গল্প

ভোটরঙ্গ



অরুন্ধতী দাস


"এই কেলে, যা যা এই চারটে ডবল হাফ চা বাবুদের দিয়ে আয় দিকিনি বাপ।"

"বলাই চারটে লেড়ে বিস্কুটও দিস।"

মদনবাবুর কথায় বলাই চটপট বয়ামের ঢাকনা খুলে চারটে বিস্কুট বাবুদের হাতে দিয়ে দেয়, ততক্ষণে কেলেও ছোট ছোট কাঁচের গেলাসে করে হাতে হাতে চা ধরিয়ে দিয়ে গেছে।

মদনবাবু পুরোনো আমলের ইন্টারমিডিয়েট। এ গাঁয়ের প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার। এই নিরক্ষর গ্রামে দু' চারজন শিক্ষিত লোকের একজন। পাড়ায় ওর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি, রোজকার মতো আজ সকালেও বলাইয়ের দোকানে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়ছেন। পাশে জনাতিনেক হাটুরে মনোযোগ দিয়ে তাই শুনছে।

বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার সীমানা বরাবর প্রত্যন্ত এক গ্রাম এই বাঘমুড়ি। রুক্ষ প্রকৃতি, বর্ষাকালেও ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হয় কি হয় না। রবি আর বিষ্যুদ এই দু'দিন হাট বসে। এছাড়া চাল ডাল তেল নুনের মুদির দোকান। দুই একটা মাছ, সবজির দোকান। একটা সস্তার ছিটে বেড়ার সেলুন, একটা পানবিড়ির দোকান আর একটা সাইকেল সারানোর দোকান। যাতায়াতে সবারই সাইকেলই ভরসা। দেড়-দুই বর্গ মাইলের এই গ্রামে সাকুল্যে হাজার দুই লোকের বাস। প্রকৃতি রুক্ষ তাই চাষবাসেরও সুবিধে নেই। গ্রামে দু-চার ঘর বামুনু, দশ-বারো ঘর কায়েত ছাড়া বেশিরভাগই নাপিত, মুচি, ডোম। গ্রামের সীমানা ঘেঁষে কয়েকঘর আদিবাসীর বাস। গ্রামের মরদেরা বর্ষাকালে পুরো বাড়িতে বসা। বাকী সময় কোনো বর্ধিষ্ণু গ্রাম বা দূরের শহরে যায় রোজগারের ধান্দায়। বেশীরভাগই যায় পুকুর কাটার কাজে, ফসল কাটতে বা শহরের পাকা রাস্তা বানানোর কাজে। দু' ক্রোশ দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম, ডাকঘর আর থানা। এখানে অসুখ বিসুখ, সাপে কাটা এসব বিপদ আপদে ওঝাই ভরসা। রসুলপুরের এক LMF ডাক্তারের কম্পাউন্ডার হরেন বিশ্বাস ক'বছর হল এ গাঁয়ে এসে ডাক্তার সেজে বসেছে। তার বেজায় গুমোর, একটু বাড়াবাড়ি হলে হরেন ডাক্তার আর নেহাৎই নাচার হলে পাঁচ ক্রোশ দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

মদনবাবু নিজের উদ্যোগে বসত বাড়ীর লাগোয়া জমিতে দরমার বেড়া আর টালির চাল দেওয়া ক'টা ঘরে একটা প্রাইমারী স্কুল খোলেন। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণী, বহু তদ্বির তদারক করে গোটাকয়েক চটির শুকতলা খুইয়ে এতদিনে একটা সরকারী অনুদান জুটিয়েছেন। প্রথমে জনা পাঁচেক ছাত্র নিয়ে শুরু করেছিলেন এখন আশেপাশের দু-চার গাঁ থেকে বেশ কিছু ছাত্র জুটেছে। একা আর পেরে উঠছেন না। গ্রামেরই তিনজন মাধ্যমিক পাশ ছেলে, যারা রসুলপুর থেকে পড়াশোনা করেছে তাদের বহাল করেছেন। সরকারী অনুদান থেকে সামান্য কিছু বেতনও দেন এদের। ইচ্ছে আছে আস্তে আস্তে প্রতি বছর একটা করে ক্লাস বাড়িয়ে এটাকে মাধ্যমিক অব্দি টেনে দেবেন।

