আমরা মুক্তোর মতো এক প্রতিভাকে দিনের আলোতে হারিয়ে রাতের অন্ধকারে খুঁজে ফিরছি। জনমানসে জুবিনের অনুপস্থিতি বর্তমান জুবিনের উপস্থিতি থেকেও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ আমাদের মতো বয়োজ্যেষ্ঠদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে — জুবিনের প্রতিভার নানা দিকের প্রতি আমাদের অবহেলা ও উদাসীনতা আজ অনুশোচনায় রূপান্তরিত করেছে।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়া এক আদরের ছোট্ট ছেলে। একটি গ্রামের মতো এক ছোট্ট শহর, একটি ছোটো ছেলের উদ্দেশ্যহীন সান্ধ্যভ্রমণ, একটি ছোটো বইয়ের দোকান, একটি ছোটো কবিতার বই — নাম 'তোমার গান'। ছোটো ছেলেটির ছোটো বুকের ভেতর বইয়ের নামটি যেন আঘাত করল। আবেগ আপ্লুত ছেলেটি 'তোমার গান' মানে নিজের গান বলে ভেবে নিল। দরদাম না করেই ছেলেটি বইটি কিনে ফেলল। বইয়ের লেখকের নামটি পড়ে দেখলো — হীরেন ভট্টাচার্য। নামটিও ভালো লাগল। বাড়ি ফিরে হাত-মুখ না ধুয়েই বইয়ের পাতা উলটাতে শুরু করল। এক জায়গায় এসে থমকে গেল —
"গানে কি আনে, সুৰৰ সোপানে সোপানে"
(গানে কী আনে, সুরের সোপানে সোপানে।)
ছেলেটি গানের ভেতরে আরও একটু ঢুকে পড়ল —
"গানে শাওণৰ আকাশৰ দৰে কান্দে
গানে ৰূপহী বিজুলী চমকেৰে হাঁহে।"
(গান শ্রাবণের আকাশের মতো কাঁদে/ গান রূপসী বিদ্যুতের মতো হেসে ওঠে)
ছেলেটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সেই বয়স, যৌবনে পা রাখা বয়স। বয়সের সন্ধিক্ষণে মনের নিভৃতে শিহরণ জাগানো সময়। অল্প কথায় হুহুকরে কেঁদে ওঠার বয়স, অল্প কথায় আনন্দে উচ্ছ্বসিত হওয়ার বয়স। মুহূর্তে পৃথিবীকে সুন্দর রূপে দেখা পাওয়া, আবার মুহূর্তেই কদর্য মনে হওয়ার বয়স। সমাজের অনিয়ম দেখামাত্র সমাজকে নতুন করে গড়ার ইচ্ছে জাগা, আবার পর মুহূর্তেই সমাজটিকে ভেঙে চুরমার করে দিতে ইচ্ছে করার বয়স। ছেলেটি হীরুদার এই গানে বহুদিন ধরে খুঁজে ফেরা প্রশ্নের এক ধরনের উত্তর পেয়ে গেল।

ছেলেটি তবলা বাজায়, একটু আধটু গানও গায়, সামান্য চর্চায় যে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারে। গুরুর কাছে তবলা শিখছে, কিন্তু কোথাও গান শেখেনি — শেখার বোধহয় প্রয়োজনও নেই। কারণ ছেলেটির হৃদয়ে গান আছে জন্মগতভাবেই, সুরও আছে জন্মগতভাবে। জুবিন বরঠাকুর নামের ছেলেটি হীরুদার গানটি সুরে সাজিয়ে ফেলল — হীরুদা টেরও পেলেন না। সাত বছর পর 'অনামিকা' ক্যাসেটের গানটি শুনে হীরুদা বিস্মিত হলেন। তখনো তিনি জুবিন বরঠাকুর নামের ছেলেটির মুখও দেখেননি। অষ্টম শ্রেণিতেই জুবিন নামের এক কিশোর কবি ও সংগীতপ্রতিভা এক বিশাল কবিপ্রতিভাকে স্পর্শ করল। দুই প্রজন্মের এক মনিকাঞ্চন সংযোগ ঘটল। 'জুবিন যুগ' নামে এক বিস্ফোরক সংগীতযুগ উন্মোচনের ভবিষ্যৎ ঘোষণা হলো।
