প্রচলিত ঐতিহ্যগত আচার অনুষ্ঠান বিশ্বাস জীবনযাপন প্রণালীই হলো লোকাচার লোকসংস্কৃতি। লোকাচার কখনো উৎসব কেন্দ্রিক, কখনো দেবতা বা পূজা কেন্দ্রিক। আবার কখনো বিবাহ সম্পর্কিত বা কখনো দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস। লোকাচার লোকসংস্কৃতি আমাদের সমাজের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও ইতিহাস বহন করে থাকে। লোকাচারগুলি যুগ যুগ ধরে টিকে থাকার প্রধান কারণই হলো মানুষের মঙ্গল সাধন, মানুষের সাথে মানুষের মিলন, যোগসূত্র সাধন ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথে সমন্বয় সম্প্রীতি সাধন করা। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নিচ, জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে মৈত্রী ভালোবাসা বিস্তার করে লোকাচার লোকসংস্কৃতি। সবার সঙ্গে সবার মিলেমিশে থাকা লোকাচারের আড়ালে থেকে যায় লোকশিক্ষা, সর্বজীবে প্রেম, সর্বলোকে প্রেম। সবাইকে নিয়ে বাঁচা সবাইকে জড়িয়ে সবার মঙ্গল চেয়ে বেঁচে থাকার যে যাপন ক্রিয়া, তাই লোকাচার লোকসংস্কৃতি। মূল আকাঙ্ক্ষা, আর্তি, আবেদন কবি শঙ্খ ঘোষের ভাষায় –
"আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।"
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বৃহত্তম জেলা রূপে আত্মপ্রকাশ করে চব্বিশ পরগনা জেলা। এই জেলার একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে সুন্দরবন। পরগনা শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে আগত, তার অর্থ রাজস্ব সংক্রান্ত বিভাগ। দেশভাগের পর বড়ো অংশটাই চলে যায় বাংলাদেশে। মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ে মোগল আমলের শেষ জরিপে এই পরগনাগুলিকে হুগলির চাকলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পলাশীর যুদ্ধের ৬ মাস পরে ১৭৫৭ সালের ২০ ডিসেম্বর এক সন্ধির শর্ত অনুযায়ী বাংলার তৎকালীন নবাব মীরজাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চব্বিশ পরগনা ভোগ দখল করার অধিকার দেন। আমিরপুর, আকবরপুর, আজিয়াবাদ, বালিয়া, বাদির হাট, বসুন্ধারি, কলকাতা, দক্ষিণ সাগর, হাতিয়াগড়, ইখতিয়ারপুর, খাড়ি জুরী, খাসপুর, মদনমল্লপুর, মাগুরা, মানপুর, ময়রা, মুরাগাছা, পাইকান, পেঁচাকুলি, সাঁতল, শাহপুর, উত্তর পরগনা, জংলি মহল ইত্যাদি ২৪টি মহল মিলিয়ে ২৪ পরগনা জেলার ভৌগোলিক এলাকা।

বেড়াচাঁপা চন্দ্রকেতু গড়।
নগর কলকাতা ছিল একসময় সুন্দরবনেরই অংশ, শিয়ালদহ সহ নানা জায়গায় মাটি খুঁড়ে বড়ো বড়ো সুন্দরী গাছ পাওয়া যায়। জোব চার্নকের কলকাতা পত্তনের সময় গোবিন্দপুর, সুতানুটি, কলিকাতা এই তিনটি গ্রাম ছিল খাল বিল জলাজমিতে পরিপূর্ণ। কালক্রমে সমুদ্র দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়ায় পলি জমে জমে ২৪ পরগনা জেলার দক্ষিণ দিকে স্থলভূমি ও জনপদের সৃষ্টি হয়। এই অঞ্চলকে আবার বলা হতো ভাটি প্রদেশ। নানা নদনদীর শাখা-প্রশাখা ১৮টি দ্বীপকে সৃষ্টি