
নব্বইয়ের দশকে ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গ্রহণ করা সংস্কারের সাথে জুবিন গার্গ নামের এক ক্ষণজন্মা শিল্পীর উত্থানের এক অনন্য সংযোগ রয়েছে। আশির দশকের শেষদিকে স্থবির হয়ে পড়া ভারতের অর্থনীতিকে এক নতুন গতি দেবার জন্য সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং দেশে উদারনীতি ঘোষণা করেন। এই নীতির ফলস্বরূপে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিদেশি পুঁজিপতিদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। সরকারি ক্ষেত্রসমূহে পর্যায়ক্রমে বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করা হয়। কল্যাণকামী রাষ্ট্র ভারতের অর্থনীতিতে 'জোর (ধন) যার মুলুক তার'এবং 'যোগ্যভোগ্যা বসুন্ধরা'নীতির প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে বেশি দিন লাগলো না।
উন্মুক্ত হয়ে পড়া বাজার অর্থনীতিকে নতুন ছন্দ দিল তথ্য প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি। বিনোদন জগতেও এলো তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লব। উদারবাদী অর্থনীতির ফলে বিশ্ববাজারে উপলব্ধ বিভিন্ন অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়িতে এবং স্থানীয় বাজারে পাবার ফলে, বিশেষ করে যুব প্রজন্মের মধ্যে পূর্বে না দেখা এক নতুন এবং তীব্র প্রতিযোগিতামুখী পরিবেশের সূচনা হয়। হঠাৎ করে মানুষের কর্মসংস্কৃতির রূপ পরিবর্তন হয়ে পড়ে। সামনে নতুন সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আসে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রতিযোগিতা। এলো দক্ষতা এবং দক্ষতা বিকাশের প্রসঙ্গ। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য যাঁরা নিজেদের তৈরি করে তুললেন, তাঁদের জন্য নিজেকে বিকশিত করার পথ প্রশস্থ হয়ে উঠল।অন্যদের ক্ষেত্রে যেন হারিয়ে যাওয়াই উপক্রম হলো।
দেশের বেশিরভাগ মানুষের মানুষের জন্য বিশ্বায়ন ছিল এক ভয়ংকর দৈত্যস্বরূপ। বাজার অর্থনীতির অতিকায় ক্ষমতাবানরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, বিনোদন ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রে যখন প্রভুত্ব বিস্তার করতে শুরু করল, তখন মানুষের পছন্দ, ফ্যাশন, পোশাক-পরিচ্ছদ, কথোপকথন, জীবনশৈলী সবকিছুতে বিশ্বায়নের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রাথমিকভাবে আঘাত এলো শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য বিভাগে। এই দুটো বিভাগে সরকার ক্রমান্বয়ে ব্যয় কমাতে শুরু করলো। নব্বইয়ের দশকের উগ্রপন্থী সমস্যাজনিত অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য অসমে বিশালাকায় শিল্পোদ্যোগ দেখা না গেলেও কিছু পরিবর্তন সকলের চোখেই পড়েছিল, যেমন অলিতে গলিতে গজিয়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যমের বেসরকারি বিদ্যালয় এবং ছোটো বড়ো শহরগুলিতে গড়ে ওঠতে থাকা নার্সিংহোম। অর্থাৎ বিশ্বায়নের প্রারম্ভিক স্তরে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্র সাধারণ মানুষের হাত থেকে বেরিয়ে গেল। ক্রমে ক্রমে আসছিল শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্সের সংস্কৃতি।
বিশ্বায়ন নামের সেই ভয়ংকর দৈত্যের সামনে অসমের মতো রাজ্যের ভাষা সংস্কৃতির বিকাশের গতিধারা কী হবে? যুগ যুগ ধরে অসমে বসবাস করে আসা ছোটো ছোটো জাতি-জনগোষ্ঠীগুলির ভাষা সংস্কৃতির বিকাশের গতিধারা কী হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মানুষের কাছে ছিল না। কিন্তু এই প্রশ্নগুলি অনবরত মানুষকে বিচলিত করে তুলেছিল। হাতে ধন সম্পদ থাকা ব্যক্তিরা কেবল উন্নত পর্যায়ের প্রতিযোগিতামুখী শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে নেবে আর অন্যরা কী করবে? বিশ্বায়ন এবং উদারবাদী অর্থনীতি একাংশের জন্য এনেছিল নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ এবং অন্য অংশের জন্য চরম হতাশা। বিশেষ করে যাঁদের হাতে সম্পদ ছিলনা তাঁরা হয়ে পড়েছিলেন সস্তা শ্রমিক। আস্তে আস্তে দেখা গেল যে বিশ্বায়ন ধনী এবং দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমাগত বৃদ্ধি করলো। এই দিকগুলি বাস্তবে প্রতিফলিত হতে কিছু সময় লেগেছিল।

