছিলেন ছেলের কোন্ ভবিষ্যের প্রতি আগ্রহ। কলকাতায় তিনি কিছুদিন ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়েছিলেন।

ম্যাট্রিকুলেশনের প্রাথমিক পরীক্ষায় ডাহা ফেল করায় তাঁর ভবিষ্যৎ এক বড়ো প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে গেল! ততদিনে থিয়েটারে বেশ নামডাক হয়েছে পৃথ্বীরাজের। ধীরে ধীরে মুম্বই শহরে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর অভিনয়ের ও পৃথ্বী থিয়েটারের। বাবার সঙ্গে যোগ দেন রাজ। প্রথাগত শিক্ষাচর্চা না করে আগামী পাঁচ বছর তিনি ফিল্ম স্টুডিয়োয় নানা ধরনের কাজ শিখতে চান বলে বাবা পৃথ্বীরাজের কাছে মত ব্যক্ত করেন। 'পৃথ্বী থিয়েটার'-এ রাজ শিক্ষানবীশ হিসেবে স্টুডিয়ো ফ্লোর ঝাঁট দেওয়া, নানা প্রপস এগিয়ে দেওয়া, আলো-পাখা চালানো ইত্যাদি কাজ করতেন। কিন্তু নিজের কাছে রেখে ছেলেকে সিনেমার কাজ শেখাতে নারাজ ছিলেন পৃথ্বীরাজ। তিনি ছেলেকে পাঠিয়ে দেন পরিচালক বন্ধু কেদার শর্মার কাছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কড়া ধাঁচের মানুষ। ক্ল্যাপস্টিক বয় হিসেবে তাঁর ইউনিটে যোগ দেন রাজ। তিনি নিজেকে ক্যামেরায় দেখে শুধু খুশিই হতেন না, নিজের মনে কল্পনা করে নিজেই নায়ক হয়ে যেতেন। একদিন একটা শট নেওয়ার সময় সাংঘাতিক একটা ঘটনা ঘটল। প্রায় সূর্যাস্ত হয়ে এসেছে,এমন সময় একটু অঙ্গভঙ্গি করে নায়কের মতো ঘুরে যেই অন্যমনস্ক হয়ে ক্ল্যাপস্টিক দিতে যান রাজ সেটা তখন আটকে যায় রাজা চরিত্রের দাড়িতে এবং ক্ল্যাপবোর্ডের টানে দাড়ি খুলে চলে এল তার সঙ্গে। এই ঘটনায় উত্তেজিত কেদার শর্মা রাজ কাপুরের গালে শুটিংয়ে ইউনিটের সামনে সপাটে এক চড় কষিয়ে দেন। এই তিরস্কার পুরস্কার হিসেবে দেখা দিল তাঁর জীবনে। এর পরে কেদার শর্মা পরিচালিত পরবর্তী ছবি 'নীলকমল' (১৯৪৭)-এর কন্ট্রাক্ট ফর্ম ও পাঁচ হাজার টাকার একটা চেক তিনি পান। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, মাত্র দশ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর অভিনয় এই নগর কলকাতায় দেবকী বসুর পরিচালনায় নিউ থিয়েটার্সের 'ইনকিলাব' (১৯৩৫) ছায়াছবিতে। এর বহু বছর পর তাঁর আত্মপ্রকাশ মধুবালার সঙ্গে 'নীলকমল' (১৯৪৭) ছবিতে। কিন্তু সেই ছবি জনপ্রিয়তা পেল না। কিন্তু এই ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে রাজ বাবা পৃথ্বীরাজের কাছে আবদার করলেন সিনেমা পরিচালনা ও অভিনয় করার। এর নেপথ্যে ছিল হয়তো এই ভাবনা, তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, থিয়েটারের জগতে থাকলে তাঁকে পৃথ্বীরাজ কাপুরের ছেলে হয়েই পরিচিত হতে হবে আর সিনেমায় তিনি এমন কিছু করবেন যাতে পৃথ্বীরাজের পরিচিতি ঘটে তাঁর পিতা হিসেবে। তিনি নার্গিসের সঙ্গে প্রথম জুটি বাঁধলেন 'আগ' (১৯৪৮) সিনেমায়। এই ছবিতে তিনি তিনটি ভূমিকায় - পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪ বছর হলেও এই ছবিতেই তিনি বুঝিয়ে দেন হিন্দি সিনেমার জগতে এক বিরাট পরিবর্তন আনতে তিনি সক্ষম। এই সিনেমা থেকেই তিনি নিজের জীবনের অনেক ঘটনা সেলুলয়েডে তুলে আনেন। এই ছবির নায়কও থিয়েটার ভালোবাসেন এবং বাবার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন, নায়কের সঙ্গে একাধিক নায়িকার সম্পর্ক।


