শীতকাল কি পৃথিবীতে একই রকম আছে? মানে আমার প্রথম শীতে, সেই ১৯৩৭ সালে পৃথিবীতে যে রকম ছিল? পাগল নাকি? দেশভাগ-টেশভাগ কত কী হয়েছে, বাংলাদেশ জেগেছে, শতাব্দী বদলে গেছে, চারপাশের ওজোন স্তর ফুটোফাটা হচ্ছে বায়ুদূষণের জন্য, পৃথিবীর উষ্ণায়ন ঘটছে, পর্বতচূড়ার হিমবাহগুলোর বুকের বরফ গলছে — এত সব কিছু ঘটে চলেছে আর শীতকাল জেদ করে অজর অমর অক্ষয় হয়ে বসে থাকবে তা তো হয় না। তবে আমাদের বৃদ্ধদের কাছে সে আগের মতোই অবাঞ্ছিত আছে বলে মনে হয়। মানে আমি বৃদ্ধ হয়েছি বলে এ কথা বলার সাহস পাচ্ছি। বৃদ্ধদের কাছে শীতকাল খুব স্বাগত অতিথি যে নয় সে কথা কে না জানে। কেন জানি না ছেলেবেলায় শীতের ব্যাপারে এই অদ্ভুত ছড়াটা আমরা শুনতাম — 'শীত করে রে দাদাভাই, কাঁথা কিনা দে! একলা ঘরে শুমু না, বউ আইনা দে!' এটা ওই বালকবয়সের উপযোগী ছড়া ছিল বলে মনে হয় না। তবে পরে মনে হয়েছে, কে জানে বাল্যবিবাহের সময়েই হয়তো এটার সৃষ্টি। আর বউ যে শীতের একটি প্রতিষেধক, তাও তো বোঝার বয়স তখন হয়নি। তার জন্যে বালকত্ব পেরিয়ে বেশ খানিকটা জীবন পেতে হয়। আরও মনে পড়ে গেল - কবি বিদ্যাপতি, সম্ভবত ওই নামের আড়ালে এক বাঙালি কবিও গেয়েছেন, 'শীতের ওড়নি পিয়া, গিরিষের বা'। প্রিয়া হলেন শীতের চাদর, আর গ্রীষ্মের শীতল বাতাস। হ্যাঁ, শীত-গ্রীষ্ময় ঋতুচিহ্নর দীর্ঘ জীবন পাওয়ার কথা হচ্ছিল। আমরা তো অনুচিতভাবে অনেকের চেয়েই বেশি জীবন পেয়েছি।
অবশ্য বৃদ্ধরা এখন প্রান্তিক অস্তিত্ব, বৃদ্ধদের কথা কে ভাবে? কাগজেপত্রে মিডিয়ায় শীতকে নিয়ে এখনই আদেখলেপনা শুরু হয়ে গেছে। আগে কী একটা বিজ্ঞাপন বেরোত, "শীতকালেই তো সাজগোজ", তাই অন্তরবসন থেকে বহির্বসনের বিপুল বিজ্ঞাপনে ছেয়ে যেত কাগজের পৃষ্ঠাগুলো। উলিকটের ড্রয়ার আর পুরোহাতা গেঞ্জি, পশম আর সার্জের শার্ট আর পাঞ্জাবি, সোয়েটার (গলা খোলা, গলাবন্ধ), চাদর, জ্যাকেট, উইন্ডচিটার, মাফলার, কোট, পারকা, বাঁদুরে টুপি, হুডওয়ালা জ্যাকেট — বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ হয়ে যাবে মিডিয়া। সে সব বুড়োদের জন্যে নয়, ইয়েটস্ তো বলেই দিয়েছেন বুড়োদের অন্য আবাস খুঁজে নিতে হয়। ও সব শিশু থেকে ছেলেছোকরাদের জন্য। কাগজে বৃদ্ধদের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাপন এখন কোষ্ঠশুদ্ধির নানা রেচকের বিজ্ঞাপন। তা খুব সুদৃশ্য লাগে না। একটা মানুষও শিশু থেকে বড়ো হতে হতে, অনেক বসন্ত, অনেক বর্ষা, অনেক শীতের মধ্য দিয়ে আসে, আর তার কাছে ক্রমান্বয়ে ঋতুগুলোর মানেও পালটে যায়। পৃথিবী বদলায়, আমরাও বদলাই, ছয় ঋতুর শারীরিক সাংস্কৃতিক মানেও আমাদের কাছে বদলে যায়।