এমনই এক প্রেক্ষিতে প্রজন্মের সামনে দুটো পথই প্রশস্ত ছিল - বিরাট চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা অথবা দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া। সেই সময়ে অসমের মতো একটি প্রান্তবর্তী রাজ্যে ১৯৯২ সালে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তেত্রিশ বছর ধরে অসমের কৃষ্টি সংস্কৃতির জগৎকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া জুবিন গার্গ নামের ব্যক্তিসত্তা প্রায় একক প্রচেষ্টায় অসমের কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং বিনোদনের জগতকে এক বহনক্ষম শিল্প হিসাবে গড়ে তুললেন - তা আমাদের বিশ্বয়াভিভূত করে। এই সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি এই শিল্পক্ষেত্রে এসেছেন এবং নিজের নিজের কাজ করেছেন, কিন্তু জুবিন গার্গ যেন সবসময়ই ছিলেন একক এবং অনন্য।এই বহনক্ষম শিল্পটিতে তিনি সমকালীন শিল্পী তথা কলা-কুশলীদের জন্য মর্যাদাসম্পন্ন জীবন জীবিকা নিশ্চিত করেছেন। তাঁর নাতিদীর্ঘ জীবনকালে চল্লিশটিরও বেশি ভাষায় এবং আটত্রিশ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে আধুনিক অসমিয়া গানের অবিসংবাদী সম্রাট হয়ে ওঠা ছাড়াও তিনি নাট্য এবং চলচ্চিত্রের জগতেও অন্যতম মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন।
যেকোনো সাধনার ক্ষেত্রে সফলতা পেতে এক উদ্যোগিক (enterprising) প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়। সকল মহৎ শিল্পীরই এক ধরনের উদ্যোগিক প্রচেষ্টা থাকে। সমকালীন শিল্প-কলা-কুশলীদের সমবেত করে একসঙ্গে এগিয়ে যাবার মধ্যে সেই প্রচেষ্টা পরিস্ফুট হয় এবং তেমন উদ্যোগ এক সামগ্রিক পরিবেশ গড়ে তোলে। অসমিয়া সমাজের ভিত্তি নব নব রূপে নির্মাণ করা মহান পুরুষগণ যেমন শ্রীমন্ত শংকরদেব থেকে শুরু করে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা - সকলের ক্ষেত্রেই এই উদ্যোগিক প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যায়। এই দায়িত্ব এক ধরনের স্ব-আরোপিতও।
জুবিন গার্গের জীবনের দিকে তাকালে এই দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অসমের কৃষ্টি-সংস্কৃতির জগৎকে এক বহনক্ষম শিল্পরূপে নির্মাণ করতে জুবিন গার্গ সামনে আসা কোনো সুযোগকেই ছেড়ে দেননি। সংগীতের চিরায়ত মঞ্চ ছাড়াও ভ্রাম্যমান থিয়েটার, ভিসিডি, চলচ্চিত্র জগৎসহ সমস্ত মঞ্চেই তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তাঁর গান ছাড়া ভ্রাম্যমান থিয়েটারে মানুষকে টেনে আনা অসম্ভব ছিল। সংগীত জগতের মানুষটি যখন অভিনয় জগতে পা রেখেছেন, সেখানেও নিজের কাজ সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে। ভ্রাম্যমান থিয়েটার এবং ভিসিডি সংস্কৃতির বিনোদনধর্মিতাকে তিনি যেমন আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, সেভাবেই চলচ্চিত্র জগতের বিনোদনধর্মিতা ছাড়াও বিশেষ করে অভিনয়ের দিকটি তিনি অত্যন্ত গভীরভাবে নিয়ে কাজ করেছেন। অভিনয় জীবন প্রসঙ্গে প্রায়ই আলোচনার পরিবৃত্তে না আসা জীবনের একবারে সূচনা পর্যায়ে বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র 'তুমি মোৰমাথো মোৰ' (তুমি আমার শুধু আমার)-তে কিন্তু জুবিন গার্গের সিরিয়াস অভিনয়ের চিহ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সৃষ্টির আকুলতায় আগুনের লেলিহান শিখার মতো সেই দু'চোখের আকুলতা অধিকাংশ নবীন শিল্পীর বেলায় দেখা যায় না। এভাবেই দেখা গেছে যে, ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে শিল্পীর সেই নিরবছিন্ন প্রচেষ্টা এবং উত্তরণের পথ একবিংশ শতকের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দশকে হয়ে উঠেছে জাতপাত-বর্ণহীন সমাজের এক সুস্থ জাতীয়তাবাদ এবং অসমিয়া জাতীয়তাবোধের অনুপম নিদর্শন। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের পথে আসতে আসতে দেশ এবং রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষায় এক কঠিন সময়ে তিনি ঘোষণা করলেন - "মোৰ কোনো জাতি নাই, মোৰ কোনো ধর্ম নাই, মোৰ কোনো ভগবান নাই, মই মুক্ত" (আমার কোনো জাতি নেই, আমার কোনো ধর্ম নেই, আমার কোনো ভগবান নেই, আমি মুক্ত)। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, "আমাদের সবাইকেই এক হয়ে থাকতে হবে, একসঙ্গে থাকতে হবে।" শাসকশ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় যখন দেশের মানুষকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদ এবং বর্ণবাদের চক্রান্তে ভাগ ভাগ করার জন্য কুটিল ষড়যন্ত্র রচনা করা হলো, সেই সময়ে শিল্পীর এই বক্তব্য যেন সমাজের মঙ্গলকামী মানুষদের চেতনা অনন্য দ্যোতনায় কাঁপিয়ে দেয়।
বলাই বাহুল্য, একজন শিল্পীর জন্য এই পথ অত্যন্ত জটিল। সমস্ত ধরনের সংকীর্ণতাকে বারে বারে তাঁকে অতিক্রম করে আসতে হয়েছে মানবতার পথে। বৌদ্ধিক কথকতা ত্যাগ করে তিনি কথা বলেছেন সাধারণ মানুষের ভাষায়। এই ভাষা এতটাই সাধারণ ছিল যে, অনেকে তাঁর বক্তব্যকে উপেক্ষাই করেছিলেন। কিন্তু জুবিন গার্গের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুতে মন্দির-মসজিদ-গির্জা সবখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হয়ে শিল্পীর প্রিয় গান 'মায়াবিনী'র মূর্ছনায় মুখরিত করে যে এক অবিশ্বাস্য মায়াবী পরিবেশের সূচনা করেছেন, সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সাধারণ মানুষ জুবিন গার্গের সরল বক্তব্যকে প্রকৃতই অন্তর থেকে উপলব্ধি করেছিলেন। অসমিয়া মানুষের এই আন্তরিকতা আজ সমগ্র বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে তুলেছে।

জুবিন গার্গের জীবনকাল ছিল এক অবিরত কর্মযজ্ঞ। অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন তিনি। এই কর্মযজ্ঞকে যদি অসমিয়া জাতীয় জীবনের এক বৃহৎ শিল্প বলে ধরা হয় এবং তার প্রেক্ষিতে শিল্পীর জীবন এবং কাজের বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, নিজের হাতে তিল তিল করে সেই বিশাল শিল্প তিনি গড়ে তুললেন ঠিকই, কিন্তু সেই শিল্পটির তিনি আদানি বা আম্বানিসদৃশ্য শিল্পপতি হতে যান নি। তাঁর ভূমিকা ছিল শুধু সেই শিল্প গড়ে তোলার,তিনি ছিলেন তার অনুপম রূপকার (architect)। শূন্য অথবা বিয়োগ (-) থেকে এই শিল্প হয়তো গড়ে তোলা হয়নি, কারণ জীবনের প্রথম মিউজিক অ্যালবাম প্রকাশের সময়ে বাবা যৎসামান্য পুঁজি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এই সামান্য পুঁজিকেই নির্মাল্য হিসেবে নিয়ে তিনি একমাত্র নিজের কণ্ঠের সাহায্যে সাবাইকে একত্রিত করার নীতিতে (inclusive)এই বিশাল শিল্প গড়ে তুলেছিলেন। একটি বটবৃক্ষের মতো হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সবাইকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, অথচ কখনো কারও কাছে হাত পাততে হয়নি। অসমের শিল্প-সংস্কৃতি জগতের অধিকাংশ শিল্পী-কলা-কুশলীর আর্থিক অবস্থা এখনও এমন যে,গুরুতর অসুখ-বিসুখের মতো সমস্যা হলেই তাঁদের অর্থের সংকট হয়।কারণ,আমাদের দেশের সৃষ্টিশীল জগতের মানুষদের জন্য তেমন আর্থিক নিরাপত্তা নেই। কিন্তু জুবিন গার্গের কখনো কোনো ক্ষেত্রে কারো কাছে হাত পাততে হয়নি,বরং উপার্জনের একটা বড়ো অংশ তিনি নিয়মিতভাবে আর্তদের দিয়ে গেছেন। আর্থিক সংকটে আক্রান্ত শিল্পী-কলা-কুশলীদের উদারহস্তে সহযোগিতা করেছেন। যে কথা মৃত্যুর পরবর্তী সময়েই মানুষের দৃষ্টিতে বেশিকরে ধরা পড়ছে। এজন্য তিনি দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন।শ্রমিকের মতো কাজ করেছেন তিনি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেঁচে থাকা অন্য অনেকের মতো এদিকের টাকা ওদিকে করেননি। নিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কষ্টোপার্জিত টাকাই তিনি মুক্ত হস্তে বিলিয়ে দিয়েছেন।

