প্রকৃত তথ্যকে আড়াল করে শাসক তার দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বাছাই-করা তথ্যকে অতিরঞ্জিত করে পরিবেশন করার চেষ্টা করে চলেছে। ফলে এটা যেমন নীতি নির্ধারণ ও গবেষণামূলক কাজের ক্ষতি করছে, তেমনি তা ভারতের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক-অর্থনীতির পক্ষে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট (ইন্ডিয়া প্রভার্টি অ্যান্ড ইকুইটি ব্রিফ: এপ্রিল ২০২৫) অনুসরণ করে দাবি করা হচ্ছে যে, ভারতের চরম দারিদ্র্য দূরীভূত হয়েছে। সবচেয়ে কম বৈষম্য রয়েছে এমন চারটি দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত। এই তথ্য গণমাধ্যম এবং জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করেছে। বিশ্ব ব্যাংক দাবি করেছে যে, ভারতে বৈষম্য চিহ্নিত করার জন্য ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে ২০২২-২০২৩-এর হাউজহোল্ড কনসাম্পশন এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচসিইএস)-এর তথ্য। এই তথ্যের একটা মস্ত বড়ো সীমাবদ্ধতা হলো এখানে ধনীদের ভোগব্যয়ের সবটা সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
জিনি কোএফিসিয়েন্ট-এর অনুপাত সামনে এনে বিশ্ব ব্যাংক সম্প্রতি জানিয়েছে, ভারতে আর্থিক বৈষম্য কমেছে। জিনি কোএফিসিয়েন্টে আর্থিক বৈষম্য সর্বনিম্ন ০ থেকে সর্বোচ্চ ১-এর মধ্যে থাকে। কোএফিশিয়েন্ট ০, অর্থাৎ এখানে কোনো বৈষম্য নেই, পুরোপুরি সাম্য বিরাজ করছে। মান ১ হলে পুরোপুরি বৈষম্য। ০ থেকে ১-এর মধ্যে মান যত বাড়বে, বৈষম্যের মাত্রা তত বেশি হবে। বিশ্ব ব্যাংকের একটি হিসাবে ২০১১-১২ সালে ভারতের জিনি কোএফিসিয়েন্ট ছিল ০.২৮৮। ২০২২-২৩-এ তা কমে হয়েছে ০.২৫৫। বিশ্ব ব্যাংকের এই হিসাবকে তুলে ধরে সরকার উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অভূতপূর্ব সাফল্য দাবি করছে।
এখানে মস্ত বড়ো এক চালাকি রয়েছে। জিনি কোএফিসিয়েন্টে বৈষম্যের হিসাব ভোগব্যয়, আয় ও সম্পদের মাপকাঠিতে হতে পারে। বিশ্ব ব্যাংক যে হিসাব এখানে দেখাচ্ছে, সেটা ৬১টি দেশের মিশ্র তথ্য থেকে করা হয়েছে। কোনো দেশের হিসাব ভোগব্যয়ের নিরিখে, আবার কোনো দেশের হিসাব আয়ের নিরিখে ধরা হয়েছে। ভারতের হিসেব ধরা হয়েছে জাতীয় নমুনা সমীক্ষা (এনএসএস)-এর দেওয়া ভোগব্যয়ের তথ্যের ভিত্তিতে। আয় কিংবা সম্পদের নিরিখে নয়। আয়ের নিরিখে ভারতে জিনি কোএফিসিয়েন্ট ২০১১ সালে ছিল ০.৫৯। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ০.৬১। অর্থাৎ আয় বৈষম্য বেড়েছে। সম্পদের নিরিখে ২০১১-তে ছিল ০.৭৫। ২০২৩-এ তা একটুও কমেনি। সম্পদের নিরিখে বিপুল বৈষম্য এতটুকুও কমেনি।
আয় ও সম্পদের নিরিখে বৈষম্যের তুলনায় ভোগব্যয়ে বৈষম্য বরাবরই কম থাকে। তার অন্যতম কারণ জীবনধারণের জন্য অত্যন্ত জরুরি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেই গরিব মানুষ তার আয়ের অধিকাংশ কিংবা পুরোটাই ব্যয় করতে বাধ্য হন। হাতে কোনো সঞ্চয় থাকে না। ধনীদের আয়ের ক্ষুদ্র অংশ ভোগের জন্য ব্যয়িত হয়। বেশিরভাগটাই সঞ্চয় কিংবা বিনিয়োগে নিয়োজিত হয়। ফলে ভোগব্যয়ের নিরিখে বৈষম্যের তুলনায় আয় ও সম্পদে বৈষম্য অনেকটাই বেশি হয়। তাছাড়া পারিবারিক ভোগব্যয়ের হিসাব ২০১১-১২ এবং ২০২২-২৩-এর যে তথ্য ও পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করা হয়েছে তা ত্রুটিপূর্ণ। অতি ধনীদের ভোগব্যয়ের প্রকৃত চিত্র এই হিসাবে আসেনি। বিশ্ব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অতি ধনীদের আয় এবং সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করাটাও দূরূহ ছিল।
