প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

অন্ধকারে ঘুম আসে না যখন



অভিজিৎ রায়


ভোট চুরি নিয়ে লিখব নাকি ভবিষ্যৎ? হ্যাঁ আমার আপনার পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে গেল এই বাংলায়। MBBS-এ ভর্তি স্থগিত হয়ে গেল। আর 'ওয়েষ্ট বেঙ্গল জয়েন্ট' পরীক্ষার রেজাল্ট ঝুলে আছে। সাধারণ বিষয়ের কলেজগুলোতে ভর্তির ব্যাপার পিছোতে পিছোতে এখন ছাত্রছাত্রীরা বিমুখ। ভর্তি পোর্টাল খুলে রেখে কে যেন গাইছে "তোমার দেখা নাই রে, তোমার দেখা নাই।"

প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক থেকে কলেজ প্রায় সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। আরও কমে যাবে খুব দ্রুত। পড়ে কী হবে? - এই প্রশ্ন এখন শুধু ফাঁকিবাজ পড়ুয়ারা করছে না, ক্রমশ দামী হয়ে ওঠা শিক্ষাব্যবস্থায় নাজেহাল মধ্যবিত্ত অভিভাবকরাও করছেন।

স্কুলে শিক্ষক নেই; মিড-ডে মিলের ঘটা আছে। স্কুল-কলেজের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ডঙ্কা বাজানো চলছে অথচ পরীক্ষার খাতা নজরে এলে শিউরে উঠতে হচ্ছে শিক্ষক থেকে অধ্যাপকদের। শিক্ষক, অধ্যাপকরা শিউরে উঠছেন আর রাজনৈতিক হর্তাকর্তারা হাসছেন কার্যসিদ্ধির সাফল্যে। এই বাংলায় ইতিমধ্যেই দুই প্রজন্মের অশিক্ষিত, বেকার তৈরির অভিসন্ধি পুরো সফল। রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে ভিড় বাড়ানো এখন রাজনৈতিক দলগুলোর বাঁ-হাতের খেল। আর, মাদারির খেলা দেখতে অভ্যস্ত শিক্ষিত জনগণের অধিকাংশই শাসকদলের ঘনিষ্ঠতা ফলাও করে দেখাতে ব্যস্ত স্যোসাল মিডিয়ায়।

কবির মাথা এখন শাসকের পিছন পিছন হেঁটে যায় না, সামনে হেঁটও হয়। চেয়ারের জল মুছতে মুছতে কখন যে গুছিয়ে চেয়ার বাগিয়ে শিকড় গেড়ে বসে পড়েছেন কবি, তা তার পাঠক বুঝতে পারেনি।

কলেজের অধিকাংশ ছাত্র এখন শিক্ষক পেটানো আর পেটো বানানোর ওস্তাদ হয়ে উঠেছে। ভোটের বাজারে চপ শিল্পের পরই পেটো শিল্পের রমরমা বাজার। বাজার নিয়ে রাজার আগ্রহ না থাকলেও গণতন্ত্রের রাজারা এখন বাজার নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।

দেশীয় সংস্থা কম দামে বেচে ভোট কেনার পুঁজি জোগাড় করার বাজার চাঙ্গা রাখতেই দাঙ্গা সংঘটিত হয় দেশে। আর, অবশেষে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়ে। রাষ্ট্র তার জনগণের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার পরিকল্পনায় দেশপ্রেমের স্ক্রিপ্ট লেখায় মন দেয়। অন্ধভক্তদের কাঁধে পা দিয়ে ইলেকটোরাল বন্ডের আড়ালে চলে জনগণের টাকা নয়ছয়ের চক্রান্ত। পুঁজিপতিদের ঋণমুকুব করে সরকার ফি-বছর। অথচ, এই কাজ দেশদ্রোহিতা নয় তার ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাকে ধ্বংস করতে উদ্যত সমস্ত স্বৈরাচারী শাসকই। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দুটি ক্ষেত্রই প্রাইভেট সেক্টরের হাতে তুলে দিতে এবং সাধারণ মানুষের আওতার বাইরে রাখতে বদ্ধপরিকর আমাদের বর্তমান শাসকদল।