আশির দশকের শেষের দিক থেকে দৃশ্যমান হয়ে পড়া সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের সেই মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে তাকে এক বহনক্ষম শিল্পের রূপ দেওয়া পর্যন্ত প্রায় একক প্রচেষ্টায় একটি পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের বিরল প্রজ্ঞার প্রয়োজন, তা তিল তিল করে তিনি আহরণ করেছেন তাঁর বোধ, অভিজ্ঞতা এবং নিবিড় পড়াশোনার মধ্য দিয়ে। সুধী সমাজের অধিকাংশের অবহেলার সমস্ত হলাহল পান করেছিলেন তিনি, কিন্তু আক্ষেপ করেননি। নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে গর্বের সাথে তিনি এই শিল্প গড়ে তোলেন। মায়ানগরী মুম্বাইয়ে ঘরবাড়ি, প্রতিষ্ঠা এবং সম্মান অর্জন করার পরও অসমের মাটিতে ফিরে আসার এক ধরনের বিরল সাহস ছিল তাঁর। জুবিন কঠোর পরিশ্রম করে কোনো একদিনে পঁয়ত্রিশটি পর্যন্ত গান গেয়েছেন বলেও কোনো কোনো শিল্পী বলেছেন। বিশ্বায়ন-পরবর্তী সময়ে কষ্ট করে এভাবে কলা-সংস্কৃতির জগৎকে শিল্প প্রতিষ্ঠানের রূপ দিলেও সম্পদ, টাকাপয়সার প্রতি তিনি একধরনের উদাসীন ছিলেন এবং সেই জন্যই হয়তো 'চোখে থেকে বুকে আঘাত করা'র মতো গভীরভাবে বিশ্বাস করা সবাই তাঁর প্রতি চূড়ান্তভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করলো।
অসমের সংগীত জগতে জুবিন গার্গের আত্মপ্রকাশের সময়কাল কেবল বিশ্বায়ন বা উদারবাদী অর্থনীতির জন্যই নয়, আরও অন্যান্য দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কয়েক দশক ধরে সামাজিক প্রেক্ষাপটে অতি উচ্চপর্যায়ের সংগীত-সাহিত্য ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া ডঃ ভূপেন হাজরিকার পরবর্তী সময়ের শিল্পীদের অপরিণত এবং অসংবেদনশীলতায় জীর্ণ গানগুলি যেন মানুষকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করতে পারেছিল না। এমন এক স্থবির সময়ে আগে বাদ্যযন্ত্রী হিসেবে চর্চা এবং সুনাম থাকা জুবিন গার্গ নামের কুড়ি বছরের বিস্ময়কর প্রতিভার গায়করূপে প্রায় আকস্মিক আবির্ভাব অসমের সংগীত জগতের জন্য ছিল একটা আলোড়ন। পাশ্চাত্য সংগীতের বিভিন্ন ধারা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকসংগীতের অপূর্ব সংশ্লেষণে জীবন্ত হয়ে ওঠা রোমান্টিক বিষাদ এবং বিমূর্ততার নতুন ধারার সেই সংগীত এবং গায়কি ছিল অসমিয়া গানের শ্রোতাদের জন্য এক আবিষ্কার। নব্বইয়ের দশকের শ্রোতার সেই অভিলাষ ছোটো বড়ো শহরগুলির অসংখ্য গুমটি দোকান, বাসস্ট্যান্ডের দোকান, মহানগরীর সিটিবাস - সব জায়গায় বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এভাবেই জুবিন গার্গের প্রারম্ভিক পর্যায়ের 'অমানিশা' অথবা 'মায়া'র মতো ক্যাসেটের গানগুলির ব্যঞ্জনা মানুষকে বেঁধে ফেলেছিল। আশ্চর্যের কথা এই যে, সেই ঘোর লাগা, সেই মায়াবী আবেশ এক মুহূর্তের জন্যও অপসৃত হয়নি।
কিন্তু সে ছিল এক সুদীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। তিন দশকেরও অধিক কালের অবিসংবাদী যাত্রা যথার্থই জুবিন গার্গকে প্রজন্মের শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি যখন গান গাইতেন, তখন এমন মনে হতো জন্মভূমির শীতল মাটিতে সিক্ত একটু বিষাদ কোথাও যেন কঁকিয়ে উঠেছে, যা আমাদের বারে বারে টেনে নিয়ে গেছে দেবকান্ত বরুয়ার 'সাগর দেখিছা' নামের বিখ্যাত কবিতার সেই অবিনাশী চিত্রকল্পের কাছে - "মাজনিশা সাৰ পাই শুনিছানে কেতিয়াবা কেতেকীৰ হিয়া ভগা মাত" (মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে চাতকপাখির হৃদয়বিদারক কণ্ঠস্বর শুনেছ কি)। জুবিন গার্গের কণ্ঠস্বরই এক ধরনের বিলাপ করে, হৃদয় বিদীর্ণ করে। যেমন করে মাঝরাতে চাতক পাখির কণ্ঠস্বর একটি তরবারি হয়ে রাতের আঁধারকে বিদীর্ণ করে।গানের কথাতে যাবার আগেই তাঁর কণ্ঠস্বর প্রথমে হৃদয়কে দু'ভাগ করে দগ্ধ করে। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এই নির্বাক মানুষের কণ্ঠস্বর মাঝরাতের চাতকপাখি হয়ে অসমের আকাশ-বাতাসে বিলাপ করেছে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, ঘৃণা এবং কলুষতায় ভরে ওঠা রাজনৈতিক দুঃসময়ের প্রচ্ছায়ই যেন এই কণ্ঠস্বরকে আমাদের কাছ থেকে অকালে ছিনিয়ে নিল।
জাতপাত, ধর্ম, বর্ণহীন সাম্যের সমাজের পৃষ্ঠপোষকতা করাই শিল্পীর কাল হলো নাকি!