'বরসাত' (১৯৪৯) ছবির একটি বিখ্যাত দৃশ্য।

এরপর 'আন্দাজ' (১৯৪৯)-এ তাঁর সহযোগী শিল্পী দিলীপকুমার। ওই বছরেই প্রকাশ পেল 'বরসাত', এই ছবিতেও নার্গিস নায়িকার ভূমিকায়। তখন নার্গিস আর রাজ পরস্পরের প্রেমে পাগল। আর. কে. ফিল্মস তখন ক্ষতির সম্মুখীন। এই অবস্থায় নার্গিস বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের গয়না বেচে সব টাকা রাজকে দিয়ে দেন ,পাশাপাশি বাইরের প্রডিউসারদের ছবিতে টাকা উপার্জন করে সেই টাকাও দেন। রাজ কাপুরের প্রথম স্বতন্ত্র প্রকাশ ঘটল 'আওয়ারা' (১৯৫১) ছবিতে। অভিনয় জীবনে যাঁকে আইডল বা আদর্শ হিসেবে তিনি মেনে নিয়েছিলেন সেই চার্লি চ্যাপলিনের অনুসরণে ভবঘুরে 'ট্র্যাম্প' চরিত্রে অভিনয়ের শুরু এই ছবিতে। সঙ্গে মুকেশের কণ্ঠে সেই বিখ্যাত গান 'আওয়ারা হুঁ', লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে 'ঘর আয়া মেরে পরদেশী', 'এক বেওয়াফা সে প্যার কিয়া', কিংবা শামশাদ বেগমের কণ্ঠে 'এক দো তিন' প্রভৃতি গান জনপ্রিয় হয়। ছবিটিতে কোথাও যেন সোশ্যালিজমের ভাবনা দেখা যায় যা পরপর অনেকগুলি ছবিতে অনুবর্তিত হয়। এরপর 'বরসাত' (১৯৪৯) - যে ছবিতে পৌরাণিক ধর্ম, আর সস্তা মেলোড্রামার মিশেলে ভরা এতদিনের হিন্দি ফিল্মের জগতে একটা বড়ো পরিবর্তন এনে দিলেন রাজ।


'বরসাত' (১৯৪৯) ছবিতে ভবঘুরে চরিত্রে রাজ কাপুর।


চার্লি চ্যাপলিনের বাসগৃহ ('মানোইর ডি ব্যান'), যা মন্ট্রেক্স-এর কাছে সুইজারল্যান্ডের কর্সিয়ার-সুর-ভেভেতে অবস্থিত সেখানে সফরকালে বিশেষ সাক্ষাৎ করতে এসেছেন (বাঁদিক থেকে) রাজ কাপুর, বিজয় ভাট, হৃষিকেশ মুখার্জি, দেব আনন্দ, পি. টি. জানি এবং নার্গিস।


