ভ্রমণ

মেঘ পাহাড়ের দেশে ক'টা দিন (পঞ্চম পর্ব)



বর্ণা কুণ্ডু


বারো'ই অক্টোবর, দু' হাজার চব্বিশ। এবারের মেঘালয় ট্রিপে হাতে বাঁচা এ-ই শেষ আস্ত একটা গোটা দিন! আইটেনারিতে আজ ডাউকি ভ্রমণ। শিলং থেকে সবচেয়ে দূরের পথ (সড়কপথে প্রায় পঁচানব্বই কিলোমিটার) এই ডাউকি। জায়গাটি ইস্ট জয়ন্তিয়া হিলস্-এ গড়ে ওঠা এমন এক সীমান্ত নগর, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ (international trade route border town)। তাই কোনোরকম ঢিলেঢালা আলসেমিকে মোটেও পাত্তা দিই নি সেদিন, দিনের শুরু থেকেই। আগের রাতে 'হোটেল শিলং অ্যাড্রেস'-এর রেস্টুরেন্টে আগাম জানিয়ে রেখেছিলাম। সেই মতো সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট প্যাক করে নিয়ে, আধঘন্টার মধ্যেই গাড়িতে উঠে বসলাম।

দিনটা সকাল থেকেই বেশ ফুরফুরে, রৌদ্রোজ্জ্বল। শিলংয়ের মূল শহরাংশ একটু পেরোতেই গাড়ি স্বচ্ছন্দেই হাই পিক-আপ নিলো।

ডাউকিযাত্রার রাস্তাটি খানিক বিশেষ। কিছু দূর এগিয়ে যাওয়ার পর থেকেই চোখে পড়ল অন্যান্য দিনের তুলনায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক পাহাড়ী পথ।


রিওয়াই যাবার স্বতন্ত্র সেই বন্ধুর লাল ধুলোর পাহাড়ী পথ।

তার কোথাও গভীর গিরিখাত, কোথাও সুবিস্তৃত উপত্যকা, আবার কোথাও বা চুনাপাথরের ছোটো-বড়-মাঝারি নানান আকৃতির পাহাড়।


এই পথের কোথাও গভীর গিরিখাত, কোথাও সুবিস্তৃত উপত্যকা, আবার কোথাও বা চুনাপাথরের ছোটো-বড়-মাঝারি নানান আকৃতির পাহাড়।

সেই পাহাড় কেটে কেটে রাস্তা তৈরির কাজ এখনো দেখলাম অব্যাহত। তাই সে' পথ বন্ধুর... টলোমলো। সে' পথে প্রচুর লাল ধুলো। কিন্তু তবুও তার প্রতি বাঁকেই অমোঘ নিশ্চয়তায় 'অপেক্ষা' হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে অপরূপ এক রোমাঞ্চ!

তার হাতছানি দুর্বার! পথিক সেই পথে একবার এসে পড়লে, তাকে ছেড়ে ফিরে যেতে পারে না আর!

আমরাও পারিনি!

শুনেছি ডাউকি'র একেবারে প্রান্ত ঘেঁষে বয়ে চলেছে বিখ্যাত স্বচ্ছতোয়া উমঙ্গট্ নদী, যে নদীর উপরিতল থেকেই নদীগর্ভের যাবতীয় মেরিন লাইফ নাকি খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যায়! তাই সেই নদী পর্যন্ত পৌঁছাতে একটা অদৃশ্য তাড়া অনুভব করছিলাম মনে মনে।

তবে তার আগে দেখে নিলাম আরো দু দুটো দর্শনীয় স্থান... রিওয়াই লিভিং রুট ব্রীজ আর মাওলিনং গাঁ। দুটোই ইস্ট খাসি হিলস্ ডিস্ট্রিক্টে পড়ে। রিওয়াই লিভিং রুট ব্রিজ থেকে আরো তিন কিলোমিটার মতো এগোলে, তবেই মাওলিনং গ্রাম। তাই সবার প্রথম গাড়ি রিওয়াই লিভিং রুট ব্রিজের স্পটে এসে থামলো।