জুবিনের শৈশবও ছিল ব্যতিক্রমী। শোনা যায়, ছয় মাস বয়সেই সে হাঁটতে শুরু করেছিল। সাধারণত একটি শিশু হাঁটতে শুরু করে নয় মাস থেকে বারো মাসের ভিতরে। সে ছিল দুরন্ত — কোথায় কখন চলে যায় ঠিক নেই। খোঁজ পেতে মা তার পায়ে ঘুঙুর বেঁধে রাখতেন। নিয়ম ভাঙতে চাওয়া শিশুটিকে শান্ত রাখতে মা একটি বড়ো মোড়া উলটো করে তার মধ্যে রেখে দিতেন। বাধা না দিলে শিশুটি শান্ত, বাধা দিলে হয়ে উঠে অবাধ্য, উশৃঙ্খল। মা ভাত খেতে বললে খায় না, ভাত খেতে নিষেধ করলে খায়। "শদিয়ালৈ নেযাবা, সতফুল নেখাবা" (শদিয়ায় যাবে না, সতফুল খাবে না) বললে জুবিনের প্রতিবাদী শিশুমনটি প্রতিবাদ করে বলতে চায় —
"শদিয়ানো কি আৰু উজাই যাম, গৈ গৈ চামপো নৈ পাম, মানস সৰোবৰত ৰাতিপুৱাৰ পৰত এবাৰ গা ধুই চাম"
(শদিয়া কি আরও উজানে যাব, যেতে যেতে চামপো নদী পাব, মানস সরোবরে ভোরহবার পর একবার স্নান করে দেখব)।
জুবিনের প্রতিবাদী সত্তার অঙ্কুরোদ্গম ঘটেছিল সেই শৈশবেই।

জুবিনের ছাত্রজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। একটার পর একটা স্কুল পাল্টাতে হয়েছে — তেজপুর, করিমগঞ্জ, বিজনী, তামুলপুর, যোরহাট এবং গুয়াহাটি। দু'বছর যদি ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছে, সারে তিন বছর বাংলা মাধ্যমে, আবার আড়াই বছর অসমিয়া মাধ্যমে পড়তে হয়েছে। ষান্মাসিক পরীক্ষায় যদি বাংলায় লিখেছে, বার্ষিকপরীক্ষা আবার অসমিয়ায় লিখেছে। মেধাবী ছাত্র হলেও জুবিন গতানুগতিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডিতে বন্দি হয়ে থাকার মতোছাত্র নয় জুবিন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ছিল তাঁর আসল 'পাঠশালা'। বিএসসি পরীক্ষার সময়ে পরীক্ষার হলে নিজের উত্তরপত্র ছিঁড়ে জুবিন তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানলেন। কাঁধে কিবোর্ড, হাতে গিটার নিয়ে সংস্কৃতি জগতের ভিতরে প্রবেশ করলেন, অনেক গভীরে প্রবেশ করলেন।বাঁশি ছাড়া সব বাদ্য বাজালেন, 'বিয়ানাম' ছাড়া সব গান গাইলেন। জুবিনের প্রিয় বিষয় ছিল ফিজিক্স আর ফিজিক্সের প্রিয় অধ্যায় ছিল 'শব্দ' (Sound)। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে জুবিন শব্দের মধ্যে সংগীতের ফিজিক্সের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সময় প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা শব্দ সংগ্রহ করে সংগীতের মধ্যে ঢুকিয়ে নিলেন। সেখানেও যদি কোনো ঘাটতি থাকে জুবিন শব্দ সন্ধানে রান্নাঘরে যায়। বাসনপত্র — থালা, বাটি, ঘটি, হাঁড়ি, লোটা, কড়াই, সসপ্যান, চাল রাখার ধামা, ডাল রাখার পাত্র, প্লাস্টিকের ঠোঙা ইত্যাদি কোনো একটা জিনিসও বাদ পড়ল না — সব কিছুই বাজিয়ে দেখতে চায় সে। প্রয়োজনীয় শব্দ ধ্বনি খুঁজে বার করে সে সংগীতে সংযোজন করে। প্রয়োজন সাপেক্ষে রক, জ্যাজ, রেগে, হিপ-হপ, রেগাটন ইত্যাদি সংগীতের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন সুষম সংগীত ধারার সৃষ্টি করে। সেই সংগীতধারা মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে — জুবিনও ঢুকে পড়লেন যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবার হৃদয়ে। আমরা বড়োরা উপলব্ধি না করলেও এভাবেই জুবিনের জনপ্রিয়তা স্তরে স্তরে দানা বেঁধেছিল জনতার হৃদয়ে।