হাটের পাশেই বলাইয়ের চা-এর দোকান। দোকান বলতে ঐ আর কি। চালা ঘরের মধ্যে দুটো স্টোভ, দু'একটা ডেচকি, কেটলি, ক'টা কাঁচের গেলাস। চা, চিনির কৌটো। কাঁচের বয়ামে সস্তার বিস্কুট, পাউরুটি আর ডিম। হাটবারে ঘুগনিও হয়। খদ্দেরদের বসার জন্য সামনে খুঁটির উপর বাঁশ ফেঁড়ে ক'টা বেঞ্চ আর বসার ক'টা প্লাস্টিকের চেয়ার। এতদিন বলাই একাই সামলাত, এখন খদ্দের বাড়াতে বড় ছেলে কানাইকে সঙ্গে নিয়েছে। ওর ডাক নাম কালু। ওর বয়স তেরো চোদ্দ হবে, কালো কষ্টি পাথরের মতো রং কিন্তু মুখ চোখ ভারি মায়া কাড়া। মুখে সবসময় হাসি লেগেই আছে। ওর বুদ্ধিশুদ্ধি দেখে মদনবাবু নিজের দায়িত্বে ওকে প্রতিদিন দোকানের পাট চুকলে রাত্রিবেলা ঘন্টাখানেক পড়ান। খুব চটপট অক্ষর পরিচয় সেরে এখন ছোট ছোট বাক্য লিখতে পারে। বর্ণপরিচয় নিজে নিজেই পড়তে পারে। সঙ্গে যোগ, বিয়োগ, ধারাপাতও চলছে। এজন্য বলাই খুবই কৃতজ্ঞ।

দোল চলে গেছে, এখনও গাছে গাছে শিমুল পলাশের আগুন জ্বলছে। ভোরবেলার দিকে শিরশিরে ভাব থাকলেও সকাল ১০টা থেকেই হাওয়া গরম হতে শুরু করে। হাওয়া এমনিতেও গরম হয়ে উঠছে, আর মাসখানেক গেলেই ভোট। হাটবারে আর পাঁচটা গাঁয়ের লোক এসে হাওয়া গরম করে যায়। মদনবাবুর সংবাদ পাঠের আসরে সবাই জানতে পারে দিল্লীতেও রাজা বদল হয়েছে। এই বাংলায় বছর পঁচিশ ধরেই শিমুল, পলাশের রাজত্ব। ভোট বলতে এই গাঁয়ের মানুষ বোঝে সিপিএম-এর কিছু জোয়ান ছেলে তাদের বিনিপয়সায় ভ্যান রিকশা চাপিয়ে রসুলপুর নে যাবে ভোট দিতে। সঙ্গে এক ঠোঙা মুড়ি বাতাসা বা তেলেভাজা। পাথুরে মুখে তারা জানিয়ে দেয় "ভোট দিন বাঁচতে, তারা হাতুরি কাস্তে।" ওদের পাথুরে মুখের কাঠিন্য বুঝিয়ে দেয় কাদের হাত থেকে বাঁচতে হবে, এই নিস্তরঙ্গ জীবনে দুগ্গা পুজোর পরেই এটা একটা উৎসব। এরা বলে ভোট পুজো।

বছর কয়েক ধরেই কিছু মানুষ গা ঢাকা দিয়ে এখানে ত্রাস ছড়াচ্ছে। সরকারী বাবুরা বলে, "খবদ্দার ওদের ধারেকাছে যাবি না, ওদের কথাও শুনবি না। ওরা জংলী।" এটা যে জঙ্গীর অপভ্রংশ ওরা বুঝতে পারে না। ওরা শুধু জানে এরা গর্ভমেন্টের শত্রু। গ্রামের লোকেরা তাই ভয়ে ভয়ে থাকে।

হঠাৎই এক হাটবারের সকালে বলাইদের চা দোকানের চালাঘরের বাইরের দেওয়ালে একটা পোস্টার চোখে পড়ল। খবরের কাগজে লাল কালি দিয়ে মোটা মোটা হরফে লেখা 'সাবধান, কেউ ভোট দিতে যাবেন না, বিপদ হবে।' ঘুম থেকে উঠেই মারাত্মক সাবধানবাণী দেখে বলাইয়ের মুখ শুকিয়ে যায়। আর কেউ দেখে ফেলার আগেই কাগজটা চটপট ছিঁড়ে ফেলতে যায়। কোথা থেকে কানাই ছুটে এসে বলে, "করিস কি বাপ? ওরা জানতে পারলে তোর গদ্দান নেবে।" বালাই বলে, "আর না ছিড়লি যে লালপার্টি গদ্দান নেবে?" কানাই উত্তরে বলে, "নারে বাপ আমি শুনেছি লাল পার্টি বাবুরাও ওই জংলীদের ভয় পায়।" আসন্ন উভয় সঙ্কটের ত্রাসে বলাই সিঁটিয়ে থাকে। রোজকার মতো একে একে খদ্দের আসে, মদনবাবুও খবরের কাগজ হাতে বসে পড়তে থাকেন, কানাই চায়ের গেলাস আর বিস্কুট ধরিয়ে দেয়। প্রথম চুমুকটা মুখে দিয়েই বলে ওঠেন, "কি রে বলাই চায়ে চিনি দিসনি?" উত্তর না পেয়ে তাকিয়ে দেখেন বলাইয়ের মুখ ফ্যাকাশে। অবাক হয়ে মদনবাবু বলেন, "কিরে তোর শরীর খারাপ নাকি?" বলাই শুকনো মুখে জবাব দেয়, "না বাবু, শরীর ঠিকই আছে, তবে বড় বিপদ।" মদনবাবুকে চালাঘরের পিছনের দেওয়ালের দিকে নিয়ে যায়, পোস্টার দেখে উনিও চিন্তিত হয়ে পড়েন। মনে মনে ভাবেন ওসব তো বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, পুরুলিয়ায় চলছে। এই এতদূরেও ওরা সংগঠন করেছে! ওঁর কপালে ভাঁজ দেখে বাকী সব খদ্দেররাও উৎসুক হয়।

