সে যেন এক বিস্মৃতপুরীর রাজকন্যার রূপকথা। এক ঢাল চুল বিছিয়ে রাজপুত্তুরের অপেক্ষায় সে। লিখতে বসেছি সে সময়ের কলকাতার গানবাজনার কথা। সে কলকাতার সঙ্গে যেমন আজকের কলকাতার প্রায় কোনো মিল নেই বললেই চলে, গানবাজনাই বা তার ব্যতিক্রম হবে কেমন করে! কালের দিকচক্রবালে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়।তবে অতীত তার রেশ রেখে যায় ভবিষ্যতের ইচ্ছাপত্রে।
আজকের এই সময়ের বাংলা গানবাজনার খিলানে কান পাতলে শোনা যায় ঠুমরি, দাদরা, আখড়াই, হাফ আখড়াই, পাঁচালি, তরজা থেকে আর কত কি। আজকের লেখার পরতে পরতে আমরা সেকালের গানের দরজা খুলে ঢুকে পড়ব বাবুদের দরবারে। সেখানে বাবুরা আছেন, চিকের আড়ালে বিবিরা আছেন, আছে তাঁদের যাপনছবির নকশিকাঁথা, ফোঁড় তুলতে বেরিয়ে আসে কত চেনা অচেনা অবয়ব, তাদের অনোখা রাগিনীকুঞ্জ। আজ সেই গোপন সিন্দুকের তালা ভেঙে বের করে নিয়ে আসব তাদের অভিমানের গান, হাসিতামাশার মণিমানিক্যকে আর একবার ছুঁইয়ে দেব ছাদবারান্দায় এলিয়ে থাকা রোদরঙের জাদুকাঠি। তবে এ লেখা সালতামামির নিরিখে নয়, ইতিহাসের ফিসফিসানি নয়, বরং সেকালের গানের গায়ে স্নেহ ভালোবাসার আসমানী আঁচলপরশ।

দুর্গাপূজার সময় কলকাতার একটি জাঁকজমকপূর্ণ ভারতীয় বাড়িতে নৃত্যশিল্পী এবং সঙ্গীতজ্ঞদের দ্বারা ইউরোপীয়দের আপ্যায়ন (১৮৩০-১৮৪০)। উইলিয়াম প্রিন্সেপ কর্তৃক অঙ্কিত।
ইতিহাস বড়ো অদ্ভুত বিষয়। মূহুর্তেই পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমরা হারিয়ে যাই সেই পুরোনো কলকাতার অলিতেগলিতে। স্যাঁতসেঁতে গন্ধের মধ্যে থেকেই ভেসে আসে আতরের খোশবাই। কলকাতায় তখন অসংখ্য বাগানবাড়ি। ইংরেজ মহল আর বাবুদের বিলাসের খবর বাতাসে ওড়ে। সে সময় গানবাজনার আসরের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন রাজা-রাজড়া আর জমিদারেরা। শোভাবাজার রাজবাড়ি, ছাতুবাবু, লাটুবাবু, ঝামাপুকুরের বাবু দিগম্বর মিত্রর বাড়ি, চিৎপুরের হরেন শীলের বাড়ির গানের ম্যহফিলের কথা পড়েছি শ্রদ্ধেয় রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের 'জলসাঘর' সহ আরও নানা মানুষের লেখায়। বিডন স্ট্রিটের আরও কিছু বাড়িতে নিয়মিত বসত গানের আসর।
স্মৃতির পথ ধরে উঠে আসে বুলবুলির লড়াইয়ের গল্প। মূলত মুঘল ও তারপর বাংলার নবাবদের হাত ধরে এই লড়াই ঢুকে পড়ে বাবুদের বিলাস প্রাসাদে। তিনরকমের বুলবুলির কথা জানা যায়। লাল, শাহ আর সিপাহী বুলবুল। সিপাহী বুলবুলের কদরদান ছিলেন সেকালের বাবুরা। কখনও খোলা মাঠে, কখনও লোহার জালের মধ্যে তাদের ছেড়ে দিতেন বাবুরা। আর নিজেদের মধ্যে লড়াই করত তারা। তাদের ট্রেনারদের বলা হত খলিফা। বুলবুলি লড়াইয়ে ছাতুবাবু লাটুবাবুর খ্যাতি ছিল৷ আজ যেখানে মিনার্ভা থিয়েটার, সেখানে ছিল ছাতুবাবুর মাঠ। শীতের দিনে বড়ো করে বসত বুলবুলির লড়াইয়ের আসর। ভিড় জমত প্রচুর। শহরের অন্য বাবুরাও আসতেন আমোদে শামিল হতে। আজ সে বাবুরাও নেই, নেই বুলবুলির লড়াইও। শুধু রয়ে গেছে বাবুগিরির কথা।আর বাবুদের বিলাসবৈঠকে গানের মজলিশ যে কত রাতকে উজ্জ্বল করে তুলেছে, তার খবর আমরা পাই সে সময়ের নানা মানুষের লেখায়।