এই নির্বাক মানুষের কণ্ঠস্বরের এমন বিলাপ করে ওঠার ভিত্তি কী? রাজনৈতিক দিক থেকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, জুবিন গার্গ-এর আত্মপ্রকাশ করা নব্বইয়ের দশকটি অসমের জন্য ছিল একটা কাল-অমানিশার দশক। অসম আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নেতৃত্বহীনতা এবং অদূরদর্শিতা, গোষ্ঠী সংঘর্ষ, উগ্রপন্থী কার্যকলাপে বিপন্ন হয়ে পড়া জনজীবন। চারদিকে সেনা-তল্লাশি। উগ্রপন্থী খোঁজার নামে যেখানে সেখানে সেনাবাহিনীর উপদ্রব, যেখানে সেখানে তল্লাশি। গ্রামে গ্রামে যেন হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ এক সাধারণ ঘটনা। ক্রমে ক্রমে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে রচিত হলো ইতিহাসের এক জঘন্যতম অধ্যায়, যার নাম ছিল গুপ্ত হত্যা। স্বাধীন অসমের দাবিতে উগ্রপন্থীর মনোবল ভেঙে দেবার জন্য তাদের পরিবার-পরিজনকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে কোথাও ফেলে রেখে যাওয়া অথবা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সরকারি নীল নকশা। পাশে কেবল হতাশা ও চাপা উত্তেজনা। পুত্রহারা মায়ের, ভ্রাতৃহারা ভগ্নির, অথবা পতিহারা বিধবার ক্রন্দন। জুবিন গার্গের মাঝরাতে চাতক পাখির হৃদয় বিদীর্ণ করা স্বরের মতো নির্বাকের কণ্ঠস্বর, বিলাপগুলোর প্রেক্ষাপট সেই করুণতম রাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকেই উঠে এসেছিল নাকি! ১৯৯৫ সালে রচনা বলে উল্লেখ করা জুবিন গার্গের একটা অবিস্মরণীয় গান হচ্ছে - "সোণৰে সজোৱা পঁজা জহি-খহি যায়, কোনে আহি পাৰিবহি সাজিব দুনাই" (সোনার তৈরি কুটির ধ্বংস হয়ে যায়, কে এসে পারবে সাজাতে আবার)। বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যম প্রাগ নিউজের তদানিন্তন মুখ্য সম্পাদক অজিত কুমার ভূঞার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, ১৯৯৫ সালে একবার মুম্বাই থেকে গুয়াহাটিতে পা দিয়েই তিনি জানতে পারলেন যে তাঁর তিনজন বন্ধু 'হারিয়ে' গেছে। সেই ঘটনা তাঁকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে, এক রাতেই তিনি এই গানটি লিখে ফেলেছিলেন।
বিশ্বায়ন এবং উদারবাদী নীতির প্রভাবে যখন অসমের কৃষিক্ষেত্র দিনে দিনে রুগ্ণ হয়ে পড়ল, ক্ষুদ্র চাষিদের বিপন্ন অবস্থা তৈরি হলো এবং তার উপর চলল উগ্রপন্থী দমনের নামে সেনাবাহিনীর নির্বিচারে অত্যাচার, তখন অসমের গ্রামগুলি থেকে ছেলেমেয়েরা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পরিযাণ করতে শুরু করে। সুযোগ-সুবিধা ও অনেক সামর্থ্য থাকা এবং প্রতিভাবান যুবক দেশ ছেড়ে চলে যান ভাগ্যের অন্বেষণে। এই ছেলেমেয়েদের যৌবন-উদ্দাম প্রেম কাহিনিগুলির এক অনন্য এবং বাঙ্ময় প্রতিনিধিত্ব করছে 'রুমাল' শীর্ষক গানটি। গানটির সূচনার আবেদনই স্বতন্ত্র - "একবিংশ শতিকাৰ প্রেম কাহিনী, ৰুমালৰে আঁৰতে"... (একবিংশ শতকের প্রেম কাহিনি রুমালের আড়ালে)। জীবন জীবিকার সংগ্রাম, জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রাণাধিক প্রেয়সীও যখন কাছ থেকে হারিয়ে যায়, তখন আকাঙ্ক্ষিত লাল রুমাল কীভাবে বিবর্ণ হয়ে পড়ে - সেটাই যেন তিনি গানের মধ্য দিয়ে বলতে চেয়েছেন। 