লিভিং রুট্ ব্রীজ। গাছের শেকড়বাকড় বেঁধে বেঁধে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি করা এমন কিছু ব্রিজ মেঘালয়ে, বিশেষতঃ চেরাপুঞ্জির আশপাশের এলাকায় দেখতে পাওয়া যায়। তাদেরই অন্যতম, এই রিওয়াই লিভিং রুট্ ব্রিজ। এটি বায়ো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এখানকার স্থানীয় মানুষ রোজকার যাতায়াত এবং গেরস্থালির নানান অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র পারাপার করার তাগিদে খাসি হিলসের গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা নাম না জানা নিরীহ, দুর্বার – বিবিধ প্রাবল্যের পার্বত্য নদীগুলোর ওপর এমনই কিছু প্রাকৃতিক সেতু নির্মাণ করেছে।


প্রাচীন, জীবন্ত এক রবার গাছের রুট বেঁধে বেঁধে তৈরি করা হয় এই ব্রিজ। এই লিভিং রুট ব্রিজ পথেই স্থানীয় মানুষ এবং আশপাশের বন্যপ্রাণীরা পারাপার করে।

রিওয়াইয়ের এই জীবন্ত সেতু অবধি পৌঁছতে আমাদের বেশ কিছু খাড়া, পাথুরে সিঁড়িপথ পেরোতে হল। শহুরে যাপন। অভ্যেস নেই। তাই বেশ কষ্ট হচ্ছিল দমে। তবুও শেষ অবধি পৌঁছে যা দেখলাম, সে অভিজ্ঞতা জীবনে এই প্রথম। পাহাড়ের দুটি খাড়া বিভাজনের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে ভৌগোলিকভাবে অপ্রসিদ্ধ, কিন্তু বেশ খরস্রোতা এক নদী। তার পাথুরে গতিপথ, মাঝারি গড়ন; কিন্তু নদীটি বেশ গভীর। পাথরে আর নদীর জলের সংঘর্ষে তৈরি হচ্ছিল তীব্র জলচূর্ণ। তার ছাট এসে লাগছিল মুখে, গায়ে। এক সহজিয়া ভালোলাগায় সিক্ত হচ্ছিলাম নিজেরই অজান্তে! এই নদীর দু'পাড় ঘেঁষে অসংখ্য রবার গাছ। তেমনই এক প্রাচীন রবার গাছের ঝুরি আর ডালপালাকে বুদ্ধি করে টেনে বেঁধে আর ব্রিজের মেঝে হিসেবে কাঠের আর বাঁশের তৈরি পাটাতন বসিয়ে বসিয়ে খাসি সম্প্রদায় বেঁধে ফেলেন এমন অভিনব এক সেতু, যা প্রতিদিনই বর্ধিষ্ণু অবস্থানে রয়েছে; কারণ রবার গাছটি আজও জীবিত।


রিওয়াই সিঙ্গেল ডেকার লিভিং রুট ব্রীজ।

তবে একদিনে তৈরি করা যায় নি এই সেতু। টানা দশ বিশ বছরের মেহনতে গড়ে ওঠা এই সেতু দিয়েই আজ পারাপার হয় রিওয়াইয়ের গ্রামীণ মানুষগুলোর প্রতিদিনের খিদে, তেষ্টা আর বেঁচে থাকার উপকরণগুলো। বন্য জন্তুরাও এই সেতুপথেই এপারের বন পেরিয়ে ওপারের বনে খাদ্য আহরণে পৌঁছায়, আবার ফিরেও যায় যে যার ডেরায় একই পথে। প্রবল বর্ষায় নদীর জল প্রায়শই এই সেতু ছুঁই ছুঁই করে। কখনো ডুবেও যায়। সে কারণে এই ব্রিজের কিছু দূরে তৈরি হয়েছে আরো একটি লিভিং রুট ব্রীজ। তার দুটো তলা। তাই সে ব্রীজের নাম 'ডবল্ ডেকার ব্রিজ'। বর্ষায় প্রবল জলোস্ফীতিতে নিচের তলার সেতু ডুবে গেলেও যাতে ওপরের বেশ কিছুটা উঁচু সেতুটিকে অনায়াসে ব্যবহার করে জীবনকে সচল রাখা যায়। এই অশক্ত প্রাকৃতিক সেতুগুলোতে পা রাখলে বোঝা যায়, সদর্থক ইচ্ছাশক্তির প্রভাব কি প্রবল! প্রকৃতির বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে, কিভাবে তার সাথে হাতে হাত মিলিয়েই একসাথে বাঁচা যায়! প্রকৃতির বন্ধুতা আখেরে যে মানুষের সত্যিকারের শক্তি, সে কথা বহুদিন আগেই এখানকার এই প্রান্তিক সহজসরল মানুষগুলো বুঝে ফেলেছে।

আমরা যে কবে বুঝব!