ফিসফাস, কানাকানি গুঞ্জন চলতেই থাকে। ওই পোস্টার দেখতেই গাঁ শুদ্ধ লোক ঝেঁটিয়ে চলে আসে। দেখতে দেখতে খবর যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায়। রবি পেরিয়ে সোম, মঙ্গল কেটে গেল। বিষ্যুদবার আবার হাট বসবে, তার আগেই একটা বিহিত করতে হবে।

বুধবার সকালে গ্রামের মাথারা একজোট হয়ে আলোচনায় বসল। মোড়ল বলল, "রসুলপুরের থানায় খবর দেওয়া দরকার"। সঙ্গে সঙ্গে দুই জোয়ান দু'চাকায় করে রসুলপুরের থানায় খবর দিল। থানার বড় দারোগা খবর শুনে ঘেমে নেয়ে একসা। এক বোতল জন ঢকঢক করে খেয়ে মেজো দারোগাকে ডাকলেন। মেজবাবুর মাথা ঠান্ডা, একটু বুদ্ধিও আছে। দুজনে পরামর্শ করে লালবাজারে ফোন করাই সাব্যস্ত করলেন। লালবাজারের বড়কর্তা ফোন পেয়ে নড়েচড়ে বসলেন। জরুরি মিটিং ঢেকে ঠিক হল অবিলম্বে মহাকরণে জানানো দরকার। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর পি.এ. ফোন ধরেই আঁতকে উঠলেন। কথা গেল মুখ্যমন্ত্রীর কানে। তড়িঘড়ি মন্ত্রীসভার বৈঠক ডেকে ঘোষণা করলেন, অবিলম্বে ওই গ্রামে পুলিশ পোস্টিং বসাতে হবে। বিষ্যুদবার ভোর না হতেই গাঁয়ের মানুষ একচকিয়ে দেখল দুখানা পুলিশের গাড়ি, পুকুর পাড়ে বাসন মাজতে এসে গাঁয়ের বৌ ঝি-রা ভয় পেয়ে বাসন কোষন ফেলে ঘোমটা টেনে বাড়ির দিকে দে দৌড়। গোটা গাঁয়ে হু হু করে খবর ছড়িয়ে পড়ল। একদিকে  ভয়, অন্যদিকে আস্ত পুলিশ দেখার কৌতূহলে বাচ্চা-বুড়ো ছটফট করতে লাগল। বলাইয়ের দোকানে যেহেতু পোস্টার পড়েছে সেখানে সর্বক্ষণের জন্য দুজন বন্দুকধারী পুলিশ মোতায়েন হল। প্রথমে একটু ভয় পেলেও তাদের বিনি পয়সায় চা বিস্কুট খাইয়ে খুশি রাখার চেষ্টা করল। পাড়ায় বলাইয়ের কদর বহুগুণ বেড়ে গেল। গাঁয়ের মোড়লও ওকে সমীহ করতে শুরু করল। কী সাহস বলাইয়ের, বন্দুকধারী পুলিশের সাথে হেসে কথা বলছে! এই দু'তিন দিনে ওর বিক্রিবাটাও অনেক বেড়ে গেছে। এতদিনের অখ্যাত একটা গ্রাম এক পোস্টারের কৃপায় জাতে উঠে গেল। মাঝে মাঝেই লাল-পার্টির দাদারা এসে খোঁজখবর নিচ্ছে। দেখতে দেখতে ভোটের দিন এসে গেল।