যৌবনে পা রাখলেন জুবিন। ইতিমধ্যে জুবিন বরঠাকুর জুবিন গার্গ হয়ে উঠেছেন। পৃথিবীটা অল্প চেনা চেনা যেন মনে হতে লাগলো জুবিনের। অনুভব করলেন, পৃথিবীটা আসলে সুন্দর, কিন্তু কিছু শক্তি পৃথিবীর সেই সুন্দর হওয়াটা চায় না। জুবিন আশির দশকের অসম আন্দোলনের বিভীষিকা ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেননি, কারণ তখন তিনি ছোটো ছেলে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের রাষ্ট্র এবং সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সন্ত্রাস দেখেছেন। জুবিন বুঝতে পারলেন যে — শব্দ মানুষের সামাজিক শ্রমের অনুপম সৃষ্টি অর্থাৎ কথা বলার অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার, কিন্তু সেই অধিকার ব্যাহত হচ্ছে। সত্যের সমান কঠোর কিছুই নেই — এই সত্য আজ কারারুদ্ধ। জুবিন তা সহ্য করতে পারলেন না। তিনি প্রকাশ্যে গাইলেন —
"শব্দ যদি প্রেৰণা হয়
শব্দ যদি শকতি হয়
শব্দ আজি কিয় শংকিত
শব্দ যদি ব্রহ্মবৃক্ষ
শব্দ যদি চিৰশুদ্ধ
শব্দ আজি কিয় সংকুচিত
শব্দ আজি বাকৰুদ্ধ
শব্দ আজি কাৰাৰুদ্ধ
শব্দ আজি নিজেই নিজত আৱদ্ধ।"
(শব্দ যদি প্রেরণা হয়/ শব্দ যদি শক্তি হয়/ শব্দ আজ কেন শঙ্কিত/ শব্দ যদি ব্রহ্মবৃক্ষ/ শব্দ যদি চিরশুদ্ধ/ শব্দ আজ কেন সঙ্কুচিত/ শব্দ আজ বাক্রুদ্ধ/ শব্দ আজ কারারুদ্ধ/ শব্দ আজ নিজেই নিজেতে আবদ্ধ)।

বাবা মোহিনীমোহন (কপিল) বরঠাকুরের সঙ্গে জুবিন।
'সোণেৰে সজোৱা পঁজা' গানে জুবিন এভাবে আঁকলেন সেই সময়ের সন্ত্রাসজর্জরিত অসমের গ্রাম্যজীবনের ছবি —
"বুঢ়ী আইৰ জুহালতে চকুলো শুকায়
দেউতাৰো একে দশা পদূলিলৈ চায়
বহুদিন হল সৰু বোপাৰ মুখ দেখা নাই
চেনেহীৰ আকাশত জোন তৰা নাই
হালৰ গৰু গোহালিতে পথাৰো শুকায়
ৰাতি হলেই গুলিৰ শব্দ ৰজনজনায়।"
("বৃদ্ধা মায়ের অশ্রু রান্না ঘরেই শুকোয়/ বাবারও একই অবস্থা ঘরে ঢোকার রাস্তার দিকে চেয়ে থাকা/ বহুদিন হলো ছোটো ছেলেটির মুখ দেখিনি/ ভালোবাসার আকাশে চাঁদ তারা নেই/ হালের গোরু গোয়ালেই বন্দি, মাঠ ঘাট ও শুকায়/ রাত হলেই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ।)
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জুবিন আরও বললেন —
"মৃত্যু এতিয়া সহজ
মৃত্যু এতিয়া উছৱ"
(মৃত্যু এখন সহজ/ মৃত্যু এখন উৎসব।)
জুবিন সোনার অসম গড়তে শান্তি চাইলেন, শস্য চাইলেন, শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে মুক্তি চাইলেন —
"শান্তি দিয়া
মুক্তি দিয়া
সোণৰ অসম গঢ়িবলৈ"...
(শান্তি দাও/ মুক্তি দাও/সোনার অসম গড়তে...)
এভাবেই জুবিনের গানে রোমান্টিকতা থেকে বাস্তবতায় উত্তরণ, জুবিনের গানে সামাজিক চেতনার উন্মেষ। আমরা বড়োরা বুঝতে না পারলেও বিক্ষুব্ধ যুব সমাজের হৃদয়ে তরুণ জুবিন প্রবেশ করলেন। আমাদের বড়োদের উপলব্ধিতে না এলেও জুবিন গানের মাধ্যমে যুবসমাজের এক বিরাট অংশকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মানসিকভাবে সংঘটিত করলেন।

বাবা কপিল বরঠাকুর, স্ত্রী গরিমা শইকিয়া গার্গ, ছোটোবোন পামি বরঠাকুর এবং তাঁর দুই কন্যা।
