প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে অর্ধেক আকাশ



সুব্রত চট্টোপাধ্যায়


১৯৩১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের বঙ্কিম-শরৎ সমিতির অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে গিয়ে বলেন - "তাঁর গল্পে যে-রসকে তিনি নিবিড় করে জুগিয়েছেন সে হচ্ছে সুপরিচয়ের রস। তাঁর সৃষ্টি পূর্বের চেয়ে পাঠকের আরো অনেক কাছে এসে পৌঁছল। তিনি নিজে দেখেছেন বিস্তৃত করে, স্পষ্ট করে, দেখিয়েছেন তেমনি সুগোচর ক'রে। তিনি রঙ্গমঞ্চের পট উঠিয়ে দিয়ে বাঙালি সংসারের যে আলোকিত দৃশ্য উদ্ঘাটিত করেছেন সেইখানে আধুনিক লেখকদের প্রবেশ সহজ হল। তাদের আনাগোনাও চলছে। একদিন তারা হয়তো সে কথা ভুলবে এবং তাকে স্বীকার করতে চাইবে না। কিন্তু আশা করি পাঠকেরা ভুলবে না। যদি ভোলে সেটা তাদের অকৃতজ্ঞতা হবে।" চুরানব্বই বছর পরে আজও রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য সমান সত্য, শরৎচন্দ্রকে ভুলে যাওয়া বাঙালি পাঠকের কাছে অকৃতজ্ঞতা। অন্তঃপুরের কথাকে শরৎচন্দ্র যে অসামান্য দক্ষতায় উপস্থাপিত করতে পারতেন, নিজের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ তার সানন্দ স্বীকৃতি ঘোষণা করেছেন। 'সাধারণ মেয়ে' কবিতাটি সেই স্বীকৃতিরই অনন্য পরিচয় বহন করে। সামাজিক পটভূমি বদলে যায়, কিন্তু নারীর যন্ত্রণার কারণগুলি দূর হয় না। সেই বেদনার ধারাভাষ্যকার হিসেবে শরৎচন্দ্রকে স্বীকৃতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের মূল প্রবণতাটিকে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একটি সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণায় লেখেন - "সমাজে যাঁহারা বর্জিত ও উপদ্রুত, তাঁহাদের প্রতি সমবেদনাই শরৎ সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা বড় প্রেরণা।" সমাজের সর্বাপেক্ষা বর্জিত ও উপদ্রুত মানুষ হলেন তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষ এবং নারী। এইসব দিকেই শরৎচন্দ্রের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছিল বলে তাঁর সাহিত্যে সমাজের অবহেলিত-অবজ্ঞাত নারীরাও ভাষ্য পেয়েছে। এদিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ থেকে তিনি সরে এসেছিলেন অনেকখানি।

শরৎচন্দ্র গ্রাম-সমাজের অসাধারণ ভাষ্যকার। তাঁর গ্রাম-সমাজ অবশ্যই একটি বিশিষ্ট স্থান-কাল দ্বারা চিহ্নিত। তা উনিশ শতকের গ্রাম বাংলা। একদিকে পরাধীন দেশ, শাসকের নির্বিচার লুণ্ঠন, জোরদার সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা; তার উপর আঘাত এসেছিল ১৭৯৩ সালের 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত'। পুরোনো জমিদারের জায়গায় এল নতুন জমিদার। এই নতুন জমিদারশ্রেণি এল মূলত কলকাতা শহরের ইংরেজ কোম্পানির আশীর্বাদপুষ্ট বড় বড় ব্যবসায়ী পরিবার থেকে। তাদের বাস ছিল কলকাতায়, আর জমিদারি ছিল গ্রামাঞ্চলে। এরা মূলত গ্রামীণ মানুষের জীবনে এক সর্বনাশের দূত হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল। তারা শহরে বিলাসবহুল জীবন যাপন করত, আমোদ-প্রমোদে খরচ করত বিস্তর, আর সেই টাকা নানা ধরনের কৌশলে আদায় করা হতো গরিব প্রজাদের থেকে। এর ওপর ছিল জমিদার ও প্রজার মাঝখানে অসংখ্য মধ্যস্বত্বভোগী। দুর্ভিক্ষ তখন গ্রামবাংলার নিত্যসঙ্গী।

