প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

নয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন ধ্বনি



লিনু হক


মানব ইতিহাসে জোয়ার দু'ভাবে আসে - এক, ইতিবাচক ভাবে যা সৃষ্টি করে। দুই, নেতিবাচক ভাবে, যা ধ্বংস করে। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে, ইউনুস-সিআইএ-আইএসআই-জামাতের মেটিকুলাস ষড়যন্ত্র, ধান্দাবাজ, এনজিও পরগাছার জোয়ারে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তাদের ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার পর তারা দেশজুড়ে ভয়াবহ নৈরাজ্য শুরু করে।

তাদের চক্রান্ত সফল করতে গিয়ে, যারা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ, গণভবন লুট, পুলিশ বাহিনীর ২৪টি থানা লুট, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, আওয়ামি লিগের সদস্যদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে হত্যাযজ্ঞ সহ বহুমাত্রিক অপরাধ সংগঠিত করেছিল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে তাদের বৈধতা দিয়ে, তাদের স্বৈরাচারী রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে এই রকম নৈরাজ্যজনক কর্মকাণ্ড মানুষ প্রত্যক্ষ করেনি। ক্ষমতায় বসেই ইউনুস তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলা প্রত্যাহার সহ নিজ প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্সের ৬০০ কোটি টাকা মকুব করেন এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য নিজ প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স-মুক্ত রাখার ঘোষণা করেন।

স্বাধীনতার অন্যতম স্থপতি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে, পরবর্তীতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ধৃষ্টতা তারা দেখায়। একে একে 'মব সংস্কৃতি'র নামে, স্কুল, কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অপমান, মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণ ইত্যাদি হেন কাজ নাই যা তারা সংঘটিত করে নাই।

অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জীবনের নিরাপত্তা, সভ্যতা-ভব্যতা, আইন-বিচার, দেশের অখণ্ডতা, ভূত-ভবিষ্যৎ একের পর এক সব শেষ করার ষড়যন্ত্র তারা করেই চলেছে। পাকিস্তান সরকার আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য যে সমস্ত ষড়যন্ত্র করেছিল, তারই প্রকাশ ঘটছে বর্তমানে ইসলামের নামে। কোথাও কেউ সাংস্কৃতিক চর্চা করতে পারছে না। যেখানেই মানুষ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা করতে যাচ্ছেন, সেখানেই তারা 'মব' দিয়ে আক্রমণ করে অনুষ্ঠান বানচাল করে দিচ্ছে।

স্কুল, কলেজে 'প্রাথমিকের সংগীত শিক্ষক' পদ বাতিল করা হয়েছে।

সংবিধান সংশোধন হলো একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন, সংবিধানকে পরিবর্তন বা পরিমার্জন করার প্রক্রিয়া করতে পারে একমাত্র নির্বাচিত সরকার। এই অনির্বাচিত সরকারের সেই ক্ষমতা নেই। অথচ, বলপূর্বক সংবিধান সংশোধনের নামে রাষ্ট্রের টাকা অপচয় করে দীর্ঘ সময় ধরে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের মতামত অগ্রাহ্য করে, মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা এবং ঢাকার কেরানিগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনভার বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং ৩০ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের এ. পি. মোলার মায়ের্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এ. পি. এম. টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য বাংলাদেশের জনগণকে জানানো হয়নি। অন্যদিকে, ২২ বছরের জন্য ঢাকার কেরানিগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ।

চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার খবরে উদ্বিগ্ন জাতি। এই জনবিরোধী সিদ্ধান্ত তাদের স্বৈরাচারী মনোভাবেরই প্রকাশ। বিদেশি প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে; বিদেশি অপারেটর এলে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কতটা সাশ্রয়ী হবে - এসব বিষয়ে কিছুই প্রকাশ করেনি সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া এবং পানগাঁও টার্মিনাল দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে 'তাড়াহুড়ো করার ও গোপনীয়তার' অভিযোগ বাংলাদেশের জনগণের। আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে এসব নেহাত বাণিজ্যিক চুক্তি, এর সঙ্গে দেশের অখণ্ডতা বিনষ্টের কোনও সম্ভাবনা নেই। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক মঞ্জুরুল হক ভাইয়ের বিশ্লেষণ তুলে ধরছি -