পরবর্তী গন্তব্য ইস্ট খাসি হিলস্ জেলার হেরিটেজ ভিলেজ 'মাওলিনং'। এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি, মেঘালয়ের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ছবির মতো সুন্দর একটি ছোট্ট গ্রাম।


মাওলিনং গ্রামের প্রবেশ পথের পাশে।

এর নিকটতম শহর হল পিনুরলা। পরপর দু'বার (২০০৩ সালে এবং ২০০৫ সালে) এই গ্রামটি এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, যদিও গ্রামাঞ্চল বলতে আমাদের পশ্চিমবঙ্গবাসীর মনে ঠিক যে ধারণাটি আঁকা আছে, বর্তমানের মাওলিনং গ্রাম কিন্তু আদৌ তেমনটি নয়। 'মাওলিনং' নামেই গ্রাম! সে' গ্রামে মাখনমসৃণ পিচ ঢালা রাস্তা সর্বত্র ...প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে সংযোজক প্রতিটি অলিগলি, সবটুকুই।


মাওলিনং গ্রাম।

একটি বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে তবেই মূল গ্রামটিতে প্রবেশ করা যায়।


এই বাঁশের তৈরি সাঁকোটি পেরিয়েই মাওলিনং গ্রামটিতে প্রবেশ করতে হয় পর্যটকদের।

গ্রামটিতে চমৎকার একটি গির্জা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বেশ কিছু ঘরোয়া অতিথিশালা আর ক্যাফের আদলে তৈরি স্থানীয় কিছু খাবার জায়গাও রয়েছে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি রঙবেরঙের ফুল আর সবুজ গাছে গাছে সুসজ্জিত। রাস্তার দু'পাশে সমান্তরালে চলেছে রকমারি পাতাবাহার আর ফুলের সারি, খেজুর গাছ। অদূরে ঝর্ণা।


মাওলিনং চার্চ।


ছবির মত সুন্দর মাওলিনং গ্রাম।

এর 'স্কাইওয়াক অবজারভেটরি'-তে এসে দাঁড়ালে, একটু উঁচু থেকে রিওয়াই অঞ্চলের অপরূপ প্রকৃতিকে দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাওলিনং সত্যিই যেন 'ঈশ্বরের নিজস্ব বাগান'... সত্যিই যেন 'মিনি সুইজারল্যান্ড'! গ্রামটিতে পরিবেশবান্ধব নানান কর্মসূচি দায়িত্ব নিয়ে পালন করে সেখানকার অধিবাসীবৃন্দ। বাঁশ আর বেতের তৈরি ডাস্টবিন সর্বত্র। যা কিছু আবর্জনা, যত্রতত্র না ফেলে, সেখানেই জমা করা হয় এবং পরবর্তীতে মাটিতে গর্ত করে সেসব একাট্টা করা হয়। সেগুলোই একসময় 'সার' হিসেবে আবার কাজে লাগে। মাওলিনং-এর অধিবাসীরা খুবই সম্পন্ন, যা চোখে পড়ল। এ গ্রামের রাস্তায় গরুর গাড়ি নয়, দামি ব্র্যান্ডের চার চাকারা চলে।

 

 

মাওলিনং ঘুরে এবার সটান ডাউকি যাত্রা। আগেই বলেছি, সে পথ স্বতন্ত্র-সুন্দর, একই সঙ্গে রোমাঞ্চে ভরা। দু' পাশে একটানা সুপুরি বনের ঋজু সারিবদ্ধতা দেখতে দেখতে ডাউকির কাছটিতে পৌঁছতে চাওয়াতেই এক অবর্ণনীয় রোম্যান্টিকতা!


