
পেরিয়ে গেছে স্বাধীনতার আটাত্তর বছর, বার্ধক্যে পৌঁছে গেছে স্বাধীন ভারত।
দেশজুড়ে হইহই করে পালিত হয়েছে 'স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব', তৈরি করা হয়েছে অজস্র স্মারক তোরণ। এরকম একটা উচ্ছ্বাসের কাল পেরিয়ে এইরকম নেতিবাচক প্রশ্ন উত্থাপন করা অশালীন জেনেও যে প্রশ্নটাকে দাবিয়ে রাখা যাচ্ছে না সেটি হল, উনিশশো সাতচল্লিশ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা পেয়েছিল কে, ভারতবর্ষ না ভারতবাসী? একটু ভেবে দেখা যেতে পারে।
'দেশ' শব্দটি একটি জটিল শব্দ, কারণ এটি একটি বানিয়ে তোলা শব্দ, একটি পরিকল্পিত রূপকথা। আদিম হোমোস্যাপিয়েন্স যখন থেকে শিকারী-সংগ্রাহকের জীবন ছেড়ে কৃষি জীবনে থিতু হল, তখন যৌথভাবে বাঁচার প্রয়োজনে, সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তাকে টিকিয়ে রাখার তাগিদে তাদের এমন অনেক কাল্পনিক ধারণার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্র বা দেশও তেমন একটি ধারণা বা আবেগ, যা ব্যবহার করে বহু মানুষকে একত্রিত করা যায়, একই রকম কাজ করতে প্ররোচিত করা যায়। ঠিক যে কাজটা অত্যন্ত সফল ভাবে করে 'ধর্ম' নামক আর একটি কাল্পনিক ধারণা। তবে সব মানুষের কাছে 'দেশ' শব্দটা কিন্তু সমান অর্থ বা আবেগ বহন করে না। পুরুলিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে পশুপালন করে দিন গুজরান করে যে হতদরিদ্র মানুষটি তার কাছে 'দেশ' শব্দের অর্থ সবুজ তৃণভূমিটুকু। আবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার যে দরিদ্র মহিলাটি কলকাতার বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে পেট ভরায় তার কাছে 'দেশ' মানে ক্যানিং বা চম্পাহাটি। উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর অধিবাসীদের কাছে রাষ্ট্রের চেয়ে রাজ্য যদি বড়ো না হতো তবে দুই রাজ্যের সীমানা নিয়ে রাজ্য সরকারের পুলিশে-পুলিশে সংঘর্ষ হতো না। উত্তর-পূর্বের 'সাতবোন' নামে পরিচিত রাজ্যগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজেদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে অধিকতর খুশি, 'ভারতীয়' না হলেও তাদের কিছু এসে যায় না। ইংরেজদের প্রভুত্ব কায়েম হবার আগে জাতি এবং ভাষাগত বিভিন্নতা নিয়ে যেসব প্রাদেশিক রাজ্য ছিল, সেইসব প্রদেশের মানুষ এখনও তাদের নিজের নিজের অঞ্চলকেই যে দেশের চাইতে বেশি প্রাধান্য দেয়, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলো। দেড় বছর ধরে জ্বলতে থাকা মণিপুরের সাধারণ মানুষের দূর্দশার দায় যে রাষ্ট্র নেয় না, যে রাষ্ট্র দূর্বল এবং নিরপরাধ মানুষগুলোকে দিতে পারে না নিরাপত্তা এবং সুস্থ জীবনের অধিকার, সেই রাষ্ট্রের উপস্থিতি কি কেবল কর আদায়ের জন্য? সে দায়িত্ব তো দেশীয় রাজারাও নিষ্ঠাভরে করে থাকত। ভারতের 'বিসমার্ক' এবং লৌহপুরুষের বজ্রমুষ্ঠিতে বাঁধা না পড়লে এইসব প্রদেশের মানুষের কাছে স্বাধীনতার অর্থ অন্যরকম হতে পারত।
'স্বাধীনতা'র যে বোধ মানুষের রক্তের মধ্যে রয়েছে, সেটা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা, নিজের মতো ভাবনা চিন্তা করার এবং আচার আচরণ করার স্বাধীনতা। ইংরেজ প্রভুদের দাসত্বে কিংবা তারও আগে দেশীয় রাজা, জমিদারদের শাসন শোষণে সেই অধিকার ছিল না সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী যখন এই জন্মগত অধিকারগুলো ফিরে পাবে তখনই তারা স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে পারবে। কিন্তু ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র আমাদের কি সেই স্বাধীনতার কিছুমাত্র ফিরিয়ে দিয়েছে? একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।

প্রথমে চোখ রাখা যাক পঁচাত্তর বছর ধরে জ্বলতে থাকা জম্মু-কাশ্মীরের দিকে। বেশি গভীরে না গিয়ে এটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে যে, উনিশশো নব্বইতে জম্মু-কাশ্মীরে লাগু হয় বিশেষ প্রতিরক্ষা আইন AFSPA, যে আইনের প্রতিবাদে মণিপুরে শর্মিলা চানুর দীর্ঘকালের অনশন দেশবাসীর নজর কেড়েছিল। কিন্তু জম্মু-কাশ্মীরে এই আইন বলবৎ হবার কথা খুব কম মানুষই জানেন। 'অ্যামনেস্টি'র রিপোর্ট বলছে, এই আইনে শুধুমাত্র নব্বই সালেই জম্মু-কাশ্মীরে গ্রেপ্তার হয়ে ফিরে না আসা মানুষের সংখ্যা আটশোর বেশি, প্রকৃত সংখ্যাটা তাহলে আরও বেশিই হবে। এই তথ্য মনে পড়িয়ে দিচ্ছে হিটলারের জার্মানিতে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ইহুদি পুরুষদের কথা, যাদের সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হতো আর তারপর তাদের সন্ধান পাওয়া যেত না। সরকারি হিসাব বলছে, জম্মু-কাশ্মীরে ঊননব্বই থেকে দু'হাজার দুইয়ের মধ্যে চল্লিশ হাজার মানুষ মারা গেছেন রাষ্ট্রের সৈন্যদের হাতে, 'আজাদি' শিবিরের মতে অবশ্য সংখ্যাটা আশি হাজার। প্রশ্নটা হল, এরা কি সবাই সন্ত্রাসবাদী? স্বাধীনতা বলতে কি বোঝে তারা? প্রশ্নটা সহজ নয়, উত্তরটা আরও কঠিন।

স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক দেশে প্রশ্ন করার এবং রাষ্ট্রের কাজে সমালোচনা করার অধিকার সকলের থাকা উচিত। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই অধিকারটুকু এদেশের কতজন মানুষের আছে? স্বাধীন রাষ্ট্রের বিশাল কলেবর বিশিষ্ট সংবিধানে দেশবাসীর জন্য যেসব অধিকারের কথা সুলিখিত হয়েছে, তার কতটুকু সুবিধা ভোগ করে এই দেশের কত শতাংশ মানুষ?
গণমাধ্যমে কোনো নাগরিক তার মত প্রকাশ করলে যখন দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন মনে প্রশ্ন জাগে ব্রিটিশ প্রভুদের রাওলাট আইনের প্রতিবাদ করে পরাধীন দেশে এত মানুষ যে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল, কি তার মূল্য? স্বাধীন দেশও যখন তার নাগরিকদের এই অধিকারটুকু দিতে পারেনি তখন কি ফল হল এত প্রতিবাদ প্রতিরোধ রক্তপাতে? এত রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা এল, তাতে আমজনতার ভাগ্য বদলালো কই? যদি প্রতিবাদী কোনো দেশবাসীর মুখ বন্ধ করতে সেই কালা আইন এখনো প্রয়োগ করে রাষ্ট্র, তবে এ কিসের স্বাধীনতা? ফাদার স্ট্যানের মৃত্যুর পর এই তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে যে ব্রিটিশ প্রভুদের সাম্রাজ্য সামাল দেবার তাগিদে তৈরি করা দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বা দেশদ্রোহী সন্দেহে যেকোনো মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখার আইন আজও টিকে আছে। এখানেই প্রশ্ন জাগে, স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনির্মাতা তথা রূপকাররা কি আদৌ এই দেশে প্রতিটা মানুষের সমান অংশীদারিত্ব আছে একথা ভেবেছিলেন, নাকি সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্ট শুধুমাত্র ক্ষমতার হাতবদল হয়েছিল? গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানে যখন দেশদ্রোহিতা বিরোধী আইনের কথা লেখা হয়, তখন এ প্রশ্ন অত্যন্ত সঙ্গত।
অশীতিপর অসুস্থ বৃদ্ধ কবি ভারভারা রাও যে দেশের জেলে বিনা বিচারে বন্দি থাকেন দিনের পর দিন, যে দেশে ছাত্রছাত্রীরা ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ জানালে রাষ্ট্র তাদের জেলে পাঠিয়ে মুখ বন্ধ করে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে সৃষ্টিশীল কাজ করতে চাওয়া লেখক-শিল্পীদের প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় যে দেশে, যেখানে আস্ফালন চালাতে পারে কেবলমাত্র রাজনৈতিক মুষ্টিযোদ্ধারাই, সেই দেশের আমআদমি কি আদৌ স্বাধীন!

পরিচিতি: কবি, গল্পকার ও শিক্ষিকা। কলকাতা।