প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

"With Corruption Everyone Pays"



অম্বিকেশ মহাপাত্র


বিশ্ববাসী একবিংশ শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ সময়কাল অতিক্রম করতে চলেছেন। বিশ্ববাসী প্রস্তরযুগ, লৌহযুগ, যন্ত্রযুগ... সব অতিক্রম করে বর্তমানে ইলেকট্রনিক যুগে অর্থাৎ e-বিশ্বে প্রবেশ করেছেন। ফলশ্রুতিতে আমরা বিশ্ববাসী বর্তমান সময়কালে বিশ্বায়ন এবং উদারীকরণের সঙ্গে International Network বা InterNet সহ e-বিশ্বে রয়েছি। পৃথিবীর বাসিন্দাদের মধ্যে উন্নততম প্রাণী মানুষ। মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদে এবং দৈনন্দিন লড়াইয়ের ফলশ্রুতিতে বিজ্ঞানচর্চা- 'স্থূল-বস্তু' থেকে 'সূক্ষ্ম (আণুবীক্ষণিক) বস্তু' থেকে 'অতিসূক্ষ্ম (অতিআণুবীক্ষণিক) বস্তু'-র বিজ্ঞানচর্চায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ বিজ্ঞানচর্চা ধ্রুপদি থেকে আধুনিক থেকে অতিআধুনিক বিজ্ঞানচর্চায় উন্নীত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একটিবার পিছন ফিরে তাকানো যাক।

প্রথমেই সাম্প্রতিককালের একটি আন্তর্জাতিক সংবাদের দিকে নজর দেওয়া যাক। এবছর ফরাসি দেশে আটাত্তরতম কান চলচ্চিত্র উৎসব (Cannes Film Festival)-এ জায়গা করে নিয়েছে ছাপান্ন বছর আগে নির্মিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে বাঙালির গর্ব বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের 'অরণ্যের দিনরাত্রি'। বর্তমান সময়কালের উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে সংরক্ষিত চলচ্চিত্র 'অরণ্যের দিনরাত্রি' কান চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্‌ বোধনের দিন প্রদর্শিত হয়। উদ্‌ বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, 'অরণ্যের দিনরাত্রি'র দুই অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর, সিমি গারেওয়াল এবং প্রযোজক পরিবারের দুই সদস্য। 'অরণ্যের দিনরাত্রি' চলচ্চিত্রের নতুন সংস্করণ প্রদর্শনের পর দুই অভিনেত্রীকে মঞ্চে আহ্বান জানালে, প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত সমস্ত দর্শক তুমুল করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করেন। দুই অভিনেত্রী তাঁদের অভিনয়ের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পরিচালক সত্যজিৎ রায় প্রসঙ্গে তাঁদের বিরল অভিজ্ঞতার কথা দর্শক-শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন।

উল্লেখ্য, 'অরণ্যের দিনরাত্রি'র পরিচালক সত্যজিৎ রায় সহ অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, শমিত ভঞ্জ, কাবেরী বসু, পাহাড়ী সান্যাল প্রমুখ প্রকৃতির নিয়মে বেঁচে নেই। কিন্তু সত্যজিতের কালজয়ী অমর সৃষ্টি 'অরণ্যের দিনরাত্রি' কালের নিয়মে বেঁচে থাকবে। বারবার ফিরে আসবে প্রাসঙ্গিক হয়ে। যে সময়কালে 'অরণ্যের দিনরাত্রি' সংরক্ষণের উদ্যোগ এবং বিদেশে মাটিতে নতুন সংস্করণের প্রদর্শন, সেই সময়কালে বাংলা সহ দেশের মাটিতে কী ঘটে চলেছে? প্রচলিত দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে রূপান্তরিত করে, সামাজিকীকরণের উদ্যোগ অব্যাহত। উদাহরণে (জন)সাধারণতান্ত্রিক দেশের প্রত্যেক সাবালক দেশবাসীর প্রাথমিক অধিকার, ভোটদানের অধিকার সহ ভোটচুরি প্রাতিষ্ঠানিকতালাভ করেছে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে দেশের সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রয়োগে 'ইলেক্টোরাল বন্ড' এবং 'বাংলার স্কুলগুলিতে নিয়োজিত ২৫,৭৫২ জন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল' হয়েছে! বাংলায় চাকরিহারা ২৫,৭৫২ জনের পরিবার 'অসহায় এবং দিশেহারা' শুধু নয়, রাজ্যের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা চরম সংকটে। মানুষের মৌলিক চাহিদা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য দুই-ই চরম সংকটে। এই প্রেক্ষিতে পাঠকবন্ধুদের অনুরোধ, ইউটিউবে 'অরণ্যের দিনরাত্রি'-র পুরোনো সংস্করণ রয়েছে, সপরিবারে দেখুন। বুঝতে পারবেন; কাকে বলে সমাজে প্রচলিত চুরি, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং ঘুস; তাহলে বুঝবেন সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রয়োগে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক চুরি, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, ঘুস দেদার শৈল্পিকভাবে সম্পন্ন হয়ে চলেছে। এখানেই প্রসঙ্গক্রমে দুর্নীতি প্রসঙ্গে কালজয়ী উদ্ধৃতি উল্লেখ করতে হয়- "With Corruption Everyone Pays"। 'চুরি, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং ঘুস' প্রসঙ্গের সঙ্গে সত্যজিতের নির্মিত চলচ্চিত্রের সম্পর্ক কোথায়?

"Thanks, God, for Corruption"

১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'অরণ্যের দিনরাত্রি'র প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

কলকাতার বাসিন্দা চার বন্ধু অসীম, সঞ্জয়, হরি এবং শেখর ছুটিতে পালামৌ জঙ্গলে বেড়াতে এসেছে। অসীম কলকাতায় একটি সওদাগরি অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মচারী এবং চার বন্ধুর মধ্যে অসীম অর্থনৈতিকভাবে বেশি সচ্ছল এবং একটি অ্যামব্যাসাডর গাড়ির মালিক। সঞ্জয় কলকাতায় একটি সরকারি অফিসে কাজ করে। হরি ফুটবল খেলোয়াড়। শেখর বেকার এবং তার সপ্রতিভ ব্যবহারের জন্য বন্ধুদের খুব প্রিয়। চার বন্ধু কলকাতা থেকে পালামৌ যাবে বলে অসীমের গাড়ি করে বেরিয়ে পড়েছে। পালামৌ এসে, কাছাকাছি কোথাও ফরেস্ট বাংলো আছে কিনা জানতে, একটি চায়ের দোকান দেখে অসীম গাড়ি থামায়। ড্রাইভারের সিটে বসে অসীম চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে থাকা, গায়ে ছেঁড়া স্যান্ডো গেঞ্জি পরা একজনকে উদ্দেশ্য করে- "এ্যায়, দেখো, এই ধার কৈ, নজদিক্ বাংলা হ্যায়? ডাক বাংলা?
তড়িৎগতিতে শেখর গাড়ি থেকে নেমে চিৎকার করে বলে- "ফরেস্ট, ...ফরেস্ট বাংলা?"
ছেঁড়া গেঞ্জি পরা হতদরিদ্র লখা দাঁড়িয়ে বলে- "আছে বাবু।"
অসীম- "কত দূর?"
লখা- "বেশি দূর নয়।"
অসীম- "তুই আমাদের সঙ্গে যাবি? জায়গাটা দেখিয়ে দিবি?"
বাবুদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে, কোন কথা না বলে, লখা নিজের কান চুলকোতে থাকে।
এমন সময় অসীম বলে- "তুই আয়, বখশিস্ দেব।"
'বখশিস্ দেব' শুনে লখার মুখমণ্ডলে হাসির ঝিলিক খেলে যায়। বিড়িতে একটা সুখটান দিয়ে, ফেলে তাড়াতাড়ি গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। ...এবং গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসে। গাড়ি কিছুটা জঙ্গলের মধ্যদিয়ে এগিয়ে গিয়ে একটি ফরেস্ট বাংলোয় ঢোকার মুখে নোটিশ বোর্ড; গাড়ি থামিয়ে নোটিশঃ 'Persons intending to use F. R. H. must have permission of DFO Daltonganj' পড়ে ভিতরে ঢুকে যায়। ভেতরের একটি জায়গায় গাড়ি থামিয়ে পাঁচ জনে পর পর নেমে পড়ে।
এমন সময় লখা- "বাবু, মাল নামাবো?"
অসীম- "না, দাঁড়া” বলে চিৎকার করে “চৌকিদার, এ্যায় চৌকিদার..., ডাকতে থাকে।"
লখা- "আমি ডেকে দিচ্ছি বাবু।"
চৌকিদারকে ডাকতে লখা চলে যায়। কিছুক্ষণ পর চৌকিদার সহ লখা ফিরে আসে। লখা এবং চৌকিদার দু'জনেই দ্রুতপায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। হরি গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, বাকি তিন বন্ধু গাড়ির পাশে। গাড়ির কাছাকাছি এসে, লখা- "বাবু, চৌকিদার।"
চৌকিদারকে উদ্দেশ্য করে অসীম- "তুমি চৌকিদার?"
চৌকিদার- "হ্যাঁ বাবু।"
অসীম- "ঘর-টর গুলো খুলে দাও, আমরা থাকবো।"
চৌকিদার- "খত্ লিখা থা আপনে?"
চালাকি করে শেখর বলে- "তুমি খত্ পাওনি?"
চৌকিদার- "নেহি বাবু।"
ধমক দিয়ে অসীম- "খত্ কা কিয়া জরুরত হ্যায়? এতগুলো কামরা খালি পড়ে রয়েছে, খুলে দাও, যা টাকা পয়সা লাগে আমরা দেব।"
মাঝখানে সঞ্জয় বলে- "ইধার কোই রিজার্ভেশন কিসকা হ্যায়?"
সঞ্জয়কে সরিয়ে চালাকি করে আবার শেখর বলে- "চিঠি ডেলিভারি নেহি হুয়া তো হাম কিয়া করেগা? খোলো, খোলো।"
চৌকিদার- "মেরে নোকরি চলি যায়েগা বাবু।"
অসীম- "কে তোমার চাকরি খাবে? DFO?"
এপর্যন্ত কথাবার্তায় চৌকিদার বুঝতে পারে, বাবুদের কোনো বুকিং নেই। বাবুরা ঘুস দিয়ে থাকতে চায়। থাকতে দিলে আইন বিরুদ্ধ হবে, উপরওয়ালা জানতে পারলে তার চাকরি চলে যাবে, এই ভেবে চৌকিদার বলে- "নেহি নেহি বাবু দুসরা বাংলা দেখ্ লিজিয়ে।"
এরপর কৌশল বদলে শেখর বলে- "এ্যায় শোন্ শোন্, VIP সমঝতা?"
চৌকিদার- "নেহি বাবু।"
সবাইকে দেখিয়ে শেখর বলে- "এ্যাঁ, এরা সব VIP হ্যায়। (অসীমকে দেখিয়ে) ও বাবু হ্যায় বড়া Executive, (সঞ্জয়কে দেখিয়ে) এ বাবু হ্যায় জুট কা বড়া লেবার অফিসার, (দূরে হরিকে দেখিয়ে) ও হ্যায় না, ...ও, ...বড়িয়া খেলোয়াড়।"
চৌকিদার বিস্মিত হয়ে বলে- "আচ্ছা।"