করে বলে এরূপ নামকরণ। ভাটপাড়া নামটিও সৃষ্টি হয়েছে এই 'ভাটি' থেকেই বলে গবেষকদের অভিমত। বেড়াচাঁপা দেবালয়ে রাজা চন্দ্রকেতুর গড় ছিল। এখানে একটি প্রাচীন বন্দরও ছিল, এখান থেকেই নানা জিনিসপত্রের আমদানি রপ্তানি হতো। বারুইপুরের কাছে গোবিন্দপুর গ্রামে রাজা লক্ষণ সেনের সময়কালের তাম্র শাসন পাওয়া যায়। বহুড়ু জয়নগর অঞ্চলেও অনেক নৃতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। সপ্তদশ শতকে রাজা প্রতাপাদিত্য এই এলাকার অধিপতি ছিলেন। বাংলায় জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য সাগরদ্বীপ, জগদ্দল, সরশুনা ইত্যাদি এলাকায় দুর্গ বানান তিনি।
১৯৮৩ সালে ডঃ অশোক মিত্রের সভাপতিত্বে একটি প্রশাসনিক কমিশন গঠিত হয় এবং তাঁদের সুপারিশ মতো ১৯৮৬ সালে পয়লা মার্চ চব্বিশ পরগনা জেলাকে উত্তর ও দক্ষিণ দু'ভাগে ভাগ করা হয়। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বর্তমানে পাঁচটি মহকুমা - বারাসত, বারাকপুর, বসিরহাট, বিধাননগর এবং বনগাঁ। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলারও বর্তমানে মহকুমা পাঁচটি - আলিপুর, বারইপুর, ক্যানিং, ডায়মন্ড হারবার এবং কাকদ্বীপ।

বারাসতের আমানতি মসজিদ।
বারাসত মসজিদের গায়ে লেখা, 'প্রভুকে প্রণাম করো।' দেবতা কোথায় থাকেন, মন্দির মসজিদ গির্জায়? সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে দেবতা মানুষের মঙ্গল করে। কিন্তু এই পোড়া দেশে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে দাঙ্গার আগুন আর ধ্বংস বাসা বেঁধেছে। ধর্মের সঙ্গে যখন সংকীর্ণ রাজনীতি যোগ হয় তখনই শুরু হয় সাম্প্রদায়িকতা, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, জ্বলে দাঙ্গার আগুন। রাজনীতির মাতব্বররা সে ধ্বংসের আগুন নিয়ে নিরন্তর খেলা করে। নতুন নতুন চিৎকার উঠছে তাজমহল, কুতুব মিনার, বারাণসীর জ্ঞানব্যাপী মসজিদ নিয়ে। দাঙ্গার বিষাক্ত হাওয়া চারিদিকে। এই আবহেই আমরা আশ্চর্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন পাই বারাসত শহরের পশ্চিমে ইছাপুরের বসু পরিবারের আমানতি মসজিদে। তাঁরা এই মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ করেন তাঁদের নিজস্ব পারিবারিক দেবস্থানের মর্যাদায়। তাঁরা তৈরি করাচ্ছেন বিশাল মিনার, কাঁচ দিয়ে ঢাকছেন মসজিদ সংলগ্ন পীরবাবা আমানত আলী শাহর হুজুর ঘর। মসজিদের ইমাম আকতার আলী বলেন, "বসুরা না দেখলে মসজিদ বাঁচিয়ে রাখা যেত না।" এই বসু বাড়ির নববধূরা বিয়ের পরে মসজিদ চত্বরে আগে প্রণাম করেন, তারপর শ্বশুরবাড়িতে ঢুকে হিন্দু প্রথায় বরণ করা হয় তাদের। নবজাতককে অন্নপ্রাশনের পায়েস খাওয়ান ইমাম সাহেব। বাড়ির কারো মৃত্যুর পরে শ্মশান যাত্রার আগে এই মাজারের সামনে শায়িত রাখা হয়। তারপর দাহের জন্য দেহ কাঁধে তোলা হয়।