ভ্যান রিকশা করে ভোটার তুলতে কাস্তে-হাতুড়ি-তারা পতাকা লাগিয়ে লাল ক্যাডারদের ছোটাছুটি। ঝোপ বুঝে কোপ মারার মতো গাঁয়ের লোকেরা দড় বাড়িয়ে নিয়েছে। শুকনো চিঁড়ে বাতাসায় হবে না। তাদের ফল, মিষ্টি, ঠান্ডা বোতল খাওয়াতে হবে। তাই-ই সই, সর্বহারার নেতারা রসুলপুর থেকে ঝুড়ি ঝুড়ি ফল আর হাঁড়ি ভরতি মিষ্টি আনছে। বহু কষ্টে ঠান্ডা বোতলও জোগাড় করেছে। গাঁয়ের মানুষ ভ্যানে উঠছে। লাল দাদারা বুথে নিয়ে যাবার পথে তাদের জামাই আদরে খাওয়াচ্ছে আবার ভোট করিয়ে ভ্যানে করেই ঘরে ফিরিয়ে দিচ্ছে। তেমন গন্ডগোল কিছুই চোখে পড়ল না। ফল বেরোবার দিন এগিয়ে আসছে। লাল পার্টির নেতারা নিশ্চিন্ত। দেখতে দেখতে ফলও বেরিয়ে গেল। এ তল্লাটে ওদের প্রার্থী গো-হারান হেরেছে। গ্রামে গ্রামে নেতারা এসে শাসাবে সে ভরসাও নেই। নিশ্চয়ই জনযুদ্ধ পার্টি এখানে প্রবল পরাক্রান্ত। পরের দিন পুলিশ পোস্টিং উঠে যেতে বলাইয়ের দোকানে খদ্দেরদের ভিড়, গোটা গাঁয়ের লোক যেন ভেঙে পড়েছে। মুখে মুখে ফিসফিস। জানা গেল এবার আশেপাশের আরও দশটা গ্রামের কেউ লালপার্টিকে ভোট দেয় নি। জঙ্গিরা নাকি আরোও ভয়ঙ্কর। এত বছরের অবহেলায় গ্রামগুলোর দুর্দশার শেষ ছিল না। গ্রামে খাবার জলের ভালো ব্যবস্থা নেই, বিজলী বাতি নেই, কোনো চিকিৎসার পরিকাঠামো নেই। উচ্চশিক্ষার কথা তো ছেড়েই দিলাম, তাই অভিযোগেরও অন্ত নেই। তবু বাঁচার তাগিদে ওরা এতদিন লাল পার্টিকেই ভোট দিতে বাধ্য থেকেছে। এবার জোরদার প্রতিপক্ষ পেয়ে ওরাও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গ্রামবাসীরা গজল্লা শেষ করে বলাইয়ের দোকানের পিছনে জড়ো হল, আরেকবার পোস্টারটা দেখবে। কী অবাক কান্ড, পুরোনোটার পাশেই হল আরেকটা কাগজে লাল কালি দিয়ে বড়ো করে লেখা 'সাবাশ'। সবাই এ ওর দিকে তাকায়, পুলিশের চোখ এড়িয়ে জংলিদের লোক ঢুকলো কি করে? এবার যে যার মতো গুটিগুটি পায়ে বাড়ির দিকে এগোয়।

বলাই সেদিনের মতো ক্যাশবাক্সের টাকাপয়সা গুণে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে গিয়ে দেখে কানাই কেমন মিটিমিটি হাসছে। বলাই ছেলেকে বলে, "হাসিস কেন রে বাপ?" কানাই হাসতে হাসতেই বলে, "হাসবনি?" কেমন দশ গাঁয়ের লোককে এমনকী গরমেন্টকেও বুদ্ধু বানিয়ে দিলাম। বলাই চোখ বড় বড় করে বলে "মানে তুই?" কানাই ঝলমলে মুখে বলে, "দেখলি তো বাপ, এক কলমের খোঁচায় সব কেমন কাঁপায়ে দিলাম। বন্দুকআলা পুলিশ এলো। গাঁয়ের লোকে পেটপুরে ফল, মিষ্টি, ঠান্ডা বোতল খেল আর মোদের দোকানের রোজগার বছরকারটা কেমন এক মাসে উঠে এল। লাল পার্টির বজ্জাতগুলান কেমন ল্যাজ গুটিয়ে পালাল। কলমের কত জোর দেখলি তো বাপ? তুইও চল মদন মাষ্টারের কাছে লিখাপড়া শিখাবি। ছেলের বুদ্ধিতে অবাক হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলাই বলল, "হ্যাঁ রে বাপ তাই চল।"

