প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

উত্তর-সত্যের কালবেলা: লেখার কাছে কী চাই



সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


বঙ্কিমচন্দ্র 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' সন্দর্ভটিতে লিখেছেন: "যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের ও মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশে লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে"। (বঙ্কিমচন্দ্র রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০১৫, পৃষ্ঠা: ৩৬) অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র লেখার দুটি অভিপ্রায়ের কথা বলছেন: দেশ ও মানবজাতির মঙ্গলসাধন ও সৌন্দর্যসৃষ্টি। একজন সাহিত্যিক তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে দেশ ও মানবজাতির মঙ্গলসাধন করতে চাইলে, দেশ ও মানবজাতিকে গভীরভাবে জানতে হয়; যুক্তি ও মননের সাহায্যে তাদের বিশ্লেষণ করতে হয়; সমসময়ে প্রকৃতি, সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক সম্পর্কসমূহের দ্বান্দ্বিক সমগ্রতার অবয়বকে চৈতন্যে ধারণ করতে হয়, বীক্ষাগত আসঞ্জনকে সংগঠিত করতে হয়, অভিজ্ঞতার দায়কে কল্পনাশক্তির সাহায্যে অতিক্রম করে গিয়ে সৌন্দর্যের আনন্দময় পরিসরকে সৃষ্টি করে তুলতে হয়। মার্কসও বলেছিলেন: ম্যান অলসো ক্রিয়েটস অ্যাকর্ডিং টু দ্য ল'জ অফ বিউটি। মানুষ শুধু উৎপাদনের নিয়মাবলীর দ্বারাই সবকিছু নির্মাণ করেনা, সৌন্দর্যের নিয়মাবলী দ্বারাও সৃষ্টি করে। এই কঠিন চর্চার কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্ববীক্ষা নির্মাণ। প্রকৃতি, সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক সম্পর্কসমূহের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কগুলিকে অনুসন্ধানের মাধ্যমেই একজন শিল্পীর বিশ্ববীক্ষা নির্মিত হয়ে ওঠে।

এই কঠিন প্রক্রিয়ার সূচনাবিন্দু হলো: এই সময়। কিন্তু কীভাবে চিহ্নিত করব নিজের সময়কে? এই সময়ে প্রকৃতি, সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক সম্পর্কসমূহের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কগুলিকে অনুধাবন করব কীভাবে? এই সম্পর্কগুলিও তো নিশ্চল নয়। ইতিহাসের গতির কারণে এই সম্পর্কগুলির অতীত আছে আবার ভবিষ্যৎও আছে। এই গতিময়তার মধ্যে যদি নিজেকে স্থাপন করি, তাহলে বীক্ষা ধীরে ধীরে আসঞ্জিত হতে থাকে, দেশকাল বিষয়ে দৃষ্টি স্পষ্ট হতে থাকে। আর তা যদি করতে না পারি তাহলে তো জানতেই পারব না লেখার মাধ্যমে দেশের ও মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করব কীভাবে? যেকোনো সৎ ও দায়বদ্ধ সাহিত্যিককে তাই সময়ের স্বর ও অন্তঃস্বর নিয়ে ভাবতেই হয়। বিষয় বাস্তবতার উপরিতলে সফরি সঞ্চরণে নিজেকে ব্যস্ত না রেখে, বাস্তবতার গভীরতর স্তরে পৌঁছাতে হয়, ঘটনাসমূহের কার্যকারণ সম্পর্ককে একনিষ্ঠ ছাত্রের মতো পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সেই ভাবনার সূত্রে নিজের উপলব্ধি থেকে উৎসারিত নান্দনিক স্পন্দনকে অস্তিত্বের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন করে তুলতে হয়। আবার স্বতোৎসারিত নান্দনিক স্পন্দনের ওপরে দাঁড়িয়েই এই কালবেলার মধ্যেই লেখার জীবনে প্রচ্ছন্ন আলোর রেখাকেও উন্মোচন করতে হয়। নাস্তিক্যের মধ্যে থেকে আস্তিক্যের সন্ধান করতে হয়। সেই আস্তিক্যের বোধই লেখককে যথাপ্রাপ্ত বাস্তবের সমালোচনা করতে বাধ্য করে। সেই আস্তিক্যের বোধই কালবেলার বিষাদ-বিপন্নতা-বিচ্ছিন্নতাকে জেনে - জারিত করে - অতিক্রম করে নতুন নন্দনবিশ্বের ব্যাপ্ত ভুবন সৃষ্টিতে লেখককে পথনির্দেশ দেয়। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ – সাহিত্যিক যা-ই নির্মাণ করুন, তাকে এই কঠিন, শ্রমসাধ্য, সুশৃঙ্খল, মনন দ্বারা জারিত গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