রোজ সকালে বসু পরিবারের লোক মসজিদের মেঝে মোছেন, আশপাশও পরিষ্কার করেন তাঁরা। রমজান মাসে রোজাও রাখেন কেউ কেউ। বসু বাড়ির ছেলে পার্থ ওরফে বাপ্পা বসু, কর্তা দীপক বসু কাজকর্মের বাইরে মসজিদের দেখাশোনা করেন নিয়মিত।১৯৬৪-৬৫ সাল নাগাদ খুলনার ফুলতলির আলকা গ্রামের বসুরা পূর্ব পাকিস্তানের রাজাকারদের অত্যাচারে এপারে ওয়াজেদ মোল্লার সঙ্গে জমি বদল করে এদেশে চলে আসেন। মুসলিম দেশ ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হলেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একবিন্দু হিংসা-বিদ্বেষ নেই তাঁদের মনে। তাঁরা বলেন, "দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল রাজাকাররা, মুসলমানরা বা হিন্দুরা নয়।" এই স্বচ্ছ বিবেচনা সকলের হয় না। বসুদের কেনা জমির চৌহদ্দিতে ছিল এই মসজিদটি। তখন পুরোনো জীর্ণ অবস্থায় ছিল মসজিদ। আজ তার এই পরিমার্জিত রূপ, মিনার, কাঁচে ঢাকা হুজুর ঘর, মসজিদের গায়ে লেখা হিন্দু বচন: 'প্রভুকে প্রণাম করো।'
বসুদের বিশ্বাস দেবস্থান হিন্দু মুসলমানের হয় না। দেবস্থান মিলন স্থান। ভারতীয় সংস্কৃতির চিরায়ত মূলমন্ত্র হলো বিরোধ নয় মিলন। ভারতের জাতীয় আদর্শ এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বারাসতের এই আমানতি মসজিদ এবং বসু পরিবার। (সূত্র: সমাজ মাধ্যমে বিশিষ্ট লেখক সুদিন চট্টোপাধ্যায়ের পোস্ট থেকে)
বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ডায়মন্ড হারবার থানার নাইয়া পাড়া গ্রামের পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দির আর বিবি মায়ের থানের মধ্যে নেই কোনো দেয়াল। তালডাংরা রত্নেশ্বর গাজীর সেবায়েত হিন্দু মুসলিম উভয়ই। নুনগোলার মজন্দনের মাজারে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নিঃসন্তান রমণী সন্তান কামনায় ইট বেধে আসেন এবং মনোবাসনা পূর্ণ হলে দিয়ে আসেন সিন্নি। নবাসন গ্রামের মানিকপীরের উরুস উৎসবে এখনো হিন্দু রমণীরা বাড়ি বাড়ি মাগন তোলেন। কামারপোলের বিখ্যাত হালদার পরিবারের প্রদত্ত জমিতে এখনো জাঁকজমক সহকারে পালিত হয় মহরম অনুষ্ঠান এবং শ্রেষ্ঠ তাজিয়াটিকে পুরস্কৃত করেন তাঁরাই। শতাধিক বছর ধরে চলে আসছে এই লোকাচার রীতি।পারুলিয়া গ্রামের চৈত্র সংক্রান্তির শিব পূজায় নীলের ঘরে প্রথম বাতি এখনো প্রজ্জ্বলিত করেন সেই গ্রামেরই একজন প্রবীণ মুসলিম।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মহেশতলায় চট্টার পাঁচ মসজিদ এলাকা চত্বরে প্রতি বছর মহরমের মাতম বা শোক জ্ঞাপন উপলক্ষে হাজার হাজার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নারী পুরুষ উপস্থিত হন। তারা মানত করে সিন্নি দেন। আবার মাটির ঘোড়াও নিবেদন করেন কেউ কেউ।
কলকাতা থেকে কাকদ্বীপ রাস্তার ধারে কুলপি পেরিয়ে শ্যাম বসুর চকে দুর্গাপূজার খরচের একটি বড়ো দায়িত্ব স্বেচ্ছায় পালন করেন সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন, আবার রমজান মাসের প্রথম রোজা ইফতার অনুষ্ঠান উদ্ যাপিত হয় নিয়ম নিষ্ঠা সহকারে হিন্দু পল্লিতে। চলে আসছে এই লোকাচার বহু বছর ধরে।
উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়ার চৌধুরী পরিবারের পারিবারিক দুর্গাপূজা আড়াইশো বছরের প্রাচীন। এখানে এখনো একটি প্রথা প্রচলিত আছে যা সম্প্রীতি সমন্বয় ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিসর্জনের দিন দুর্গা প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় সেই গ্রামেরই এক মুসলিম পরিবারের বাড়িতে। সেই মুসলিম পরিবার এক সময়ে দুর্গাপূজার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁরা ছিলেন জমিদার চৌধুরী পরিবারের নায়েব গোমস্তা। সেই পরিবারের একজন প্রবীণ মানুষ দুর্গা প্রতিমার কাঠামোর একটা অংশ করাত বা কাটারি দিয়ে কেটে দেওয়ার পর সেখান থেকেই প্রতিমা বিসর্জন করতে নিয়ে যাওয়া হয়।
এর কিছুটা দূরেই হাড়োয়ার বেড়াচাঁপায় বিদ্যাধরী নদীর তীরে বিখ্যাত পীর গোরাচাঁদের মাজার। লোকশ্রুতি অনুসারে গোরাই পীর রাজা চন্দ্রকেতুর কথা মতো লোহার বেড়া বা সীমানায় চাঁপা ফুল ফুটিয়েছিলেন বলেই এই জায়গার নাম হয় বেড়াচাঁপা।
১২ ফাল্গুন তাঁর মৃত্যুর দিন প্রতি বছর উরস উৎসব বা মেলা শুরু হয়। মাসাধিক সময় ধরে চলে মেলা। কাওয়ালি, বাউল, মানিকপীরের গানের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেন শিল্পীরা।
সেই মাজারে একটি প্রথা আজও প্রচলিত। বারঘোষপুরের রমণীরা গোদুগ্ধ এনে পীরের সমাধিতে ঢেলে দেন। তার পরই শুরু হয় মাজারের আনুষ্ঠানিক অন্যান্য ক্রিয়াকলাপ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং লাইনে ঘুটিয়ারি শরীফ স্টেশন লাগোয়া গাজী বাবার মাজার। শুধু জেলা বা রাজ্যের নয়, দেশ-বিদেশ থেকেও ছুটে আসেন অগণিত ভক্তবৃন্দ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্ম বর্ণের নারী পুরুষই আসেন সেখানে। ঘুটিয়ারি শরীফের বৃত্তাকার পুকুরে স্নান অনেক মানুষের কাছেই পুণ্যস্নান হিসেবে মান্যতা পায়। সেই পুকুর নির্মাণ করে দেন বারুইপুরের রায়চৌধুরী পরিবারের মদন রায়চৌধুরী প্রায় ৪০০ বছর আগে। প্রত্যেক বছর ১৭ শ্রাবণ চৌধুরী পরিবারের একজন প্রবীণ ব্যক্তি গাজী বাবার মাজারে চাদর চড়ানোর পরেই শুরু হয় বাৎসরিক উরস বা উৎসব। সেই পুকুর 'মক্কা পুকুর' নামে খ্যাত। বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের মানুষ মনস্কামনা পূরণের আশায় ফুল ভাসান পুকুরে। যার হাতের কাছে ফুল তাড়াতাড়ি আসবে, তার মনোবাসনা তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে। মনস্কামনা পূর্ণ হবার পর পীরের দরগায় সিন্নি দেন ভক্তবৃন্দ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মহেশতলা থানার উত্তর প্রান্তে আকড়া ফটক। বর্তমান থানা রবীন্দ্রনগর। সেখানেই আছে সত্য পীরের মাজার। কেউ বলেন সত্য পীর, আবার কেউ বলেন সত্য নারায়ণ। প্রতি বৃহস্পতিবার জাতি ধর্ম বর্ণ ভাষা নির্বিশেষে শত শত নারী-পুরুষ আসেন সত্য পীরের মাজারে নানা মনস্কামনা নিয়ে। আবার সেটা পূর্ণ হলে সিন্নি দেন পরম আনন্দে। লোকশ্রুতি এই, কোনো এক হিন্দু জমিদারের সন্তান অজানা অসুখে আক্রান্ত হন। ডাক্তার কবিরাজ কেউই তাকে সুস্থ করতে পারেন না। শেষে এক ফকিরের পরামর্শে তিনি সস্ত্রীক সত্য পীরের মাজারে গিয়ে প্রার্থনা জানান। তার সন্তান সুস্থ হয়ে উঠলে উভয় ধর্মের মানুষদের ডেকে পরামর্শ নেন এবং সত্যনারায়ণ নামে পুজো করতে থাকেন তাঁরা, সত্য পীর হয়ে যান সত্য নারায়ণ।
