বিবিধ

লেখক



বাণীব্রত চক্রবর্তী


ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে একজন লেখককে আমরা জানি তিনি লিখতে বসেন। কী লিখতে বসেন তার কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নেই। লেখার অভ্যাসে যেন জং না ধরে উদ্দেশ্য প্রধানত এই। বিষয় নানা ধরনের হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে তিনি নিজের ছেলেবেলার কথাও লেখেন। এই লেখার ভেতরে তিনি ফিরে পেতে চান পুরনো কলকাতার নানা ছবি। যে কলকাতায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে তিনি আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর পরিবারের কথা, যে স্কুলে পড়েছেন, যে কলেজে পড়েছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনার দিনগুলো, সেইসব বন্ধুদের কথা, মাস্টারমশাইদের কথা, কোনও কোনও বইয়ের কথাও থাকে। থাকে সেই হারিয়ে যাওয়া কলকাতার পথঘাটের কথাও কিংবা কোনও অবিস্মরণীয় মানুষের কথাও। একান্নবর্তী পরিবারে তিনি বড় হয়েছেন। সেইসব মধুর-বিধুর অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গও থাকে আর থাকে তাঁর অনুভবের কথাও। সব সময় যে তিনি নিজের ছেলেবেলার কথা নিয়ে বিভোর থাকেন তা কিন্তু নয়। নিজেকে দূরে রেখে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে জীবনকে দেখার প্রচেষ্টাও কখনও কখনও তাঁর লেখায় পাই না এমনও নয়। কিংবা হয়তো একটা গল্প লিখতে শুরু করে দিলেন অথবা একনাগাড়ে লিখে যেতে থাকলেন একটি উপন্যাস। এমন কী কোনও কোনও ভোরবেলায় নতুন কোনও বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করে দিলেন। বইয়ের র‌্যাক থেকে নামিয়ে আনলেন একগাদা বই। যা তাঁর প্রবন্ধ রচনার জন্য প্রয়োজন। মোটের ওপর ভোরবেলায় ঘুম ভাঙার পর তিনি কিছু লিখবেনই লিখবেন। প্রাত্যহিক এই চর্চা চলতেই থাকবে। এই অভ্যাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে হয়তো একদিন দেখা যাবে একটি অনুচ্ছেদ লিখতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হল লিখতে তিনি বড় ভালোবাসেন। ব্যক্তিগত কথাগুলো শেষপর্যন্ত যেন সমষ্টিগত কথা হয়ে ওঠে এমন অভিপ্রায় তাঁর লেখার মুহূর্তেগুলো আচ্ছন্ন করতে থাকে। কবে কী লেখা লিখবেন তার কোনও ধরাবাঁধা নিয়মকে তিনি মোটেই প্রশ্রয় দেন না। আর লেখার ব্যাপারে এই ভোরের লেখক বড্ড খুঁতখুঁতে। বিশেষত গদ্য ও বানানের ব্যাপারে। তবে কি তিনি চমৎকার গদ্য লেখেন! লেখেন কি নির্ভুল বানান! তা নয়। চেষ্টা করেন। এইটুকু বলা যেতে পারে। তাঁর লেখায় যেমন বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথা থাকে তেমন অখ্যাত মানুষের কথাও। বিখ্যাত-অখ্যাতদের মেলবন্ধন ঘটান এই লেখক। জগৎ ও জীবনের প্রতি অপার ভালোবাসা এবং মায়া ফুটে ওঠে তাঁর লেখায়। সত্যি কি ফুটে ওঠে? সে ভার তিনি তাঁর পাঠকদের ওপর ছেড়ে দেন। আজ তিনি কী লিখেছেন! আসুন, তাঁর লেখার দিকে নেত্রপাত করা যাকঃ

"যে পুকুরে হাঁস নেই সেই পুকুরে কয়েকটি হাঁস ছেড়ে দিই। যে গাছে ফুল ফোটে না সেই তরুতে ফুল ফোটাই। আকাশ বড় বেশি ফরসা। এনে দিই কালো মেঘের পরদা। যারা আন্দোলন করেন, অনশনে বসেছেন তাঁদের সব দাবি মেটানো হোক। যে মেয়েটি তানপুরা নিয়ে তেতলার ঘরে একা একা ভুল সুরে গান গাইছে এই মুহূর্তে সে ঠিক সুরের গভীরে ঢুকে পড়ুক। নবীন কবি ছন্দ মেলাতে পারছেন না। অতর্কিতে মিলিয়ে দিক ছন্দ। রোগা একটি বালক এই শীতে বড়রাস্তায় দাঁড়িয়ে হি হি করে কাঁপছে। আমাদের বাড়ির ওই বয়সের ছেলেটার কত সোয়েটার। ছুটে গিয়ে তাকে দিয়ে আসি একটি সোয়েটার। রাস্তা পেরতে পারছেন না এক বৃদ্ধ। কেউ এগিয়ে এসে তাঁকে রাস্তা পার করে দিক। না। না। আকাশে কেন মেঘের যবনিকা রেখেছি! সরিয়ে দিলাম। চারদিকে ফুটে উঠুক সকালবেলার আলো।"

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। গল্পকার, ঔপন্যাসিক। লেখকের বহু গল্প ইংরেজি, হিন্দি ও ওড়িয়া ভাষায় তরজমা হয়েছে।