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্তা অধ্যাপক।

"এই কেলে, যা যা এই চারটে ডবল হাফ চা বাবুদের দিয়ে আয় দিকিনি বাপ।"

"বলাই চারটে লেড়ে বিস্কুটও দিস।"

মদনবাবুর কথায় বলাই চটপট বয়ামের ঢাকনা খুলে চারটে বিস্কুট বাবুদের হাতে দিয়ে দেয়, ততক্ষণে কেলেও ছোট ছোট কাঁচের গেলাসে করে হাতে হাতে চা ধরিয়ে দিয়ে গেছে।

মদনবার পুরোনো আমলের ইন্টারমিডিয়েট। এ গাঁয়ের প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার। এই নিরক্ষর গ্রামে দু' চারজন শিক্ষিত লোকের একজন। পাড়ায় ওর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি, রোজকার মতো আজ সকালেও বলাইয়ের দোকানে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়ছেন। পাশে জনাতিনেক হাটুরে মনোযোগ দিয়ে তাই শুনছে।

বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার সীমানা বরাবর প্রত্যন্ত এক গ্রাম এই বাঘমুড়ি। রুক্ষ প্রকৃতি, বর্ষাকালেও ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হয় কি হয় না। রবি আর বিষ্যুদ এই দু'দিন হাট বসে। এছাড়া চাল ডাল তেল নুনের মুদির দোকান। দুই একটা মাছ, সবজির দোকান। একটা সস্তার ছিটে বেড়ার সেলুন, একটা পানবিড়ির দোকান আর একটা সাইকেল সারানোর দোকান। যাতায়াতে সবারই সাইকেলই ভরসা। দেড়-দুই বর্গ মাইলের এই গ্রামে সাকুল্যে হাজার দুই লোকের বাস। প্রকৃতি রুক্ষ তাই চাষবাসেরও সুবিধে নেই। গ্রামে দু-চার ঘর বামুনু, দশ-বারো ঘর কায়েত ছাড়া বেশিরভাগই নাপিত, মুচি, ডোম। গ্রামের সীমানা ঘেঁষে কয়েকঘর আদিবাসীর বাস। গ্রামের মরদেরা বর্ষাকালে পুরো বাড়িতে বসা। বাকী সময় কোনো বর্ধিষ্ণু গ্রাম বা দূরের শহরে যায় রোজগারের ধান্দায়। বেশীরভাগই যায় পুকুর কাটার কাজে, ফসল কাটতে বা শহরের পাকা রাস্তা বানানোর কাজে। দু' ক্রোশ দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম, ডাকঘর আর থানা। এখানে অসুখ বিসুখ, সাপে কাটা এসব বিপদ আপদে ওঝাই ভরসা। রসুলপুরের এক LMF ডাক্তারের কম্পাউন্ডার হরেন বিশ্বাস ক'বছর হল এ গাঁয়ে এসে ডাক্তার সেজে বসেছে। তার বেজায় গুমোর, একটু বাড়াবাড়ি হলে হরেন ডাক্তার আর নেহাৎই নাচার হলে পাঁচ ক্রোশ দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

মদনবাবু নিজের উদ্যোগে বসত বাড়ীর লাগোয়া জমিতে দরমার বেড়া আর টালির চাল দেওয়া ক'টা ঘরে একটা প্রাইমারী স্কুল খোলেন। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণী, বহু তদ্বির তদারক করে গোটাকয়েক চটির শুকতলা খুইয়ে এতদিনে একটা সরকারী অনুদান জুটিয়েছেন। প্রথমে জনা পাঁচেক ছাত্র নিয়ে শুরু করেছিলেন এখন আশেপাশের দু-চার গাঁ থেকে বেশ কিছু ছাত্র জুটেছে। একা আর পেরে উঠছেন না। গ্রামেরই তিনজন মাধ্যমিক পাশ ছেলে, যারা রসুলপুর থেকে পড়াশোনা করেছে তাদের বহাল করেছেন। সরকারী অনুদান থেকে সামান্য কিছু বেতনও দেন এদের। ইচ্ছে আছে আস্তে আস্তে প্রতি বছর একটা করে ক্লাস বাড়িয়ে এটাকে মাধ্যমিক অব্দি টেনে দেবেন।