অবিভক্ত বাংলার এক বিস্তীর্ণ এলাকা সুন্দরবন। সুন্দরবন ১৮ ভাটির দেশ। ১৮টি বিভিন্ন নদ-নদী সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। শতাধিক দ্বীপাঞ্চল নিয়ে এই সুন্দরবন এলাকা। দেশভাগের পর বড়ো অংশ বাংলাদেশে চলে যায়, বাকি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। সুন্দরবন এলাকার জনপ্রিয় লোকনাট্য 'বনবিবির পালা' সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন। এই লোকনাট্যের শিল্পী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলেই। লোকশ্রুতি অনুসারে সুন্দরবনের অধিপতি ছিলেন দক্ষিণ রায়। জল জঙ্গল জমি ১৮ ভাটির মালিক সে। মক্কার ইব্রাহিম ও তার বউ গুলাম বিবির সন্তান বনবিবি ও তার ভাই শাহ জঙ্গলী সুন্দরবনে জন্মগ্রহণ করেন। বেশ কয়েক বছর পর সুন্দরবনে আজানের শব্দ শুনে দক্ষিণ রায় বুঝতে পারেন যে, এই জঙ্গলে অন্য কেউ অধিকার বসিয়েছে। দক্ষিণ রায় ছুটে আসেন সেখানে। তাদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দক্ষিণ রায় পরাস্ত হন। পরে দক্ষিণ রায়ের মা নারায়ণীর ও বনবিবির চুক্তি অনুসারে গভীর জঙ্গলের অধিকার পান দক্ষিণ রায় এবং জনবসতি অঞ্চলের অধিকারী হন বনবিবি ও তার ভাই শাহ জঙ্গলী। 'বনবিবির পালা' 'জহুরানামা' বা 'ধনাই মনাই দুখে পালা' নামেও পরিচিত। লোভী নিষ্ঠুর ধনাই সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে দরিদ্র সন্তান দুখেকে সুন্দরবনে ছেড়ে দেন বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের ভেট হিসেবে। বাঘ দুখেকে খেতে এলে বনবিবি ও তাঁর ভাই শাহ জঙ্গলীর সহযোগিতায় বাঘের হাত থেকে রক্ষা পায় দুখে। দক্ষিণ রায় গাজীশাহর কাছে বিচার প্রার্থনা জানালে গাজী শাহ উভয়ের মধ্যে আবার মীমাংসা করে দেন। এলাকা ও গোষ্ঠী ভেদে এই কাহিনীর নানা রূপান্তরও দেখা যায় নানা শিল্পীর মুখে।
সুন্দরবনের কাঠ সংগ্রহকারী বাউলী, মধু সংগ্রহকারী মৌলিরা বনবিবি বা বনদেবীর পূজা করে তবেই যান গভীর অরণ্যে মধু, কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে। তাদের পুজোর পুরোহিত যেকোনো ধর্ম বর্ণের মানুষ। উপাচার সাধারণ ফলমূল মুরগি। সুন্দরবনে ঢোকার পর তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া মুরগি দক্ষিণ রায়ের জন্য অর্ঘ্য হিসেবে ছেড়ে দেন। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সুন্দরবনের মানুষ বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার নিষ্ঠাভরে বনবিবির পুজো করেন। নদীতে স্নান করে পঙ্কিল কণ্টকসংকুল পথে গণ্ডি কেটে কেটে মেয়েরা দেবীর মন্দিরে গিয়ে পুজো দেন। পুজো চলার সময়ে মাথায় মাটির মালসা বা হাড়িতে আগুন নিয়ে তারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সুন্দরবনের খাঁড়ি।
