১৯৯৩ সালের একটি শীতের বিকেলে 'এবং কথা' পত্রিকার সম্পাদক বন্ধু দীপংকর রায়ের সঙ্গে 'শতভিষা' পত্রিকা বিষয়ে কবি আলোক সরকার এবং দীপঙ্কর দাশগুপ্তের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের বিরল সুযোগ ঘটেছিল। লিটল ম্যাগাজিন বিষয়ে ভাবনার আন্তর সম্পর্কগুলি নিয়ে ভাববার সুযোগ এসেছিল সেই প্রথম। যদিও প্রথম যৌবনে, সত্তরের দশকজুড়ে আমি যুক্ত ছিলাম দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত 'অভিনয়' নাট্য পত্রিকার কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে। হয়তো লিটল ম্যাগাজিনের ভিতর মহলের তাঁতঘরের কারুকাজ নির্মাণের হাতেখড়ি ঘটেছিল সেখানেই। লেটারপ্রেসে ছাপার কৃতকৌশল ট্রেডল মেশিনের ছাপার ঝপাং ঝং শব্দ বুকের ভিতর অনুরণন তুলেছিল তখনই। আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বাংলা বিভাগের ছাত্র হিসেবে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনীর পরিকল্পনার সূত্রে জেনেছিলাম লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের অন্দরমহলের নানা টুকরো খবর। এই সব নানা টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে আজ মনে হয় 'লিটল ম্যাগাজিন' এই শব্দবন্ধটির অর্থ অনেক বদলে গেছে। শুধু যে ছাপার ক্ষেত্রে ডিটিপি এসেছে তাই নয়, ভাবনা জগতের ভিতরেও ঘটে গেছে অনেক অদল বদল।
মনে পড়ছে 'শতভিষা' পত্রিকার রজত জয়ন্তী বর্ষ সংখ্যায় (১৩৮৩) আলোক সরকার একটি দীর্ঘ আত্মস্মৃতিমূলক রচনায় লিখেছিলেন: "'শতভিষা' প্রকাশিত হবার কিছুদিনের মধ্যেই 'শতভিষা'র মতো ক্ষুদ্র আকারের কোনো কবিতার কাগজ, পরপর অনেকগুলি প্রকাশিত হলো। রোহীন্দ্র চক্রবর্তীর 'কবিতা' পত্রিকা, সতেন্দ্র আচার্য, অসিত চট্টোপাধ্যায় 'সব শেষের কবিতা', ভূমেন্দ্র গুহরায়, স্নেহাকর ভট্টাচার্যের 'ময়ূখ'। আক্ষরিক অর্থে বাংলা সাহিত্যে লিটল ম্যাগাজিনের সূত্রপাত হলো।" কিন্তু, দুঃখের হলেও একথা সত্যি যে, বাংলা লিটল ম্যাগাজিন বিষয়ে কোনো ধারাবাহিক আলোচনা আজও হয়নি। বাংলা সাময়িকপত্র বিষয়ে অনেক আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে এদেশে এমনকী বাংলাদেশেও। অতি সম্প্রতিও 'সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা' বাংলা সাময়িক পত্র বিষয়ে একটি মূল্যবান সংখ্যা প্রকাশ করেছেন। 'কবিতা', 'কৃত্তিবাস', 'এক্ষণ', 'শতভিষা', 'বারোমাস', 'সমকালীন' পত্রিকার নির্বাচিত রচনা গ্রন্থাকারে প্রকাশিতও হয়েছে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে লিটল ম্যাগাজিনের কোনো ইতিহাস রচিত হয়েছে বলে জানা নেই।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে যে 'লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী'র আয়োজন করা হয়েছিল, তার পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছিল একটি ছোটো পুস্তিকা (২৮ এপ্রিল, ১৯৮১)। আমরা, বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা বেশ কিছু পত্রিকার সম্পাদকের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম কিছু প্রশ্ন নিয়ে। আর সম্পাদকের সেই উত্তরগুলি ছাপার অক্ষরে সাজিয়ে দিয়েছিলাম আমরা। অবশ্য এই পরিকল্পনাটির নেপথ্য রূপকার ছিলেন কবি অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষ। আর প্রেসের দায়িত্ব সামলেছিলেন অধ্যাপক পিনাকেশ সরকার। এই প্রদর্শনীটির উল্লেখ করলাম এই জন্যে যে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে নয়, সম্ভবত আমরাই প্রথম ১৯৫০-১৯৮০ পর্যন্ত প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম কলকাতায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, ২৮-৩০ এপ্রিল, ১৯৮১।

সেই পুস্তিকায় যে সমস্ত পত্রিকার সম্পাদকেরা আমাদের প্রশ্নগুলির উত্তর দিয়েছিলেন। তাঁদের সবার মধ্যেই একটা বিষয়ে সাদৃশ্য ছিল যে তাঁরা সকলেই একটি স্বাধীন, স্বতন্ত্র আদর্শ নির্ভর পত্রিকা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পত্রিকার বিপণনের দিক নিয়ে তেমনভাবে ভাবিত ছিলেন না কেউই। তাই আয়তনের দিক থেকে এই পত্রিকাগুলি যেমন ছোটো ছিল, তেমনি আয়ুও ছিল সীমিত। কিন্তু, কোথায় যেন একটা লড়াই ছিল। 'অলিন্দ' পত্রিকার সম্পাদক সম্প্রতি প্রয়াত কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত লিখেছিলেন: "বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা' পত্রিকা তখন বন্ধ। আমি চেয়েছিলাম তাঁরই সমধর্মী ও পরিপূরক একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে।" আর পত্রিকার প্রকাশ বিষয়ে লিখেছিলেন: "'অলিন্দ' জন্মাবধি অনিয়মিত।" সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 'কৃত্তিবাস' সম্পর্কে লিখেছিলেন: "অন্যান্য আরও অনেক লিটল ম্যাগাজিনের মতো প্রায় অনেক সময়ই 'কৃত্তিবাস' নিয়মিত প্রকাশ হতে পারেনি।" তিনি আরও লিখেছেন, "যে কোনো লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনার ব্যাপারে যে সমস্যা থাকে তা হলো প্রথমত আর্থিক, এবং দ্বিতীয়ত ভালো লেখা পাওয়ার সমস্যা।" দুর্ভাগ্যবশত আজ প্রতিষ্ঠিত লিটল ম্যাগাজিনগুলির কাছে একটাই সমস্যা 'বিজ্ঞাপন'। তাই 'লিটল ম্যাগাজিন'-এর নামপত্রে আজকাল 'ম্যানেজার' নামধারী কারো নাম ছাপা হয়। তাই 'লিটল ম্যাগাজিন'-এর কাছে লেখা বা টাকা কোনোটাই আজ আর সমস্যা নয় বলেই মনে হয়।