"স্মরণ করা যাক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রনিক্যালস! তারা বাণিজ্য করার জন্য একটি নৌবহর নিয়ে অবিভক্ত ভারতে এসেছিল এবং তাদের নৌকা রাখার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা চেয়েছিল, পরে তারা ছোট ছোট কুঠি স্থাপন করে, যা পরবর্তীতে বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৬০০ সালে রানি প্রথম এলিজাবেথ তাদের ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করার একচেটিয়া অধিকার দেয়। তারা প্রথমে বালেশ্বরে একটি বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে এবং পরে হুগলি, ঢাকা, কাশিমবাজার ও কলকাতায়ও বাণিজ্যকুঠি গড়ে তোলে। এরপরেই তারা পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) এবং বক্সারের যুদ্ধের (১৭৬৪) মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এবং বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। ১৭৬০ সালে তারা মীর জাফরকে সরিয়ে মীর কাশিমকে সিংহাসনে বসায় এবং পরে মোঘল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়।"

এর সঙ্গে চট্টগ্রামের কন্টেইনার টার্মিনাল ব্যবহারের চুক্তি কী? নিছকই বাইল্যাটারাল বিজসেন ডিল? আসুন দেখা যাক:

এই চুক্তি শুধুই ব্যবসা নয় বরং ভূ-রাজনৈতিক স্ট্র্যাটিজিক্যাল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতোই দখলদারিত্বে প্রাথমিক সোপান। যার সম্ভাব্য পরিণতি - বিশ্ববাণিজ্যের যুদ্ধকেন্দ্র হয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হারানো পর্যন্ত হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর নানা কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরে ভারত-চীন-মায়ানমার সহ মালাক্কা প্রণালী হয়ে আসিয়ান কানেক্টিভিটি, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা তথা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।

১. চট্টগ্রাম বন্দর এই অঞ্চলের একমাত্র প্রাকৃতিক সমুদ্রবন্দর যাকে বলা যেতে পারে বঙ্গোপসাগরকে নিয়ন্ত্রণের গেটওয়ে। মালাক্কা প্রণালী হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক ও মধ্যপ্রাচ্য রুটের সাঙ্গে জড়িত। সেটা যতটা বাণিজ্যের কারণে, তার চেয়ে বেশি সামরিক দিক থেকে। বিশ্ব রাজনীতিতে এই অঞ্চলটি যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তারাই পুরো এশিয়া-ওসেনিয়া-ভারত মহাসাগরে কর্তৃত্বের ছড়ি ঘোরাবে।

২. ভারতের ল্যান্ডলক উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর ওপর নজদারির জন্য সমুদ্রপথের সবচেয়ে কাছে। যদিও ভারত তার পণ্য আমদানি-রফতানিতে এই বন্দর থেকে সুবিধা নিতে পারে না, তাই তারা মিয়ানমারের সিটওয়ে বন্দর থেকে মিজোরাম পর্যন্ত স্পেশাল হাইওয়ে নির্মাণ করেছে। যেখান থেকে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে লজিস্টিক সাপ্লাই দেবে। এখানে বহির্শক্তি ঘাঁটি গাড়লে ভারতের জন্য তা হুমকি স্বরূপ।

৩. চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর দিয়ে BCIM করিডর, চীনের মেরিটাইম বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিসিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। চট্টগ্রাম চীনের বানানো কর্ণফুলী টানেলও বিনিয়োগ-নির্ভর শিল্পাঞ্চলের প্রবেশপথ, এই অঞ্চলে চীনের সামুদ্রিক সক্ষমতা সীমিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চট্টগ্রাম বন্দর ও মালাক্কা প্রণালী নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে কব্জায় রাখতে আমেরিকার কাছে কৌশলগত কারণে চট্টগ্রাম বন্দর ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। চীনের রফতানি পণ্যের প্রায় ৬০ ভাগের গেটওয়ে মালাক্কা প্রণালী। অঞ্চলটি চীন-ভারত-জাপান-মায়ানমার সকল পক্ষই নিয়ন্ত্রণ রাখতে মরিয়া। এই অঞ্চলে আমেরিকা এসে মায়ানমারের রাখাইন স্টেটে, কক্সবাজারের শিলখালিতে ঘাঁটি গাড়তে পারলে বাকি দেশগুলোর ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে পারবে। আর সে কারণেও তাদের চট্টগ্রাম বন্দরকে আগে 'হাত করা' দরকার।