ঘরোয়া মজলিশ।
সাহিত্য সংস্কৃতিতে তখন রেনেশাঁর রোশনাই। শহরের বাবুদের বৈঠকখানায় বসেছে চাঁদের হাট। আর ওপাশে এপাড়া ওপাড়ায় ভেসে আসছে হাফ আখড়াই, শখের যাত্রাপালা, বুলবুলির লড়াই, কবির লড়াইয়ের সুর। সে এক অদ্ভুত সমন্বয়সঙ্গীত। মেসবাড়ি থেকে দালানকোঠা, বৈঠকখানা ঘর থেকে পাঁচমাথার মোড় সবখানেই রঙ-বেরঙের সুরলহরী ভেসে বেড়াচ্ছে। যার যা পছন্দ, হরেকরকম্বার মধ্যে থেকে বেছে নিলেই মন ফুরফুরে। রাজবাড়ি থেকে কোঠাবাড়ি সকলেই যে যার মনপসন্দ শিল্পের কদরদান।

বাংলার পটচিত্রে ফুর্তিরত বাবু।
সে সময় গানবাজনার প্রধান উদ্যোগী ছিলেন সমাজের প্রতিষ্ঠিত লোকজন। চিৎপুরের হরেনবাবুর বাড়িকে সঙ্গীতের পীঠস্থান বলা হতো। তিনি নিজে সুরবাহার বাজাতেন। তাঁর জলসাঘরে আসতেন কেরামতুল্লা খাঁ সাহেবের মতো তবলিয়ারা। একটি ঘটনার কথা বলি। একদিন সে বাড়িতে জলসাঘরে দীপ জ্বলে উঠল।হরেনবাবুর হুকুম হল, বাড়ির সব পোষা পাখিকে খাঁচাশুদ্ধু কাপড় ঢেকে এনে টাঙিয়ে দাও জলসাঘরের চারধারে। কারণ শুনবেন? ওস্তাদরা আসরের শেষে গাইবেন ভোরের রাগরাগিনী আর সাচ্চা রাগদারী যদি হয়, তাহলে পাখিরা ভোর হয়েছে ভেবে ডেকে উঠবে। যদিও সুর হল, সুরাও হল, কিন্তু সেই রাতে পাখি ডাকল না। তাতে হরেনবাবু খুশি হননি সে তো বলাই বাহুল্য।
যে সময়ের কথা হচ্ছে, সে সময় সভ্য বাড়ির মেয়েরা গানবাজনা করতেন না। অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষের লেখায় আমরা বাঈজীদের কথা পড়েছি। এ কথা সকলেই বলেছেন যে, রাতে যাঁদের গান শুনে বা নাচ দেখে বাবুরা মুগ্ধ হয়েছেন, দিনে তাঁদেরই কেমন নোংরা বলে অসম্মান করা হতো। শ্রদ্ধেয় অমিয়নাথ সান্যাল এই বাঈজীদের সম্পর্কে বলেছেন, "আমার মতে তাঁরা এক একজন গান্ধর্বী। আসলে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে একজন গান্ধর্বীর যে সম্মান পাওয়া উচিত, সে সম্মান আমরা দিতে পারিনি"।

শোভাবাজার রাজবাড়িতে দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে নৃত্যানুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র।