চার্লি চ্যাপলিনের সাথে রাজ কাপুর। জর্জিয়া, ১৯৫৫।

তারপর 'বুটপালিশ' (১৯৫৪), 'শ্রী ৪২০' (১৯৫৫), 'জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়' (১৯৬০) প্রভৃতি একের পর এক হিট ছবি। হলিউডের অনুসরণে আঙ্গিকের যে বদলের সূচনা তিনি জীবনের প্রথম পরিচালিত ছবি 'আগ'-এ আনতে সচেষ্ট হয়েছিলেন 'বরসাত'-এ এসে তা সম্পূর্ণতা পেল বলা যায়। হলিউডের পরিচালক ফ্রাঙ্ক কাপরার ছবি তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর ছবির মতোই রাজের এই সময়ের বিভিন্ন সিনেমায় সাধারণ চেহারার নায়ক চরিত্র ক্রমে সুপারহিরোতে পরিণত হয়। আর ছবির প্রকরণশিল্পের দিক থেকে তাঁকে প্রভাবিত করলেন হলিউডের আর একজন পরিচালক - অরসন ওয়েলস। তাঁর ছবির প্রেরণাতেই ছবির ক্ষেত্রে আলো-আঁধারি, ক্লোজ-আপ শটে ব্যাক-লাইটের স্বপ্নমায়া ধীরে ধীরে সত্যের সহযোগী হয়ে উঠতে লাগল। 'বরসাত' ছবিটির পর 'আওয়ারা' ছবিতে এসে রাজ তাঁর সিনেমার ক্যামেরাম্যান বদলালেন, ইউনিটে এলেন ক্যামেরামান হিসেবে পরবর্তীকালে বিখ্যাত রাধু কর্মকার। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই ছবি থেকে 'রাম তেরি গঙ্গা মইলি' (১৯৮৫) পর্যন্ত তিনি রাজ কাপুরের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং পাশাপাশি আর একটি তথ্য মনে করা যেতে পারে তা হল, রাজ কাপুর পরিচালিত দশটি ছবির মধ্যে নয়টি ছবিতেই ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রী হিসেবে রাধু কর্মকার যুক্ত ছিলেন।

ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার বছরেই মধুবালার সঙ্গে জুটি বেঁধে রাজ কাপুরের সিনেমা বেরিয়েছিল 'নীলকমল' যদিও তা দর্শক সমাদৃত হয়নি। সেই সময় বলিউড সাম্রাজ্যের পূর্বতন অভিনয়ের সম্রাটরা - অশোককুমার, বলরাজ সাহনিরা নায়ক থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছেন চরিত্রাভিনয়ে। তাঁদের শূন্যস্থান পুরণ করতে এগিয়ে আসছেন দিলীপকুমার (ইউসুফ খান), দেব আনন্দ (ধরম দেবদত্ত পিশোরিমল আনন্দ) ও রাজ কাপুর (রণবীর রাজ কাপুর) - এই তিনজন তরুণ অভিনেতা যাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছাড়া আর একটা বিষয়ে খুব মিল তা হল তাঁরা তিনজনই দেশভাগের ফসল। দিলীপকুমার ও রাজ কাপুর এসেছিলেন অবিভক্ত ভারতের পেশোয়ার থেকে, আর দেব আনন্দ পাঞ্জাব থেকে। তখন ভারতীয় সিনেমার দর্শকদের বেশিরভাগ পছন্দ করতেন মেলোড্রামা। এই তিনজন এবং দক্ষিণে শিবাজি গণেশন আর পূর্বে আমাদের উত্তমকুমার ধীরে ধীরে জনপ্রিয় নায়ক হয়ে উঠছিলেন সেই সময় থেকে। গ্রাম থেকে শহরে আসার ঢল তখন মানুষের। সেই জনসাধারণের মনের মানুষ, তাদের স্বপ্নপূরণের প্রতীক হয়ে উঠছেন সেলুলয়েডের ফ্রেমে রাজ কাপুর এবং অন্যান্যরা। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ তাঁর ছবির আঙ্গিক, বক্তব্য ও পরিবেশনায় বদল এনেছেন।


শিল্পী বাল ঠাকরের ডিজাইন করা 'আর. কে. ফিল্মস'-এর লোগো।


চলচ্চিত্রে 'আর. কে. ফিল্মস'-এর লোগোর দৃশ্যায়ন।

নার্গিসের সঙ্গে যখন প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন রাজ তখন তিনি দুই সন্তানের পিতা। 'বরসাত' ছবির সাফল্যের পর তৈরি হয়েছিল 'আর. কে. ফিল্মস'-এর সেই বিখ্যাত লোগো - রাজের এক হাতে বেহালা আর অন্য হাতে নার্গিস তাঁর কোলে আধো শোয়া। রিয়েল লাইফ মিলে গেল রিল লাইফের সঙ্গে। 'আওয়ারা' (১৯৫১) থেকে রাজের শেষ পরিচালিত ছবি 'রাম তেরি গঙ্গা মইলি' (১৯৮৫) পর্যন্ত এবং তারপর তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র রাজীব কাপুর পরিচালিত ছবি 'হেনা' (১৯৯১) ছবিতে এই লোগোর ব্যবহার ঘটেছে। শোনা যায় এই লোগোটির ডিজাইন করেছিলেন শিল্পী বাল ঠাকরে (পরবর্তী কালে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা দলের প্রধান)।