বুড়োদের কথা বলতে বলতে ছড়িয়ে যাওয়ার স্বভাব, তাই নিজেকে সামলে নিচ্ছি। ছয় ঋতুর হিসেবের মধ্যে না গিয়ে শুধু শীতকালের কথা বলি। আমারও একটা সুখের শীতকাল ছিল, সকলের মতোই। শিশু হিসেবে শীত কেমন উপভোগ করতাম সে আমার খুব বেশি মনে নেই। একটা তো শীত থেকে শারীরিক আত্মরক্ষা। শৈশবে মায়ের আঁচল বা চাদরের নীচে তো আশ্রয় তো অতি দুর্ভাগা ছাড়া সকলেরই থাকে। তা ছাড়া আমাদের জন্যে মস্তবড় উঠোনে বা বাড়ির চারপাশের খোলা পরিসরে সকাল থেকে সারাদিনের রোদের আমন্ত্রণ ছিল, পুকুরে চানের আগে বিপুল বিক্রমে গায়ে ভয়ংকর ঝাঁজওয়ালা সর্ষের তেল মাখা ছিল, গা ঢাকবার মধ্যবিত্ত জামাকাপড় ছিল, রাত্রে লেপের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার মধ্যবিত্ত সুযোগ ছিল। আগুনের আঁচ পোহানো ছিল। ছোলাফসলের মাঠে আগুন জেলে ছোলা পুড়িয়ে খাওয়া ছিল। নদীতে-পুকুরে চান করতাম, কিন্তু নদী-পুকুরের জল ছিল দয়াশীল, তা আরামদায়কভাবে গরম থাকত সেই গ্রামে, সকালে তা থেকে ধোঁয়াও বেরোত একটু।

এখন তো আর বলার উপায় নেই যে, শীতের খেলা ক্রিকেট, বা শীতের সবজি ফুলকপি। টাকা রোজগারের জন্যে ক্রিকেট সারা বছর চলে, ফুলকপিও প্রায় সারা বছর মাটি ফুঁড়ে উঠতে বাধ্য হয়। আমাদের সময় তো আলুও শীতকাল ছাড়া পাওয়া যেত না — সে এক হতচ্ছাড়া পৃথিবীর বাসিন্দা ছিলাম আমরা। শীতে আলু তুলে খাটের নীচে বালি বিছিয়ে রাখা হত, অন্য সময়ে খাওয়ার জন্য।
ক্রিকেট, আমাদের গেঁয়ো ভাষায় 'ব্যাটবল', আমরা শীতকালেই খেলতাম আরামদায়ক পিঠে মাথায় হাত-বুলোনো রোদ্দুরে। ফুলকপিও শীতেই আসত বাড়িতে তাদের চমৎকার স্বাদগন্ধ নিয়ে, রান্নাঘরে তার ভাজা বা ছেঁচকি হতে থাকলে সারা গ্রামে ছড়িয়ে যেত, বাতাস যেন তার পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিত সব ঘরে। শীতে বাঁধাকপিও আসত ফুলকপির ল্যাজ ধরে, তারও তখন গন্ধ ছিল চমৎকার, এখন তো তা প্রায় ঘাসের মতো হয়ে গেছে, ধর্মের ষাঁড়কে দিলে সেও মুখ ফিরিয়ে নেয়, বরং ফিরে চোখ লাল করে গুঁতোতে আসে। কমলালেবুও আসত শীতের মিষ্টতা নিয়ে। পুরো একটা কমলালেবু সকলের হয়তো জুটত না। ফলে খুলে আস্ত কোয়া মুখে দেবার কথা আমরা কেউ ভাবতাম না। এক একটা কোয়া নিয়ে, তার বক্ষ উন্মুক্ত করে, বিচি ছাড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে সেটিকে খেতাম। আর আসত গলদা চিংড়ি মাছ। কেন যেন শীতেই তাদের বেশি করে ধরা দেওয়ার ইচ্ছে হত। আর এখন যা বারোমেসে — সেই করলারও চাষ হত শীতকালে, শীত ফুরোতে ফুরোতে আমাদের পাতে দেখা দিতে আরম্ভ করত তারা। অনেক পাঠক অবশ্য আমাকে ধিক্কার দেবেন, কমলালেবুর সঙ্গে করলা — এটা ব্যাকরণের দিক থেকে ঠিক হল না। কিন্তু কী করব, আমার বিকৃত রুচিতে দুটোই তো ভালো লাগে। ডায়াবেটিস হওয়ার অনেক আগে থেকে।
পশ্চিম বাংলায় যাকে নলেন গুড় বলা হয়, সেই খেজুর (আমাদের ভাষায় 'খাজুইরা') গুড়ও দেখা দিত শীতে। এবং মায়েরা নানারকম পিঠেপুলি বানাতেন তার সমর্থনে। পায়েস তো বটেই, পুলিপিঠের দুধের রসে মিশত খেজুর গুড়, আর শুধু খেজুর গুড় দিয়ে 'চিতই পিঠা' তো অমৃতের সহোদর। বিদেশে মেপ্ল সিরাপ দিয়ে প্যান্কেক খাবার সময় তার কথা মনে করে চোখে জল আসত — কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা!
