শিল্পী জুবিন গার্গ স্মরণে

ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর জুবিন গার্গ



নরেন পাটগিরি


জুবিন গার্গের রহস্যজনক মৃত্যুর ন্যায়বিচার দাবি করা যেমন জরুরি, একইভাবে তাঁর অকাল মৃত্যুর জন্য প্রকৃত দায়ী যে ভোগবাদ, সেটাও জুবিন অনুরাগীদের জানা প্রয়োজন। ভোগবাদ দেশের এবং বিশেষ করে রাজ্যের শিল্প ও সংস্কৃতিকে পণ্য সামগ্রীতে পরিবর্তন করার জন্য অহরহ অবিরত অপপ্রয়াস চালিয়ে আসছে। ভোগবাদ বহুজাতিক (সংস্থার) মতবাদের সর্বশেষ সন্তান। এই ভোগবাদের ভয়াবহ হুমকির বলি হলেন জুবিন গার্গ। তাঁর বাধা-বন্ধনহীনস্বাধীন উন্মুক্ত মন, প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি এবং অতি স্পর্শকাতর স্বভাব একইসময়ে তাঁকে চুম্বকীয় গুণের অধিকারী করার সঙ্গে সঙ্গে ভোগবাদী ভীতি প্রদর্শনের শিকার হওয়ার দিকে টেনে নিয়ে যায়। জুবিনের মতো প্রচণ্ড আবেগ-অনুভূতিপ্রবণ, রাজাকে দেবতা না বলা অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের তোয়াক্কা না করা মেজাজের সমান্তরালভাবে সুগভীর সৃজনের স্রোতস্বিনী কথা-সুরের সম্মোহনকে ভোগবাদের পণ্যরূপে ব্যবহার করার জন্য তাঁকে 'আত্মা' বলে দাবি করা সরকারের অনুগ্রহে পালিত মদ্দা বাঁদরের দল মরণফাদের দিকে ঠেলে দিলো। মুনাফাখোর ভোগের লালসায় মত্ত বাজারটি জুবিনের আকাশলঙ্ঘী জনপ্রিয়তাকে ব্র্যান্ড রূপে ব্যবহার করার নামে তাঁর অসুরক্ষিত জীবনের সুযোগ নিয়ে ভয়ানক বিপদ ডেকে আনলো।

চলচ্চিত্র বিষয়ের অধ্যাপক মৌলি সেনাপতি একটি ইংরেজি নিবন্ধে লিখেছেন, ভোগবাদ এবং আন্তর্জাতিক বাজার অর্থনীতি শিল্প-সংস্কৃতিকে পণ্যে রূপান্তর করার পাশাপাশি শ্রোতা-দর্শকের রুচিকেও নিজের মতো করে তৈরি করতে চেষ্টা করে; মানুষের ইচ্ছাশক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আন্তর্জাতিক বাজারের বারাঙ্গনা ভোগবাদ সংগীত, নৃত্য ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নিজের মুনাফা লাভের জন্য শিল্পী সমাজকে মঞ্চ তৈরি করে দেয়। দর্শক কী শুনবেন, কী দেখবেন তার জন্য নীতি নির্ধারণ (algorithm) করে এবং ভাইরাল হওয়ার মতো তথাকথিত শিল্পপণ্য সৃষ্টি করে। এমন শিল্পপণ্য সমূহ জৈবিক বা মৌলিক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

করপোরেটের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিনোদন বলিউডের সংগীত কারখানাগুলো তথাকথিত 'ট্যালেন্ট হান্ট' ইত্যাদি বর্তমানে শিল্পীর সাফল্যকে নতুন করে সূত্রায়িত করতে নেমে পড়েছে। সামাজিক স্মৃতিতে রূপান্তরিত হওয়া একসময়ের জনপ্রিয় সংগীতগুলি এখন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাজস্ব (revenue) সংগ্রহের জন্য বিনোদনের বিষয় (content) হয়ে পড়েছে। লোক সাংস্কৃতিক পরম্পরাগুলি হয়ে উঠেছে দর্শক ধরা বরশি। ভোগবাদের দরবারে শিল্পীর সৃজন-সংহতির কথা নেই; মানবিশিষ্টতা বা গভীরতার প্রসঙ্গও অবান্তর; এখানে সাংস্কৃতিক কোনো সামগ্রীর বাজারদরই মুখ্য বিষয়। শিল্প-সংস্কৃতি আগে ছিল শ্রোতা দর্শকের আনন্দ-অভিজ্ঞতার সুকুমার আশ্রয়; এখন এই মানসিক অভিজ্ঞতাকে সুরার মতো সেবন করতে হয় এবং শিল্পীকে গণ্য করা হয় 'পারফরমিং মেশিন' (performing machine) রূপে। সাংবাদিক রীতা চৌধুরীর পডকাস্ট প্ল্যাটফর্মে জুবিন নিজেকে গান গাওয়া 'মেশিন' বলে আক্ষেপ করেছিলেন।