এই কঠিন-জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে, যেকোনো সৃষ্টিশীল মানুষই যথাপ্রাপ্ত বাস্তবের সমালোচনা করেন। তার ফলে অনিবার্যভাবেই উঠে আসে অনেক প্রশ্ন। তারা প্রশ্নমালায় জর্জরিত করেন পাঠকের চেতনাকে, জাগিয়ে তোলেন অসংখ্য জিজ্ঞাসাকে। আমরা আমাদের সাহিত্য থেকে চাই সমসময় সম্পর্কে এমন অনেক জিজ্ঞাসা, যা বর্তমান ও অতীত সম্পর্কে আমাদের মননকে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করবে। আমাদের যাপিত জীবনের ও চারপাশের বাস্তবতার ছদ্মবেশকে উন্মোচন করবে। সাহিত্য, এই ছদ্মবেশকে উন্মোচন করতে পারলেই, পাঠকরা আপাতসময় ও প্রকৃতসময়ের পার্থক্যকে বুঝে নিতে পারেন। সমসময়ের পরিসরে দাঁড়িয়েও পাঠকের চৈতন্যে অস্তিত্বের নতুন বোধ জাগ্রত হয়। দ্বন্দ্ব-সংশয়ের মধ্যেও উন্মোচিত হয় দীপ্তিময় বীক্ষা, অবভাসিক নিরীক্ষণ।

বিংশ শতক পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর পঁচিশ বছর অতিক্রম এসে বিশ্বায়ন-উদারিকরণ-বিলগ্নিকরণের নামে সত্যের মোড়কে অনেক অসত্যকেও উৎপাদিত হতে দেখলাম আমরা। এই সত্যবিভ্রমগুলি অসংখ্য সান্তাক্লজ হাজির করলো আমাদের সামনে। পি. সি. সরকারের গিলিগিলি হোকাসপোকাস যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে কম্পিউটার, ইনফরমেশন টেকনোলজি, আর্টিফিসিয়াল-ইন্টেলিজেন্সের হাত ধরে। পোস্টমডার্ন-পোস্টট্রুথ সৃষ্ট এইসব 'ময়দানব'-দের মধ্যে প্রতিমুহূর্তে 'ময়াসুর' ও 'দানব' সংশ্লেষিত হচ্ছে। সাম্প্রতিকতম প্রযুক্তি ও জাদুবিভ্রম মিলেমিশে, শক্তিশালী দানব ও অসামান্য স্থপতির সমন্বয়ে, তৈরি হচ্ছে এমন অসংখ্য 'ময়দানব', যা প্রতিদিন এলিয়েনেশন, কমোডিটি ফেটিসিজম, রিইফিকেশনকে সহনীয়, মান্য, অনুসরণযোগ্য করে তুলছে। উত্তর-সত্য বিশ্বে সব 'সত্যের' মালিকানা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির মালিকদের হাতে। আধুনিকোত্তর বা পোস্টমডার্ন বিশ্বের মতই উত্তর-সত্য বিশ্বেও সবথেকে ঘৃণিত শব্দ হলো 'সত্য'। সত্যের অবসান মানে প্রশ্নের অবসান, যুক্তির বিদায়। উত্তর-সত্য বিশ্বকে আধুনিকোত্তর বা পোস্টমডার্ন বিশ্বের বিস্তার হিসেবে দেখাটা জরুরি। আধুনিকোত্তরবাদী ও উত্তর-সত্যপন্থী সমালোচকরা যে সত্যেকে প্রত্যাখ্যান করেন তার কারণ, তারা বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না।