বাঈজি নাচ।
'বাঈজি' কথাটা সম্ভবত মধ্যপ্রদেশ অথবা রাজস্থান থেকে এসেছে। রাজস্থানী ভাষায় শব্দটির মানে মা কিংবা বড় বোন। যেমন মীরাবাঈ, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, দুর্গাবাঈ। রাজস্থানে মা-কেও বাঈ বলে, আবার কাজের লোককেও বাঈ বলে, আবার মহারানীকেও বাঈ বলা হয়। স্বামীর বড় বোনকেও মহিলারা বাঈজি বলেন। গুরুজন স্থানীয় মহিলারা 'বাঈজি' এবং বয়সে ছোট মহিলারা 'বাঈ'। মহারাষ্ট্রে অল্প বয়সী মহিলাদের 'বাঈ' বলা হয়, মধ্যপ্রদেশেও 'বাঈ' কথাটার প্রচলন রয়েছে। সুতরাং 'জি' যোগ করে যে শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, নিশ্চয়ই সমাজে তিনি একজন সম্মানীয় কেউ। বাঈজি সম্পর্কে পড়তে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে এঁরা এত বড় বড় একেক জন শিল্পী, তাহলে তাঁদের সম্পর্কে এমন বাজে কথা কেন বলা হতো? বাঈজিরা ঠুমরি গানে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন তার নিদর্শন ভুরি ভুরি। এই ঠুমরিকে লঘু চালে লোকজন বলতেন ঠুংরি। সে সময় এমন অনেক খেয়ালগায়ক বা ধ্রুপদিয়া ছিলেন যাঁরা ঠুমরিকে গান বলেই মনে করতেন না। ঠুমরি গাইয়েদের স্থান উচ্চাঙ্গসঙ্গীত সমাজে ছিল না। কিন্তু ঠুমরি মোটেই হালকা চালের গান নয়। একটু তাতে কথা অনুযায়ী সুর এবং তার চেয়েও বড় কথা বন্দিশের ভাব। বেনারসের ঠুমরি একরকম, লখনৌয়ের আলাদা, আবার পূরব অঙ্গের গায়কি, একের থেকে অন্যে আলাদা। আর শুধু গানই তো নয়, সেখানে তাল ও লয়কারী পেশ করাও তো রীতিমত সাধনার বিষয়। সব বন্দিশের সঙ্গে যে সব নর্তকীরা নৃত্য পরিবেশন করতেন, তিনতাল, ঝাঁপতাল, দীপচন্দী, চাঁচর তালের সঙ্গে রাগের অনায়াস তালমেল, এমনকি রাগরাগিনীর মনোমুগ্ধকর মিশ্রণের সঙ্গে বন্দিশের কথার মেলবন্ধনে মিশে যেত আতরের খুশবু আর দীপদানের সূক্ষ্ম কারুকাজ। জলসাঘরের ঝাড়বাতির আলোয় নৃত্য সহযোগে সে সব পেশকশে সঙ্গীতরসিকেরা হায় হায় করে উঠতেন।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
উনিশ শতকের সূচনায় রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, সাধক রামপ্রসাদের সঙ্গে বাংলা গানে অন্য বিভার আবির্ভাব। এর পাশাপাশি চলছিল আখড়াই, হাফ-আখড়াই। রামনিধি গুপ্ত অর্থাৎ নিধুবাবুকে একটু বেশি গুরুত্ব দিতেই হবে। আখড়াই ধীরে ধীরে জায়গা ছেড়ে দেয় টপ্পা গানমহলে প্রবেশের পর। কবিগানের চটকদার লড়াই, সস্তা খেউড় গানের প্রচলন কমল উন্নত, পরিমার্জিত ভাষায় টপ্পা এসে। তার যন্ত্রানুষঙ্গও ছিল আনন্দ দেওয়ার মতই। নিধুবাবুর শিষ্য মোহনচাঁদ বসু নিয়ে এসেছিলেন হাফ-আখড়াই।কবিগান, পাঁচালি, তরজা আখড়াইয়ের থেকে ভিন্নপথের। কবি, পাঁচালী ছিল গ্রামীণ, আখড়াই গান বেশ নাগরিক। যা থাকার, তাই থেকে গেল। হ্যাঁ, টপ্পা আজও পথ চলছে, আজও তা গবেষণার বিষয়। শোরী মিঞার টপ্পার মতো মোটা দানার কারুকাজ সরিয়ে নিধুবাবু তাকে সাজিয়েছিলেন বাংলার পেলব, মধুর লাবণ্যে। নিধুবাবুর ছাড়াও এক্ষেত্রে বলতেই হবে কালী মির্জা, রাধামোহন শ্যামদাস, শ্রীধর কথকের কথা। টপ্পা রীতিমত বৈঠকী গান। তাতে রাগরাগিনী নিয়ে পরীক্ষা ছিল। এরপর ক্রমে সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে হালকা ধরণের খেমটার অনুপ্রবেশ হয়। 'সূদন' ভণিতায় মধু কান অর্থাৎ মধুসূদন কিন্নর পরিচিতি পান ঢপ-কীর্তনে। এভাবেই বহুবিচিত্র পথ ধরে ভবিষ্যতের দিকে চলতে থাকে সেকালের বাংলা গান।
মনোহরশাহী কীর্তনে মাতোয়ারা ছিলেন বেশ। কিছু রসিক মানুষ। ধীরে ধীরে কীর্তনও নানা ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে।রেনেটি, গরাণহাটির গায়কি মিশে যায় আদি কীর্তনের স্রোতে। রামায়ণ গান, দাশরথি রায়ের পাঁচালি, গোবিন্দ অধিকারীর পালাগান, নীলকন্ঠ মুখোপাধ্যায়, বদন অধিকারীর কৃষ্ণযাত্রা গানে তখন গ্রাম থেকে শহর মুখরিত। এ প্রসঙ্গে আসে এন্টনি কবিয়াল ও ভোলা ময়রার কথাও। এঁদের সবার গান অনুসন্ধান করলে সে সময়কার সমাজের চালচিত্রটি স্পষ্টভাবে ধরা দেয় আমাদের মনে।