অসীম সবাইকে সরিয়ে সামনে আবার এগিয়ে আসে এবং পকেট থেকে মানি ব্যাগ বের করে, তার থেকে দুটো বড়ো নোট বের করতে করতে অসীম বলে- "বাদ দে। এতদূর যখন আমরা এসেছি, ফিরে তো যাব না, (দুটো বড়ো নোট চৌকিদারের সামনে ধরে) এই নাও, ঘরটা খুলে দাও।"
ঘুসের প্রস্তাবে চৌকিদার কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। একদিকে দারিদ্র্যের যন্ত্রণা লাঘবে ঘুসের টাকা নেবে? আবার ঘুসের টাকার বিনিময়ে ঘরগুলো ব্যবহার করতে দিলে, আইনভঙ্গে চাকরি চলে গেলে খাবে কি? সেকারণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় সকলের সামনে নীরবে দু'হাত কচলাতে থাকে, দোদুল্যমান অবস্থা। হাত বাড়িয়ে বড়ো নোট দুটো নিতে পারছে না। এই অবস্থা কিছুক্ষণ। পরে ফের অসীম বলে- "কি ভাবছ? কি? DFO কে আমরা বলে দেব। তোমার চাকরি যাবে না” বলে বড়ো নোট দুটো চৌকিদারের হাতে গুঁজে দেয়।
তখন চৌকিদার বড়া Executive বাবুর কথায় খানিক আশ্বস্ত হয়ে, খানিক দারিদ্র্য লাঘবে, ঘাড় ডানদিকে ঈষৎ ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে দুই হাতে গুঁজে দেওয়া দুটো বড়ো নোট মুঠোস্থ করে।
তখন স্বগতোক্তিতে “Thanks, God, for Corruption” বলে অসীম বলে- "যাও, ঘরটা খুলে দাও।"
চৌকিদার ঘর খুলে দেয়। লখা গাড়ির উপর থেকে মালপত্র নামিয়ে ঘরে পৌঁছে দেয়।

