- Things are getting out of hand. That mob is getting really violent. What now?
- We can't shoot, that's for sure. A lathi charge is an option, but leads to too much rage. And they're armed. Whoever we send might be killed.
- But there must be something we can do?
- There's one way out...
- Well?
- Moore. He's the only plan that can work. Look... he's right there with that horse of his. You just need to give the order.
- But...
- There's no time Sir, it has to be him. Let him lead. It won't be the first time...
ভাবার সময় নেই আর। আর এটা ওর প্রথমবার নয়, আগেও ও এ'কাজ অনেক করেছে। অর্ডার দিন, রাস্তা নেই এছাড়া... ওকে লিড করতে দিন...
এমন যে কতবার হয়েছে! অর্ডার দিতেন লালবাজারের কর্তারা। দিতে বাধ্যই হতেন। এবং উন্মত্ত দাঙ্গাবাজদের নিয়ন্ত্রণে আনতে দলবল নিয়ে অসমসাহসে ঘোড়া ছুটিয়ে দিতেন দীর্ঘকায় চেহারার ওই সুদর্শন অফিসার। রনি মুর।
স্বাধীনতা আসন্ন তখন। ১৯৪৬ সাল। দেশজুড়ে ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে দাঙ্গা। কলকাতাও ব্যতিক্রম নয়। রাজপথে হিংসার উদযাপন চলছে যত্রতত্র। শহরের নাগরিক প্রায়ই ধর্ম নিয়ে হানাহানির শিকার হচ্ছেন... বয়স্ক মানুষ থেকে নিরপরাধ নারী, দিন-আনা-দিন-খাওয়া শ্রমিক থেকে দুধের শিশুও।
দাঙ্গাকে বশে আনার একটা মুশকিল হল, উন্মত্ত মানুষের ভিড়ে অগ্রপশ্চাৎ তলিয়ে না ভেবে চট করে গুলি চালানো যায় না। চালালে নিরীহ মানুষেরই মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে। নিতান্ত প্রয়োজন হলে গুলি চালাতেই হবে, কিন্তু 'নিতান্ত প্রয়োজন' মানে কতটা? নিরীহ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে লাঠি বা টিয়ার গ্যাসে যদি ছত্রখান করা যায় বেলাগাম জনতাকে, সেটাই শ্রেষ্ঠ পন্থা।

ঘোর সঙ্কটে ঠান্ডা মাথায় সেই পন্থা অবলম্বন করার মতো মাত্রাবোধ অল্প লোকেরই থাকে। রনি মুরের তা ছিল। ছিল মুহূর্তে জনতার মনোভাব বুঝে নেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা। এবং বুঝে নিয়ে সেইমতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপস্থিত বুদ্ধি। নির্দেশ পাওয়া মাত্র তীরের ফলার মতো তাঁর ঘোড়া ছুটে যেত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। লাঠি, স্রেফ লাঠির দাপটে শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যেত দাঙ্গাপিপাসুদের। স্বস্তির হাঁফ ছাড়ত লালবাজার। কতবার যে হয়েছে এমন!
ব্রিটিশ সাহেব নন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। রনি মুর এই দেশেরই ভূমিপুত্র। পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন ১৯২০ সালে। বাবা ট্রেনচালক। রনি কাজে নেমে পড়লেন, বয়স যখন সবে আঠারো ছুঁয়েছে। ফায়ারম্যানের কাজ। গ্রীষ্মের তীব্র চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে প্রায় ফুটন্ত স্টিম ইঞ্জিনের ভিতরে দাঁড়িয়ে কাজ। রনির ছিল পেশীবহুল শক্তপোক্ত চেহারা। ছিল অনিঃশেষ পরিশ্রমের ক্ষমতা। ফায়ারম্যানের কাজটা করতেন সাবলীলভাবে। দিনের পর দিন ওই অমানুষিক খাটাখাটনির গ্লানি ছুঁতে পারত না যুবক রনিকে। না শরীরে, না মনে।
মা ভাবতেন, ছেলে সামান্য ফায়ারম্যান হয়েই বাকি জীবনটা কাটাবে? আপ্রাণ চাইতেন, ছেলে রেলের চাকরি ছেড়ে দিক। ভাল বক্সিং করে কিশোর বয়স থেকেই, না হয় সেটাকেই পেশা করুক। বা অন্য কোনও কিছু। মায়ের স্বপ্নের শরিক ছিলেন রনি নিজেও। চলে এলেন কলকাতায়। কলকাতা পুলিশে সার্জেন্ট পদে চাকরির আবেদন করলেন। মনোনীত হলেন, এবং ট্রেনিং-এর পাট চুকিয়ে পাকাপাকি বহাল হলেন কলকাতা পুলিশের চাকরিতে। কর্মজীবনের শুরুর দিনগুলোয় দায়িত্ব পড়ল চৌরঙ্গী-ধর্মতলা-পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে টহলদারির।
কিশোরবেলা থেকেই রনির শিরা-ধমনীতে স্রোত বইত অ্যাডভেঞ্চারের। যে কাজে ঝুঁকি নেই, থ্রিল নেই, সেটা আবার কাজ নাকি? মুগ্ধ হয়ে দেখতেন শহরের রাজপথে মাউন্টেড পুলিশ বা কলকাতার ঘোড়সওয়ার পুলিশবাহিনীর দৃপ্ত টহলদারি। উপরওয়ালাদের কাছে আবেদন করলেন, "দেখুন না স্যার একটু, খুব শখ মাউন্টেড পুলিশ হওয়ার। একটা সুযোগ যদি দেন?"