৫. মায়ানমারের উপর থেকে চীনের কর্তৃত্ব হঠিয়ে সেখানে নিজেরা গেড়ে বসে রেয়ার আর্থ মিনারেল কব্জা করতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরের মতো এমন একটি পোতাশ্রয় দরকার আমেরিকার, যেখান থেকে চীন, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম সহ আশেপাশের গোটা ইন্দো-প্যাসিফিক জোনে খবরদারি করতে পারবে।

৬. রাখাইন আর্মি পুরোপুরি আমেরিকার সাহায্যে চলে। তাদের অধীনে প্রায় দেড়শ' মাইল লম্বা সামুদ্রিক অঞ্চল। সেখানে সহজেই আমেরিকা ঘাঁটি বানাতে পারে। তার পরও তাদের চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এরই আশেপাশে করিডোর-ঘাঁটি বানাতে হবে!

প্রশ্ন উঠতে পারে চট্টগ্রাম বন্দর কব্জা করে এই অঞ্চলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে বাণিজ্যের সিংহভাগ দখল করতে চায় আমেরিকা, কিন্তু বন্দর তো লিজ দেওয়া হচ্ছে ডেনমার্ক, আরব আমিরাত, সুইৎজারল্যান্ড ও সৌদি আরবকে। তার সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক কী?

এটাই আমাদের পলিটিক্যাল ক্লাউন, অকাট মূর্খ, সাম্রাজ্যবাদের বাটার-ব্রেড গেলা বুদ্ধিব্যাপারি, হাত-পাতা ভিখিরি এনজিও গং, অস্তিত্বের সংকটে ভোগা লিবারেল বাম আর প্যারাসাইট কালচারাল ফ্রন্টের গোবর মস্তিষ্কে ধরা পড়ছে না। পড়ার কথাও নয় কারণ, সেখানে ঠাসা রয়েছে কুবুদ্ধি আর কূটবুদ্ধি। ডেনমার্ক, সুইৎজারল্যান্ড, আমিরাত, সৌদি আরবের এইসব কোম্পানির গোড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এইসকল কোম্পানি শুধু যে পোর্টবিজনেস করে তাই নয়, এরা সামরিক দিক থেকেও একটা 'কন্টিনজেন্ট'। আজকে একটি কোম্পানির কিছু হোক, দেখা যাবে সবার আগে আমেরিকা জবাব চাইছে।

দেশের ১৭ কোটির ৯৯ শতাংশই এতসব জটিল এবং কুটিল বিষয়ে মাথা ঘামাতে পারে না। তারা এসব কেনা-বেচার কোনোকিছুতেই নেই। ওই যে ১ শতাংশ, তারাই দেশের পরগাছা বুদ্ধিবৃত্তিক ধেড়ে শয়তান। দেশমাতৃকাকে নিলামের হাটে তুলে বেচে দিতে এদের বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হয় না, বরং উৎসবের মোডে এসব শয়তানি করে আসছে, এবারও করতে নেমেছে। বাংলাদেশের প্রধান ধমনী চট্টগ্রাম বন্দরে বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদীদের ঘাঁটি গাড়তে দিয়ে এরা দুশো, পাঁচশো কোটি টাকার চেমো গন্ধে নেশাগ্রস্থ।

এই সংকট থেকে যারা দেশকে বাঁচাতে পারত সেই 'জনদরদি' সাজা রাজনৈতিক দলগুলো এখন আগামী বছরগুলোতে কীভাবে ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের চামড়া ছুলে নুন লাগাবে সেই স্বপ্নে বিভোর।

সমস্যা হলো যে বেইমানদের লোভের বলি হয়ে দেশটা আবার পশ্চিমাদের কলোনি হতে চলেছে... যখন সত্যি সত্যিই দেশটা 'নয়া পশ্চিমা উপনিবেশ' হয়ে যাবে এবং ফিলিপিনসের মতো এখানকার ১১/১২ বছরের কন্যাশিশুরাও গর্ভধারণে বাধ্য হবে, তখন জবাবদিহিতার জন্য এদের 'কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না'।