যেহেতু সত্তর দশকেই আমরা সাবালকত্ব অর্জন করেছিলাম তাই সেই সময়ের কথাই বেশি মনে পড়ে। জানা না জানা কত পত্রিকা যে প্রকাশিত হয়েছে সেই সময়, তার কোনো তালিকা হয়তো আজ পাওয়া যাবে না। 'পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি' প্রকাশিত 'বাংলা লিটল ম্যাগাজিন তথ্যপঞ্জি'তে সারা পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলি থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনের তালিকা দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক-রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সাহিত্যের আন্তর সম্পর্ক চিরকালীন। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সূচনা হয়। আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সত্তর দশকের প্রতিবাদী সাহিত্য ভাবনায় প্রতিফলন লক্ষ করা যায় লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় পাতায়। কিন্তু ক্রমশই তা স্তিমিত হয়ে আসে। রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার কারণে লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রগত কিছু পরিবর্তন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সাধারণ সাহিত্যমনস্ক পাঠকের পরিবর্তে লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভাব্য পাঠক হয়ে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অধ্যাপক ও গবেষক। পত্রিকার দাম ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগল। সাধারণ সংখ্যা নয়, ক্রমশ 'বিশেষ সংখ্যা'ই একমাত্র সংখ্যা হয়ে উঠলো। প্রচ্ছদের শিল্পী হিসেবে সম্পূর্ণ পেশাদার শিল্পীদের অনুপ্রবেশ ঘটলো বিপুলভাবে। অপটু হাতের নিষ্ঠা নয়, সম্পূর্ণ পেশাদারি ভাবনার প্রকাশ ঘটলো লিটল ম্যাগাজিনে। কিছু পত্রিকার কথা মনে পড়লেই যেমন বিশেষ সংখ্যার কথাই মনে পড়ে। লিটল ম্যাগাজিন আগে ছিল নবীন কবি-সাহিত্যিকদের সূতিকাগার, আজও হয়তো কিছুটা আছে, কিন্তু বেশিরভাগটা নয়। সৃজনশীল সাহিত্য, যেমন গল্প-কবিতা উপন্যাসের ক্ষেত্রে নতুন লেখকদের পদসঞ্চার ঘটেছে; কিন্তু প্রবন্ধের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সম্পাদক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যেতে চান না। আমার প্রিয় পত্রিকা 'অনুষ্টুপ'-এর সত্তর-আশির চরিত্র আর এখনকার চরিত্র দেখলেই তা স্পষ্ট হবে। সম্পাদক অনিল আচার্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ প্রকাশিত সেই পুস্তিকায় ১৯৮১ সালেই অবশ্য বলেছিলেন। ১৯৬৫-৬৭ পর্যন্ত যাঁরা 'অনুষ্টুপ' পড়েছেন তাঁরা আগের 'অনুষ্টুপ'-এর সঙ্গে বর্তমানের কাগজটি মেলাতে গেলে দীর্ঘ হোঁচট খাবেন। আর আজ ১৯৮১-র পরে ২০২৩-এ পৌঁছে পাঠক আরও হোঁচট খাবেন।

আরও একটি প্রবণতার ফল এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। ক্রোড়পত্র বা বিশেষ সংখ্যাগুলিকে বই আকারে প্রকাশ করার বাণিজ্যিক উদ্যোগ। বলাবাহুল্য, পত্রিকার জন্য ছাপা ফর্মা থেকেই পত্রিকা আর বইয়ের ভাগাভাগি বাঁধাই আর একটু ভূমিকা। একটি পত্রিকাকে টিকিয়ে রাখার জন্য তা নিশ্চয়ই জরুরি; কিন্তু এই সমস্ত পরিকল্পনার পাঁকে পাঁকে ক্রমশই হারিয়ে যেতে থাকে সম্পাদকের প্রতিবাদী মন, মনন। সেই পাঠকের কথা সম্পাদকেরা আজ বিস্মৃত হয়েছেন।


ক্রমশই ভিজে যায় ভাবনার বারুদের কণাগুলি। মনে পড়ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনীর কথা। কবি অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষ একটি পোস্টারের জন্য লিখেছিলেন: "লিটল ম্যাগাজিন — ভাবনার বারুদশালা"। সেই বারুদের কণাগুলি আজ ভিজে যাচ্ছে। বিশ্বায়ন আর বিপণন নির্ভরতার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে 'ম্যাগাজিন' শব্দের তাৎপর্য।

পরিচিতি: সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখক। ভারত সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন (সংস্কৃতি দপ্তর) দপ্তরের প্রাক্তন সিনিয়র ফেলো। কলকাতা।