(F. R. H. = Forest Rest House and DFO = Divisional Forest Officer)

নির্যাস: সমাজে 'ঘুস-দুর্নীতি' নিন্দনীয় হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে 'ঘুস-দুর্নীতি'-র ব্যবহার বহু প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। বর্তমান সময়কালের সঙ্গে এর তফাত কী? বর্তমান সময়কালে দুই সরকার আইন, সংবিধান এবং বিচারব্যবস্থা সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে 'ঘুস- দুর্নীতি'-র সরকারিকরণ সহ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে চলেছেন। উদাহরণে 'ইলেক্টোরাল বন্ড', 'পি এম কেয়ার্স ফান্ড', 'এস‌এসসি-২০১৬', 'OBC সার্টিফিকেট প্রদান', রেশন দুর্নীতি, প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ মামলা,...।

"ঘুস, নেশা, জুয়া, সেক্স, ভায়োলেন্স এ সমস্ত সেই মহাভারতের যুগ থেকে চলে আসছে"

প্রসঙ্গক্রমে চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিতের আরও একটি চলচ্চিত্রের মূলভাবনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র 'জন-অরণ্য'। 'জন-অরণ্য' চলচ্চিত্রের প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

কলকাতা মহানগরের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার। দুই ভাই ভোম্বল এবং খোকন (পোশাকি নাম সোমনাথ ব্যানার্জি)। খোকনের দাদা ভোম্বল বিবাহিত এবং চাকরিরত। বৌদি কমলা সুচারুভাবে ঘরকন্না করেন। খোকনের মা প্রয়াত। বিপত্নীক, সৎ-সজ্জন বৃদ্ধ বাবা বেশিরভাগ সময় বাড়িতে থাকেন। বৌদি সবসময় বৃদ্ধ শ্বশুরমশায় সহ পরিবারের সকলের খেয়াল রাখেন। এবং পাশাপাশি পরিবারের কারুর যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সেদিকেও নজর রাখেন।

১৯৭০-এর দশক, শিক্ষাক্ষেত্র সহ রাজ্যজুড়ে সার্বিক নৈরাজ্য। সেই সময়কালে খোকন (সোমনাথ ব্যানার্জি) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে বিএ অনার্স পাস করে। চাকরির জন্য অনেক সন্ধান এবং চেষ্টার পর হতোদ্যম হয়ে শেষমেষ বড়বাজারে অল্প পুঁজির 'অর্ডার অ্যান্ড সাপ্লায়ার'-এর ব্যবসা শুরু করে। ব্যবসায়ীকে ইংরেজিতে বলা হয় 'The Middleman' অর্থাৎ বাংলায় 'দালাল'।

একদিন রাত্রিবেলা খাবার টেবিলে, লোডশেডিং থাকায় মোমবাতির আলোয়, খোকন, দাদা ভোম্বল এবং বাবা তিনজনে একসাথে রুটি-তরকারি খাচ্ছেন। বৌদি খাবার পরিবেশন করছেন এবং পাশাপাশি শ্বশুরমশাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে পাখার বাতাস করছেন। সেই সময় পরিবারের মধ্যে যে কথোপকথন -

টেবিলের নিচ থেকে বিড়াল- "ম্যাঁও"
নিচের দিকে তাকিয়ে দাদা ভোম্বল- "কিরে পেট ভরেনি?”
বিড়াল পুনরায়- "ম্যাঁও"
বৌদি- "ওকে আর দিও না তো। ও বেজায় হ্যাংলা হয়ে গেছে।"
খোকনকে উদ্দেশ্য করে বাবা- "তুই রেডক্সন নিয়মিত খাচ্ছিস তো?
খোকন- "হুঁ"
বৌদি- "খাচ্ছে মানে, রোজ মনে করিয়ে দিতে হয়।"
খোকন- "প্রশ্ন হচ্ছে খাচ্ছি কিনা? উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। ব্যস।"

বাবা- "সি ডেফিসিয়েন্সিটা তোর ছেলেবেলা থেকে। শরীরের উপরে স্ট্রেন পড়ছে তো।"
খোকন- "না। শরীর তো বেশ ভালোই আছে বাবা। এই কালই তো; কলকাতার কাছে একটা কাপড়ের মিলে গেছিলাম। দু'বার বাস বদলাতে হলো। স্ট্রেন হয়নি তো?
বাবা- "ব্যবসায় নেমে যদি স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, তবে তো সেটা পজিটিভ গেম বলতে হয়।"
দাদা- "কোন্ মিল রে?"
খোকন- "কেজরিওয়াল। মানে ওখানে একটা কেমিক্যালের বড়ো অর্ডার পাওয়ার কথা আছে।"
দাদা- "আচ্ছা। ...পেলেই সোমনাথ কানোরিয়া?"
খোকন- "তা না হোক। তবে এক বছরের দায় নিশ্চিন্তি।"
বাবা- "কাপড়ের মিলে... কি কেমিক্যাল?"
খোকন- "অপটিক্যাল হোয়াইটনার বলে।"
বাবা- "অপটি... ক্যাল হোয়াইটনার?"
খোকন- "হুঁ"
দাদা- "তুই কি চেয়ারে বসিস্? না গদিতে?"
বৌদি- "আচ্ছা, তুমি কি বলতো?"
খোকন- "গদিতে। ডানলো-পিলো।"
বাবা- "তা তুই যে অর্ডারটা পাবি..."
খোকন- "না... পাবো... মানে পাওয়ার চান্স আছে।"
বাবা- "যাইহোক। যদি পাস, তাহলে কি বেসিসে পাবি? তোর মালটা ভালো বলে, না কি রেটটা ভালো বলে, না তুই মানুষটা ভালো বলে?"
তৎক্ষণাৎ পাশ থেকে দাদা- "ঘুস-টা ভালো বলে।"
খোকন- "ঘুস! আর তোমাদের চাকরিতে বুঝি ঘুস নেই?"
দাদা- "এক'শ বার। আমি কি অস্বীকার করছি?"
বাবা- "সর্বত্রই ঘুস!"
দাদা- "সর্বত্র কেন বাবা? সর্বকালে ঘুস। উৎকোচ, আচ্ছা উৎকোচ কথাটা তো সংস্কৃত? তার মানে পুরাকালে ঘুস ছিল। ঘুস, নেশা, জুয়া, সেক্স, ভায়োলেন্স এ সমস্ত সেই মহাভারতের যুগ থেকে চলে আসছে। হ্যাঁ, এ সবই ঐতিহ্যের ব্যাপার...।"
বাবা- "তার মানে তোকেও..."
খোকন নিরুত্তর; কিছুক্ষণ পর দাদা- "বাবা, কি জিজ্ঞেস করছেন?"
খোকন- "শুনেছি।"
ফের কিছুক্ষণ সব চুপচাপ...
বাবা- "ঘুস ছাড়া কোনো কাজই হয় না। এটা বিশ্বাস করাটা..."
দাদা- "এটা বিশ্বাস করার কোনো দরকার নেই বাবা। সব ব্যাপারে অল্পবিস্তর ঘুস দিতে হয়। ও নিয়ে ভাববার কিছু নেই। আর খোকন ঘুস দিলে সামান্যই দিতে পারবে। ওর ক্ষমতা-ইবা কতটা?
অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে বৌদি- "আচ্ছা, তোমরা কি শুধুই কথা বলবে? আজ আমি নিজের হাতে রান্না করেছি, তা জান?"
দাদা- "বাবা জিজ্ঞেস করলেন তো। তাই বুঝিয়ে বললাম।"
বাবা- "জিজ্ঞেস করি। তার কারণ আছে ভোম্বল।"
দাদা- "কারণ নিশ্চয়ই আছে। তবে সব প্রশ্নের উত্তর তো আর খোলামেলা দেওয়া যায় না। মানে উত্তর দিতে গিয়ে মুশকিলে পড়ে যেতে হয়।"
বাবা- "তোদের ব্যাপার বলেই জিজ্ঞেস করি। তোরা ছাড়া আমার আর কে আছে বল, তোদের মা যখন গেলেন, এবং যেভাবে গেলেন, এত কষ্ট! সে তো চোখে দেখা যায় না। তারপর থেকে ঈশ্বর-টিশ্বর সব কিরকম মিনিংলেস হয়ে গেছে আমার কাছে। এ বয়সে একটা লোকের যেসব অবলম্বন থাকে, আমার তো সেসব নেই। গুরু টুরু মানি না। তোরা দু'জন আর বৌমা। বৌমা তো আছেই। সবসময় আছে। কাছে কাছে আছে। কিন্তু তোরা দু'জন দূরে সরে গেলে, মনের মধ্যে সব সংশয় দানা বাঁধে। এ্যাংজাইটি হয়। তার থেকে যত খিট খিটেমি। খিট খিটেমি, যেটা আমি অ্যাভয়েড করতে চাই। তবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে যদি তোদের অসুবিধা হয়, তাহলে..."
দাদা- "না না অসুবিধার কি আছে? আমরা তো আছি। আমরা তো পালিয়ে যাইনি। তাছাড়া আমরা তো ভালোই। ছেলে তো ভালো। কিন্তু তোমার মতো ভালো হ‍ওয়া যায় না। সেটা তো সম্ভব নয়। খোকন ভালো। আমিও ভালো। তোমার বৌমা তো ভালোই। এখনো শাড়ি ছেড়ে ম্যাক্সি ধরেনি। আর রান্নাবান্না তো..."
বাবা খাওয়া সম্পূর্ণ না করে উঠে যান
বৌদি- "বাবা, বাবা মিষ্টি খাবেন না? বাবা মিষ্টি আছে।" বাবা কোনো উত্তর না করে খাবার টেবিল ছেড়ে চলেই যান, হাত ধোয়ার জন্য। বৌদি পেছন পেছন কিছুটা গিয়ে, ফিরে এসে বলে- "ছিঃ ছিঃ। ...কবে যে তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি হবে?"
দাদা- "আমি এমন কি একটা বললাম?"