সময় এগোলো। সময়ের সঙ্গে জুবিনের জনপ্রিয়তাও আকাশ ছুঁলো। জুবিনের বহুমুখী প্রতিভা পরিব্যাপ্ত হলো। জুবিন অনুরাগের ঢেউ উঠলো। একটা স্তাবক বাহিনীরও সৃষ্টি হলো। সংস্কৃতির ব্যবসায়ীদের জিভ লকলকিয়ে উঠলো। জুবিন চিৎকার করে বললেন — "মই পুঁজিবাদক ঘৃণা কৰোঁ।" (আমি পুঁজিবাদকে ঘৃণা করি)। সেই এই সময়ে জুবিনের পুঁজিবাদ বিরোধিতা অনুরাগীদের খুব একটা স্পর্শ করতে পারিনি। বিপদের লক্ষণ জুবিন বুঝতে পেরেছিলেন। তাই 'Water' কবিতায় সতর্ক করে বলেছিলেন —
"মোৰ প্রতিবাদী সত্তাৰ পরিধি
তহঁতে বুজি নাপাবি
মই নদীৰ পৰা সাগৰলৈ যাব পারোঁ
সাগৰৰ পৰা ঘূৰিও আহিব পারোঁ
মাথো মোৰ ৰং সলনি হ'ব
মোৰ সোৱাদ সলনি হ'ব
পাৰে পাৰে এৰি থৈ যাম অকল বালি
বালি বৰ হিংস্র
ঠান্ডাত শুকাই নিব তোৰ তেজ
গৰমত উখখাই দিব তোৰ দুভরি
খোজ কাঢ়িব পাৰ যদি আহিবি
মই চুমা খাম তোর ৰক্তাক্ত দুভৰিত।"
(আমার প্রতিবাদী সত্তার পরিধি/ তোরা বুঝতে পারবি না/ আমি নদী থেকে সাগরে যেতে পারবো/ সাগর থেকে নদীতে ঘুরেও আসতে পারবো/ শুধু আমার রং পরিবর্তন হবে/ আমার স্বাদের পরিবর্তন হবে/ পারে পারে রেখে যাব কেবল বালি/ বালি এবং বালি/ বালি খুব হিংস্র/ ঠান্ডায় শুকিয়ে দেবে তোর রক্ত/ গরমে পুড়িয়ে দেবে তোর দু'পা/ হাঁটতে যদি পারিস আসবি/ আমি চুমু খাব তোর রক্তাক্ত দু'পায়ে)।

সংস্কৃতির ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে নিশ্চুপ ছিল, কিন্তু সুযোগের সন্ধানে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই বিশ্বপুঁজিবাদ সংস্কৃতিকে পণ্যে রূপান্তরিত করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। এই পরিকল্পনার অন্তরায় ছিল বিশ্বের সমাজবাদী শিবির। নব্বইয়ের দশকে এই অন্তরায় কিছু পরিমাণে দুর্বল হয়। কিন্তু ২০০৮ সালে বিশ্ব পুঁজিপাদের সংকট পুঁজিবাদকে অধিক আগ্রাসী করে তোলে। সংস্কৃতির আঞ্চলিক ব্যবসায়ীরা পুঁজিবাদের উপকরণ হয়ে পড়ে। এই পরিবেশ জুবিনকে পরিবেষ্টিত করে রাখে। একদিনে ৩৬টি পর্যন্ত গান রেকর্ড করতে হয় জুবিনকে। তাঁর পরিশ্রমের বিনিময় মূল্য ভোগ করে ব্যবসায়ীরা। জুবিনের মতো প্রতিভাধর শিল্পীকে যন্ত্রে পরিণত করা হলো। সমাজবাদ সংস্কৃতিকে সম্পদ বলে গণ্য করে এবং জুবিন গার্গ সমাজবাদকে সমর্থন করে মঞ্চে 'লাল সালাম' দিতে শুরু করলেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, জুবিন বাঁহাতে 'লাল সালাম' দিয়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পোষণ করা তাঁর ঘৃণাকে আরও প্রকট করে তুললেন। তিনি প্রকাশ্যে উদাত্ত কণ্ঠে বললেন — "মই এজন সমাজবাদী, মই এজন বাঁওপন্থী। মোৰ আদর্শ ব্যক্তি হ'ল বিষ্ণুপ্রসাদ ৰাভা, চে গুৱেভাৰা, চার্লি চেপলিন।" (আমি একজন সমাজবাদী, আমি একজন বামপন্থী, আমার আদর্শ ব্যক্তি হলেন বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা, চে গুয়েভারা, চার্লি চ্যাপলিন)। জুবিন অতি সংবেদনশীল একজন যুবক, যন্ত্রবৎ জীবন তাঁকে বিব্রত করে, তাই কিছুক্ষণের জন্য হলেও তা থেকে মুক্ত হতে চায় জুবিন। ছেলেবেলার দিনগুলি ফিরে পেতে চায়। 'বন্য লৰালি' (বন্য শৈশব) চেয়ে জুবিন বললেন —
"সৰা শেৱালি দেখিলেই মোৰ মনত পৰে
সেই চোতালখনলৈ আৰু সেই পদূলিটোলৈ
য'ত এতিয়াও উশাহ লোওঁ মই
প্রতিডাল দুবৰিত মোৰ বন্যল'ৰালি...