হাটের পাশেই বলাইয়ের চা-এর দোকান। দোকান বলতে ঐ আর কি। চালা ঘরের মধ্যে দুটো স্টোভ, দু'একটা ডেচকি, কেটলি, ক'টা কাঁচের গেলাস। চা, চিনির কৌটো। কাঁচের বয়ামে সস্তার বিস্কুট, পাউরুটি আর ডিম। হাটবারে ঘুগনিও হয়। খদ্দেরদের বসার জন্য সামনে খুঁটির উপর বাঁশ ফেঁড়ে ক'টা বেঞ্চ আর বসার ক'টা প্লাস্টিকের চেয়ার। এতদিন বলাই একাই সামলাত, এখন খদ্দের বাড়াতে বড় ছেলে কানাইকে সঙ্গে নিয়েছে। ওর ডাক নাম কালু। ওর বয়স তেরো চোদ্দ হবে, কালো কষ্টি পাথরের মতো রং কিন্তু মুখ চোখ ভারি মায়া কাড়া। মুখে সবসময় হাসি লেগেই আছে। ওর বুদ্ধিশুদ্ধি দেখে মদনবাবু নিজের দায়িত্বে ওকে প্রতিদিন দোকানের পাট চুকলে রাত্রিবেলা ঘন্টাখানেক পড়ান। খুব চটপট অক্ষর পরিচয় সেরে এখন ছোট ছোট বাক্য লিখতে পারে। বর্ণপরিচয় নিজে নিজেই পড়তে পারে। সঙ্গে যোগ, বিয়োগ, ধারাপাতও চলছে। এজন্য বলাই খুবই কৃতজ্ঞ।

দোল চলে গেছে, এখনও গাছে গাছে শিমুল পলাশের আগুন জ্বলছে। ভোরবেলার দিকে শিরশিরে ভাব থাকলেও সকাল ১০টা থেকেই হাওয়া গরম হতে শুরু করে। হাওয়া এমনিতেও গরম হয়ে উঠছে, আর মাসখানেক গেলেই ভোট। হাটবারে আর পাঁচটা গাঁয়ের লোক এসে হাওয়া গরম করে যায়। মদনবাবুর সংবাদ পাঠের আসরে সবাই জানতে পারে দিল্লীতেও রাজা বদল হয়েছে। এই বাংলায় বছর পঁচিশ ধরেই শিমুল, পলাশের রাজত্ব। ভোট বলতে এই গাঁয়ের মানুষ বোঝে সিপিএম-এর কিছু জোয়ান ছেলে তাদের বিনিপয়সায় ভ্যান রিকশা চাপিয়ে রসুলপুর নে যাবে ভোট দিতে। সঙ্গে এক ঠোঙা মুড়ি বাতাসা বা তেলেভাজা। পাথুরে মুখে তারা জানিয়ে দেয় "ভোট দিন বাঁচতে, তারা হাতুরি কাস্তে।" ওদের পাথুরে মুখের কাঠিন্য বুঝিয়ে দেয় কাদের হাত থেকে বাঁচতে হবে, এই নিস্তরঙ্গ জীবনে দুগ্গা পুজোর পরেই এটা একটা উৎসব। এরা বলে ভোট পুজো।

বছর কয়েক ধরেই কিছু মানুষ গা ঢাকা দিয়ে এখানে ত্রাস ছড়াচ্ছে। সরকারী বাবুরা বলে, "খবদ্দার ওদের ধারেকাছে যাবি না, ওদের কথাও শুনবি না। ওরা জংলী।" এটা যে জঙ্গীর অপভ্রংশ ওরা বুঝতে পারে না। ওরা শুধু জানে এরা গর্ভমেন্টের শত্রু। গ্রামের লোকেরা তাই ভয়ে ভয়ে থাকে।

হঠাৎই এক হাটবারের সকালে বলাইদের চা দোকানের চালাঘরের বাইরের দেওয়ালে একটা পোস্টার চোখে পড়ল। খবরের কাগজে লাল কালি দিয়ে মোটা মোটা হরফে লেখা 'সাবধান, কেউ ভোট দিতে যাবেন না, বিপদ হবে।' ঘুম থেকে উঠেই মারাত্মক সাবধানবাণী দেখে বলাইয়ের মুখ শুকিয়ে যায়। আর কেউ দেখে ফেলার আগেই কাগজটা চটপট ছিঁড়ে ফেলতে যায়। কোথা থেকে কানাই ছুটে এসে বলে, "করিস কি বাপ? ওরা জানতে পারলে তোর গদ্দান নেবে।" বালাই বলে, "আর না ছিড়লি যে লালপার্টি গদ্দান নেবে?" কানাই উত্তরে বলে, "নারে বাপ আমি শুনেছি লাল পার্টি বাবুরাও ওই জংলীদের ভয় পায়।" আসন্ন উভয় সঙ্কটের ত্রাসে বলাই সিঁটিয়ে থাকে। রোজকার মতো একে একে খদ্দের আসে, মদনবাবুও খবরের কাগজ হাতে বসে পড়তে থাকেন, কানাই চায়ের গেলাস আর বিস্কুট ধরিয়ে দেয়। প্রথম চুমুকটা মুখে দিয়েই বলে ওঠেন, "কি রে বলাই চায়ে চিনি দিসনি?" উত্তর না পেয়ে তাকিয়ে দেখেন বলাইয়ের মুখ ফ্যাকাশে। অবাক হয়ে মদনবাবু বলেন, "কিরে তোর শরীর খারাপ নাকি?" বলাই শুকনো মুখে জবাব দেয়, "না বাবু, শরীর ঠিকই আছে, তবে বড় বিপদ।" মদনবাবুকে চালাঘরের পিছনের দেওয়ালের দিকে নিয়ে যায়, পোস্টার দেখে উনিও চিন্তিত হয়ে পড়েন। মনে মনে ভাবেন ওসব তো বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, পুরুলিয়ায় চলছে। এই এতদূরেও ওরা সংগঠন করেছে! ওঁর কপালে ভাঁজ দেখে বাকী সব খদ্দেররাও উৎসুক হয়।