রাজ কাপুরের অভিনীত ছবির সংখ্যা সম্ভাব্য ৬৭। তার মধ্যে ১০টি ছবি নিজের পরিচালনায়। আর ১৬টি ছবিতে নার্গিস ও রাজ কাপুর জুটি অভিনয় করেছেন যার শুরু 'আগ' (১৯৪৮) আর শেষ 'জাগতে রহো'। 'আওয়ারা' ছবিতে মুকেশের কণ্ঠে 'আওয়ারা হুঁ' এই গান দোলা লাগাল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিধ্বস্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থী এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। 'শ্রী ৪২০' ছবিতে নায়ক রুশী চেহারাসদৃশ রাজের অভিনয় ও মুকেশের কণ্ঠে 'মেরা জুতা হ্যায় জাপানি/ ইয়ে পাতলুন ইংলিশস্তানি/ শর পে লাল টোপি রুশি/ ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি' - সেই প্রবাহকে আরও জোরদার করে তোলে। লক্ষণীয়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে, এই উপমহাদেশে দেশভাগ-পরবর্তী ভারতে যখন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ এক প্রবল সংকটের মুখে, সংখ্যাতীত বাস্তুহারা মানুষের ঢল নেমেছে দেশের বিভিন্ন অংশে, সেই প্রতিবেশে দেখা দিয়েছিল 'আওয়ারা' বা 'শ্রী ৪২০'-এর মতো ছবি। আবার তেমন এক জীবনের সমুদ্রে সাঁতার কেটে দিশাহারা চরিত্র দেখা দিয়েছিল 'মেরা নাম জোকার' ছবিটির মূল চরিত্রটিতে। জীবনের সঙ্গে সিনেমাকে একাকার করে ফেলেছিলেন বলে তাঁর নানা সিনেমায় নিজের জীবনের নানা ঘটনা টুকরো টুকরো হিসেবে এসেছে। পণ্ডিত নেহরুর ভারতের ভাবনা ছিল রাজের ছবি বানানোর নেপথ্যে। সামাজিক পরিবেশ, গ্রামীণ নগর ও শ্রেণি বিভাজন, সাধারণ মানুষের বঞ্চনার উপলব্ধি ও তথাকথিত সভ্য মানুষের সমাজকে চ্যালেঞ্জ, পরিবর্তিত সমাজের নৈতিক দ্বিধা সবকিছু রাজের সিনেমায় আপাত দৃশ্যের আড়ালে ফল্গুধারার মতো বয়ে যায়। পাশাপাশি এক সম্প্রীতির বার্তাও তিনি রেখে যেতে চান কোনো সংলাপ বা গানের কথায়।

(দুই)

তাঁর সব ছবির ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য তা হল, একাধিক বক্স-অফিস হিট গান। জীবনের নায়ক-পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন রাম গাঙ্গুলি। এই ছবির 'জিন্দা হুঁ ইস তরাহ কে' (মুকেশ), 'কাহে কোয়েল শোর মচায়ে রে' (শামসাদ বেগম), 'সোলহ বরষ কী' (শামসাদ বেগম ও মহম্মদ রফি) প্রভৃতি গান জনপ্রিয় হয়। তাঁর বেশিরভাগ ছবির সংগীত পরিচালক শঙ্কর জয়কিষণ। 'বরসাত' (১৯৪৯) থেকে শুরু করে 'আওয়ারা' (১৯৫১) - 'শ্রী ৪২০' (১৯৫৫) - 'আনাড়ি' (১৯৫৯) - 'জিস দেশ মেঁ গঙ্গা বহতি হ্যায়' (১৯৬০) - 'সঙ্গম' (১৯৬৪) - এবং 'মেরা নাম জোকার' (১৯৭২) পর্যন্ত প্রচুর জনপ্রিয় ফিল্মি গান দর্শক-শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন এই জুটি। 'বরসাত' ছবিতে 'হাওয়ামেঁ উড়তা যায়ে' (লতা মঙ্গেশকর), 'জিয়া বেকরার হ্যায়' (লতা), 'বরসাত মেঁ হমসে মিলে' (লতা), 'মেরি আঁখো মেঁ বস গয়া কোঈ রে' (লতা), 'পতলি কোমর হ্যায়' (লতা ও মুকেশ), 'ম্যাঁয় জিন্দগি মেঁ হরদম' (মহম্মদ রফি) প্রভৃতি গান দর্শক-শ্রোতার দ্বারা বন্দিত হয়। 'আওয়ারা' ছবিতে 'ঘর আয়া মেরা পরদেশি' (লতা), 'আওয়ারা হুঁ' (মুকেশ), 'এক দো তিন' (শামসাদ বেগম), 'যব সে বালম ঘর আয়ে' (লতা), 'হম তুঝসে মোহব্বত কর কে' (মুকেশ) ইত্যাদি গান আজও বহু মানুষ শোনেন। 'আনাড়ি' সিনেমায় 'দিল কী নজর সে' (লতা ও মুকেশ), 'নাইনটি ফিফটি সিক্স' (লতা ও মান্না দে) , 'ওহ চাঁদ খিলা ওহ তারে হঁসে' (লতা ও মুকেশ), 'সব কুছ শিখা হমনে' (মুকেশ) ইত্যাদি গান জনপ্রিয় হয়েছিল।