এই ঋজু সুপুরি বনের পাশ দিয়েই ডাউকি যাওয়ার রাস্তা।


ডাউকি অভিমুখে সুপুরি বনপথ।

ডাউকির প্রধান আকর্ষণ হল ডাউকি নদীর পার, যাকে স্থানীয় মানুষ উমঙ্গট্ নদী নামেও ডাকে। পাহাড়ি উপত্যকা থেকে নদীর পার অভিমুখী সেই ক্রমশঃ নিচু ঢালের two way রাস্তাটি খুব একটা প্রশস্ত নয়। পাশাপাশি দুটো গাড়ি কোনোমতে যেতে পারে, তাও খুব সতর্কভাবেই। ডাউকির দিকে যেতে একটা সময় পরে ডানহাত বরাবর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তটি স্পষ্ট দেখা গেল। কাঁটাতারের খুব উঁচু পাঁচিলের এ পাশে ভারতের মেঘালয়, আর ও পারে শিলেটের সবুজ প্রান্তর।


এপাশে ভারতের মেঘালয় ওপাশে বাংলাদেশ। ওপাশে সবুজ মাঠের অংশটি সময়মনসিংহ জেলার।

একটা সময় সবটাই আমাদের অখণ্ড বঙ্গদেশ ছিল! জায়গাটির এমনই মাহাত্ম্য যে, যেকোনো বাঙালির এই পথটুকু পেরোতে একটা চিনচিনে ব্যথা বুকে বাজবেই!


ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের সেই বিখ্যাত কাঁটাতারের বেড়া।

উমঙ্গট্ নদী মেঘালয়বাসীর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মার্চ এপ্রিল মাসে এখানেই বাৎসরিক বোট্ রেস্ অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া এই নদী-ই হল রিপনার ওরফে জয়ন্তিয়া হিলস্ আর খাসি হিলস্-এর 'হিমা খাইরিম'-এর মাঝামাঝি বয়ে চলা একমাত্র প্রাকৃতিক সীমারেখা। পাহাড়দুটোকে সংযুক্ত করে রেখেছে সরু একটাই মাত্র ব্রিজ...


উমঙ্গটের ওপর তৈরি, জয়ন্তিয়া আর খাসি হিলস্-এর সংযোজক সরু ব্রিজ।

এই উমঙ্গট্ নদীর পার অবধি পৌঁছতে আমাদের বেশ সঙ্কটেই পড়তে হল হঠাৎ করে, শেষদিকে। সরু এবড়োখেবড়ো রাস্তার একটা বিশেষ জায়গায় এসে হঠাৎ-ই পড়লাম তীব্র যানজটে। সে এমনই এক অনড় অচল অবস্থা যে, আমাদের গাড়ি সামনে এবং পেছনে সব মিলিয়ে শ' দেড়েক গাড়ির ঠিক মাঝখানটিতে ফেঁসে। পৌঁছতেও পারি না, ফিরে যেতেও পারি না। টানা ঘন্টা দু' এক ওভাবেই বসে রইলাম। বলা ভালো, বাধ্য হলাম।


ডাউকির কাছাকাছি পৌঁছে, সেই তীব্র যানজট।

শেষে জট খুলল। ধীরে ধীরে গাড়ির সারি আবার এগোতে লাগলো। বিকেল সাড়ে চারটের পর পৌঁছলাম ডাউকি অর্থাৎ উমঙ্গট্ নদীতে। সে নদীরও কিছুটা চর ভারতের, বাকি অংশ বাংলাদেশের। মনুষ্যসৃষ্ট এ এক হাস্যকর বিভাজন!


উমঙ্গটের তীর। ডাউকি।

উমঙ্গট্ নদী তীরে পৌঁছেই কি এক অদ্ভুত ভালোলাগায় অবশ হল মন! নদীর বিস্তীর্ণ পার জুড়ে ছোট বড় সাদা সাদা নুড়ি পাথর। নদীর পারে গিজগিজ করছে মানুষ। প্রচুর ডিঙি নৌকো ঘাটে বাঁধা। নির্দিষ্ট ডিঙির নির্দিষ্ট মাঝি। মানুষকে বিভিন্ন সময়ের প্যাকেজে উমঙ্গট্ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে তারা। আমরা বাসুমাঝির ডিঙায় উঠলাম। ধীর বৈঠায় মাঝিভাই আমাদের ঘোরাতে লাগল উমঙ্গট্। উমঙ্গটের জলে বৈঠা বাওয়ার তালে তালে সে মাঝি সত্যি দেখি মিঠে এক দেশজ সুর ভাঁজছে! অপার্থিব সে' সুর... সেই অনুভূতি!