সেউজ পথাৰ, বাউলি বা,সমাহিত সোণালী ধৰিত্রী,
মুকুলি আকাশ, এজাক বগলীৰ জিলমিলানি
কাউৰিৰ কা আৰু পাৰৰ ৰণ-ৰণনি
থুনুক-থানাক কাৰোবাৰ মাত
খিৰকীৰে ভাঁহি অহা গুঞ্জন, অস্ফুট কথোপকথন
স্মৃতিৰে ৰাঙলী মোৰ বন্যল'ৰালি।"
(ঝরা শেফালি ফুল দেখলেই মনে পড়ে যায়/ সেই উঠোনটা আর সেই দুয়ার মুখের কথা/ যেখানে আজও আমি প্রশ্বাস নিই/ (যার) প্রতিটি দূর্বাঘাসের ফাঁকে লুকিয়ে আছে আমার অবাধ আমার বন্য শৈশব.../ সবুজমাঠ, বাউল বাতাস, সমাহিত সোণালি ধরিত্রী,/ মুক্ত আকাশ একঝাঁক ঝলমলে বক/ কাকের কা কা আর পায়রার বাকবাকম/ কারও আধো আধো কথা/ জানালার ফাঁক গলে ভেসে আসা গুঞ্জন, অস্ফুট কথোপকথন/ স্মৃতিতে রাঙা আমার বন্য শৈশব)

জুবিন আবার বাস্তবে ফিরে আসে। পুঁজিবাদের তৈরি ভোগবাদী জীবনের যান্ত্রিকতার বিভীষিকা গানে চিত্রিত করেন —
"ৰাতিপুৱা শুই উঠি
যাবৰে হয় যে স্কুললৈ
গোধুৰ গোধুৰ পঢ়াৰ বোজা
কাঢ়িয়াওঁতে যায় দিন দূৰলৈ
স্কুলৰ শেষত টিউশন কৰি
ঘূৰি আহি একো নাপাওঁ বিচাৰি
হোমৱর্ক কৰি ভাগৰি
বিচনাৰ কোলাকে লওঁ সামৰি।"
(ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে/ যেতে হয় স্কুলে/ ভারি ভারি পড়ার বোঝা/ টানতে টানতেই দিনগুলো ফুরিয়ে যেত/ স্কুলের শেষে টিউশন সেরে/ ফিরে এসে নিজেকে আর খুঁজে পেতাম না/ হোমওয়ার্কে ক্লান্ত হয়ে/ শেষে আশ্রয় নিতাম বিছানার কোলে)
তিনি আরও বলেছেন —
"ৰাতিপুৱা শুই উঠি
চাহত শোহা মাৰি পেপাৰ পঢ়ি
একেই খবৰ একেই ছবি
একেই মৰামৰি ঠগাঠগি
ন বজাত গা ধুই উঠি
পেট পুজা কৰি কাপোৰ পিন্ধি
অফিচ কৰি দিনটো খাটি
আবেলি ঘূৰি আহোঁ চুচৰি
যন্ত্ৰ, আমি যেন যন্ত্ৰ।"
(সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে/ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজে চোখ রাখি/ একই হানাহানি, একই প্রতারণা/ ন'টায় স্নান সেরে/ খেয়েদেয়ে জামাকাপড় পরে/ অফিসে গিয়ে সারাদিন খেটে/ সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরা/ যন্ত্র, আমরা সবাই যেন যন্ত্র)।
এই গানের যন্ত্রসংগীত এবং হারমোনাইজেশনের মধ্যেও জুবিন ভোগবাদী দর্শনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত করেছেন। রান্নাঘরে থাকা বিভিন্ন বাসনপত্রের শব্দ এখানে যন্ত্রসংগীত হিসেবে ব্যবহার করেন এক বিরল সাংগীতিক দক্ষতায়। যান্ত্রিক জীবন মানুষকে উপেক্ষা করে, মানুষের সামাজিক দৃষ্টি ধূসর করে। এতে বিরূপ হন জুবিন। মানুষের এক নতুন সংস্করণ সৃষ্টির বাসনা জাগে তাঁর মনে। 'মেটামোরফোসিস' কবিতায় তিনি লেখেন —
"মই যদি ঈশ্বৰ হ'লোহেঁতেন...
দিলোহেঁতেন এটা মস্তিষ্ক
যি মস্তিষ্কত আস্ফালিত হ'ব
পরিবর্তন, আবর্তন আরু নিয়ন্ত্রণৰ ন ন সূত্র...
দিলোহেঁতেন এজুৰি Hi-Power চকু
যার মাজেদি সকলো সঁচা বস্তু দৃশ্যমান
দিলোহেঁতেন দুখন Extra কাণ
শুনিবলৈ সকলো অস্ফুট শব্দ, উশাহ-নিশাহ
হুমুনিয়াহ, হতাশা আরু সময়র পদধ্বনি।"
(আমি যদি ঈশ্বর হতাম/ দিতাম একটা মস্তিষ্ক/ যে মস্তিষ্কে আস্ফালিত হবে/ পরিবর্তন, আবর্তন এবং নিয়ন্ত্রণের নতুন নতুন সূত্র.../ দিতাম একজোড়া Hi-power চোখ/ যার মধ্য দিয়ে সব সত্য বস্তু দৃশ্যমান/ দিতাম দুটো Extra কান/ শুনতে সব অস্ফুট শব্দ, শ্বাসপ্রশ্বাস/ দীর্ঘশ্বাস, হতাশা এবং সময়ের পদধ্বনি...)