নির্যাস: সত্যজিতের কথায় 'ঘুস-দুর্নীতি' সর্বকালে এবং সর্বত্রই ছিল। এটাই বাস্তব। সাধারণতান্ত্রিক ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দুই সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব 'ঘুস-দুর্নীতি'কে সমাজ থেকে নির্মূল করার চেষ্টা করা। নিদেনপক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু ঘটছে ঠিক তার বিপরীত। দুই সরকার সাংবিধানিক দায়-দায়িত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে পরিকল্পনামাফিক 'ঘুস-দুর্নীতি'র সরকারিকরণ সহ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে চলেছেন। উদাহরণে- 'ইলেক্টোরাল বন্ড', 'পি এম কেয়ার্স ফান্ড', কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন মাধ্যমে ভোটচুরি' এবং 'এস‌এসসি-২০১৬ মাধ্যমে নিয়োগ', 'আর জি করে তরুণী চিকিৎসকের প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড সহ তথ্য প্রমাণ লোপাট'। এছাড়াও অসংখ্য উদাহরণ সমাজে তথা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে।

• ৬৬,৭৪৪ প্রাথমিক স্কুলের মধ্যে ৫,১৪৯টিতে একজন মাত্র শিক্ষক
• ৬,৪২৬ আপার প্রাইমারি স্কুলের ৮৯১টিতে একজন মাত্র শিক্ষক
• প্রাথমিকে ১১,৫১৫টি স্কুলে ৩০-এর কম পড়ুয়া
• ওই স্তরেই ৩,৬৬৯টি স্কুলে ১৫ জনের কম পড়ুয়া
• ৭৪৭টি প্রাইমারি স্কুলে একজনও পড়ুয়া নেই
• আপার প্রাইমারিতে ১,৪৭৫টি স্কুলে ৩০ জনের কম পড়ুয়া
• ৭২০টি স্কুলে ১৫ জনের কম ছাত্রছাত্রী
• ২৫৯টি স্কুলে একজনও পড়ুয়া নেই

* সূত্র: প্যাব মিনিটস, শিক্ষামন্ত্রক

এসএসসি ২০১৬ - দুর্নীতির সরকারিকরণ

ন' বছরের ঘটনাপ্রবাহে শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পর নির্দেশে যে ছবি উঠে এসেছে -