জুবিন ভোগবাদী বাজারের আগ্রসনটিকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন, সেজন্য মুম্বাইয়ের সর্বভোগী-এটিটিউড (attitude)-কে আলবিদা জানিয়ে নিজের মুলুকে (অসম) সংগীতচর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন। হিন্দি সিনেমার আগ্রাসন রুখতে মন দিয়েছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজে। তাই বহু সময়ে তিনি অর্থ সর্বস্ব ভোগবাদের ছদ্মবেশী জালে পা দেওয়া থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু রাজ্যের উচ্চপদস্থ আমলা এবং গৃহ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সহযোগিতায় শ্যামকানু মহন্তের মতো মূল্যবোধহীন স্বেচ্ছাচারী একজন ব্যবসায়ীকে করপোরেটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সরকার অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছিল। জুবিন যাতে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে না পারে, তাঁকে যাতে করপোরেটের মায়াজালের ঘেরাটোপের মধ্যে রাখা যায়, এজন্যই 'রঙালি', এজন্যই 'নর্থ-ইস্ট ফেস্টিভেল'-এর আয়োজন।

আসলে গুলি একটা, কিন্তু শিকার দুটো। এই গোটা যন্ত্রমূলক প্রক্রিয়াটিতে শ্যামকানু, সঞ্জীব নারায়ণ এবং বিজেপি'র যুব মোর্চার একসময়ের সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা ও জুবিন গার্গের আপ্ত সহায়ক সিদ্ধার্থ শর্মা সরাসরি সরকার এবং করপোরেটের চোখের ইশারায় জুবিনকে ঘিরে রাখা উচ্ছিষ্ট খাওয়া চাকর। জুবিন বলেছিলেন তাঁর সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। কিন্তু তিনি না গেলে কোনো একজন উদ্যোক্তা নাকি 'সুইসাইড' করবেন বলেছিলেন। এই উদ্যোক্তাটি কে? এক ধরনের ব্ল্যাকমেইল করে জুবিনকে জোর করে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জীবিতকালে জুবিন বিহু মঞ্চে এবং নানা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, 'আমি কাউকে ভয় করি না'। বর্তমান বিজেপি সরকার বা সরকারের প্রধান হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে ভয় না করার কথা স্পষ্টতই বলেছিলেন তিনি। একটি রাষ্ট্রীয় বৈদ্যুতিন মাধ্যমে তিনি স্পষ্টভাবে বর্তমানের মন্ত্রীদের দুর্নীতিগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছিলেন। এছাড়া বিহু মঞ্চে হাজার হাজার দর্শককে বিজেপি-কে ভোট না দেওয়ার জন্য খোলাখুলিভাবে আহ্বান জানিয়েছিলেন। 'গেরুয়া দলের কাজ নেই' বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমার কোনো ধর্ম নেই; আমার কোনো জাতি নেই; আমার কোনো ভগবান নেই; আমি মুক্ত, আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা।"