(দুই)
বিদেশের কথা যখন এসেই পড়ল তখন সেটা বলতে কে ছাড়ে? বিশেষ করে যে বাঙালি বিদেশে গেছে তার তো এটা সংগত অধিকার। এই অধমের ভাগ্যেও সেই রকম শিকে ছিঁড়েছিল, সে বছর ছয়েক ছিল এমন একটা অঞ্চলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরভাগে, যেখানে ছ-সাত মাস বরফ থাকে শীতকালে। প্রথমে শিকাগোতে চার বছর, তার পরে মিনিয়াপোলিসে দু-বছর। শীত তো শীত, শীতের চতুর্দশ পুরুষকে দেখা হয়ে গেছে ওই ছ-বছরে। আকাশ ধূসর করে ঝিরিঝিরি বরফ পড়তে শুরু করল, রাস্তাঘাট, মাঠ, বাড়ির ছাদ, ন্যাড়া পর্ণমোচী গাছের ডালপালায় বরফের ভাস্কর্য রচিত হল, হু-হু করে বইতে লাগল লেক মিশিগান থেকে শীতের বাতাস। এমনিতেই শীতের পারদ কমতে কমতে মাইনাস ৩৫ ডিগ্রির মতো, তার পরে ওই বাতাসের 'উইন্ড চিল্ ফ্যাক্টর' মিলে তার মোট পরিমাণ দাঁড়াল মাইনাস ৬৫ ডিগ্রি। হায় তখন ফেসবুক হয়নি, তাই আমাদের জাম্বুবানের মতো পোশাক আর বরফের ছবি দিয়ে মুখবইয়ের মুখ ঢেকে দেবার কোনও সুযোগ ছিল না।
মানুষ এই অবস্থায় বাঁচে কী ভাবে? বাঁচে, কারণ অফিসে, স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, দোকানে ব্যাংকে ভেতরটা সব গরম, একবার ঢুকে পড়লে সমস্যা নেই। গাড়িতে ঢুকে পড়লেও সমস্যা নেই, গাড়িও গরম। কিন্তু রাস্তায় বেরোতে হলে তোমাকে যা করতে হবে তা এই। মানবশরীরের চর্মাবরণের ওপরে প্রথমে ফুলহাতা গরম গেঞ্জি আর তলায় গরম 'ড্রয়ার' পরতে হবে। তার ওপরে প্যান্ট (ট্রাউজার্স) আর শার্ট, তাও ফুল হাতা। তার ওপরে টাই, তার ওপরে ফুলহাতা সোয়েটার। তার ওপরে লম্বা কোট বা ভেতরে পশমের মতো লোমবসানো পার্কা। তার ওপরটা ওয়াটারপ্রুফ। হাতে গরম দস্তানা। তাও তা তুমি পকেটে পুরে রাখতে পারলে বাঁচো। মুখে বাঁদুরে টুপি, বা ওই পার্কা জ্যাকেটের সঙ্গে জোড়া হুড, যা দড়ি দিয়ে টেনে মুখের চারপাশে শক্ত করে বাঁধা যায়। পায়ে গরম মোজা, তার ওপরে শু। কিন্তু শুধু শু হলে চলবে না। বরফের ওপর হাঁটলে বরফে জুতোর চামড়া খেয়ে নেবে। তাই তারও ওপরে আর-একটা রাবার বা কিছুর আবরণ — যার নাম ওভারশু। এইভাবে মহাকাশযাত্রীর মতো সজ্জিত হয়ে তুমি যখন বরফের মধ্যে রাস্তায় বেরোলে, তখন মুখের যেটুকু অংশ তোমার খোলা রইল, মনে হবে তার ওপর কোনও প্রাকৃতিক সার্জন ল্যনসেট দিয়ে চামড়া কেটে কেটে অস্ত্রোপচার চালাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বুড়োরা এত প্রতিরক্ষা সত্ত্বেও এই মারকুটে শীত সহ্য করতে পারে না, তাই তারা দলে দলে দক্ষিণের গরম অঞ্চলে ফ্লোরিডাতে চলে যায়, অনেকটা পরিযায়ী পাখিদের মতো। সেখানে সাময়িক ঘরসংসার পাতে, শীত ফুরোলে ফিরে আসে। বড়োলোকের দেশে সবই সম্ভব।