আধুনিকোত্তরবাদীরা যুক্তি দেন যে, মানুষ মূলত সাবজেকটিভ বা মন্ময়ী। মন্ময় বা সাবজেকটিভ অবস্থান থেকেই মানুষ তাদের অনন্য বিশ্বাস ও মূল্যবোধগুলির ভিত্তিতে তারা বাস্তব তথ্যগুলিকে সংগঠিত করে ও তার পরিবর্তন ঘটায়। সেই কারণেই তথ্যের ভিত্তিতে তারা যে আখ্যানগুলি নির্মাণ করেন তা-ও সাবজেকটিভ বা মন্ময়ী। সেই কারণেই বরাবরই 'সত্য' আধুনিকোত্তরবাদী ও উত্তর-সত্য সন্দর্ভে বা ডিসকোর্সে একটি ঘৃণিত শব্দ। উত্তর-সত্য জনমত গঠনের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির কথা বলে, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যগুলি বাতিল হয়ে গিয়ে আবেগ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি আবেদন বেশি শক্তিশালী হয়। সত্য যদি অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে আমরা মিথ্যাকে বা অর্ধ-সত্যকে বা সিকি-সত্যকে বা আবোল তাবোল কথাকে, বুলশিটকে, চিহ্নিত করব কেমন করে? অনেক তাত্ত্বিকের অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বর্তমান উত্তর-সত্য বিশ্বেও সত্য কিন্তু অস্তিত্ববান এবং মিথ্যা এখনও মিথ্যা। দুই-এর সঙ্গে দুই যোগ করলে এখনও চারই হয়।

বর্তমান সময়ে জ্ঞানের বিশ্বজনিনীকরণের বিরোধিতা করা, যুক্তিবাদকে প্রত্যাখ্যান করা, আপেক্ষিকতাবাদ ও নিহিলিজমের পক্ষাবলম্বন করা, খণ্ডায়নকেই শেষকথা বলে বিশ্বাস করা, চিন্তার যে কোনো ধরনের আসঞ্জনশীলতাকে প্রত্যাখ্যান করা, বিষয়ীকে সবসময়েই বিকেন্দ্রীভূত; খণ্ডায়িত ও অনির্ধারিত বলে প্রতিষ্ঠা করা, অবজেকটিভিটি বা তন্ময়তাকে অসম্ভব বলে মনে করে সবজেকটিভিটি বা মন্ময়তাকে চূড়ান্ত বলে মনে করা – যে কোনো সত্যই অলীক করে তোলে। তাই এই সময়ে ছদ্মবিশ্ব নির্মাণে সহায়ক বিভ্রম সৃষ্টিকারী মাদক-বিনোদন; কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অপপুরাণের জোয়ারের জলে ভেসে যাচ্ছে সবধরনের সত্যের ধারণা। উপগ্রহ চ্যানেল, ইন্টারনেট, ফেসবুকের অশেষ আক্রমণে অকৃপণ বিনোদন যে শুধু মাদকতায় পূর্ণ থাকছে তা-ই নয়, চাহিদার চরিত্রকে হোমোজিনাইজ করে লগ্নিপুঁজির জন্য বানিয়ে তুলছে অভিন্ন চাহিদাসম্পন্ন এক বিশাল বাজার। সাহিত্য ১৯৫০-১৯৬০-এর দশকেই হয়ে উঠেছে পণ্য। এখন তা খোলাখুলি ক্ষমতার সেবাদাস, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির সুর-তাল-ছন্দের সঙ্গে তার বয়ন-বুনন-বয়ানগুলি অবিচ্ছিন্ন। সোপ অপেরার সিরিয়াল আর উপন্যাসের সিরিয়াল এখন যেভাবে শাসকশ্রেণির মতাদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজ করে চলেছে তা অতীতে কল্পনাও করা যেত না।

এই কালবেলাতে শামসুর রহমান আকুতি জানান: "তাহ'লে আখেরা, হায়, এই কালবেলায় কোথায়/ বিশ্বস্ত আশ্রয় পাবো খুঁজে? কে আমাকে/ বুকে টেনে নিয়ে সুমধুর কণ্ঠস্বরে/ বলবে, 'বান্ধব ভয় পেও না, এখানে ঠাই নেই ঘাতকের"। (এ কেমন কালবেলায়) এখন ঘাতক তো শুধু দৈহিক বলপ্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করে না! চৈতন্যে মড়ক অনেক শক্তিশালী ও বহুগুণ ব্যাপ্ত ঘাতক। শাসকশ্রেণির মতাদর্শগত আধিপত্য আমাদের চৈতন্যকে প্রতিদিন স্থবির অচল সমালোচনাহীন করে দিতে চাইছে। কিন্তু ধনতন্ত্রে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব তো অমীমাংসেয় থেকে যায় বলেই সমান্তরালভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তর ও বর্গের যাপিত জীবনের গভীর থেকে বিকল্প ভাষা ও সংস্কৃতির উৎসারণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই সাংস্কৃতিক অসমসত্ত্বতা ঐতিহাসিকভাবেই শাসকশ্রেণির মাস্টার ডিসকোর্স বা মহাসন্দর্ভের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিকল্প সন্দর্ভের উত্থানকে অনিবার্য করে তোলে। এই বিকল্প সন্দর্ভকে ধারণ ক'রে চলেছে লিটল ম্যাগাজিন, অনলাইন ম্যাগাজিন। সংস্কৃতি কারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্যগুলি হলো: হোমোজিনাইজড বা সমসত্বধর্মী ও সিউডো-ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক বা নকল-ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী। তাই সংস্কৃতি কারখানার বাইরে, সমসত্ত্বধর্মী ও নকল-ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী পরিসরের বাইরে, এখনও লিটল ম্যাগাজিন আর অনলাইন ম্যাগাজিনই লেখককে দেয় মননশীল সৃষ্টির পরিসর, শিল্পের স্বায়ত্তশাসিত পরিসরে দাঁড়িয়ে যথাপ্রাপ্ত বাস্তবতার সমালোচনার স্বাধীনতা, প্রান্তীয় ও নিরুচ্চার বর্গের যাপিত জীবনের গভীর থেকে উঠে আসা বিকল্প সন্দর্ভগুলিকে উচ্চারণের আকাশ।

