বিবিধ

অচেনা নিজের সঙ্গে



অভিজিৎ রায়


এখন নিজের সাথে কথা বলতে ভয় হয়। ভয় হয় একজন অচেনা মানুষ সামনে এসে দাঁড়ালে। অবিকল আমার মতন চেহারায় সে আমাকে বিস্মিত করে। সে আমার ভাবনার সবটুকু জেনে নিয়ে বিরোধিতা করে আমার ভাবনার। চোখের সামনে থেকে দ্রুত সরে যায় আলটপকা একটা মন্তব্য করে। আমি ছটফট করি। এসব কথা অন্য কেউ বোঝে না। আসলে অন্য কেউ আমাকে আমার মতো করে খোঁজে না।

নিজেকে এভাবে আবিষ্কার করতে ভয় হয়। বারবার আমি ভয় পাই আর একটু একটু করে বদলাতে থাকি। আমার ভিতরের উদ্যমী, স্পষ্টবাদী লোকটা হারিয়ে যায়। আমি যাকে চিনি সেই আমি কখনো আমার সামনে আসে না আর। বারবার সেই অচেনা লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাকে বিদ্রুপ করে, ভয় দেখায়। এতে তার কী লাভ বুঝি না আবার আমিও তার সামনে থেকে সরে যেতে পারি না যতক্ষণ সে সরে না যায়। নিজেকে বড়ো অসহায় মনে হয়।

নিজেকে অচেনা মনে হলে অন্যকে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন ভীতু মানুষ এই জীবনে, এই পৃথিবীতে, এই সমাজ-সংসারে পজিটিভ কিছুই দেখতে পায় না। যে নিজেকে ভয় পায়, সে তার পারিপার্শ্বিক সমস্ত কিছুকেই ভয় পাবে সেটা স্বাভাবিক। আমি সেই স্বাভাবিক প্রবণতার শিকার হয়ে পড়ি। আমার কথা বলতে ভয় হয়, যে কোনও কাজ করতে ভয় করে, বাঁচতে ভয় করে। নিজেকে কখনও অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় আবার কখনও অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় সমাজ, সংসার, পৃথিবীকে। এই চক্রব্যূহ থেকে বের হবার পথ যে নেই তা নয় কিন্তু আমি নিজেই জানি না সেই পথ না খোঁজার কারণ কী? আমি বুঝি না কেউ সেই পথ খুঁজে দিলে আমি কী কারণে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে নিজেকে অনন্য মনে করি, অসাধারণ মনে করি!

নিজেকে বিস্ময় বালক হিসাবে চিহ্নিত করতে পেরেই আমি খুশি থাকি। তৃপ্ত হই। অথচ, মাঝেমধ্যে সেই নিজের সাথে কথা বলতেই আমার ভয় করে। ভীষণ ভয়। আমি নিজেকে একা করে নিয়ে অদ্ভুত এক অবসাদের স্বাদ নিতে নিতে হিংস্র হয়ে পড়ি। আশেপাশের সবকিছুকেই ধ্বংস করার মধ্যে মুক্তি আছে বলে মনে করি। অথচ সেই নিজেকেও অচেনা মনে হয়। ভয় হয়। এত এত ভয় নিয়ে আমি কোথায় লুকোবো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি আমার সামনের অচেনা আমার কাছে। সে নিরুত্তর থাকে আর আমাকেই প্রশ্ন করে, এ তুমি কেমন তুমি?

পরিচিতি: বিশিষ্ট কবি। তবে তাঁর ছোটগল্প, উপন্যাস, মুক্তগদ্য, উত্তর সম্পাদকীয় সমস্ত লেখাই বাণিজ্যিক বড় কাগজে প্রকাশ পেয়েছে। মুদ্রণ ও প্রকাশনা ব্যবসার সাথে যুক্ত।