জুবিন ছিলেন প্রকৃতির সন্তান। তিনি গাছের সঙ্গে কথা বলতেন। পাখির সাথে, জীব-জন্তুর সঙ্গে কথা বলতেন। প্রকৃতির বুকে অনুরণিত সুর, শব্দ, লয়, সুর, শব্দ এবং ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। ঝড় এলে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে রাতের অন্ধকার, বিদ্যুৎ চমকের আলো এবং ঝড়ের ছন্দের সাংগীতিক সুসংহতি (Synchronization) খুঁজে বার করতেন। তাই জুবিন গেয়েছিলেন — "ধুমুহার সতে মোর বহু যুগরে নাচোন"। ঝড়ের তাণ্ডবে আহত একটি বাঁদর শাবক (মধুসূদন গার্গ), একটি কাক (কাকু গার্গ), একটি বক (উদাসিনী গার্গ) এবং একটি কাঠঠোকরা জুবিন আশ্রয় দিয়েছিল। জুবিনের পরিচর্যা এবং আতিথেয়তায় তারা হারিয়ে যেতে বসা জীবন ফিরে পেয়েছিল। তারা জুবিনের সঙ্গেই খেত, জুবিনের সঙ্গেই শুতো। কিন্তু জুবিন সাবার চেয়ে ভালোবাসত মানুষকে, মানুষের ঐক্যকে। নারী মানেই হলো প্রকৃতি। আমাদের সমাজের অবহেলিত, নির্যাতিত নারীসমাজকে মাতৃর মর্যাদা দিয়েছিল জুবিন। কিছুক্ষেত্রে নিজের পত্নী গরিমা শইকিয়া গার্গের মধ্যেও নিজের মাকে আবিষ্কার করেছিলেন জুবিন। বোধের কত উচ্চতায় বিচরণ করতে পারলে যে এমন অনুভূতিসম্পন্ন হওয়া যায়, জুবিন ছিলেন তার বিরল দৃষ্টান্ত।
জুবিন ছিলেন একজন গভীর মনোযোগী পাঠক। জুবিন কখন বইপত্র পড়ে তা তাঁর ঘনিষ্ঠরাও টের পেতেন না। কিন্তু কোনো একটা বিষয়ে তাঁর মন্তব্যে বিস্মিত হয়ে অনুভব করা যেত যে জুবিন একজন বইয়ের আগ্রাসী পাঠক। গান, সাহিত্য, সিনেমা, খেলা এবং দর্শন ছিল জুবিনের প্রিয় বিষয়। জুবিনের স্মৃতিশক্তি এবং ধীশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। একটি মাঝারি মাপের বই পড়তে একজন সাধারণ পাঠকের যদি দু'দিন লাগে, জুবিন সেই বই তিন ঘণ্টাতেই পড়ে শেষ করে ফেলতেন। বইয়ের কথাগুলি তাঁর মগজে ছবি হয়ে রয়ে যেত।
২০১৪ সালে অসমে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। প্রথম অবস্থায় জুবিন রাজ্যের কিছু পরিবর্তন হবে বলে কিছুটা আশাবাদী ছিলেন। দিন এগোয়। জুবিনের আশায় ঠান্ডা জল পড়লো। জুবিন প্রকাশ্যে বলে দিলেন, পরিবর্তন শব্দটি শুনতে ভালো, আসলে কিন্তু...। একটুও সঙ্কোচ না করে জুবিন গাইলেন —
"মন্ত্রী এমএলএ
পাপৰহে মাত্র
দেখিবলৈ খাদ্য
আচলতে শব্দ"।
(মন্ত্রী এমএলএ/ কেবলমাত্র পাপী/ দেখতে খাদ্য/ আসলে শব্দ।)
এই গানটির মধ্য শাসকদলকে দু'বেলা দু'মুঠো ভাত খুটে খুটে খাওয়া জনতার সঙ্গে কু-রাজনীতি না করতে সতর্ক করে দিয়ে জুবিন বললেন —
"জাতি মাটি ভেটি
আৰু প্রগতি
জাতি জনগোষ্ঠী
আছ লুটিপুতি"
(জাতি মাটি ভিটে/ এবং প্রগতি/ জাতি জনগোষ্ঠী/ নিচ্ছো লুটপাট করে)
সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। মনুবাদকে ঘষে মেজে মসৃণরূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা শুরু হলো। সমাজের বিভিন্ন অংশ বিশেষ করে যুবসমাজকে টার্গেট করা হলো। যুবসমাজের হৃদস্পন্দন জুবিন সমাজকে বিশেষ করে যুব সমাজকে এই বিপদের বিরুদ্ধে সচেতন করতে বললেন —
"মোৰ কোনো জাতি নাই
মোৰ কোনো ধৰ্ম নাই
মোৰ কোনো ভগৱান নাই
মই মুক্ত, মই কাঞ্চনজংঘা"
(আমার কোনো জাতি নেই/ আমার কোনো ধর্ম নেই/ আমার কোনো ভগবান নেই/ আমি মুক্ত, আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা)। এখানে জুবিন জাতি মানে জাতপাতকে বুঝিয়েছে।