সুযোগ এল। ঘোড়ায় চড়ার প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কিছুদিনের মধ্যে রনির অন্তর্ভুক্তি ঘটল 'ঘোড়পুলিশ' বাহিনীতে। এবং শুরুতেই মুখোমুখি হলেন আকস্মিক বিপর্যয়ের। ট্রামের সঙ্গে প্রবল ধাক্কা লাগল রনির ঘোড়ার। বাঁচানো গেল না ঘোড়াটিকে। পিঠে গুরুতর আঘাত পেয়ে রনি শয্যাশায়ী থাকলেন তিন মাস। সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিলেন পূর্ণ উদ্যমে। দক্ষতা বা সাহসে চিড় ধরাবে সাময়িক চোট-আঘাত, সে বান্দাই ছিলেন না রনি। না হলে সেরে ওঠার মাস ছয়েকের মধ্যেই কেউ বক্সিং রিংয়ে নেমে পড়ে বীরবিক্রমে?

বক্সিংয়ে সহজাত প্রতিভা ছিল রনির। পুলিশের চাকরির পাশাপাশি নিখাদ নিষ্ঠায় চালিয়ে গিয়েছেন বক্সিং-অনুশীলন। রিংয়ে ক্রমে ধারালো হয়েছে শৈলী, 'ভালো' থেকে 'খুব ভালো' এবং 'খুব ভালো' থেকে শ্রেষ্ঠত্বের সড়কে পা রেখেছেন অনায়াসে।
শহরে 'বক্সার রনি'-র 'বাউট' আছে আজ? ব্যস, খবর পেলেই হল। তিলধারণের ঠাঁই হতো না দর্শকদের। চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশকে দেশের বক্সিং দুনিয়ায় তখন রনি মুর প্রায় অপ্রতিরোধ্য। রিংয়ের রাজা। যাঁর সামনে দাঁড়াতে না পেরে তখন পরাভূত হচ্ছেন একের পর এক ডাকসাইটে বক্সার।
রনির লড়াই থাকলে ফলাফল জানতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতেন সাধারণ মানুষও। অধিকাংশ যুদ্ধই হেলায় জিততেন রনি। হারতেন হাতে গোনা যে ক'টায়, বা যেগুলো যেত হাড্ডাহাড্ডির পর্যায়ে, তা হয়ে উঠত চর্চার বিষয়। ১৯৪৪ সালের এমনই এক লড়াইয়ের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল 'The Statesman'-এর পাতায় -
"Nuttall sent Moore down with a smashing right for a short count in the very first round. Moore not only rose full of confidence but carried the fight to Nuttall and a toe-to-toe exchange thrilled the crowd."