প্রখ্যাত গায়ক মুকেশ-এর সাথে রাজ কাপুর।


রাজ কাপুর ও তাঁর সহধর্মিণী কৃষ্ণা-র সাথে আন্তরিক মুহূর্তে লতা মঙ্গেশকর।

বিখ্যাত সুরকার খৈয়াম রাজ কাপুরের একটি ছবিতেই সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ছবির নাম 'ফির সুবহ হোগি' (১৯৫৮)। এই ছবিতে 'ওহ সুবহ কভি তো আয়েগি' (আশা ভোঁসলে ও মুকেশ), 'আশমান পে হ্যায় খুদা আউর জমিন পে হম' (মুকেশ), 'জিস প্যার মে ইয়ে হাল হো' (মুকেশ ও মহম্মদ রফি) প্রভৃতি গান ছিল। এর আগেই 'শ্রী ৪২০' (১৯৫৫) ছবিতে সংগীত পরিচালক শঙ্কর জয়কিষণের সুরে 'মেরা জুতা হ্যায় জাপানি' (মুকেশ), 'দিল কা হাল শুনে দিলওয়ালা' (মান্না দে), 'ইচক দানা বিচক দানা' (লতা ও মুকেশ), 'প্যার হুয়া ইকরার হুয়া' (লতা ও মান্না দে), 'রামাইয়া ভস্তাওয়াইয়া' (আশা, লতা ও মহম্মদ রফি), 'মুড় মুড়কে না দেখ মুড় মুড়কে' (আশা ও মান্না), 'ও জানেওয়ালে মুড়কে জারা দেখতে যানা' (লতা)-র মতো অনেক গান প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এরপর তিনি একটি দ্বিভাষিক ছবি নির্মাণ করলেন 'জাগতে রহো' (১৯৫৬ / বাংলা 'একদিন রাত্রে') যে ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সলিল চৌধুরী। বাংলা ভার্সনটিতে অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাস, প্রদীপকুমার, পাহাড়ি সান্যাল, গঙ্গাপদ বসু সহ ইফতিকার, রাজ কাপু্র প্রমুখ এবং একটি ক্যামিও চরিত্রে নার্গিস। বাংলায় 'এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়' (মান্না / হিন্দিতে 'জিন্দেগি খোয়াব হ্যায়' (মুকেশ), 'জাগো মোহন প্রীতম' (হিন্দিতে 'জাগো মোহন প্যারে' / লতা)। এরপর রাজ কাপুরের প্রযোজনায় এবং রাধু কর্মকারের পরিচালনায় 'জিস দেশ মেঁ গঙ্গা বহতি হ্যায়' (১৯৬০)। সেই ছবিতেও একাধিক জনপ্রিয় গান যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'আ অব লৌট চলে' (লতা ও মুকেশ), 'হোঠোঁ পে সাচ্চা রহথি হ্যায়' (মুকেশ), 'হ্যায় আগ হমারে সিনে মে' (আশা, মুকেশ, মহেন্দ্র কাপুর ও মান্না দে), 'ও বসন্তী পবন পাগল' (লতা), 'হো ম্যায়নে প্যার কিয়া' (লতা) ইত্যাদি। এরপর সংগীতপ্রিয় দর্শক তাঁর কাছ থেকেউপহার পেল 'সঙ্গম' (১৯৬৪) ছবি। এই ছবিতেও একাধিক জনপ্রিয় গান - 'মেরে মন কী গঙ্গা আউর তেরে মন কী যমনা কা' (মুকেশ), 'ও মেরে সনম' (লতা ও মুকেশ), 'ইয়ে মেরা প্রেমপত্র পড় কর' (মহম্মদ রফি ও লতা), 'হর দিল যো প্যার করেগা' (মুকেশ, মহেন্দ্র কাপুর ও লতা), 'দোস্ত দোস্ত না রহা' (মুকেশ) রাজ কাপুর ব্যবহার করেছিলেন।