আমাদের উপর চাপানো করের টাকা কর্পোরেট কোম্পানিগুলোকে ঋণমকুবের মাধ্যমে বিলিয়ে দেবার দুরভিসন্ধি বন্ধ হোক। বন্ধ হোক ভাতা বা ডোলের রাজনীতি। আরও বন্ধ হোক সরকারি খাত থেকে সরকারি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শাসকদলের প্রচার অভিযানের চিরকালীন বন্দোবস্ত। এই টাকা প্রকৃত উন্নয়নের পরিপন্থী। কিন্তু আবারও সেই একই ব্যাপার। প্রশ্ন করা শেখানোর শিক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন খুব প্রয়োজন। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

'অশোকা ইউনিভার্সিটি'র নাম নিশ্চয়ই আপনারা সবাই শুনেছেন! এখানকার লিবারাল আর্টসের ছাত্ররা গ্রেপ্তার হচ্ছে প্রশ্ন করার অপরাধে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের এই করুণ অবস্থা কি সত্যিই কারও নজরে পড়ছে না? ভোট চুরির অভিযোগ করলে বিরোধী নেতাকে হলফনামা দিতে বলা হয়, অথচ দেশের শয়ে শয়ে বিধায়ক, সাংসদ যে হলফনামা মিথ্যে শিক্ষা ও সম্পত্তির হিসাব দেখানোর পরও শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পান, তার বেলা?

তার বেলা ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে ভাষণ শুনবেন আপনি আর বিক্রি হয়ে যাওয়া মিডিয়ায় খবরের বদলে যাত্রাপালা দেখবেন রাত্রিদিন। দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়ে যাচ্ছে? তাতে আপনার কী মশাই? আশি কোটি লোককে রেশনবিলিই যে সবকা বিকাশ সেই অর্থনীতি আপনি কবে বুঝবেন? কবে বুঝবেন যে বিকাশ আর বিনাশ একাকার করে দিয়ে আমাদের বাঁচার ন্যূনতম অধিকার কাড়ার এক চক্রান্ত চলছে প্রতিনিয়ত?

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানেরও আগে প্রশ্ন করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে। দ্রুত, খুব দ্রুত নির্বাচিত সরকারকে দেশের যাবতীয় অধোগমনের দায় স্বীকার করে শিক্ষার গুরুত্ব মেনে নিতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতির মতো আত্মহত্যাপ্রবণ সিদ্ধান্তগুলোকে এক্ষুনি রদ করে শিক্ষাখাতে ব্যয় বাড়িয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

করতে তো হবে। কিন্তু করবে কে বা কারা? যার বা যাদের করার কথা, তারা তো সব ধর্মে ভণ্ডামি আর মূর্খতা ছড়িয়ে ক্ষমতার সন্ত্রাস বজায় রাখতে চাইছে এই দেশে। সব শেষে পরাধীনতার শিকলে আরও একবার বাঁধতে চাইছে দেশের সমস্ত মানুষকে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য চুরির পর এবার ভোট চুরি করে দেখিয়ে দিয়েছে ভারতীয় গণতন্ত্রের নগ্ন রূপ। এখন একটাই প্রশ্ন। যে ভোটার পাঁচ বছর সরকারকে গালাগাল দেবার পর ভোটের দিন সকালে সবচেয়ে আগে গিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়ায়, সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এইবার! নাকি বজরংবলীর নতুন নতুন মন্দির আর রামনবমীর অস্ত্র মিছিলে উচ্ছ্বসিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে আচ্ছে দিনের স্বপ্নে?

চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: বিশিষ্ট কবি। তবে তাঁর ছোটগল্প, উপন্যাস, মুক্তগদ্য, উত্তর সম্পাদকীয় সমস্ত লেখাই বাণিজ্যিক বড় কাগজে প্রকাশ পেয়েছে। মুদ্রণ ও প্রকাশনা ব্যবসার সাথে যুক্ত। বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ।