[বাংলাদেশের মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশিষ্ট অভিনয় শিল্পী শ্রদ্ধেয় আমিরুল হক চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে আমদের ই-ম্যাগাজিনের উৎসব সংখ্যার জন্য তাঁর পছন্দমতো একটি লেখা দেবার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। প্রবীণ অভিনেতা সেই অনুযায়ী বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা গোলাম মুস্তাফাকে নিয়ে একটি স্মৃতিচারণামূলক লেখা পাঠিয়েছেন। ছোটো অথচ অনবদ্য এই স্মৃতি আলেখ্যটিতে যেমন অনন্য অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার যৌবন, অভিনয় জীবন গড়ে ওঠা, তাঁর জীবনদর্শন অঙ্কিত হয়েছে, একই সঙ্গে লেখক-অভিনেতা আমিরুল হক চৌধুরীর জীবনের একটা অধ্যায় সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। অপরূপ আঙ্গিকে লেখা এই স্মৃতি আলেখ্যটির মধ্য দিয়ে বিশিষ্ট অভিনেতা আমিরুল হক চৌধুরীর লেখকসত্তাও বিশেষভাবে পরিস্ফুট হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, এই নিবন্ধটি পাঠকদের কাছেও অত্যন্ত মনোগ্রাহী হবে। এখানে পাঠকদের কথা ভেবে যাঁকে নিয়ে এই স্মৃতি আলেখ্যটি রচিত, সেই বরেণ্য অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার অভিনয়-জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু কথা তুলে ধরা হলো –

গোলাম মুস্তাফা: বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা এবং অগ্রগণ্য আবৃত্তিকার। তিনি মঞ্চ, বেতার এবং টিভিতে অভিনয়ের মাধ্যমে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালে 'রাজধানীর বুকে' ছবিতে জমিদারের ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করেন। মূলত প্রথম ছবি থেকেই তিনি খলনায়ক চরিত্রের একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেতা হিসেবে হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রায় তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে তিনি বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। টেলিভিশন মাধ্যমেও ছিল তাঁর দৃপ্ত পদচারণা। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাংলাদেশ ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এওয়ার্ড ইত্যাদি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এই বরেণ্য শিল্পীকে 'একুশে পদক' (২০০১ সাল) দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। অভিনয় শিল্পী গোলাম মুস্তাফার জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ মার্চ অবিভক্ত ভারতে, বর্তমানে বাংলাদেশের বরিশালের নলছিটির দপদপিয়া গ্রামে। তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী হোসনে আরা। তাঁদের দুই কন্যা অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা ও ক্যামেলিয়া মুস্তাফা। সুবর্ণা মুস্তাফার স্বামী হুমায়ুন ফরিদিও (বর্তমানে প্রয়াত) ছিলেন বাংলাদেশের একজন অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। ২০০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় কিংবদন্তি অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার জীবনাবসান হয়।]
দপদপিয়া গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে সন্ধ্যায় শান্ত সুপারিগাছের সারি পার হয়ে 'রূপসী বাংলা'র কবি জীবনানন্দ দাশের টিনের ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর ধীরপায়ে হেঁটে স্টিমারঘাট, সেখান থেকে চাকাওয়ালা স্টিমারে কীর্তনখোলা নদী পার হয়ে বুড়িগঙ্গা সদরঘাট, তারপর জীবনের নানা পথ পার হয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, পরাধীনতার পর্বত চূর্ণ-বিচূর্ণ করে নতুন অভিজ্ঞতা, বাতাসে বাংলার ঘ্রাণ। একদল তরুণ নাটক করার জন্য জড়ো হয়েছে, মহড়া চলছে সেগুনবাগিচায় কলেজ অব মিউজিকে। ফটক দিয়ে ঢুকলেই পুরোনো ধাঁচের হলুদ দোতলা বাড়িটিই তখনকার কলেজ অব মিউজিক। সামনের প্রশস্ত জায়গায় নাটকের মহড়া শেষ করে তরুণেরা বসেছে, আড্ডা চলছে। সবার অলক্ষ্যে পেছন থেকে উচ্চারিত হলো 'শান্তি'। সবাই একসঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে সম্মোহিত। সুন্দর, সুঠাম দেহ, ভরাট কণ্ঠস্বর, মুখে প্রশান্তির হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা – মানুষ গোলাম মুস্তাফা। এই তো সেই মানুষটি, যাঁকে আমরা খুঁজছি। কখন যে এই স্বনামধন্য, দেশবরেণ্য প্রতিষ্ঠিত শিল্পী আমাদের বন্ধু হয়ে গেছেন। ঘোষণা দিয়ে নয়, সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত এই নৈকট্য। ধীরে ধীরে আরও গভীর হলো সম্পর্ক। সামান্য একটু সুবিধা পেতে আমরা অনেকেই সত্যকে বিকৃত করে ফেলি, কিন্তু মুস্তাফাভাইয়ের অন্তর ছিল ভরাট, দীনতা তাঁকে কখনোই স্পর্শ করেনি।
১৯৭৬ সালে আড্ডা সামনে রেখে ৪০০ নিউ ইস্কাটন রোডে কফি হাউস করে ফেললাম। মুস্তাফা ভাই আড্ডায় তাঁর আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, আমরা আলোকিত হচ্ছি। নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি, রাজনীতি, খেলাধুলা, খাদ্য, পোশাক, জোকস – কত কী নিয়ে আমাদের আড্ডা। মুস্তাফা ভাইয়ের তথ্যভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ! তাঁর সঙ্গে সব বিষয়েই একমত হয়েছি তা নয়, অনেক বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছি, কিন্তু তিনি কখনোই তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেননি।
পরনিন্দা একদম পছন্দ ছিল না, তাই আড্ডা সমৃদ্ধ হতো। আমাদের আড্ডার অলিখিত নিয়ম, সদস্যরা একে অপরকে দেখলে 'শান্তি' বলে সম্বোধন করতেন। এটা মুস্তাফাভাই শুরু করেছিলেন। আড্ডায় সবাই বসে আছি, মুস্তাফাভাই এলেন, হাতটা ওপরে তুলে ভরাট কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, 'শান্তি'। আধুনিক, প্রগতিশীল মানুষ মুস্তাফাভাই দেশের ও মানুষের কল্যাণ চাইতেন। 'শান্তি' শব্দটি তারই প্রতীক হিসেবে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হতো।

অনেক কিছু করার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন করেছেন; তাঁর এই আত্মবিশ্বাস আমাদের অনেক শক্তি জোগায়। ৩১ বছরের এই টানা আড্ডায় কিছুদিন মাত্র, শুক্রবার দুপুরের দিকটায় কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে চলে যেতেন; বলতেন, "তোমার ভাবি অসুস্থ, তাঁকে সময় দিতে হয়, তাই নিয়মিত আসতে পারি না।" কথাটা খুব ভালো লাগত। কর্তব্যপরায়ণ মানুষ গোলাম মুস্তাফাকে কোনো বিষয়ে কখনো দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে দেখিনি। নিজের ভালো মানবিক কর্মগুলো নীরবে করতেন, লোক দেখানোর জন্য নয়। একজন যথাযথ ভদ্রলোক।
তাঁর জীবনদর্শনের একটি কাঠামো আঁকতে পারি এভাবে: মুস্তাফা ভাই, আপনি কি আমাদের মনের কথাগুলো শুনতে পাচ্ছেন? আলোর সুড়ঙ্গে আপনি কোথায় অবস্থান করছেন? আমাদের কথাগুলো কি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আপনার কাছে? দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আড্ডার মানুষগুলো চলেছেন তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে। কোথায়? দূরে, আরও দূরে। এই দুর্গমতা, এই কষ্ট অতিক্রম করতেই হবে, মানবতার কাছে সুন্দরের কাছে পৌঁছাতেই হবে। পায়ে ফোসকা পড়ে সারা শরীরে টনটনে ব্যথা। টেনে টেনে পা সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পিপাসায় গলার ভেতরটা খসখসে হয়ে আছে, আর বোধহয় সম্ভব হলো না সুন্দরকে স্পর্শ করার!

সামনে ও কে দাঁড়িয়ে? ধ্যান ভেঙে এক সন্ন্যাসী বললেন, "তোমরা আলোর পথে চলেছ? সুন্দরকে স্পর্শ করতে চাইছ? তোমরা ভুল করে পথ হারিয়ে ফেলেছ। এসো আমার সঙ্গে। একটু সামনে গিয়ে বাঁ দিকে যেতে হবে। চলো, আমি তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাই।" সম্মোহিত হয়ে আমরা তাঁর পিছু পিছু চললাম। যাচ্ছি তো যাচ্ছি...। ছোট্ট একটা পাহাড়ি বেদিতে এসে উনি দাঁড়ালেন এবং বললেন, "আমি এ পর্যন্তই। এবার তোমরা যাও। কিছু দূর এগিয়ে গেলেই পেয়ে যাবে তোমাদের সেই সুন্দরকে। তবে অভীষ্ট লক্ষ্যকে তোমাদের বিশ্বাসে সব সময় ধারণ করতে হবে।" আমরা তাঁর কথামতো সামনে এগিয়ে চলেছি। একটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে বাঁয়ে বাঁক নিতেই দেখি, একি! আলোঝলমলে অথচ স্নিগ্ধ পরিবেশ। আমাদের সব শক্তি যেন ফিরে আসছে, মনের শক্তি যেন আরও দ্বিগুণ হচ্ছে। আমরা সবাই এক বিরাট চত্বরে এসে দাঁড়ালাম। আহা! আলো, আলো আরও আলো। সামনে বিশাল মানস সরোবর। স্ফটিকের মতো জল। হাজার বছরের ধ্যান ও গম্ভীর চেহারায় শান্ত-স্নিগ্ধ হাসির রেখা আমাদের আরও কাছে যেতে আহবান করছে। একি সুন্দর! এমন গভীর সুন্দর! এ কি জান্নাতুল ফেরদাউসের বর্ণনার কোনো অংশ! আমরা সবাই মিলে মানস সরোবরে গোসল করলাম। সমস্ত শরীর-মন জুড়িয়ে গেল। লাখো বছরের জন্য পূত-পবিত্র হয়ে গেলাম!
সন্ন্যাসী বেদি থেকে বিদায় দেওয়ার সময় আমাদের একটা ঝোলা দিয়ে বলেছিলেন গোসলের পর এটা খুলতে। ঝোলার মুখ বাঁধা ছিল। খুলে দেখি আমাদের প্রত্যেকের জন্য সাদা কাপড়, রক্তচন্দন থেকে আহরিত সুগন্ধি। এর নিচেই রাখা আছে পদ্মপাতার মোড়কে আমাদের জন্য খাবার। সুমিষ্ট ফল, খই, মধু আরও কত কী খেলাম! সবাই মিলে মানস সরোবর থেকে আঁজলা ভরে পানি পান করলাম। সমস্ত শরীর-মনে শান্তির অনুভূতি। আমরা সবাই সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরিধান করেছি, চন্দন থেকে আহরিত সুগন্ধি মেখেছি। এখন আমরা সবাই মিলে মহামানবের মিলনমেলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

সবুজ গোলাপে সজ্জিত একটা সেতু পার হয়ে মানস সরোবর সামনে রেখে বিরাট এক সবুজ চত্বর। এখানেই মহামানবেরা জড়ো হয়েছেন। মানবতার গান গাইবার জন্য। বিরাট উৎসবের আয়োজন। এই যে এত বড়ো উৎসব, এখানে হচ্ছে কী? কেন, আপনি জানেন না মহামিলনের এক দীর্ঘ সেতু নির্মিত হচ্ছে, মানবতার সেতু, সারা বিশ্বের মানুষ এই সেতু পার হয়ে যাবে, তারই কাজ চলছে। এমন সময় বেদি থেকে মিলনের গান ভেসে আসছে। বড্ড পরিচিত এই কণ্ঠ। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে গেলাম, চেহারাও খুব চেনা, মুখে শান্তির শাশ্বত ঔজ্জ্বল্য, মানবের মিলনের গান করছেন লালন ফকির। এত সুন্দর লাগছে লালনকে। তাঁর গলায় বৈচি ফুলের মালা, মাথায় ঝুঁটি ওপরে খোঁপা করে বাঁধা, মুখে দাড়ি, হাতে একতারা, তিনি মিলনের গান করছেন। পেছনে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে শুনছেন রবীন্দ্রনাথ, সক্রেটিস। এই গানে স্বর্গীয় অনুভূতি হচ্ছে। মনের ভেতর যেন মিলনের বান ডেকে যাচ্ছে। গান থামল। সবাই আচ্ছন্ন, চারপাশ নিস্তব্ধ নিশ্চুপ।... সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে একটি শব্দ উচ্চারিত হলো, 'শান্তি'। পাশে তাকিয়ে দেখি মুস্তাফাভাই, ডান হাতটি ওপরে তুলে মুখে স্নিগ্ধ প্রশান্তির হাসি; বলছেন, "ব্রহ্মাণ্ড 'শান্তি'র পক্ষে রায় ঘোষণা করছে।"

পরিচিতি: আমিরুল হক চৌধুরী - বাংলাদেশের স্বনামধন্য অভিনেতা।