'মেরা নাম জোকার' (১৯৭০) ছবির গানের এলপি রেকর্ডের কভার। কভারে ছবির সংগীত পরিচালক শঙ্কর-জয়কিষণ-এর ছবিও দেখা যাচ্ছে।


'মেরা নাম জোকার' (১৯৭০) ছবির একটি দৃশ্য।

এরপর সত্তরের দশকের সবচেয়ে বিগ বাজেটের, তাঁর স্বপ্নের ছবি 'মেরা নাম জোকার' (১৯৭০), যা তেমনভাবে দর্শক আনুকূল্য না পেলেও এক মহৎ প্রচেষ্টা ছিল বলা যায়। 'সঙ্গম' এবং এই ছবিটির প্রদর্শন সময় ছিল চার ঘণ্টার। এত বড়ো ছবি থ্রিল, অ্যাকশন, বাদ দিয়ে শুধু প্রেম, বিরহ, গান ও মেলোড্রামা দর্শক হয়তো পছন্দ করেনি। তাঁর সব ছবিতেই নিজের জীবনের কিছু কিছু ঘটনার প্রক্ষেপ ঘটেছে ফিল্মের পরিসরে। শোনা যায় সত্যজিৎ রায় 'মেরা নাম জোকার' - এই ছবি পছন্দ করলেও এর দৈর্ঘ্য বিষয়ে রাজ কাপুরকে সচেতন করেছিলেন। রাজ কাপুর একসময় চেয়েছিলেন সত্যজিৎ তাঁর আর. কে. ফিল্মসের ব্যানারে একটি ছবি পরিচালনা করুন, কিন্তু সেই অনুরোধ সবিনয়ে সত্যজিৎ ফিরিয়ে দেন। 'মেরা নাম জোকার' ছবির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বেও ছিলেন শঙ্কর জয়কিষণ। এই ছবিতেও একাধিক জনপ্রিয় গান ছিল - 'জিনা ইহাঁ মরনা ইহাঁ' (মুকেশ), 'জানে কহাঁ গ্যয়ে ওহ দিন' (মুকেশ), 'এ ভাই জরা দেখকে চলো' (মান্না), 'অঙ্গ লাগ যা বালমা' (লতা), 'কহতা হ্যায় জোকার সারা জমানা' (মুকেশ), 'তিতর কে দো আগে তিতর' (আশা ও মুকেশ), 'দাগ না লগ জায়ে' (আশা ও মুকেশ)। এই ছবিটি বানানার আগে পরিচালক হিসেবে রাজ দীর্ঘদিন নিজেকে ছবির জগৎ থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন যদিও অভিনেতা হিসেবে অন্যের ছবিতে কাজ করেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন দর্শকের অভিরুচির ধীরে ধীরে বদল ঘটছে। এই ছবিতে তিনি তাঁর মধ্যম পুত্র ঋষি কাপুরকে 'রাজু' নামের একটি চরিত্রে নির্বাচন করেন। এই সিনেমাটি বানাতে গিয়ে তাঁর প্রচুর টাকা দেনা হয়ে যায় এবং তা মেটাতে তিনি ঋষি ও ডিম্পল কাপাডিয়াকে নিয়ে কিশোর প্রেমের ছবি বানান - 'ববি' যে ছবিতে আপাতত শ্রেণিবৈষম্যের কথা থাকলেও শেষে প্রেমের জয় হয়। এই ছবিতেও লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল প্রতিটি গানকেই তাঁদের সুরের বৈচিত্র্যে জনপ্রিয় করেন। এই সিনেমায় পুরুষকণ্ঠ হিসেবে শৈলেন্দ্র সিং অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর কণ্ঠে 'ম্যায় শায়র তো নহি' সহ অন্যান্য গানগুলিও সুপার হিট হয়। এছাড়া 'বেশক মন্দির মসজিদ তোড়ো' (চঞ্চল), 'বাহার সে কোঈ অন্দর ন আ সকে' (লতা ও শৈলেন্দ্র সিং), 'এ ফঁসা' (লতা)', 'মুঝে কুছ কহনা হ্যায়' (লতা ও শৈলেন্দ্র সিং), 'না চাহুঁ সোনা চাঁদি' (মান্না, শৈলেন্দ্র), 'ঝুট বোলে কাউয়া কাটে' (লতা ও শৈলেন্দ্র) ইত্যাদি সুপারডুপার হিট হয়।