টমাস পিকেটির নেতৃত্বে ওয়ার্ল্ড ইউনিকোয়ালিটি ডেটাবেস (ডব্লিউ. আই. ডি.) অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য চিত্র উপস্থিত করতে সক্ষম হয়। জনসংখ্যার অনুপাতে সম্পদ ও আয়ের আপেক্ষিক অংশ জিনি কোএফিসিয়েন্টের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব হয় না। টমাস পিকেটির হিসাবে পাওয়া যায়, ২০২২-২৩-এ ভারতে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের হাতে দেশের মোট আয়ের ২২.৬ শতাংশ ও সম্পদের ৪০.১ শতাংশের মালিকানা রয়েছে। আয়ের নিরিখে নিচের দিকে রয়েছেন এমন ৫০ শতাংশের হাতে রয়েছে দেশের সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংকের জিনি কোএফিসিয়েন্টে এ তথ্য পাওয়া যায় না।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ছাড়াও বৈষম্যের আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ ধরন রয়েছে: অঞ্চলে-অঞ্চলে, গ্রামে-শহরে, নারী-পুরুষে, বিভিন্ন জাতিতে, বিভিন্ন শ্রেণিতে, সামাজিক ক্ষেত্রে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রভৃতি বিভিন্ন সূচকে বৈষম্য প্রতিফলিত। জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশই কর্মসংস্থানের জন্য সংগঠিত ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, তাঁরা নির্ভরশীল অপ্রথাগত ক্ষেত্রের ওপর। ভারতে ঐতিহাসিকভাবেই মহিলারা শ্রমশক্তির নিরিখে প্রান্তিক। তাঁরা মোট শ্রমের মাত্র ৩৫.৯ শতাংশ।
৫২.৭ শতাংশ স্কুলে কোনও কার্যকর কম্পিউটার নেই। ইন্টারনেটের সংযোগ নেই ৫৩.৯ শতাংশ স্কুলে। এর ফলে এক ভয়ঙ্কর 'ডিজিটাল ডিভাইড' তৈরি হয়েছে। গ্রাম ও শহর মিলিয়ে ইন্টারনেটের সংযোগের আওতায় ৪১.৮ শতাংশ। তারই মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অল্প আয়ের মানুষজন। এক্ষেত্রেও পুরুষের তুলনায় মহিলারা অধিকতর বঞ্চিত। গ্রাম ভারতে যেখানে ৪৯ শতাংশ পুরুষ ইন্টারনেট সংযোগের আওতায়, সেখানে ২৫ শতাংশ মহিলা ইন্টারনেটের সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছে। পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া (পিএআরআই)-র 'ডিজিটাল ডিভাইড ইন্ডিয়া: ইউনিকোয়ালিটি রিপোর্ট, ২০২২' অনুযায়ী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইড মারাত্মকভাবে রয়েছে। দেশের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ মানুষ কম্পিউটার চালাতে কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে সক্ষম। সাম্প্রতিককালে ডিজিটাইজেশনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও নেটওয়ার্ক রেডিনেস ইনডেক্স (এনআরআই)-এ বৈষম্য যথেষ্ট পরিমাণ রয়ে গেছে। ২০২৪-এ ১৩৩টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ৪৯তম। যাঁরা ইন্টারনেটের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তাঁরা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ক্রমশ সংকুচিত হওয়ার ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, বৈষম্য প্রসারিত হচ্ছে। সমস্ত ধরনের বৈষম্যের মিলিত প্রভাব ভারতের বৈষম্যের মাত্রাকে বহুগুণ বিস্তৃত করেছে।
জন্মের এক বছরের মধ্যে এক হাজার শিশুর মধ্যে যতজন মারা যায় সেটা হলো শিশু মৃত্যুর হার (ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট - আইএমআর)। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে শিশু মৃত্যুর হার ২৪.৫। এটা এখনও যথেষ্ট বেশি। ২০২৪-এ ভারতে গড় আয়ু ৭০.৬২ বছর। বিশ্বের গড় ৭৩.৩ বছর। ১৯৩টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৩০তম। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের লিঙ্গ বৈষম্যে ভারতের স্থান ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১৩১তম। ২০২৪-এ বিশ্ব ক্ষুধা সূচক (গ্লোবাল হাঙ্গার ইন্ডেক্স)-এ ১২৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৫তম। সর্বোপরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ জীবনযাত্রার সামগ্রিক মান মাপার যে কম্পোজিট ইন্ডেক্স তৈরি হয়েছে তা হলো মানব উন্নয়ন সূচক (হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স - এইচডিআই)। এর মান ০ থেকে ১-এর মধ্যে। ভারতের স্কোর ০.৬ ৪৪। ২০২৪-এ ভারতের স্থান ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৩৪তম। এই সূচক থেকেই ভারতের বৈষম্যের চিত্র আন্দাজ করা যায়। শুধুমাত্র জিনি কোএফিসিয়েন্টের একটি তথ্যকে আঁকড়ে ধরে বৈষম্যের কুৎসিত চেহারাকে আড়াল করা সম্ভব নয়।

পরিচিতি: প্রাবন্ধিক, প্রাক্তন অধ্যাপক, চাকদহ, নদিয়া।