'সাহিত্যের খেলা' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন: "সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। এ দু'য়ের ভিতর যে আকাশপাতাল প্রভেদ আছে, সেইটিই ভুলে গেলে লেখকরা নিজে খেলা না করে পরের জন্য খেলনা তৈরি করতে বসেন। সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে, তার প্রমাণ বাংলাদেশে আজ দুর্লভ নয়"। এই মনোরঞ্জনকারী লেখার বিকল্প কী হতে পারে? যে লেখা আমাদের চৈতন্যে জিজ্ঞাসার জন্ম দেবে? এই সূত্রেই মনে পরে ১৯১৪-র ১৩ জুলাই প্রমথ চৌধুরীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠির কথা: "একরকম জাতের ভালো লেখা আছে যা পড়তে পড়তে পদে পদে এই কথাটা মনে আসে যে এ আমি ভাবিনি, এ আমার মাথায় আসত না, এ আমার কলমে আসা সম্ভব নয় – সেইরকম ঐশ্বর্যশালী লেখাকে পাঠক অনেকক্ষণ পর্যন্ত অস্বীকার করতে চেষ্টা করে – এইরকম লেখার কাছে পাঠকের মন পরাভব মানতে কষ্ট ও লজ্জা বোধ করে"। বীক্ষাগত আসঞ্জন ও স্বাতন্ত্র্য এই ধরনের লেখাকে যে ঐশ্বর্য দান করে, তা অর্জন ও নির্মাণ এক কঠিন ও দীর্ঘ চর্চার পরিণতি। এই সময়ে লেখার জীবনে গভীর মননচর্চা ও পঠনের পাশাপাশি সস্তার জনপ্রিয়তার লোভ বর্জন করা না গেলে বিকল্প সন্দর্ভ নির্মাণ সম্ভব নয়। ২ ফাল্গুন, ১৩২৪ তারিখে প্রমথ চৌধুরীকে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: "আমাদের দেশে পনেরো আনা লেখার মধ্যে মন জিনিসটা নেই – আমাদের পাঠকদের পাকযন্ত্র সেইজন্য ওটা এখনও হজম করতে শেখেনি। উপদেশ ও অশ্রু এবং উত্তেজনা যতই জোগাবে তার অফুরান কাটতি"।

রবীন্দ্রনাথ যে বাস্তবের কথা বলছেন তা আমাদের বর্তমান কালবেলাতেও অনুপস্থিত নয়। লেখার জীবনে তরলতা ও রক্ষণশীলতা আমাদের চারপাশে প্রবলভাবে উপস্থিত। তাদের আক্রমণকে প্রতিহত করা সত্যই কঠিন। জনপ্রিয়তার মোহকে প্রত্যাখ্যান করা মোটেই সহজ নয়। 'সবুজ পত্র'-এর ১৩২২-এর শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রমথ চৌধুরীর সতর্কবার্তা এই কালবেলার লেখার জীবনে এখনও স্মরণীয়: "...এ যুগে পাঠক হচ্ছে জনসাধারণ, সুতরাং তাঁদের মনোরঞ্জন করতে হলে আমাদের অতি সস্তা খেলনা গড়তে হবে, নইলে তা বাজারে কাটবে না। এবং সস্তা করার অর্থ খেলো করা। বৈশ্য লেখকের পক্ষেই শূদ্র পাঠকের মনোরঞ্জন করা সংগত"। এই সময়ে পাঠকের মনোরঞ্জনের কথা না ভেবে যিনি সৃষ্টি করেন তার পক্ষে আদর্শ আশ্রয়স্থল হলো লিটল ম্যাগাজিন ও অনলাইন ম্যাগাজিন।