যৌবনে গহরজান।

গানের আসরে গহরজান।

মালিকাজান (আগ্রার)
এতক্ষণ যাঁদের কথা হল, তাঁরা সকলেই পুরুষ। মহিলাদের কথা যদি বলি, তাহলে সর্বাগ্রে আসে যজ্ঞেশ্বরীর কথা, যিনি ঝুমুর-তরজায় প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। বলতেই হবে মালিকাজান, গহরজানের কথা।
সেকালের গানের কথা বললে আর এক ধরণের গানবাজনার প্রসঙ্গ আসবেই। আর সঙ্গে আসবে রূপচাঁদ পক্ষীর কথা। তাঁর গানে নানা বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসেছে কলকাতার স্থাপত্যশৈলীর প্রসঙ্গ।কলকাতার খাসবাবুদের আনুকূল্যে সব ধরণের গানবাজনাই চলছিল মনের আনন্দে।
যখন বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ছন্দ নিয়ে আসছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তখন তাঁর কলমেও উঠে আসছে বেশ কিছু অন্যরকম গান। সেকালে অনেক সমাজ সচেতকই সাহিত্যচর্চার নানা আঙ্গিকের সঙ্গে সঙ্গে কখনও কখনও গানও রচনা করেছেন। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ, গিরীশ ঘোষ সহ আরও নানা গুণীজনের কথা আমরা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে পারি। এবং সে সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধারার গানের প্রচলন ছিল, তার থেকে এইসব গানে যে উৎকৃষ্ট সাহিত্যসুধা ছিল, তা অনেক সাধারণ মানুষকেও অন্যভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল।
গানবাজনা সব কালেই একদিকে যেমন বিনোদন সঙ্গে অবশ্যই মনের আলোকস্তম্ভ। ইতিহাসের পাতা উলটে এই যে খানিকক্ষণ সেকালে ঘুরে এলাম, তাতে যত না দেখা হল, না-দেখার অতৃপ্তি রয়ে গেল তার অনেক বেশি। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে যে গানবাজনায় আধুনিক চিন্তন আর মননের দ্যুতিতে যে সুরের প্রবাহ, সে পাতায় চোখ রাখব পরে কখনও।

পরিচিতি: সঞ্চালিকা (বেতার ও দূরদর্শন)।