'একবিংশ শতকের প্রেম কাহিনি' বলে শুরু না করলে গানটি নিছক এক প্রেমের কাহিনিই হয়ে থাকত। কিন্তু এই কথার সংযোগ গানটিকে অনন্য মাত্রা এনে দেয়। কাজেই 'সোনার তৈরি কুটির'-এর মতোই 'রুমাল' গানটিও হয়ে উঠেছিল প্রতিনিধিত্বমূলক (representative)। অন্য একটি হৃদয়বিদারক গান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে লেখা - "কেউফালে গুজৰি-গুমৰি আহিলে বান, উটুৱাই নিলেহি গাঁওখন, সুখৰে ঘৰখন, পলকত মোক কৰিলে কঙাল।" (চারদিকে বিকট গর্জনে ধেয়ে আসা বন্যা ভাসিয়ে নিল গ্রামটি, চোখের পলকে ভেসে গেল গোয়ালঘরের গোরু দুটি, পলকে পলকে নিয়তি আমাকে করলো কাঙাল)।

রোমান্টিক বিষাদ, বিমূর্ত ভাবনা, প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা এবং আকুলতা জুবিন গার্গের গানের অন্যতম আকর্ষণ। ভূপেন হাজরিকার 'পোণেইৰ পোণাকণ' (আদরের শিশু) অথবা 'যুবক প্রশান্ত দাস আৰু (এবং) যুবতী অনামিকা'র মতো সমাজের স্থিতাবস্থাকে পরিবর্তন করতে চাওয়া গানের চিত্রকল্প জুবিন গার্গের গানে পাওয়া যাবেনা, কিন্তু আছে ঘুমপাড়ানি গানের মতো নিষ্ঠুর সময়ের বিবরণী, প্রজন্ম যেখানে অসহায়। উদারবাদী অর্থনীতির ভোগবাদ, মানবতার অবক্ষয়কেও যেন তিনি রোমান্টিক বিষাদের বিমূর্ত ভাবনায় গানের মধ্যে ধরে রেখেছেন। তাঁর অনেক গানে মৃত্যুচেতনা রয়েছে। পাশ্চাত্য সংগীত এবং লোকসংগীতের অপূর্ব সংশ্লেষণে সাজানো বৈপ্লবিক সংগীত জুবিন গার্গের সংগীতসমূহকে অনন্য করে তুলেছে। ইতিমধ্যে প্রচারিত অসংখ্য সাক্ষাৎকারের মধ্যে বিপুল অধ্যয়নশীল শিল্পীর অধ্যয়ন শৈলীর বিষয়ে জানার অবকাশ রয়ে গেছে। অনেক সময়ে তাঁর গানগুলি ভাস্কর্য শিল্পের মতো মনে হয়। গানগুলিকে যেন স্পর্শ করে দেখা যায়। আস্তে আস্তে বিলাপ করে গায়। অসমিয়া গানে এত করুণ সুর আগে ছিলনা জন্যই তাঁর গায়কি আমাদের নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক সামগ্রিক শোকের পরিবেশের দিকে বারে বারে নিয়ে যায়। শেষ পর্যায়ে 'ৰাজনীতি নকৰিবা বন্ধু' (রাজনীতি করবে না বন্ধু) বলে তিনি সমাজ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ব্যঙ্গাত্মক গান গেয়েছেন। জুবিন গার্গ যখন সঙ্গীত পরিবেশন করতেন তখন শ্রোতার সঙ্গে, বিশেষ করে যুবপ্রজন্মের শ্রোতার সঙ্গে যে অপূর্ব সাংগীতিক সংযোগ ঘটত, তা অনুষ্ঠানস্থলে নিজে কখনো উপস্থিত না থাকলে বোঝানো কঠিন। সমগ্র অনুষ্ঠানস্থল যেন উদ্দাম হয়ে উঠত এবং গানের ছন্দ শিরায় শিরায় প্রবাহিত হতো। অনুষ্ঠানস্থলে পা রাখার জায়গা থাকতো না। দশকের পর দশক ধরে তিনি এই আবেশ ধরে রেখেছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সেই সঙ্গে এই শিল্পী হয়ে উঠেছেন এক আরাধ্য সত্তা (cult figure) - যার মহিমা কোনোভাবেই নস্যাৎ করা যাবেনা।

গীতি-সাহিত্যে সমাজের স্থিতাবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ জানানো গানের বাণী জুবিন গার্গের গানে প্রায় পাওয়া না গেলেও, কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্র 'কাঞ্চনজঙ্ঘা'য় বিদ্রোহী জুবিন গার্গের চমৎকার উপস্থিতি আমাদের স্তম্ভিত করে তোলে। এখানে প্রোটাগনিস্ট চরিত্র হিসেবে বারে বারে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে সিস্টেমকে - জাতি-ধর্ম-বর্ণবাদ আচ্ছাদিত সিস্টেমে আশাহত হয়ে পড়া যুব প্রজন্মের বেদনাকে। তিনি বলছেন প্রয়োজন সাপেক্ষে মোক্ষমঅবস্থান নিতে। বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার বিপ্লবী আদর্শের সঙ্গে অর্নেস্ট চে'গুয়েভারার বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত বলে নিজেকে পর্যায়ক্রমে সোশ্যাল লেফ্টিস্ট, সোশ্যালিস্ট এবং কমিউনিস্ট বলে ঘোষণা করেছেন। বিজেপি সরকারের শাসনে ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামো ভেঙে দিয়ে আরএসএস'র হিন্দুত্ববাদী দর্শন এবং হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার সময়ে তিনি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন - "মোৰ কোনো জাতি নাই, মোৰ কোনো ধর্ম নাই, মোৰ কোনো ভগবান নাই, মই মুক্ত" (আমার কোনো জাতি নেই, আমার কোনো ধর্ম নেই, আমার কোনো ভগবান নেই, আমি মুক্ত)। মূলত এটা 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' চলচ্চিত্রের মূল প্রোটাগনিস্টের একটা সংলাপ, যে চরিত্রে জুবিন গার্গ নিজেই অভিনয় করেছেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের সংলাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না রেখে জুবিন গার্গ একে নিজের শিল্প দর্শনের সঙ্গে একাকার করে দিয়েছেন। অনেক সময়ই তিনি বলেছেন - "মই বামুন যদিও মোৰ লগুণ নাই" (আমি ব্রাহ্মণ যদিও আমার পইতা নেই)। গায়ের জামাটিকে তুলে ধরে দেখিয়ে দেন যে সত্যিই তাঁর পইতা নেই। অবশ্য কোনো ধর্মের প্রতি তাঁর মনে বিদ্বেষের মনোভাব ছিল না। বরং সবাইকে একত্রিত করার নীতিতেই তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। একটা সময়ে বিহুর মঞ্চে 'হিন্দি গান চলবে না' বলে উগ্রপন্থী সংগঠনের দেওয়া হুমকিকেও একক প্রচেষ্টায় কঠোরভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তিনি।

আশ্চর্যের কথা এই যে, শিল্পীর একাংশ তোষামোদকারী এবং চাটুকার ডান-বাঁ দিক থেকে ঘিরে ধরে তাঁকে 'খেয়ালি' বা 'বোহেমিয়ান শিল্পী' বলে প্রচার চালিয়েছিল এবং প্রগতিশীল অংশ থেকে দূরত্বে রেখে দিয়েছিল। শিল্পীর স্বভাবজাত সরলতাকে 'শিশুমন' বলে প্রচার চালানো হয়েছিল। তার চেয়েও আশ্চর্যের কথা, প্রগতিশীল এবং বৌদ্ধিক সমাজেরও অধিকাংশই জুবিন গার্গের এই উত্তরণের পথটিকে উপেক্ষা করে তাঁকে প্রায় ব্রাত্য করেই রেখেছিল। অবশ্য প্রগতিশীলদের মধ্যে তরুণ প্রজন্মের বেশিরভাগই সিএএ আইন বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সময় দেওয়া তাঁর মতামত সমূহকে গুরুত্ব প্রদান করে জুবিন গার্গের শিল্প দর্শনের সঠিক মূল্যায়ন করতে অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। প্রগতিশীল, বামপন্থী ছাত্রসমাজ, জাতীয়তাবাদী শিবির - সবার প্রতি তিনি সাড়া দিয়েছেন। সে যেই হোন না কেন, বর্ণবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজের জন্য অনবরত সোচ্চার হয়ে থাকা জুবিন গার্গের প্রগতিশীল কণ্ঠটির প্রতি সমসাময়িক বৌদ্ধিক সমাজ সময়মতো মনোনিবেশ করলে হয়তো বা তাঁকে এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে হারাতে হতো না। মনে হয় হিন্দুত্ববাদী প্রবণতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে সমাজে প্রদান করা নিরাপত্তা থেকে জুবিন গার্গ যেন সবসময় বঞ্চিত এবং উপেক্ষিত রয়ে গেছেন। প্রতিভার লালন-পালনের জন্য সমাজ যথাযথভাবে সাড়া না দিলে লম্পটদের হাতে প্রতিভা কীভাবে চক্রান্তের বলি হয়, জুবিন গার্গ কি তার সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ নয়?