ক্যাঙ্গারু কোর্ট, যার নামকরণ করা হয়েছে - 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল'। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দিয়ে পুনর্গঠন করে যে আদালতে যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারকার্য সম্পন্ন করেছিল। বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের সময়কালে। তাই তিনি এখন অভিযুক্ত। আর যুদ্ধ অপরাধীদের পক্ষের প্রধান আইনজীবী তাজুল ইসলাম এই আদালতের চিফ প্রসিকিউটার। এই আদালতের কোনো বিচারপতি, আন্তর্জাতিক আদালতের বিচার করার মতো মানসম্পন্ন বিচারক নয়।

আদালতের একতরফা রায়ে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নামে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। বিচারক রায় ঘোষণার সময় বলেছিলেন - "We decided to inflect death sentence."

স্বাভাবিকভাবেই বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার প্রতিপক্ষ রায়কে স্বাগত জানায়। তবে দেশের জনগণ এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুখপাত্র এই রায়ের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছেন।

আদালত প্রাঙ্গণকে কব্জা করে রেখেছে, যেখানে অভিযুক্তদের কোর্টে আনা-নেওয়ার সময় শারীরিক অত্যাচারের শিকার হতে হয়। শুধু শিকার নয়, প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে, হত্যা করে আদালত প্রাঙ্গণ রক্তাক্ত করা হয়। এরই মধ্যে আওয়ামি লিগের বেশ ক'জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে জেলের অভ্যন্তরে নানা কায়দায় হত্যা করা হয়েছে।

স্বৈরাচার বলতে এমন এক ধরনের শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠী নিরঙ্কুশ ও সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করে এবং জনগণের মতামত, সংবিধান ও আইনের তোয়াক্কা না করে স্বেচ্ছাচারী ভাবে দেশ পরিচালনা করে। উপরে উল্লেখিত, সমস্ত ঘটনা, স্বৈরাচারী আচরণ।

স্বৈরাচারের মূল বৈশিষ্ট্য:

নিরঙ্কুশ ক্ষমতা: শাসক বা শাসকগোষ্ঠী এককভাবে সমস্ত ক্ষমতা ধারণ করে এবং তারা কোনো আইনি বা সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার অধীন নয়।

অগণতান্ত্রিক: জনগণের মতামতকে এখানে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না এবং ক্ষমতা জোরপূর্বক দখল করা হয়।

একচ্ছত্র আধিপত্য: দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ থাকে স্বৈরশাসকের হাতে।

আইনের ঊর্ধ্বে: আইনের শাসন এখানে থাকে না এবং শাসক নিজের ইচ্ছামতো যা খুশি তাই করতে পারেন।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে শাসকের অধীনস্থ করে রাখা হয়।

বর্তমান বাংলাদেশের এই পরিণতির জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ব্যর্থতা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। স্বাধীনতা বিরোধীদের ত্যাগ না করে, তাদের সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, রাজাকার-এর সঙ্গে আত্মীয়তা, দলে অনুপ্রবেশ, রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদারী সহ সব দোষে দুষ্ট ছিলাম আমরা মুক্তিযুদ্ধ পক্ষ শক্তি। এখন সময় হয়ছে আত্মশুদ্ধির।

আমরা নিজেদের আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ আমরা ফিরে পাবো এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অন্ধকার যত গভীর হয়, আলো তত নিকটবর্তী হয়। এই নেতিবাচক জোয়ারের বিরুদ্ধে, ইতিবাচক বাংলাদেশ, এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আবার জয়ী হবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু।

পরিচিতি: কাজী ফেরদৌসী হক লিনু লেখালেখি করেন 'লিনু হক' নামে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। বাসস্থান: ঢাকা, বাংলাদেশ। প্রকাশিত গ্রন্থ: 'মেয়ে বিচ্ছু', 'অবরুদ্ধ নগরের গেরিলা ৭১', 'প্রথম পুরুষ', 'মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে বাংলার নারী'।