● প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অধঃপতনের ছবি
● তৃণমূলস্তরের বেকারত্ব ও অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের ভয়াবহতা
● চাকরির বাজারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সর্বনাশা দৃষ্টান্ত

শুধু একটি রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয় বরং সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবস্থান ও দুর্নীতির বিস্তারের প্রচ্ছায়া তুলে ধরে।

দুর্নীতির সরকারিকরণে সামগ্রিক বারতা

সরকারের প্রধান এবং মন্ত্রী-সান্ত্রিদের হাবভাব এবং কথাবার্তায় স্পষ্ট; দুর্নীতি করেছি, বেশ করেছি। 'প্রমাণিত চিহ্নিত দাগি'দের তালিকা প্রকাশ করব না। 'প্রমাণিত চিহ্নিত দাগি'দের স্বার্থ সর্বাগ্রে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করব। বারেবারে মামলায় চাকরি বাতিল হয়েছে, হোক; নিয়োগ বন্ধ হয়ে আছে, বন্ধ থাক। তার দায় মুখ্যমন্ত্রীর নয়, সরকারেরও নয়। কেবলমাত্র মামলাকারী, আইনজীবী এবং বিরোধীদের। অর্থাৎ কোর্টের নির্দেশ মানব না। তারজন্য যদি কোর্ট অবমাননার মামলা হয়, হোক। সবকিছু আটকে যায়, যাক। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের মূলমন্ত্র। “এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই”। ফলে কার্যত রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। একটা প্রজন্ম সহ সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা উৎসাহিত হচ্ছে। সরকারের এটাই মূল লক্ষ্য। অপরদিকে শাসকদলের পার্টি-ফান্ড স্ফীত হচ্ছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এ সবের ফসল হলো সামাজিক অবক্ষয়, ছাত্র সমাজের পড়াশোনার প্রতি নিরুৎসাহী হয়ে পড়া, নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া। সমাজে শিক্ষকরা যে সম্মান শ্রদ্ধা পেতেন তার বদলে তাঁদের দিকে সন্দেহের তীর নিক্ষেপিত হওয়া। প্রাথমিক শিক্ষার হালহকিকতও এই প্রসঙ্গে আলোচিত হতে পারে - শিশুরা হারিয়ে ফেলছে তাদের সারল্য।

এসএসসি ২০১৬ - সালতামামি ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন

● সাল ২০১৬, 'The WBCSSC' স্কুলে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

● সাল ২০১৯, বেনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে অনশন, রাস্তায় বিক্ষোভ-আন্দোলন; কোর্টে শত শত মামলা-পিটিশন।

● ৩ এপ্রিল ২০২৫, প্রায় ছ'বছর পরে দীর্ঘসূত্রী বিচার প্রক্রিয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়। ২৫,৭৫২ জনের পুরো নিয়োগ বাতিল।

● বিচার প্রক্রিয়ায় কোর্টের নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগ নেতৃত্বাধীন তদন্তকমিটি এবং সিবিআই, দুইয়ের তদন্ত রিপোর্ট। তদন্ত রিপোর্টে প্রমাণিত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আপাতত সতের দফা বেনিয়মের মাধ্যমে দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে।

● প্রশ্ন, ২৫,৭৫২ জনই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সহযোগিতায় টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে নিয়োজিত? কক্ষণো সম্ভব নয়। তাহলে একাংশ যোগ্যতার নিরিখে বৈধভাবে নিয়োজিত। অপর অংশ দুর্নীতির সহযোগিতায় টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে নিয়োজিত।

● প্রশ্ন, কারা বৈধভাবে নিয়োজিত এবং কারা অবৈধভাবে নিয়োজিত? হলফনামা এবং তথ্যপ্রমাণ সহ সেই তালিকা কোর্টে জমা দেওয়ার দায়িত্ব কার? 'The WBCSSC'-এর। সতের দফা বেনিয়মের মাধ্যমে দুর্নীতির বাহিরে আর কোনরকম বেনিয়ম কি হয়নি? 'The WBCSSC'-এর স্পষ্ট জবাব নেই।

● অবৈধভাবে নিয়োজিতদের নামের তালিকা কোর্টে 'The WBCSSC' জমা দিয়েছেন? না।

● ৩০ মে ২০২৫, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পুনর্বাছাই এবং পুনর্নিয়োগের জন্য 'The WBCSSC' যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, তাতেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে পুরোপুলি মান্য করা হয়নি।

