বিবিধ

গানের একাল সেকাল



দেবাশীষ গাঙ্গুলি (টুনাই)


গান কেমন দেখতে হয়? নিজেকে প্রশ্ন করেছি বহুবার, আর উত্তর না পেয়ে আরও গভীরে ঢোকার চেষ্টা করেছি। তবে এর সময়কাল ছোটো হলেও খুব ছোটো নয়। ১৯৯৩ সালেই বোধহয় প্রথম স্টুডিয়োতে ঢোকার সুযোগ হয়েছিল। তখনই জেনেছিলাম স্টুডিয়োর ভেতরটা ঠিক কিরকম দেখতে হয়।

সেই সময়ের অনুভুতিটা ছিল, কাগজে লেখা প্রথম প্রেমপত্রের মতো। যা ভোলার নয়। কোনো বিশেষ সময় তার মতো করেই ভাল হয়। এখন বেশ কিছুটা গানযাপনের সুবাদে বুঝেছি - গান নিয়ে বাঁচার কী মানে। কতটা কাছাকাছি এলে শুধু একটা নতুন গান বাঁধার প্রেমে একা-জীবনের সব চাওয়া-পাওয়াকে উপেক্ষা করা যায়। সে সময়ের গান ছিল ক্যাসেট-এ বন্দী নীলপরী। বাড়িতে প্লাস্টিক ছিঁড়ে তাকে মুক্ত করতে হতো। যে ছড়িয়ে পড়ত বাড়ি থেকে পুজোর প্যান্ডেল পর্যন্ত। ক্যাসেটের গন্ধ হতো না ঠিকই কিন্তু পুজোর আগে প্রকাশিত হতো বলে তাতে বেশ একটা পুজো পুজো গন্ধ মাখানো থাকত। ভালবাসার উপহার হিসেবে ক্যাসেটের জুড়ি ছিল না। জন্মদিনের উপহার হিসেবে মানুষ ক্যাসেট দিত। এমনকি ক্যাসেট দেওয়া-নেওয়া ঘিরে প্রেম নিবেদনও হয়ে যেত!

প্রথম যখন নিজের গান ক্যাসেট-বন্দী হয়ে এলো, সেই গান শুনে আমি তো আহ্লাদে আটখানা। গানটির নাম ছিল 'যেওনা দখিন দ্বারে'।

মনে আছে, তখন পুজোর বাজারের খরচের মধ্যেই পুজোর গানও ধরা থাকত। ক্যাসেটের এপিঠ আর ওপিঠ-এর কত নম্বর গান ভাল লাগল তা ছিল আড্ডার বিষয়। মতের মিল না হলেই ছিল ঝগড়া। এভাবেই নতুন গান আলোচনায় চলে আসত। খুব জরুরিও ছিল সেটা।

এবার একটু থমকে গেলাম। এলো সিডি। অনেক দাম দিয়ে কিনতে হতো। পকেটে টান পড়ত। তা-ও গান তো...। আমি যেই আমিই রইলাম... রইলনা ক্যাসেট, সিডি। ওরা হাত ছেড়ে চলে যেতে যারা এলেন তারা এখনও রয়েছেন। গানও হচ্ছে। তবে ওই যে সহজলভ্য জিনিস মূল্যহীন হয়ে যায়। হয়ত এসময় এরকমই। ইউটিউব-এ গান তারাই শোনে যাদেরকে শোনাতে পারা যায়। তবে লিংক আর ক্যাসেট যে কতটা বদলের প্রতীক তা যারা বোঝার তারা বোঝে। আমি তো আজও বাড়ির ওই ছোট্টো কালো টেপরেকর্ডার-এর ভেতরে বাজা ক্যাসেটে আমার হারানো শৈশবের গন্ধ পাই। আমরা যারা এ যুগেও গান নিয়েই রয়ে গেলাম তারা না হয় শৈশব খুঁজে নিতে ক্যাসেটের ধুলো ঝেড়ে শুনে নেব। তোমরা যারা শুধু এই সময়টাই দেখলে তাদের কাছে সেই সময়ের অনুভবটুকু ছড়িয়ে গেলাম।

আমার এ' জীবনের কিছু মূল্যবান স্মৃতি বন্দী হয়ে রইল রংচটা ক্যাসেট আর সিডি-র ছবিতে। ইউটিউব-কে মানিয়ে নিয়েছি। যেমন নিতে হয়। তবে ইউটিউবও পুজোর গান আর বাংলা গানের বন্ধু। ওকে যত্নে রেখো... ওকে মিশতে দিও অনেক অনেক লোকের সাথে।

পরিচিতি: সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক।