পডকাস্ট জিনিসটা আজকাল বেশ চলছে। সাধারণভাবে পডকাস্টে দেখা যায় শোনা যায় বিখ্যাত মানুষদের সাক্ষাৎকার, তার পাশাপাশি নাচ, গান, রান্না, সেলাই, খেলা, পরচর্চা, সবই এর বিষয় হতে পারে। এই হালচাল দেখে আমারও খুব ইচ্ছে হল গানবাজনা নিয়ে একটা পডকাস্টের আদলে কিছু করতে। যে কোনও কাজে মধ্যবিত্তের অন্যতম সমস্যা হল সাধ আর সাধ্যের তফাৎ। তাই ছবি তোলার জন্য, সম্পাদনা করবার জন্য আর আলাদা করে না কাউকে না বলে নিজের ভয়ঙ্কর অল্পবিদ্যা ফলাবো বলেই স্থির করলাম। আমি আর আমার একরকম নিত্যসঙ্গী কৃষানু বেরোলাম। বুঝতেই পারা যায় যে একই লোকের পক্ষে ক্যামেরার সামনে আর পিছনে একই সময়ে থাকা সম্ভব নয়। 'ডামি' হিসাবে কৃষানুকে বসিয়ে ক্যামেরার ফোকাস ইত্যাদি ঠিক করে নিয়ে আমি বসলাম কৃষানুর জায়গায়। কৃষানু ক্যামেরার পিছনে অফ আর অন করবার দায়িত্ব নিয়ে পাহারায় রইল।
এ ঘটনাটা ঘটছে দক্ষিণ কলকাতার নিউ গড়িয়া এলাকার একটা পার্কে। পার্কটা পুরোনো, আগাছা-গজানো, মশায় ভরা, পাঁচিল-ভাঙা। দেখলে বোঝা যায় অনেকদিন নিয়মিত কেউ এখানে খেলাধুলো করেনি। পার্কের ভেঙে পড়া পাঁচিলেরই ইঁটের ওপর বসে আমরা কাজ করছি। এমন সময় এক প্রৌঢ়, ইউনিফর্ম-পরা নিরাপত্তাকর্মী এলেন। আমাদের ভিডিও করা দিয়ে আপত্তি জানালেন। বললেন, "বারণ আছে। প্ৰসঙ্গত বেপাড়ার লোক এসে পাড়ার ঝোপঝাড় বহুল এলাকায় ঢুকলে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। তবে আমরা কাউকে বিরক্ত করিনি - প্রশ্নই ওঠে না। ওখানে কেউ ছিলেনই না। কোনও কৃত্রিম আলো জ্বালাইনি। লাউডস্পিকার বাজাইনি, আগুন জ্বালিনি, চেঁচামেচি করিনি। কিন্তু "বারণ আছে”, তাই ওখানে আমরা যা করছি, তা করা যাবে না। এই বারণ কে করল? সাধারণত বাসিন্দাদের নিয়ে পাড়ায় একটা সমবায় সমিতি থাকে। এরা অনেক ক্ষেত্রেই রেজিস্টারড সোসাইটি নয়। হওয়ার দরকারও নেই। কিন্তু এইসব সমিতির কার্যনির্বাহী পদে যাঁরা বসেন, তাঁরা হলেন অধিকাংশত অবসরপ্রাপ্ত, মোটামুটি কর্মহীন, স্বনিযুক্ত জনহিতকারী পাড়াস্তরের মোড়ল। এঁরাই এইসব বারণ করেন। অনুমতি, মৌখিক বা লিখিত, নিতে হলে কার কাছে যাবো জিজ্ঞেস করতে সেই নিরাপত্তাকর্মী বলতে পারলেন না। "'কো-অপরেটিভ'-এর অফিস বলে একটা ছোট ঘর দেখালেন। তখন দুপুর বিকেলের দিকে গড়াচ্ছে। সেই অফিসঘরে তালা দেওয়া। জানা গেল সকালবেলা খোলে। নিরাপত্তাকর্মীর কাছে অফিসবাবুদের নম্বর পাওয়া গেল না। তার মানে একটা সাধারণ স্থান, যা জনসাধারণের ব্যবহার করার জন্যই রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে খুব নিরীহ কাজ করতে গেলেও বিশেষ ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় থাকা, তাঁদের সুবিধেমতো সময়ে এসে কাজ করা ইত্যাদি অনেক কিছুই বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়াল।
এই যে সাধারণ স্থানকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখার ব্যবস্থা, এর পক্ষে কিছু নাগরিক যুক্তি আছে। পার্কে কেয়ারি করা বাগান করলে ভোরবেলা হাঁটতে আসা স্বাস্থ্যসন্ধানীরা ফুল চুরি করে। বাগান রক্ষা করা যায় না। কুনাগরিকেরা সেখানে আবর্জনা ফেলে। সন্ধ্যের পরে পার্কের বেঞ্চে বেঞ্চে কপোত-কপোতিরা আসে। তাদের সবার আচরণ শোভন হয় না। আর আসে পাতাখোরেরা। তাদের আড্ডা সহজেই সহজেই সমাজবিরোধী রূপ নেয়। সুতরাং গ্রিল দিয়ে, পাঁচিল দিয়ে ঘেরো। এবং তালা দিয়ে দাও। সহজ সমাধান।