উন্নয়নের নামে রাজ্য সরকার অসমের জমি প্রায় বিনামূল্যে অতিধনীদের হাতে তুলে দেয়, বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়, এমনকী গুয়াহাটির দীঘলিপুখুরির পারের কিছু গাছও সরকারি উদ্যোগে কাটা হয়। জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই প্রতিরোধের অংশীদার হয়ে জুবিন বলে ওঠেন, "কী ঘণ্টা হবে এসব করে, যেখানে গাছ কাটা দরকার সেখানে গাজ লাগাচ্ছে, যেখানে গাছ লাগানো প্রয়োজন সেখানে গাছ কাটছে।" জনগণের মাঝে বসে জুবিন সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "We cannot do it, because we don't need it." — "আমরা চাইনা, তাই আপনারা গাছ কাটতে পারেন না।"
জুবিন 'বুহুম' কবিতাতে বলেছেন —
"মোৰ উদং পথাৰতে তোৰ বৰ উৎপাত
মই গছৰ সন্তান
মই পাহাৰৰ সন্তান
মই নদীৰ সন্তান
মোক চুই দিলেই জ্বলি যায় এবুকু বহ্নিমান
মই তোৰ নহয়
মই প্রকৃতির সন্তান।"
(আমার খোলা জমিতে তোর বড্ড উৎপাত/ আমি গাছের সন্তান/ আমি পাহাড়ের সন্তান/ আমি নদীর সন্তান/ আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে জ্বলে যায় এইবুক বহ্নিমান/ আমি তোর নয়/ আমি প্রকৃতির সন্তান)
বায়ান্ন বছরের ছোট্ট জীবনকাল, কিন্তু তার মধ্যেও চল্লিশটা ভাষায় আটত্রিশ হাজারেরও বেশি গান, কতগুলো সিনেমা, বেশকিছু সিনেমা ও থিয়েটারের সংগীত পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, অভিনয়, ফুটবল এবং জনকল্যাণমূলক কাজ ইত্যাদির চাপে জুবিনের নিজের সাথে মুখোমুখি বসে কথা বলার সময়ও হলো না। জুবিনের প্রয়োজন ছিল নিজের সঙ্গে একা কথা বলার, ইচ্ছাও ছিল তাঁর। কিন্তু জুবিনকে যারা ঘিরে ছিল তাদের মধ্যে অন্তত কয়েকজনের বিষয়ে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলার খুবই প্রয়োজন ছিল। শুধু নিজের জন্যই নয়, আমাদের জন্যও এই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জুবিনকে নিজের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হল না।

জুবিন এক ব্যতিক্রমী এবং অতি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। প্রায় সমস্ত অতিপ্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের আচরণে কিছু স্ববিরোধ দেখা যায়। জুবিনের আচরণেও দেখা যায়সে কখনো অতিক্রুদ্ধ, কখনো শান্ত-সমাহিত, আবার কখনো উৎফুল্ল, আবার কখনো হতাশ। তাঁর এই মানসিক অবস্থাকে তিনি নিজেই Bipolar Disorder বলে উল্লেখ করেছেন। রেগে গেলে বা খুব বেশি আনন্দিত হলে জুবিন কখনো প্রকাশ্যে কিছু তথাকথিত অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করতেন। তার কিছু শব্দ অভিধান অনুমোদিত। জুবিনের গানের তালে তালে কিশোরেরা সবাই 'বোকা নৃত্য' (মাটিতে উদ্দাম নৃত্য) করে। এটি জুবিনের আবিষ্কার নয়। পৃথিবীর বহু লোককলায় এই নৃত্য রয়েছে। আমাদের আপত্তি শুধুমাত্র এইটিই যে,এই নৃত্য স্বতঃস্ফূর্ত হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু মদ্যপানে মাতাল করা উন্মাদনার নৃত্য হওয়া উচিত নয়।