১৯৫২ সালে রনি জিতলেন জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়নের খেতাব। '৫৭-য় ফের ভারতসেরা। অলিম্পিক বক্সিং দলে ডাক পেয়েছিলেন দু'বার। দীর্ঘদিন ছুটি নিতে হবে বলে যাননি, এতটাই ছিল কাজের প্রতি নিষ্ঠা, এতটাই ছিল দায়িত্ববোধ। বক্সিং গ্লাভসকে বিদায় জানিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে।
রিংয়ের ভিতরে তো বটেই, রিংয়ের বাইরেও ছিলেন চ্যাম্পিয়ন। সার্জেন্ট হিসেবে জীবন শুরু করে যে উল্কাসদৃশ উত্থান রনির ৩৬ বছরের বর্ণময় কেরিয়ারে, তা কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে বিরলতম। ১৯৪১-৪৬ সার্জেন্ট পদে, '৪৬-৫০ অবধি সার্জেন্ট মেজর। ১৯৫০-৫৬ ইনস্পেক্টর হিসেবে। '৫৬-৬৪ পর্যন্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার। ১৯৬৬ সালে পেলেন বিরল স্বীকৃতি, পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের 'আইপিএস' অফিসার হিসেবে মনোনয়ন দিল কেন্দ্রীয় সরকার, নিযুক্ত হলেন কলকাতা আর্মড পুলিশের 'ডেপুটি কমিশনার' হিসেবে। '৭২-এ পদোন্নতি পেয়ে 'সিনিয়র ডেপুটি কমিশনার' একই বিভাগে। অবসর আরও পাঁচ বছর পরে, ১৯৭৭ সালে। রনির ফেয়ারওয়েল প্যারেডে উপচে পড়েছিল পুলিশকর্মীদের ভিড়। জীবদ্দশাতেই প্রায় কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া এক পুলিশ অফিসারকে খাকি পোশাকে শেষবারের মতো দেখতে।

চাকরিজীবনে কত যে পুরস্কার পেয়েছেন, ভূষিত হয়েছেন কত যে সম্মানে-স্বীকৃতিতে, হিসেব নেই কোনও। কিন্তু রনি মুরের মতো অফিসারদের আর কবেই বা সম্পূর্ণ মাপা গেছে স্বীকৃতি-পুরস্কারের মানদণ্ডে? রনির অধীনে যাঁরা কাজ করেছিলেন এবং এখনও জীবিত, তাঁদের স্মৃতিচারণে স্পষ্ট, তৎকালীন কলকাতায় রনি মুর ছিলেন এক রূপকথার নায়ক। অথচ রক্তমাংসের। কখনও শৌর্যের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন প্রায় একক প্রতিরোধে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা থামিয়ে, কখনও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচাচ্ছেন ইলেকট্রিক তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মহিলাকে, কখনও দুর্বৃত্তরা ময়দান চত্বর ছেড়ে আতঙ্কে পালাচ্ছে ঘোড়সওয়ার রনিকে দূর থেকে এক ঝলক দেখতে পেয়েই।
কত যে কাহিনী, কত যে গল্প, কত যে 'মিথ' জন্ম নিয়েছিল রনিকে নিয়ে সে সময়। যার কিছু হয়তো কিঞ্চিৎ অতিরঞ্জন, কিন্তু 'মিথ' তো আর সাধারণ গড়পড়তাদের নিয়ে তৈরি হয় না। ব্যতিক্রমীদের নিয়েই হয়। রনি মুর ব্যতিক্রম ছিলেন আপাদমস্তক।
শহরটাকে ভালবাসতেন প্রাণ দিয়ে। শহরও সেই ভালবাসা ফিরিয়ে দিত অকুণ্ঠে। আমজনতার মধ্যে রনির জনপ্রিয়তা ছিল আকাশ ছুঁইছুঁই। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, এমন এক অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস-এর স্মৃতিচারণ, "রনি যেখানেই যেত, ভিড় জমে যেত সাধারণ মানুষের। লোকে অটোগ্রাফের খাতা বাড়িয়ে দিত। কেউ কেউ প্রণাম করতে চাইত পা ছুঁয়ে। ভিড়ের মধ্যে থেকে শোনা যেত গুঞ্জন, 'দ্যাখ দ্যাখ, ওই দ্যাখ, রনি মুর!' কোনও পুলিশ অফিসারের ক্ষেত্রে এ জিনিস আর কখনও দেখিনি।"
রনি মুর। পুরো নাম, রোনাল্ড অ্যালেন মুর। শেষ জীবন কাটিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার পার্থে। মৃত্যু, ২০১৩ সালের ২ আগস্ট, ৯৩ বছর বয়সে। আশ্চর্য সমাপতন, মৃত্যুদিনটি 'বিশ্ব অ্যাংলো ইন্ডিয়ান দিবস'। জীবদ্দশায় যে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের আইকনে পরিণত হয়েছিলেন রনি।
যেদিন রনি মুর মারা গেলেন বছর ছয়েক আগে, সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে খবর এল কলকাতা পুলিশে, শোক গ্রাস করেছিল লালবাজারের অলিন্দকে। রনির অবসরের সালটা মনে করিয়ে দিই আরেকবার। ১৯৭৭। সে সময় যাঁরা জন্মানইনি, যাঁরা কখনও তাঁকে চাক্ষুস দেখেনইনি, তাঁরাও প্রবীণ অফিসারদের কাছে সেদিন শুনতে চাইছিলেন রনি মুরের কীর্তিগাথা। কর্মজীবন শেষ হওয়ার ছত্রিশ বছর পর যা অকল্পনীয়! ভাবাই যায় না শতাব্দীপ্রাচীন একটি প্রতিষ্ঠানের মননে ব্যক্তিবিশেষের স্মৃতির এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত!
কেউ কেউ, খুবই মুষ্টিমেয় কেউ কেউ বোধহয় এভাবেই বেঁচে থাকেন মৃত্যুর পরেও। রনি মুর যেমন।

পরিচিতি: সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিষয়ে পাঠরত। গবেষণামূলক লেখায় আগ্রহী।