ফিসফাস, কানাকানি গুঞ্জন চলতেই থাকে। ওই পোস্টার দেখতেই গাঁ শুদ্ধ লোক ঝেঁটিয়ে চলে আসে। দেখতে দেখতে খবর যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায়। রবি পেরিয়ে সোম, মঙ্গল কেটে গেল। বিষ্যুদবার আবার হাট বসবে, তার আগেই একটা বিহিত করতে হবে।

বুধবার সকালে গ্রামের মাথারা একজোট হয়ে আলোচনায় বসল। মোড়ল বলল, "রসুলপুরের থানায় খবর দেওয়া দরকার"। সঙ্গে সঙ্গে দুই জোয়ান দু'চাকায় করে রসুলপুরের থানায় খবর দিল। থানার বড় দারোগা খবর শুনে ঘেমে নেয়ে একসা। এক বোতল জন ঢকঢক করে খেয়ে মেজো দারোগাকে ডাকলেন। মেজবাবুর মাথা ঠান্ডা, একটু বুদ্ধিও আছে। দুজনে পরামর্শ করে লালবাজারে ফোন করাই সাব্যস্ত করলেন। লালবাজারের বড়কর্তা ফোন পেয়ে নড়েচড়ে বসলেন। জরুরি মিটিং ঢেকে ঠিক হল অবিলম্বে মহাকরণে জানানো দরকার। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর পি.এ. ফোন ধরেই আঁতকে উঠলেন। কথা গেল মুখ্যমন্ত্রীর কানে। তড়িঘড়ি মন্ত্রীসভার বৈঠক ডেকে ঘোষণা করলেন, অবিলম্বে ওই গ্রামে পুলিশ পোস্টিং বসাতে হবে। বিষ্যুদবার ভোর না হতেই গাঁয়ের মানুষ একচকিয়ে দেখল দুখানা পুলিশের গাড়ি, পুকুর পাড়ে বাসন মাজতে এসে গাঁয়ের বৌ ঝি-রা ভয় পেয়ে বাসন কোষন ফেলে ঘোমটা টেনে বাড়ির দিকে দে দৌড়। গোটা গাঁয়ে হু হু করে খবর ছড়িয়ে পড়ল। একদিকে  ভয়, অন্যদিকে আস্ত পুলিশ দেখার কৌতূহলে বাচ্চা-বুড়ো ছটফট করতে লাগল। বলাইয়ের দোকানে যেহেতু পোস্টার পড়েছে সেখানে সর্বক্ষণের জন্য দুজন বন্দুকধারী পুলিশ মোতায়েন হল। প্রথমে একটু ভয় পেলেও তাদের বিনি পয়সায় চা বিস্কুট খাইয়ে খুশি রাখার চেষ্টা করল। পাড়ায় বলাইয়ের কদর বহুগুণ বেড়ে গেল। গাঁয়ের মোড়লও ওকে সমীহ করতে শুরু করল। কী সাহস বলাইয়ের, বন্দুকধারী পুলিশের সাথে হেসে কথা বলছে! এই দু'তিন দিনে ওর বিক্রিবাটাও অনেক বেড়ে গেছে। এতদিনের অখ্যাত একটা গ্রাম এক পোস্টারের কৃপায় জাতে উঠে গেল। মাঝে মাঝেই লাল-পার্টির দাদারা এসে খোঁজখবর নিচ্ছে। দেখতে দেখতে ভোটের দিন এসে গেল।