হিন্দুত্বের ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা ধর্মান্ধ বাতাবরণের মধ্যে দাঁড়িয়ে কে করতে পারে এমন দুঃসাহসিক মন্তব্য? শ্রদ্ধেয় ডক্টর ভূপেন হাজারিকাও পারেন নি; ডক্টর হীরেন গোহাঁই বা ডঃ নবীন শইকীয়াও বলতে পারেন নি এমন কথা। জুবিনের মধ্যে ছিল এক বিদ্রোহী তরুণ। তিনি উচ্চারণ করেছেন: "I am a rebel, I am Che Guevara". তাঁর 'গুরু' বিষ্ণুপ্রসাদ রাভাও শংকরদেব, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং চে গুয়েভারাকে সম্মান এবং শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেছেন। কিউবা সরকারের মন্ত্রীত্ব হেলায় ছেড়ে দিয়ে আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করার লক্ষ্যে জীবনপাত করার মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বলিভিয়ার জঙ্গলে গেরিলা যোদ্ধা চে গুয়েভারাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল। চে গুয়েভারাকে অনেকে রোমান্টিক বিপ্লবী বলেন এবং 'জুবিন জেনারেশন'কে জুবিন রোমান্টিক হওয়ার কথা বলেছিলেন। এই রোমান্টিকতার মধ্যে নিশ্চিতভাবে বিপ্লবী বাস্তবতাও আছে। তিনি কারো 'চাকর হতে পারেন না' - এমন কথা এবং গানগুলির জন্যই জুবিনের পিছনে দাঁড়িয়েছিল এক বিশাল জনশক্তি এবং এই জনশক্তিকে তিনি এক সাক্ষাৎকারে 'সমাজবাদী' হতে পরামর্শ দিয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজের গায়ের পইতা ছিঁড়ে ফেলা, জাত - পাত - ধর্মহীন - সংবেদনশীল মানবতার প্রোজ্জ্বল প্রতীক জুবিন গার্গের সমাধিস্থলে কেউ 'সর্বধর্ম মন্দির' নির্মাণের প্রস্তাব দিচ্ছে; তাঁকে ভগবানের সারিতে নিয়ে যাবার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, যাতে তাঁর মানবিক সত্তাটিকে লুকিয়ে রাখা যায়। প্রিয় জুবিনদা তাঁর সৃষ্টি করা সংগীতরাজির মাধ্যমে অসম এবং অনুরাগীদের মধ্যে একজন আপন মানুষ হয়ে থাকুন! সিএএ আন্দোলনের সময় সরকারের মন্ত্রী এবং শাসকদলের নেতাদের তিনি গানের মাধ্যমে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, 'পলিটিক্স নকরিবা বন্ধু' (পলিটিক্স করবে না বন্ধু)।

তিনি গাছপালা এবং জীবজন্তুর বন্ধু ছিলেন; গাছকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন; গাছের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কথা বলতেন। উদাসীন গার্গ কাটিয়েছেন অনেক অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। দীঘলি পুখুরির পারে সরকারের নির্বিচারে গাছ কাটার সময়ে জুবিন মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গাছ কাটার বিরোধিতা করে ঘোষণা করেছিলেন, "সমস্ত গাছ কেটে ফেলো, তারপর আমাকে কেটে ফেলো"। পরিবেশ রক্ষার জন্য জুবিন ছাড়া এমন নির্ভীক কথা আর কে বলতে পারে? জুবিনকে ভগবান সাজানোর দরকার নেই, তিনি চিরদিন হয়ে থাকুন মানুষের অধিকার এবং ন্যায়-যুদ্ধের সারথি।

তাঁর অকালমৃত্যু প্রমাণ করে গেল তাঁর পোষণ করা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর হিন্দু-মুসলমানের বিভেদবাদী রাজনীতিকে তাঁর অবাঞ্চিত মৃত্যু স্তব্ধ করে দিল; সম্প্রদায়িক রাজনীতিকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেললো। অথচ এমন সমাজহিতৈষী সমন্বয়ের সামাজিক বাতাবরণকে নোংরা রাজনীতির অভব্য বাগ্‌ধারায় আহত করারযে অপচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে ধিক্কার!

এইজন্যই জুবিন গার্গের ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধী মনোভাব যেকোনো কারণেই হোক শিল্পীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে অনেকেই আলোচনা করছেন।

এখন সংবাদ মাধ্যমে এক-দুজন করে জুবিনকে মানি মেশিন (money machine) হিসেবে ব্যবহার করে তাঁর আশেপাশে একধরনের বড়ো মাছির মতো ভনভন করতে থাকা ধূর্তরা মুখ খুলতে শুরু করেছে। এই ধরনের বড়ো মাছি কয়েকটির আসল চেহারার সঙ্গে জমিখোর আদানির মুখের মিল অস্পষ্টভাবে দেখা গেছে।

(মূল অসমিয়া থেকে ভাষান্তর: সন্দীপ দে)

চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, গবেষক, পত্রিকা সম্পাদক, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার ও তথ্যচিত্র পরিচালক। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ, অসম রাজ্য কমিটির সম্পাদক।