বাসু মাঝি।

আকাশে ধীর পায়ে সন্ধে নামছে... মেঘের হালকা নরম ছায়া পড়েছে আমাদের মুখে, সঙ্গে সেই উদাস 'মাঝি-গান'... মুগ্ধতা! আহা!


উমঙ্গটের বুকে সূর্যাস্ত।

বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ জলতরঙ্গ-রব আমাদের যেন বয়ে নিয়ে চলেছিল সাক্ষাৎ অমরাপুরীতেই; কিংবা মনে হচ্ছিল, আমরা বোধহয় কাশ্মীর আর পাকিস্তানের সীমান্তে কোনো এক জলপথে, নৌবিহারে!

আত্মায় মিশছে সুবাতাস... প্রশান্তি... রূপকথা!


উমঙ্গটের মাঝখানে একটি সাদা পাথরের চর।


উমঙ্গট্ নৌবিহারে।

এমন ফুরফুরে যাপনে হঠাৎ করে নামলো ঝমাঝম বৃষ্টি... ঠিক মাঝনদীতে। নিজেদের অমন অসহায় ভিজে যাওয়া থেকে বাঁচাই, বিধি এমন কোনো একটা উপায়ও রাখেননি। অতএব, উমঙ্গট্ নদীর বুকে প্রাণখুলে একসাথে ভিজলাম আমি আর আমার মেয়ে। এ আনন্দ লিখে বোঝানো একেবারেই অসম্ভব। বোঝাতে চাইলামও না তাই কাউকে!

শুধু মনেপ্রাণে খুব করে চাইলাম, এমন অপূর্ব ডাউকি প্রাণে বাঁচুক। তার স্বভাবস্বচ্ছ কাচজলে সে বাঁচুক অনন্তকাল; মানুষ কম আসুক এমন সাক্ষাৎ স্বর্গে!


উমঙ্গটের কাচজলে।

ফেরার পথে আকাশে নতুন কালো মেঘ। প্রবল পার্বত্য বৃষ্টি! ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে একসময় গাড়ি শিলং ফেরার পথে পৌঁছল। ততক্ষণে আকাশ পরিষ্কার। হু হু করে ছুটে চলেছে গাড়ি। সাথে সাথে চলেছে পাহাড়ের সারি। ল্যাম্পপোস্টের অভাবে সেগুলোকে ভূতুড়ে দেখাচ্ছে রীতিমতো। তবে হ্যাঁ, সঙ্গে চলেছিল মহানবমীর রুপো চাঁদ।


ফিরতি পথে নবমীর চাঁদ।

পাহাড় আর চাঁদের লুকোচুরির সেই ছেলেমানুষী দেখতে দেখতে অবশেষে শিলং এসে পৌঁছলাম, রাত তখন সোয়া এগারোটা। 'শিলং অ্যাড্রেস' হোটেল কর্তৃপক্ষের আতিথেয়তা কোনোদিনও ভোলার নয়। হটকেসে আমাদের ধোঁয়া ওঠা ডিনার যত্নে গুছিয়ে রেখে, তাঁরা আমাদের নিরাপদে ফেরার অপেক্ষাতেই ছিলেন!


নিঝুম রাতে আমাদের অপেক্ষায় জেগে হোটেলের ঘর।

পরের দিন অর্থাৎ অক্টোবরের তেরো তারিখ সকাল দশটা সোয়া দশটা পর্যন্তই শিলং-কে এবারের মতো প্রাণভরে দেখেছি; শিলংময় হয়েই থেকেছি। প্রাতরাশ সেরে হোটেলের যাবতীয় ডিপার্চার ফরম্যালিটিস্ মিটিয়ে আটটার মধ্যেই চেক-আউট করলাম। গুয়াহাটি এয়ারপোর্ট ফিরতে হবে।


'হোটেল শিলং অ্যাড্রেস'-এর তিনটি ডাইনিং স্পেসের একটি, এখানেই হোটেলের গেস্টদের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সার্ভ করা হ'তো প্রত্যহ।

 

 

তার আগে, অরুণজ্যোতিকে খুব করে ধরলাম, একবার যেন 'শিলং পিক্' ঘুরিয়ে তবেই এয়ারপোর্টে ছাড়ে আমাদের। অরুণজ্যোতি এই চারদিনে আমাদের বন্ধুই হয়ে উঠেছিল! সে ঠিক মাপ করে ঘুরিয়ে দিলো শিলং পিক-ও!