এরপর সংগীতনির্ভর ছবি বিতর্কিত 'সত্যম শিবম সুন্দরম' (১৯৭৮)। সেই ছবিতে স্বল্পবসনা জিনত আমনের উপস্থিতি বলিউডের ফিল্মজগতে তথা সারা দেশে ঝড় তুলেছিল। কিন্তু যৌনতাকে তিনি বিনোদনের সঙ্গে মিলিয়ে মানবমনস্তত্বের অজানা দিকটিকেও হয়তো দেখাতে চেয়েছিলেন 'মেরা নাম জোকার' ছবিতে। 'সত্যম শিবম সুন্দরম' সিনেমায় সৌন্দর্য ও যৌনতা কি এক না আলাদা? - এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয় শিক্ষিত ইঞ্জিনিয়র নায়ক চরিত্রটি (অভিনয়ে শশী কাপুর)। এই ছবিতেও অসাধারণ কিছু গান লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল জুটি উপহার দেন। টাইটেল সং 'সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্' (লতা), 'ভোর ভয়ে পঙ্ঘট পে' (লতা), 'যশোমতী মাইয়া সে বোলে নন্দলালা' (লতা ও মান্না), 'চঞ্চল শীতল নির্মল কোমল' (মুকেশ) ইত্যাদি গান প্রবল জনপ্রিয় হয়। এরপর দুটি ছবি 'প্রেমরোগ' (১৯৮২) ও 'রাম তেরি গঙ্গা মইলি' (১৯৮৫) ছবি পরিচালনা করেন রাজ কাপুর। প্রথম ছবিটিতে 'ম্যায় হুঁ প্রেমরোগী' (সুরেশ ওয়াড়কর), 'ভমরে নে খিলা ফুল' (লতা ও সুরেশ), 'ইয়ে গলিয়াঁ ইয়ে চৌবারা' (লতা), 'মোহাব্বত হ্যায় ক্যা চীজ' (লতা ও সুরেশ), 'মেরি কিসমত মে তু নহি শায়দ' (সুরেশ ও লতা) ইত্যাদি গান দর্শক-শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করেছিল। আর দ্বিতীয় ছবিটির সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সুরকার রবীন্দ্র জৈন। এই ছবিরও একাধিক গান জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। যেমন, টাইটেল সং 'রাম তেরি গঙ্গা মইলি' (লতা), 'তুঝে বুলায়ে ইয়ে মেরি বাহেঁ' (লতা), 'ম্যায় হি ম্যায় হুঁ' (সুরেশ ওয়াড়কর) প্রভৃতি গান। শেষোক্ত দুটি ছবিতেও যৌনতা ছবির গল্পে মিশে আছে যে নগ্নতাকে শিল্পী রাজ বলতেন 'মুকাদ্দাস উরিয়া' (পবিত্র নগ্নতা) তার প্রয়োগে তিনি একাধিকবার বিতর্কেরও সম্মুখীন হয়েছেন।


ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু-র সাথে (বাঁদিক থেকে) দিলীপকুমার, দেব আনন্দ ও রাজ কাপুর।


ইন্দিরা গান্ধীর সাথে (বাঁদিক থেকে) শঙ্কর-জয়কিষণ, মেহমুদ, রাজ কাপুর।

রাজ কাপুরের প্রায় প্রতিটি ছবিতেই সংগীতের প্রাধান্য দেখা যায় তার কারণ গানের প্রতি, সুরের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ। শোনা যায় দশ বছর বয়সে তিনি যখন কলকাতায় ছিলেন সেই সময়ে নিউ থিয়েটার্সে রাইচাঁদ বড়াল, কানন দেবী, পঙ্কজ মল্লিকের কাছে কিছুদিন সংগীত শিক্ষা করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে সঙ্গী টেপরেকর্ডারে তিনি নানা লোকসংগীতের সুর ধরে রাখতেন এবং সময়বিশেষে সেইসব সুর সহযোগী সংগীত পরিচালকদের শোনাতেন।