এক শনিবার দুপুরে বাড়ি ফেরার সময় ভদ্রবেশী সাত-আটজন কলেজের ছেলেমেয়ের দল দেখি আমাদের বাড়ির পাশের পার্কের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে। দু'জনের হাতে ক্যামেরা। তারা পার্কে ঢুকে কিছু ছবি তুলতে চায়। কিন্তু তালা। আমি এখানেই থাকি শুনে তারা আমার কাছে চাবি চায়, অথবা চাবির সন্ধান চায়। নিরাপত্তাকর্মী দাদাকে এ-গলি সে-গলি খুঁজে, পেলাম অবশেষে। তাঁকে খুঁজলাম কারণ পার্কের চাবি কোথায়, কার কাছে গেলে পাওয়া যায় সেটা আমিও জানতাম না। তিনি কো-অপরেটিভের সভাপতি, সম্পাদক আর সদ্যপ্রাক্তন সম্পাদকের ফ্ল্যাট দেখিয়ে দিলেন। তবে নির্দিষ্ট করে বলতে পারলেন না যে চাবি কোথায় পাবো। এই করতে করতে আলো কমে এল। ছেলেমেয়েগুলো ব্যাজার মুখে বাড়ি চলে গেল।
এর কয়েক মাস পরে ওই একই পার্কের মধ্যে আমি পাঁচিল টপকে ঢুকে পড়লাম। পাঁচিলটা মোটামুটি উঁচু আর আমার চেহারাটি সম্প্রতি মেদবহুল। কিন্তু ছাত্রদশায় যথেষ্ট খেলাধুলো কারবার সুবাদেই হয়তো, পাঁচিল টপকাতে পারলাম। উদ্দেশ্য ছিল পার্কের ভিতরের শিউলি গাছের তলা থেকে গোটা কুড়ি ঝরে পড়া শিউলি কুড়োনো। সেই ফুলগুলোও আমাদের একটা ভিডিও নির্মাণে কাজে লাগত। পাশের বাড়ির একতলা থেকে সমীরবাবু প্রথমে বহিরাগত সমাজবিরোধী পার্কের পাঁচিল টপকে ঢুকে পাড়ার শান্তি বিপন্ন করতে পারে আন্দাজ করে ধমক দিলেন। দিতে দিতে বেরিয়ে এসে যখন আমাকে চিনতে পারলেন, তখন প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি লজ্জিত আর ভদ্র হয়ে গেলেন। আমাকে বললেন - "তুমি তো এখানকার পুরোনো বাসিন্দা। তুমি চাইলেই আমি চাবি দিতাম। তুমি টপকাতে গেলে কেন! আসলে টপকাতে গেলে আবার গ্রিলগুলো কংক্রিটের গাঁথনি থেকে খুলে আসবে... ভাঙবে... পুরোনো হয়েছে তো এগুলো! ওই দেখো কেমন রং চটে গেছে ওপাশটা। রোজ রোজ তো আর রিপেয়ার করা যায় না। আর খুলে যে রাখবো... সময় তো ভালো নয়! কখন কে এসে ঢুকবে...। এই তো সেদিন...", ইত্যাদি।
দু'টো কথা জানা গেল, এক, পার্কের চাবি সমীরবাবুর কাছে থাকে, আর দুই, পাড়ার মোড়লদের সভা বসলে আর অবসরপ্রাপ্তদের হাওয়া খেতে ইচ্ছে করলে, অথবা সরস্বতীপুজো ইত্যাদি পাড়ার পালা-পার্বণে পার্কের তালা খোলে। যদিও পার্কে একটা ছোট্ট রঙিন সাইনবোর্ডে লেখা আছে 'টট্-লট্"। মানে শিশু-উদ্যান।
আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিই। আর সাধারণের ব্যবহারযোগ্য এক চিলতে সবুজকে পাঁচিল ঘিরে তালা দিয়ে রাখি। ভাবি, এই তালা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা দিচ্ছে। অনেক প্রশ্ন গজায় মনে। আমাকে বা আমার বাবাকে বা সমীরবাবুকে ছোটবেলায় যদি প্রতি বিকেলে খেলতে যাওয়ার আগে পাড়ার কোনও মোড়লের বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে আসতে হতো, তাহলে সেই মাঠে খেলতাম কি? আমাদের কি অধিকার আছে সুস্থ ভবিষ্যৎ-প্রজন্মের প্রত্যাশা করবার? জনসাধারণের ব্যবহারযোগ্য স্থানে তালা দেওয়া কি আইনসিদ্ধ কাজ? তালা কি সব সময় শুধু নিরাপত্তাই দেয়? আমি কি বাজে বকছি?

পরিচিতি: সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী।