ফেরার আগে অরুণজ্যোতির সাথে এই ছবি। ভাইটিকে বিদায় জানানোর সময় ভারাক্রান্ত বোধ করেছিলাম।

'শিলং পিক' মূল শিলং শহর থেকে দক্ষিণে ১০ কিলোমিটার মতো গেলে, পড়ে। শিলং-এর এটিই সর্বোচ্চ পয়েন্ট, যেখান থেকে একাধারে গোটা শিলং শহরের অপার্থিব এক দৃশ্যসুখ পায় চোখ, এছাড়াও বেশ কিছু প্রপাত, হিমালয়ের কিয়দংশ, অধুনা বাংলাদেশের সবুজ প্রান্তর... এ' সবটুকুও দেখা যায়।


শিলং পিক্।

এই জায়গা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি ১,৯৬২ মিটার উঁচু। জায়গাটির একটি গম্ভীর দায়িত্বের দিকও রয়েছে। ভারতীয় বায়ুসেনার radar station-টিও শহরের এই বিশেষ অংশে। তাই এখানকার প্রবেশাধিকার খুবই কড়া নিরাপত্তাধীন। শিলং পয়েন্টের একটি পৌরাণিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। স্থানীয় মানুষ মনে করেন, শিলং শহরের প্রাণপুরুষ লেই শিলং ওরফে ইউ শিলং-এর বাড়ি এই জায়গাটিতেই ছিল। সেই কারণে প্রতি বসন্তে এই 'শিলং পিক্' সেজে ওঠে লেই শিলং-কে কেন্দ্র করে উদ্ যাপিত এক বিশেষ ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনে।

শিলং পিক্ থেকে এবার সোজা গুয়াহাটি এয়ারপোর্ট অভিমুখে ছুটলো আমাদের গাড়ি। পথে একে একে ছেড়ে এলাম উমিয়ম লেক, উমিয়ম ব্রিজ, উমিয়ম নদ। সেদিন দুর্গাপুজোর দশমী। রাস্তায় চোখে পড়ল মায়ের বিসর্জন শোভাযাত্রাও! 


বাড়ি ফেরার পালা। গুয়াহাটি এয়ারপোর্টের পথে।


বাড়ি ফেরার পথে উমিয়ম ব্রিজ।


রাস্তায় দেখা... বিজয়া দশমী।

বিকেল পৌনে পাঁচটা। কলকাতা এয়ারপোর্টের রানওয়েতে আমাদের এয়ার ইন্ডিয়ার বায়ুযান। ফ্লাইট উইন্ডো'র ওপারে কলকাতার সূর্যাস্ত।


দমদম বিমানবন্দরে দশমীর সূর্যাস্ত।

চোখে স্মৃতির ক্যলাইডোস্কোপ... ডন বসকো মিউজিয়ামের ছাদ থেকে দেখা সূর্যাস্তের পশ্চিম আকাশ, চেরাপুঞ্জি হয়ে ফেরার পথে সূর্যডোবা পশ্চিম আকাশ, উমঙ্গটের জলে শেষ সূর্যের রঙ... ছোট বড় তরল সোনার একাধিক বৃত্তরাজি তখন চোখে একাকার!

বাড়ি ফিরছি। কিন্তু মনটা ভারি বিচ্ছেদকাতর...! 

চেরাপুঞ্জির সেই কালো মেঘঢাকা রাস্তার ধারেই কি আমার পূর্বজন্মের ছোট্ট সাদা বাড়িটা ছিল?

(সমাপ্ত)

চিত্রঋণঃ লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: শিক্ষিকা ও লেখক।