১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কুড়ি বছরে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ষোলোবার। এইসব দুর্ভিক্ষে প্রাণ গিয়েছিল ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের। শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসে এই সামন্ততান্ত্রিক জরাগ্রস্ত পল্লিসমাজের জীবন্ত চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলি তাই সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণার বাইরে সেভাবে বেরোতে পারেনি। তিনি অসামান্য কিছু নারী চরিত্র নির্মাণ করেছেন কিন্তু প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই তারা প্রার্থিত পরিণতি পায়নি। বারেবারেই সমাজনীতির সঙ্গে ব্যক্তির দ্বন্দ্বে ব্যক্তির পরাভব ঘটেছে। আসলে সামন্ততন্ত্রে ব্যক্তির প্রতিষ্ঠা খুব সুলভ নয়। 'নারীর মূল্য' প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র নারীর প্রশ্নে যতটা বিদ্রোহী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন তাঁর সৃষ্ট গল্প-উপন্যাসে তা লক্ষ করা যায় না। 'নারীর মূল্য' প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: "মণি-মাণিক্য মহামূল্য বস্তু, কেন না, তাহা দুষ্প্রাপ্য। এই হিসাবে নারীর মূল্য বেশি নয়, কারণ সংসারে ইনি দুষ্প্রাপ্য নহেন। জল জিনিসটা নিত্য প্রয়োজনীয়, অথচ ইহার দাম নাই। কিন্তু যদি কখন ওইটির একান্ত অভাব হয়, তখন রাজাধিরাজও বোধ করি এক ফোঁটার জন্য মুকুটের শ্রেষ্ঠ রত্নটি খুলিয়া দিতে ইতস্তত করেন না। তেমনি - ঈশ্বর না করুন, যদি কোনদিন সংসারে নারী বিরল হইয়া উঠেন, সেই দিনই ইঁহার যথার্থ মূল্য কত, সে তর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হইয়া যাইবে - আজ নহে। আজ ইনি সুলভ।" এই প্রবন্ধে তিনি নানান সমাজের উল্লেখ করে দেখান, সমাজ নির্বিশেষে, দেশকাল নির্বিশেষে প্রায় সর্বত্রই নারী নির্যাতন চলতে থাকে। সেখানে তাঁর বক্তব্য প্রগতিশীল এবং আধুনিক, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রে সেই প্রগতিশীল-আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ খুব একটা দেখা যায় না। সমাজের পুঞ্জিভূত রক্ষণশীলতার সঙ্গে তাঁর লেখকসত্তা কোথাও যেন একটা আপোশ করে ফেলে। ওই প্রবন্ধে তিনি আরও লেখেন "এই যে পুরুষ চোখের উপরেই অন্যায় অধর্ম করিবে, অথচ সতীত্ব বজায় রাখিবার জন্য তাহার স্ত্রী কথাটি মাত্র বলিতে পারিবে না (শাস্ত্র বাক্য!), এমনকি, তাহার বীভৎস জঘন্য ব্যাধিগুলি পর্যন্ত জানিয়া শুনিয়া নিজ দেহে সংক্রমিত করিয়া লইতে হইবে, এর চেয়ে নারীর অগৌরবের কথা আর কি হইতে পারে?" এই বক্তব্যের প্রতিফলন তাঁর কথাসাহিত্যে সেভাবে দেখা যায় না। এখন শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাস থেকে নির্বাচিত নারী চরিত্রগুলির ভূমিকা আলোচনা করা যেতে পারে।

'বড় দিদি' উপন্যাসের বিষয়বস্তু হলো বিধবার মনে প্রেমের উন্মেষ। আত্মভোলা সুরেন্দ্রর প্রতি বিধবা মাধবীর মন আকৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু তার প্রেম স্বীকৃতি পায় না। একই টানাপোড়েন আমরা লক্ষ করি 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে রাজলক্ষ্মী চরিত্রে। ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা আর সমাজের রীতিনীতি - এই দুইয়ের অসামঞ্জস্যে শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মী দুই ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা হয়েই থেকে যায়। পরস্পর মিলতে পারে না। এটাই তাদের বিধিনির্দিষ্ট নিয়তি। রাজলক্ষ্মী বিধবা এবং পতিতা। শৈশবেই সে বিক্রি হয়ে যায়। তার খেসারত তাকে দিতে হয়েছে সারা জীবন ধরে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সে সরে এসেছে পতিতাবৃত্তি থেকে, বেছে নিয়েছে বাইজির জীবন। কিন্তু কিছুতেই স্বাভাবিক জীবনে সে ফিরতে পারে না। সমাজ পুরুষের হাজার অন্যায় মেনে নেয় কিন্তু নারীর সামান্যতম পদস্খলনও ভুলতে পারে না। রাজলক্ষ্মীর প্রশ্ন: "পুরুষ মানুষ যত মন্দই হয়ে যাক, ভাল হ'তে চাইলে তাকে তো কেউ মানা করে না; কিন্তু আমাদের বেলায় সব পথ বন্ধ কেন?" গভীর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে, শুধু সমাজের ভয়ই নয়, রাজলক্ষ্মীর নিজের মধ্যেও ছিল অনতিক্রমণীয় দ্বিধা। শ্রীকান্ত লক্ষ করে 'হঠাৎ বঙ্কুর মা অভ্রভেদী হিমাচলের ন্যায় পথ রুদ্ধ করিয়া রাজলক্ষ্মী ও আমার মাঝখানে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।' মাতৃত্বের সংস্কার অতিক্রম করা রাজলক্ষ্মীর পক্ষেও সম্ভব হয়নি। 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের অন্নদাদিদি অধ্যায়টি আরো মারাত্মক। সে যেন স্বামী নামক এক আইডিয়ার ক্রীতদাস। স্বামীর জন্য পিতা-মাতা সমাজ সংসার সব কিছু সে ত্যাগ করেছে। অথচ এই স্বামী তার দিদিকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিল, অবলম্বন করেছিল সাপুড়ের জীবন। অন্নদাদিদি তার হাজার অত্যাচার সহ্য করে আদর্শ স্ত্রীর জীবন কাটিয়ে যায়। কী বলা যায় এই আত্মত্যাগকে? এ-কী নিছক-ই প্রেম নাকি সহস্র বছরের সংস্কারের দাসত্ব করা? 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে অভয়া উপকাহিনি অন্য সত্যের ইঙ্গিত দেয়। সমগ্র শরৎ সাহিত্যে অভয়া ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। অনেক কষ্টের পথ পেরিয়ে অভয়া তার প্রেমাস্পদের জন্য বর্মায় পৌঁছয়। কিন্তু অচিরেই তার মোহভঙ্গ হয়। সতীনের সঙ্গে ঘর করতে রাজি হলেও অভয়া তার স্বামীর কাছে উপেক্ষা আর অবহেলাই অর্জন করে। সে অনুভব করে প্রেমহীন, ভালবাসাহীন দাম্পত্য জীবন আসলে গণিকা জীবনেরই নামান্তর। তাই সে বিদ্রোহ করে। রোহিনীর ভালবাসাকে স্বীকৃতি দেয়। সতীত্বের মোহ ছিন্ন করে সে বেরিয়ে আসে। স্পষ্ট ভাষায় শ্রীকান্তকে জানায়: "এমন লোকের (রোহিনী) সমস্ত জীবনটা পঙ্গু করে দিয়ে আর আমি সতী নাম কিনতে চাইনে শ্রীকান্তবাবু।" দ্বিধাহীনভাবে সে জানিয়ে দেয়: "আমাদের নিষ্পাপ ভালবাসার সন্তানরা মানুষ হিসেবে জগতে কারও চেয়ে ছোট হবে না।" শরৎচন্দ্রের সমগ্র উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে বলতেই হবে, অভয়া এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। সংস্কার অতিক্রমী এই বলিষ্ঠতা সে কোথা থেকে পেল? শরৎ উপন্যাসের প্রায় সর্বত্র সতীত্বের সংস্কার বড় হয়ে উঠেছে, ব্যতিক্রম অভয়ার ঘটনা। এর কি একটা কারণ অভয়ার এই ব্যতিক্রমী প্রয়াস বাস্তব হয়েছে বর্মার মাটিতে, বাংলায় নয়। হয়তো তাই। বাংলায় এমন ঘটনা ঘটাবার সাহস হয়তো অর্জন করতে পারেন নি লেখক। 'শ্রীকান্ত'র চতুর্থ পর্বে কমললতার কাহিনীও অপরিতৃপ্ত প্রেমাকাঙ্ক্ষা এবং তার ব্যর্থতারই ধারাচিত্র।