● সরকারি স্কুলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয়েছে, তা প্রমাণিত। ২০১৬ সালে যাঁরা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলেন; যাঁরা আবেদন করেছিলেন; যাঁরা নিয়োজিত হয়েছিলেন সহ তাঁদের পরিবার পরিজন; যাঁরা তদন্ত প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন; যাঁরা মামলাকারী; মামলাকারীদের হয়ে যাঁরা আইনজীবী হিসেবে স‌ওয়াল করেছেন; যাঁরা বিভিন্ন কোর্টে বিচারপতি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন; যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কুশীলব সহ রাজ্যবাসী এবং দেশবাসী একবাক্যে স্বীকার করেছেন এবং করবেন, হ্যাঁ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয়েছে।

● প্রশ্ন, তাহলে এই 'প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি'র জন্য মূল অপরাধী কে বা কারা? বিচার প্রক্রিয়ায় তা চিহ্নিত হওয়া দরকার ছিল। কোর্ট তা করেছেন? না। দ্বিতীয়ত অপরাধীদের চিহ্নিত করে, যথাযথ শাস্তি দেওয়া হোক, কোর্ট ঘরে 'স‌ওয়াল-জবাব' প্রক্রিয়ায় কোন আইনজীবী দাবি করেছেন? শুনিনি।

● কোনো আইনজীবী এবং কোনো বিচারপতি মূল অপরাধী চিহ্নিতকরণে কোনো সদর্থক ভূমিকা পালন না করলে, কেন করেননি? দ্বিতীয়ত, রাজ্যবাসী স্পষ্টভাবে জানেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে প্রথম এবং প্রধান অপরাধী 'The WBCSSC'। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি, শিক্ষা দফতর এবং রাজ্য সরকারের মন্ত্রীসভা।

● যাঁরা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে বেসরকারি ব্যবস্থাকে সুবিধে পাইয়ে দিতে, পরিকল্পনামাফিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে দাগিদের অবৈধভাবে নিয়োগ করলেন, তাঁদের কোন‌ও শাস্তি হলো না! কিন্তু যাঁরা যোগ্যতার নিরিখে বৈধভাবে নিয়োজিত হয়েছিলেন এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যাঁরা বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়েছেন, তাঁরা মৃত্যুসম শাস্তি পেলেন।

● প্রশ্ন, তাহলে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় থেকে ন্যায়বিচার মিলল না কেন? কারণ একটাই, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থা থেকে স্বাধীন ভারতের বিচারব্যবস্থা সবসময় অর্থশালী এবং প্রভাবশালীদের পক্ষে কাজ করে চলেছেন। 
দুর্নীতি প্রতিরোধে বামফ্রন্ট সরকার সফলভাবে 'The WBCSSC'-কে ব্যবহার করতে পারলেও, স্বঘোষিত 'সততার প্রতীক' নেতৃত্বাধীন 'মা – মাটি - মানুষ' সরকার পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে 'The WBCSSC'-কে 'The West Bengal Central Super Scam Commission'-এ পরিণত করেছে।

প্রকৃতি বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, স্বঘোষিত 'সততার প্রতীক' নেতৃত্বাধীন 'মা-মাটি-মানুষ' সরকারের দ্বারা 'The WBCSSC' মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ নিয়োগ সম্ভব নয়। এমনকী সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের নজরদারিতেও সম্ভব নয়।

তাহলে? সত্যজিতের 'হীরক রাজার দেশে'-র ন্যায় উদয়ন পণ্ডিতের নেতৃত্বে ভালো মানুষের জোট দরকার এবং ভূতের রাজার বলে বলিয়ান 'গুপি-বাঘা' জুটির ভূত তাড়ানোর মন্ত্র (দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান)-এর সমতুল কর্মসূচির সফল প্রয়োগ দরকার। এটাই ঐতিহাসিক বারতা।

ঋণস্বীকার: সত্যজিতের 'অরণ্যের দিনরাত্রি', 'জন-অরণ্য' এবং 'হীরক রাজার দেশে' এবং ইন্টারনেটে গুগল, ইউটিউব প্লাটফর্ম।

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, লেখক, সমাজকর্মী।