কবিতা

দিকনির্দেশ



বিষ্ণুপ্রিয়া বসু


একদিন -
রাতের অন্ধকারে
ফেলে এলে উঠোন-ঘেরা সারি সারি ঘর,
কালো দীঘির বাঁধানো ঘাট, আদিগন্ত ধানক্ষেত,
লেবুপাতার গন্ধ মাখা পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয়।

এপার এলে।
উদ্বাস্তু অনিশ্চয়তার শেষে
জুটল জরিপ করা একফালি জমি, দুটো ঘর,
বাকি পরিসর জুড়ে ধীরে ধীরে স্বপ্ন নিচয়।

চোখ বুজলেই -
মনের আকাশে ভাসে
আম, জাম, জারুলের নিবিড় সবুজ মেলামেশা।
জমি জুড়ে তাই অঙ্কুরিত অতীত মাথা চাড়া দেয়।

বয়স বাড়ে।
অবসর জীবন কাটে
ভরা সংসারের কলকোলাহল ছেড়ে এক কোণে
শান বাঁধানো লাল রোয়াকে একটুকু শান্তির আশায়।

পরম আদরে
কচি দুটো হাত টানে -
"দাদা, পুব দিকে সুয্যি ওঠে বুঝি?"
"পুবে জামরুলের ডালে ভোরের নরম আলো দোল খায়"।

"আর পশ্চিমে?
যেখানে সূয্যি ডোবে?"
"সেইখানে কাঁচা-মিঠে আমগাছে, তেঁতুল পাতায়
ঘন হয়ে সন্ধ্যা এলে, বাতি জ্বলে তুলসীতলায়।

"শীত এলে
উত্তুরে হাওয়া বয়?"
"ওই দিকে নারকেল, সুপুরির সারি মাথা নাড়ে
বাঁশঝাড়ে পাতা কাঁপে, পাক খেয়ে ঝরে ঝরে যায়"।

"দখিন দুয়ার খুলে
ফাগুন এল নাকি?"
"শুধু বুঝি তাই? ওইখানে কাঞ্চন ফুলে ফুলে সেজে ওঠে,
রঙিন ফুলের ফাঁকে কৃষ্ণ কোকিল গান গায়"।

এইভাবে
মিশে যায় পুব-পশ্চিম।
অতীতের হাত ধরে ভাবীকাল চিনে নেয় দিকনির্দেশ
মুছে যায় কাঁটাতার, দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, এই বাংলায়।

শিল্পী: হরেন দাশ।

পরিচিতি: প্রাবন্ধিক ও বিশিষ্ট চিকিৎসক। কলকাতা।