সোভিয়েত রাশিয়ায় বিশেষ সফরে রাজ কাপুর।


১৯৫০ সালে ভারতে আগত সোভিয়েত উজবেকিস্তানের লেখকদের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে (সামি আবদুকাহোর ইত্যাদি) রাজ কাপুর।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দেশ ছাড়া রাজ কাপুর পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রভূত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তাই ১৯৫০-এর দশকে তিনি ভারত ও সোভিয়েতের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের দূত হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৯০ সালে বিশ্ব চলচ্চিত্রের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ইনগ্রিড বার্গম্যান, চার্লি চ্যাপলিন, জিন গ্যাবিন, মেরিলিন মনরোর সঙ্গে রাজ কাপুরকেও সম্বর্ধিত করেছিল। ১৯৭১ সালে তিনি 'পদ্মভূষণ' ও ১৯৮৮ সালে 'দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননা' লাভ করেন। তার আগে ১৯৫৫ সালে 'শ্রী ৪২০' ছবিটি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিল। ১৯৫৩ এবং ১৯৫৫ সালে 'আওয়ারা' ও 'বুট পালিশ' ছবি দুটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে 'গ্র্যান্ড পুরস্কার' পর্যায়ে প্রতিযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯৫৭ সালে কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে 'জাগতে রহো' ছবিটি 'ক্রিস্টাল গ্লোব' জিতে নেয়। দেশে রাজ কাপুর বিভিন্ন বিভাগে ১১টি 'ফিল্মফেয়ার পুরস্কার'ও লাভ করেন। আর জীবনের শেষ পর্বে ১৯৮৮ সালের ২ মে 'দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার' গ্রহণের অনুষ্ঠানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে ভরতি হওয়ার পর একমাস বাদে ২ জুন, ১৯৮৮ তাঁর জীবনাবসান ঘটে।


নিজ বাসগৃহে রাজ কাপুর।


চেম্বুর-এ 'আর. কে. ফিল্মস অ্যান্ড স্টুডিয়োস'-এর প্রবেশদ্বার।


রাজ কাপুর অভিনীত চলচ্চিত্রের প্রচারচিত্র (বাঁদিক থেকে ক্রমানুসারে) 'বরসাত' (১৯৪৯), 'আওয়ারা' (১৯৫১), 'সঙ্গম' (১৯৫৪), 'বুট পলিস' (১৯৫৪)।


রাজ কাপুর অভিনীত চলচ্চিত্রের প্রচারচিত্র (বাঁদিক থেকে ক্রমানুসারে) 'শ্রী ৪২০' (১৯৫৫), 'জাগতে রহো' (১৯৫৬), 'জিস দেশ মে গঙ্গা বেহতি হ্যায়' (১৯৬০), 'মেরা নাম জোকার' (১৯৭০)।


'রাম তেরি গঙ্গা মইলি' (১৯৮৫) ছবির সম্পাদন কক্ষে রাজ কাপুর।

'মেরা নাম জোকার' ছবির 'জীনা ইহাঁ মরণা ইহাঁ' গানটিতে ছিল 'কল খেল মেঁ হম না হো/ গর্দিশ মে তারে রহেঙ্গে সদা/ ভুলেঙ্গে হম ভুলোগে তুম/ পর হম তুমহারে রহেঙ্গে সদা/ রহেঙ্গে ইয়হিঁ আপনে নিশান/ ইসকে সিবা যানা কহাঁ।' জীবনের নিয়মে মানুষ একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও সে থাকবে - এই সত্যটিকে নিজের শিল্পের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। নিজেকে ভারতীয় সিনেমার 'The one and only showman' হিসেবে চিরকালীন প্রতিষ্ঠায় অভিষিক্ত করেছেন। কিন্তু পাশাপাশি একটি সংশয়মূলক প্রশ্নও রেখে গেছেন 'শুধুই শোম্যান না স্বপ্নো কা সওদাগর?'

পরিচিতি: অধ্যাপক, কবি, প্রাবন্ধিক, সঙ্গীতশিল্পী।