ভ্যান রিকশা করে ভোটার তুলতে কাস্তে-হাতুড়ি-তারা পতাকা লাগিয়ে লাল ক্যাডারদের ছোটাছুটি। ঝোপ বুঝে কোপ মারার মতো গাঁয়ের লোকেরা দড় বাড়িয়ে নিয়েছে। শুকনো চিঁড়ে বাতাসায় হবে না। তাদের ফল, মিষ্টি, ঠান্ডা বোতল খাওয়াতে হবে। তাই-ই সই, সর্বহারার নেতারা রসুলপুর থেকে ঝুড়ি ঝুড়ি ফল আর হাঁড়ি ভরতি মিষ্টি আনছে। বহু কষ্টে ঠান্ডা বোতলও জোগাড় করেছে। গাঁয়ের মানুষ ভ্যানে উঠছে। লাল দাদারা বুথে নিয়ে যাবার পথে তাদের জামাই আদরে খাওয়াচ্ছে আবার ভোট করিয়ে ভ্যানে করেই ঘরে ফিরিয়ে দিচ্ছে। তেমন গন্ডগোল কিছুই চোখে পড়ল না। ফল বেরোবার দিন এগিয়ে আসছে। লাল পার্টির নেতারা নিশ্চিন্ত। দেখতে দেখতে ফলও বেরিয়ে গেল। এ তল্লাটে ওদের প্রার্থী গো-হারান হেরেছে। গ্রামে গ্রামে নেতারা এসে শাসাবে সে ভরসাও নেই। নিশ্চয়ই জনযুদ্ধ পার্টি এখানে প্রবল পরাক্রান্ত। পরের দিন পুলিশ পোস্টিং উঠে যেতে বলাইয়ের দোকানে খদ্দেরদের ভিড়, গোটা গাঁয়ের লোক যেন ভেঙে পড়েছে। মুখে মুখে ফিসফিস। জানা গেল এবার আশেপাশের আরও দশটা গ্রামের কেউ লালপার্টিকে ভোট দেয় নি। জঙ্গিরা নাকি আরোও ভয়ঙ্কর। এত বছরের অবহেলায় গ্রামগুলোর দুর্দশার শেষ ছিল না। গ্রামে খাবার জলের ভালো ব্যবস্থা নেই, বিজলী বাতি নেই, কোনো চিকিৎসার পরিকাঠামো নেই। উচ্চশিক্ষার কথা তো ছেড়েই দিলাম, তাই অভিযোগেরও অন্ত নেই। তবু বাঁচার তাগিদে ওরা এতদিন লাল পার্টিকেই ভোট দিতে বাধ্য থেকেছে। এবার জোরদার প্রতিপক্ষ পেয়ে ওরাও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গ্রামবাসীরা গজল্লা শেষ করে বলাইয়ের দোকানের পিছনে জড়ো হল, আরেকবার পোস্টারটা দেখবে। কী অবাক কান্ড, পুরোনোটার পাশেই হল আরেকটা কাগজে লাল কালি দিয়ে বড়ো করে লেখা 'সাবাশ'। সবাই এ ওর দিকে তাকায়, পুলিশের চোখ এড়িয়ে জংলিদের লোক ঢুকলো কি করে? এবার যে যার মতো গুটিগুটি পায়ে বাড়ির দিকে এগোয়।

বলাই সেদিনের মতো ক্যাশবাক্সের টাকাপয়সা গুণে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে গিয়ে দেখে কানাই কেমন মিটিমিটি হাসছে। বলাই ছেলেকে বলে, "হাসিস কেন রে বাপ?" কানাই হাসতে হাসতেই বলে, "হাসবনি?" কেমন দশ গাঁয়ের লোককে এমনকী গরমেন্টকেও বুদ্ধু বানিয়ে দিলাম। বলাই চোখ বড় বড় করে বলে "মানে তুই?" কানাই ঝলমলে মুখে বলে, "দেখলি তো বাপ, এক কলমের খোঁচায় সব কেমন কাঁপায়ে দিলাম। বন্দুকআলা পুলিশ এলো। গাঁয়ের লোকে পেটপুরে ফল, মিষ্টি, ঠান্ডা বোতল খেল আর মোদের দোকানের রোজগার বছরকারটা কেমন এক মাসে উঠে এল। লাল পার্টির বজ্জাতগুলান কেমন ল্যাজ গুটিয়ে পালাল। কলমের কত জোর দেখলি তো বাপ? তুইও চল মদন মাষ্টারের কাছে লিখাপড়া শিখাবি। ছেলের বুদ্ধিতে অবাক হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলাই বলল, "হ্যাঁ রে বাপ তাই চল।"

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, লেখক, প্রাবন্ধিক। কলকাতা।