শুধু তাই নয় বাড়ির পুরুষরা গভীর অরণ্যে মধু, কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়িতে ফিরে না আসা পর্যন্ত মেয়েরা অনেকেই উপোস পালন করেন এবং নিয়ম নিষ্ঠা সহকারে নিরামিষ দ্রব্য ভক্ষণ করেন, অনেকেই চুল না বেঁধে, কোনো অলঙ্কার পরিধান না করে কাটান।
কেন্দুখালি ব্যাঘ্র শ্বাপদ সঙ্কুল দ্বীপে বনবিবির পুজো হয় প্রতিবছর পয়লা মাঘ এবং এই উপলক্ষে বিরাট মেলা বসে সেখানে।

বনবিবি।
বনবিবির প্রতিমায় আশ্চর্যরকম ভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সমন্বয় ভাবনার অসাধারণ নিদর্শন আমাদের চোখে পড়ে। তাঁর মাথায় টুপি, চুলে বিনুনি, গলায় হার, কপালে লতাপাতার পারস্য চিত্রকলা। গায়ের রং হলুদ, মাথায় মুকুট। কালু গাজীর প্রতিমার ক্ষেত্রেও অনুরূপ সমন্বয় ভাবনার নিদর্শন মিলে। মাথায় টুপি, গালে দাড়ি আবার হাতে ত্রিশূল, গলায় পৈতে।
বনবিবির পুজোর কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্র-তন্ত্র নেই, যেকোনো ধর্ম বর্ণের মানুষ পুরোহিত হতে পারেন। নিয়ম-নিষ্ঠা মেনে পুজো করা হয়। জঙ্গলে যাবার এক সপ্তাহ আগে থেকে পরিশুদ্ধভাবে থেকে, স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে জঙ্গলের মধু, কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে যায় তারা। বনে ঢুকে পালিত মোরগ মুরগি ছেড়ে দেয় দক্ষিণ রায়ের বা বাঘের উপঢৌকন হিসেবে।

ফকির।
বনবিবি বা বনদেবীর হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে মিলিতভাবে পুজো করা সম্পর্কে সেখানকার মানুষের কাছে জানতে চাইলে তারা সহজেই অকপটে বলেন যে বনের দেবতা দক্ষিণ রায় বা বাঘ যখন পেছন থেকে এসে আক্রমণ করে তখন সে বোঝেনা কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান?

বাউল।
সুন্দরবনের মাঝি মাল্লারা নদী সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় নৌকা ট্রলার নিয়ে। প্রবল ঝড়-ঝঞ্ঝায় যখন নদী সমুদ্র উত্তাল হয় নৌকা ট্রলার ডুবে যাবার উপক্রম হয় তখন হিন্দু-মুসলমান সব ধর্মের মাঝি মল্লারা পাঁচ পীরের নাম ধরে প্রার্থনা জানায়, 'বদর বদর'।
এরকম অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে নানা জেলায় নানা রাজ্যে দেশে-বিদেশে। এই সমস্ত নিদর্শন মানুষকে সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করে গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করতে উদ্বুদ্ধ করে। আসুন সবাই মিলে মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিচয়কে বড়ো করে তুলি। প্রেম প্রীতি ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হই। সমস্বরে সবাই বলি – সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।

পরিচিতি: প্রাবন্ধিক, গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