ও দেশে শীত ভয়ংকর বটে, কিন্তু তার একটা চমৎকার বর্ণাঢ্য ভূমিকা আছে, তার নাম হেমন্ত। সেই হেমন্তে পাতা ঝরে যায় বটে, কিন্তু তার আগে, আমেরিকা আর কানাডার মাঝামাঝি অরণ্যে পর্ণমোচী গাছের পাতগুলো এমন রঙে রঙিন হয়ে ওঠে যে মনে হয় বনের মাথায় রামধনু নেমে এসেছে। পাতাগুলো হলুদ থেকে সোনালি, সোনালি থেকে লাল ও গাঢ় লাল, তার পর তামাটে হয়ে ঝরে যায়, আর রঙের এই ভোজবাজি, ওই 'ফল কালার্স' দেখার জন্যে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে যায়। মনে হয় এক অলৌকিক ভ্যান গখ্ অরণ্যের পর অরণ্য জুড়ে রঙের মোটা তুলি নিয়ে আকাশের ক্যানভাস জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

তার পরে পাতা ঝরতে থাকে, কর্মে রং সব মুছে যায়, ন্যাড়া গাছগুলো কালো কালো ডাল নিয়ে দাবানলে পুড়ে যাওয়া জঙ্গলের মতো আকাশে হাত তুলে অসহায় প্রার্থনার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই প্রার্থনায় সাড়া মেলে শীতের পরে।

আর ওই সব দেশে বসন্তের ফিরে-আসাটা দেখবার মতো। মাঠকে মাঠ বরফে ঢেকে আছে, হঠাৎ দেখা গেল মাঝে মাঝে তার মধ্যে ফুটো তৈরি হচ্ছে, আর তার মাঝখানে কালচে সবুজ, মৃতপ্রায় ঘাসের দেখা মিলছে। দুদিন পরে তার মধ্যে উজ্জ্বল হলুদ ক্রোকাস ফুল মাথা তুলল একটি দুটি করে, আর বরফ সরে যেতে আরও অনেক ক্রোকাস দেখা দিতে লাগল 'বরফজয়ের সেনা'র মতো, ক্রমে বরফ-উধাও সবুজ মাঠে অসংখ্য ক্রোকাস মাথা দোলাতে লাগল হাসিমুখে। ওদিকে আকাশে তখন আর এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটছে। এতদিন নানা গাছ, বার্চ সিড়ার মেপ্, অ্যাশ ইত্যাদি সব কালো কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ন্যাড়া ডালপালা নিয়ে। হঠাৎ দেখা গেল ওই সরু সরু ডালগুলোতে যেন অসংখ্য পোকা এসে বসেছে। ক্রমে সেই পোকার দেহ ফুঁড়ে সবুজ পাতার মুখ দেখা গেল, আর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই গাছগুলো সবুজ পাতায় ঝলমল করতে লাগল। নীচে গেরস্থবাড়ির সযত্নরচিত বাগানে টিউলিপের ঝাড়ে ফুল এলো, চারপাশটাকে আলোকিত আর রঙিন করে দিল। এমন নাটকীয় উদ্দাম বসন্ত আমাদের এদিকে আসে না কেন জানি না।

ঋতুচক্র তো মানুষের জীবনের রূপক হয়ে যায়। আমরা বুড়োরা এখন শীতের রাজ্যে ঢুকে পড়েছি, তার থেকে নিষ্ক্রমণের পথ একটাই, তারপর শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত কিছুই নেই। সেই সম্ভাবনায় রোমাঞ্চিত হয়ে বাঁচি।
চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: বিশিষ্ট ভাষাবিদ, লেখক, প্রাক্তন উপাচার্য - রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। নিবাস: কলকাতা।