আসলে জুবিন গার্গ নিজেকে বারে বারে সোশ্যাল লেফ্টিস্ট, সোশ্যালিস্ট বা কমিউনিস্ট বলার পরেও প্রগতিশীল সমাজ তাঁকে উপেক্ষা করে আদর্শগত সীমাবদ্ধতা থেকেই। জুবিন গার্গ সমগ্র জীবনে যা চেয়েছিলেন, যার জন্য তাঁর আকুলতা ছিল, তা ছিল শিল্পের এবং শিল্পীর স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা পুকুরের ঘোলা জলে আবদ্ধ থাকা ব্যাঙের স্বাধীনতা নয়। শিল্পীসত্তা সব সময় পরিবর্তনকামী এবং স্বাধীনতাকামী। তিনি পার ভেঙে যেতে চান। এই স্বাধীনতার আকুলতার জন্যই একজন বৈপ্লবিক সাংগীতিক প্রতিভাধর অনন্য ব্যক্তিত্ব রোমান্টিক বিমূর্ততা এবং বিষাদের অশ্রু থেকে নিজের শিল্পীসত্তাকে অহরহ উত্তরণের দিকে টেনে এনেছিলেন।
সোশ্যাল লেফ্টিস্ট, সোশ্যালিস্ট বা কমিউনিস্ট বলার সময় তিনি মার্কস, এঙ্গেলস, মাও জে দঙের মতো নেতাদের বইপত্র বা গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছিলেন কিনা সে কথা জানা যায়না। কিন্তু তিনি ম্যাক্সিম গর্কি, দস্তয়েভস্কি'র লেখা পড়েছিলেন বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নিজেই ব্যক্ত করেছেন। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, মৃত্যুর সময়ে তিনি যেন এক পর্বান্তরের (metamorphosis) মধ্যে ছিলেন। জুবিন গার্গের সত্তার ভেতরে থাকা বিদ্রোহী মানুষটিকে (rebel) অনেকেই সময়মতো উপলব্ধি করতে পারলেন না।

ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গেও তিনি জড়িত হয়েছিলেন। সদস্য পদ নিয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ৩০ অক্টোবর অসমের বিভিন্ন স্থানে উগ্রপন্থীদের ভয়ংকর বোমা বিস্ফোরণে শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনার পর গণনাট্য সংঘের শিল্পীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি অনুষ্ঠান করেছিলেন। কিন্তু বিরাট প্রতিভাধর এই শিল্পীকে সেইসময়ের গণনাট্য সংঘের চর্বিতচর্বণ এবং নিরস কার্যপ্রণালী হয়তো ধরে রাখতে পারেনি। তিনি অনেকটা পথ এগিয়েছিলেন। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের মধ্যে হয়তো তাঁর সন্ধান করা বৈপ্লবিক চেতনায় উজ্জীবিত সহযাত্রীকে তিনি খুঁজে পাননি। তাই তিনি একাকীই অগ্রসর হন।

অত্যন্ত জটিল সময়ে জুবিন গার্গ অসমিয়া লোকসংগীতের ধারাটিকে নতুন করে উজ্জীবিত এবং সম্প্রসারিত রূপ দিলেন গানগুলিকে নতুনভাবে পরিবেশন করে। রিমিক্স-এর নামে একটা সময়ে অনেক কণ্ঠশিল্পী লোকসঙ্গীতের মূলভাব বিকৃতভাবে উপস্থাপনা করেছিলেন। কিন্তু জুবিন গার্গ সবসময় অবিকল রূপেই লোকসংগীত পরিবেশন করেছেন। এই ক্ষেত্রে বিহুগীতের প্রসঙ্গটিই বেশি করে চর্চা হলেও বিভিন্ন ভক্তিমূলক গান, রাসের গান, ফাগুয়ার গান, টোকারি গান ইত্যাদি নতুন করে গেয়ে লোকসংগীতের ধারাটিকে এক নতুন মাত্রা দেন। জুবিন গার্গের টোকারি গানের পরিবেশনা আমাদের চোখে অশ্রুধারা নামিয়ে আনে। পার্বতী প্রসাদ বড়ুয়া, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, নবকান্ত বড়ুয়া, ভূপেন হাজারিকার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের রচিত গানগুলিও তাঁর কণ্ঠে নতুন করে প্রাণ পেয়েছিল। তেমনি বড়ো, রাভা, কার্বি, ডিমাছার মতো জনগোষ্ঠী সমূহের গানও তিনি গেয়েছিলেন অথবা নিজের গানের অংশ করে নিয়েছিলেন। জুবিন গার্গের প্রকৃতি, জীবজন্তুও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদ, স্পষ্ট বাক্ এবং সরলতার স্বরূপ এতটাই প্রকাশ্য ছিল যে, অনেক সময়ই তা যেন অসাধারণ মনে হতো। বন্যার সময় পথে নেমে তিনি বন্যাত্রাণ সংগ্রহ করেছেন।



কেবল সংগীত, চলচ্চিত্রবা অভিনয়ের পারদর্শিতার জন্যই নয়, বিরল ধরনের মানবিক চেতনার অধিকারী হওয়ার জন্যই তাঁকে মানুষ এত আপন করে নেন যে, তাঁর প্রয়াণে সমবেত হওয়া মানুষ, ন্যায়বিচার চেয়ে ডিজিটাল সংগ্রাম - এই সমস্ত কিছুই রেকর্ড স্থাপন করেছে। তাঁর সমাধিস্থলে প্রতিদিন অগণিত মানুষের স্রোত বইছে। হিন্দুত্ববাদী প্রবণতা ছড়িয়ে দিয়ে সমাজটাকে তছনচ করার ষড়যন্ত্রের মুখে জুবিন গার্গ যেন হয়ে উঠেছেন জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে মানবতাবাদের এক বিরল প্রতীক, যে প্রতীক অসমভূমিকে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির এক পূন্যভূমিতে পরিণত করে তুলেছে।
জুবিন গার্গের কর্মকাণ্ডের সঠিক মূল্যায়নই শিল্পীকে আমাদের মধ্যে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
(ভাষান্তর: সন্দীপ দে)
চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: সাংবাদিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও নিবন্ধকার। নিবাস: গুয়াহাটি, অসম।