এই কালবেলাতেও যারা কথাসাহিত্য-নাটক-কবিতা-প্রবন্ধের লেখার জীবনকে পাঠকের মনোরঞ্জনের মোহ থেকে মুক্ত রেখে, সংস্কৃতি কারখানার বাইরে দাঁড়িয়ে, সময়কে ধারণ করছেন, আবার তাকে অতিক্রম করে নতুন নন্দনবিশ্ব নির্মাণ করতে চাইছেন, তাদের সৃষ্টি আর নির্মাণের ভিতর থেকে শুধু ইমপালস নয়, সেইসঙ্গে উইল-ও (will) পাচ্ছি। তারা শুধুই বর্তমান সময়ের নৈতিক আচরণের নির্দিষ্ট মানের অবনমই নয়, সেইসঙ্গে অসঙ্গতিগুলির কার্যকারণ সম্পর্কগুলিকেও উন্মোচন করছেন। শুধুই ইভেন্ট বা ঘটনা নয়, ইভেনচুয়ালিটি বা সম্ভাব্য পরিণামগুলিকেও স্পষ্ট করে তুলতে পারছেন। তারা আমাদের শুধুই ভারচুয়ালিটি পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখছেন না, তারা ভার্চু-কেও দেখাতে পারছেন। তারাই সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রথাগত পিঞ্জরকে বিনির্মিত করতে পারছেন। ডায়ালগইজম বা দ্বিবাচনিকতা জীবনের অনতিক্রম্য বিধি বলেই সাহিত্যের পিঞ্জর থেকে জন্ম নিচ্ছে জীবন্ত লেখার প্রতিস্রোত, বিকল্প সন্দর্ভ। সংস্কৃতি কারখানা সময়কে পিঞ্জরায়িত করছে। সমান্তরালভাবে বিকল্প সন্দর্ভের সংগ্রামী যজ্ঞের আগুন থেকে উৎসারিত হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচেতনা ও সময়বোধের প্রতিরোধী স্পর্ধা। তরুণ অতিতরুণরা নিজেদের হৃৎপিণ্ডে হাত রেখে, হৃদস্পন্দনকে দ্রুততর করতে করতে; রিক্ততা, ভণ্ডামি, ঘৃণা, বিদ্বেষকে প্রত্যাখ্যান করে দৃপ্ত লেখার প্রতিপ্রশ্নে জর্জরিত করতে চাইছেন আমাদের। তারাই সময় ও ইতিহাসকে শুধুই উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, সৃষ্টি ও নির্মাণের বহুমাত্রিকতার আলোয়, ইতিহাসের মৃত্যু আর ভাবাদর্শের অবসানের বিভ্রমের অন্ধকারকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছেন। এদের সৃষ্টি আর নির্মাণ পাঠককে নিছক নিষ্ক্রিয় ও নিরুপায় ভোক্তা আর গ্রহীতায় স্থির থাকতে দিচ্ছে না। অনন্বয় আর পণ্যমোহের সঞ্চরমান অনুভূতিপুঞ্জকে সর্বেসর্বা থাকতে দিচ্ছে না। হে পাবক, অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি, অন্ধকারে/ তোমার পবিত্র অগ্নি জ্বলে। (মাঘসংক্রান্তির রাত) কঠিন অমেয় দিন রাত এইসব।/ চারিদিকে থেকে থেকে মানব ও অমানবিকতা/ সময়সীমার ঢেউয়ে অধমুখ হয়ে/ চেয়ে দেখে শুধু মরণের/ কেমন অপরিমেয় ছটা। তবু এই পৃথিবীর জীবনই গভীর। (পৃথিবীর রৌদ্রে) সে অনেক লোক লক্ষ্য অসম্ভবভাবে ম'রে গেছে।/ ঢের আলোড়িত লোক বেঁচে আছে তবু।/ আরো স্মরণীয় উপলব্ধি জন্মাতেছে।/ যা হবে তা আজকের নরনারীদের নিয়ে হবে।/ যা হল তা কালকের মৃতদের নিয়ে হয়ে গেছে। (পৃথিবীর রৌদ্রে)

পরিচিতি: প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, রাজ্য কমিটির সদস্য - পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ, যুগ্ম সম্পাদক - ইন্ডিয়ান স্কুল অফ সোসাল সায়েন্সেস, লেখক, গবেষক।