পতিতার প্রেমাকাঙ্ক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত 'দেবদাস' উপন্যাসটি। চন্দ্রমুখী দেবদাসকে ভালোবেসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেয়েছিল, কিন্তু ফিরব বললেই কি ফেরা যায়? দেবদাস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় - "আমি কত যে তোমাদের ঘৃণা করি। চিরকাল ঘৃণা করব - ...তবু আসব, তবু বসব, তবু কথা কব - না হলে যে উপায় নেই।" পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় চন্দ্রমুখীরা পুরুষের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করবে, প্রয়োজনে তাদের সুশ্রূষা করবে; কিন্তু ভালবাসার অধিকার তাদের নেই। চন্দ্রমুখীর সেবায় সুস্থ হয়ে যাবার পর চন্দ্রমুখী তাকে নিয়ে পশ্চিমে যাবার প্রস্তাব দিলে উত্তরে দেবদাস জানায় - "ছিঃ, তা হয় না! আর যাই করি, এত বড় নির্লজ্জ হ'তে পারব না।" এখানে দেবদাস কোনো ব্যক্তি নয়, পুরুষশাসিত সমাজের প্রতিনিধি মাত্র। 'চরিত্রহীন' উপন্যাসে কুলিন বিধবা সাবিত্রী সংসারের আকাঙ্ক্ষায়, প্রেমে কুলত্যাগ করেছিল, কিন্তু তার পরিণামে সে হয় মেসের ঝি। সেখানে সতীশকে সে ভালোবাসে, তার প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করে; কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার পাপবোধ। নিজের প্রেমকে উপেক্ষা করে সে সতীশের সামাজিক সম্মান রক্ষা করতে চায়। আর এইজন্য প্রতিমুহূর্তে সে বেদনাদীর্ণ হয়েছে। 'চরিত্রহীন' উপন্যাসের অশান্ত প্রেমাকাঙ্ক্ষার প্রতীক চরিত্র কিরণময়ী। উপেন্দ্রর উপেক্ষার জবাব সে দিবাকরকে কেন্দ্র করে মেটাতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে তার দ্বন্দ্বই বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র, দ্বন্দ্বেই সে নিরন্তর পুড়েছে। 'গৃহদাহ' উপন্যাসের অচলা নিত্য দোলায়িত হয়েছে মহিম ও সুরেশকে কেন্দ্র করে। সে মহিমকে ভালোবেসেছিল কিন্তু সুরেশের প্রতিও তার আকর্ষণ কম নয়। কোনো একটি ভিত্তির উপর অচলা নির্দিষ্টভাবে দাঁড়াতে পারেনি। তার চরিত্রের এই দোদুল্যমানতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। 'পথের দাবী' উপন্যাসের সুমিত্রা তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: "যে সমাজে কেবলমাত্র পুত্রার্থেই ভার্য্যা গ্রহণের বিধি আছে, নারী হয়ে তাকে তো আমি শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পারিনে। আপনি সতীত্বের চরম উৎকর্ষের বড়াই করছিলেন, কিন্তু এই যে-দেশে বিবাহের ব্যবস্থা, সে দেশে বস্তু বড় হয় না, ছোটই হয়। সতীত্ব তো শুধু দেহেই পর্য্যবসিত নয় অপূর্ব্ববাবু, মনেরও তো দরকার। কায়মনে ভালবাসতে না পারলে তো ওর উচ্চস্তরে পৌঁছান যায় না। আপনি কি সত্যই মনে করেন মন্ত্র পড়ে বিয়ে দিলেই যে-কোনো বাঙালী মেয়ে যে-কোনো বাঙালী পুরুষকে ভালবাসতে পারে? এ কি পুকুরের জল যে যে-কোন পাত্রে ঢেলে মুখ বন্ধ করে দিলেই কাজ চলে যাবে?" গোঁড়ামিকে জয় করতে পারার পরেই অপূর্ব খ্রিস্টান ভারতীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে। 'শেষ প্রশ্ন' উপন্যাসের কমল ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা, রীতিনীতি এবং অনুশাসন সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বস্তুত পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিষয়ে সে মোহমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে। তার স্পষ্ট বক্তব্য: "কর্ম ভোগের নেশায় পুরুষেরা আমাদের মাতাল করে রাখে। তাদের বাহবার কড়া মদ খেয়ে চোখে আমাদের ঘোর লাগে, ভাবি, এই বুঝি নারী-জীবনের সার্থকতা। ...শুধু মেয়েমানুষেই জানে এত বড় দুর্ভোগ, এত বড় ফাঁকি আর নেই, কিন্তু একদিন এ বিড়ম্বনা যখন ধরা পড়ে, তখন প্রতিকারের সময় বয়ে যায়।" তার মতে, নরনারীর ভালবাসার ইতিহাস মানব সভ্যতার সবচেয়ে সত্য ইতিহাস। বিবাহ জীবনের আর পাঁচটা ঘটনার মতো একটা ঘটনা মাত্র। বিবাহকে নারী জীবনের সর্বস্ব বলে সে মেনে নিতে চায়নি।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নানান পিছুটান নারী চরিত্রগুলিতে সক্রিয় থেকেছে। তাঁর উপন্যাসে নারী চরিত্রগুলি অঙ্কিত হয়েছে আদর্শায়িত করে। নারীর ত্যাগের, সেবা-পরায়ণতার যে সনাতন আদর্শ যুগ যুগ ধরে ভারতীয় সমাজে চলে আসছে, সেই আদর্শেই যেন শরৎচন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছেন তাঁর নারী চরিত্রগুলিকে। বিরল দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া তাঁর উপন্যাসে নারীর ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি অবহেলিত অবজ্ঞাত নারী জীবনের যন্ত্রণা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত করেছেন, কিন্তু নারীকে পুরুষকেন্দ্রিকতার বৃত্ত থেকে বের করে দেখাতে পারেননি। আসলে সামন্ততান্ত্রিক যে ব্যবস্থায় তিনি বর্তমান ছিলেন, সেই ব্যবস্থাই তাঁর হাত বেঁধে দিয়েছে। সামন্ততন্ত্রে নারী ব্যক্তিত্ব চিরকালই উপেক্ষিত থেকে যায়। বোধহয় লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিও এক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে উঠেছে। নারীর যথার্থ মূল্য কিভাবে অর্জিত হবে সে সম্পর্কে লেখক ঘোষণা করেন: "নারীর মূল্য নির্ভর করে পুরুষের স্নেহ, সহানুভূতি ও ন্যায়-ধর্মের উপরে। ভগবান তাহাকে দুর্বল করিয়াই গড়িয়াছেন, বলের সেই অভাবটুকু পুরুষ এই সমস্ত বৃত্তির মুখের দিকে চাহিয়াই সম্পূর্ণ করিয়া দিতে পারে, ধর্মপুস্তকের খুঁটিনাটি অর্থের সাহায্যে পারে না।" পুরুষ-কেন্দ্রিকতার বাইরে নারীর অস্তিত্বের কথা তিনি ভাবতেই পারেন না, এখানেই তাঁর চিন্তার সীমা।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের নারী চরিত্রের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়। বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসে তিনি ইউনিভার্সাল মাদারহুড-এর ধারণা বিবৃত করেছেন। এদিক থেকে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হলো 'বিন্দুর ছেলে', 'রামের সুমতি', 'মেজ দিদি' প্রভৃতি। 'মেজ দিদি'র হেমাঙ্গিনী, 'বিন্দুর ছেলে'র বিন্দুবাসিনী এবং 'রামের সুমতি'র নারায়ণী ইউনিভার্সাল মাদারহুডের প্রতীক প্রতিনিধি। এসব চরিত্রগুলির বৈশিষ্ট্য হল, রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তারা সন্তানস্নেহে উদ্বেল হয়েছে। সমগ্র বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে। এইসব নিয়েই গড়ে উঠেছে শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাস। তথাকথিত অবজ্ঞাত অবমানিত জীবনের যাপন চিত্র রচনা করতে গিয়েই তিনি বারংবার নারী-পুরুষের জীবন রহস্যের সন্ধান করেছেন। আর এই সন্ধানের মধ্য দিয়েই তিনি উপস্থাপিত করেছেন তৎকালীন বাংলার অন্তঃপুরের গোপন রহস্য। তাতে উনিশ শতকের সমাজ জীবনে নারীর অবস্থান বিন্দুটি স্পষ্ট হয়ে যায়।

চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: কো-অর্ডিনেটর, স্নাতকোত্তর বাংলা বিভাগ, নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজ, কোন্নগর, হুগলি। প্রাবন্ধিক। রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ। নিবাস: শ্রীরামপুর, হুগলি।