দার্শনিকভাবে জুবিন ছিলেন বস্তুবাদী ও নাস্তিকতাবাদী। জুবিন বিশুদ্ধবাদের (Puritanism) বিরোধী ছিলেন। প্রকৃতিতে কোনো বস্তুই বিশুদ্ধ রূপে থাকে না, একটির সাথে আরেকটি সম্পর্কযুক্ত হয়ে থাকে। প্রকৃতির সব কিছু সব সময়ে সুন্দররূপে থাকে না; মানুষ প্রকৃতিকে সুন্দর রূপে সাজিয়ে তোলে। সেখানে মানুষের শ্রম নিহিত থাকে অর্থাৎ সংস্কৃতি শ্রমেরই সৃষ্টি। সংস্কৃতি নেতিবাচক থেকে ইতিবাচক দিকটি তুলে ধরে। সামগ্রিকতা এবং আংশিকতার সম্পর্কের মূল্যায়ন করে, সামগ্রিকতার প্রগতিশীল অংশকে নির্দিষ্ট করে বিকাশের গতিতে সংযোজিত করে এবং প্রাচীনের প্রগতিশীল অংশকেও নতুন করে সাজিয়ে তোলে। জুবিন এই দর্শনকেই অধ্যয়ন এবং অনুসরণ করেছিলেন। জুবিনের এই দর্শনে শাসক-শোষকরা মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। জুবিনকে ভাববাদের দিকে টেনে নেবার একটা প্রচেষ্টা চলছিল। সরকারি পক্ষের বুদ্ধিজীবী কয়েকজন কিছুটা চেষ্টাও করেছিলেন। এই বুদ্ধিজীবীরা বাইরে সমাজমুখী, ভেতরে ভোগবাদী। তাঁরা ভেতরে আস্তিকতাবাদী, বাইরে অজ্ঞেয়বাদী। তাঁরা জুবিনকে শরীর থেকে আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার পরামর্শ দিতে চায়। কিন্তু জুবিন আত্মার অস্তিত্বকে প্রকাশ্যে অসার বলেন। জুবিনের বৌদ্ধিক বিচরণ অতি উচ্চস্তরের, তা স্পর্শ করা এতটা সোজা ছিলনা। এ বিষয়ে বেশি করে টানাটানি শুরু হলে জুবিন আরও একধাপ ওপরে উঠে গিয়ে বলে ওঠেন — "I am socialist, I amleftist, I am communist"। জুবিন ক্রধান্বিত হন ভাববাদী দর্শনের ভণ্ডামিতে। দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে তিনি বলেছেন, "I was not like that, people have made me a machine." এখানে জুবিন 'People' শব্দটিতে জনসাধারণকে বোঝাননি, বুঝিয়েছেন পক্ষপাতদুষ্ট বুদ্ধিজীবীদের, সংস্কৃতির ব্যবসায়ীদের।


জুবিন ইউকেলিপটাস হতে চেয়েছিলেন, জুবিন কাঞ্চনজঙ্ঘা হতে চেয়েছিলেন, জুবিন সাগরের নিচে শুয়ে বিশ্ব প্রকৃতির সৃষ্টি অনুভব করতে চেয়েছিলেন। জুবিন ছিলেন অধ্যয়নঋদ্ধ এক যুবক, বইপত্রের চেয়েও মানুষের কাছ থেকে বেশি করে শিক্ষালাভ করা যুবক জুবিন, পৃথিবীর পাঠশালার খুব মেধাবী ছাত্র জুবিন। তাই জুবিন স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে ভালবাসতেন। কিন্তু জীবনের অন্তিম সাঁতারে সিঙ্গাপুরের সাগরে কোনো স্রোত ছিলনা, ছিল মাত্র ঢেউ, শঠতার ঢেউ। কাছে ছিল না সৃষ্টিশীলতার মান উপলব্ধি করার মতো কোনো সঙ্গী, ছিল মাত্র কয়েকজন রক্তপিপাসু সংস্কৃতি ব্যবসায়ী এবং সৃষ্টিশীলতাকে বিপথে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন মুনাফালোভী সরকারি পক্ষের সংস্কৃতি ব্যবসায়ী। তারা ভেবেছিল যে, জুবিন নেই মানে কোনো বিপদই নেই। কিন্তু অবর্তমান জুবিন এখন জনসাধারণের বুকে প্রতিবাদী জুবিনরূপে রূপান্তরিত হয়েছে। যতই জুবিনের মৃত্যুর তদন্ত ছলনার নামান্তর হয়ে উঠেছে, ততই প্রতিবাদের আগুন তীব্রভাবে জ্বলে উঠেছে। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ সরিয়ে রেখে মানুষ জুবিনের দর্শনের পক্ষে সমবেত হয়েছে। এখন জুবিন একজন গায়কই শুধু নন, একজন কবি বা গীতিকারই নন, একজন সংগীতকার বা চিত্রনাট্যকারই নন, চলচ্চিত্রের একজন নায়ক বা পরিচালকই নন, একজন স্বচ্ছ হৃদয়ের সরল ব্যক্তিত্বই নন — জুবিন এখন এক সামাজিক আন্দোলন। শাসক-শোষক শ্রেণি জুবিনকে ভগবান সাজাতে উঠেপড়ে লেগেছে, সাধারণ মানুষ সেই ভগবানের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে। সবাই সমস্বরে আওয়াজ তুলেছে — We want justice for Zubin — আমাদের ন্যায়বিচার চাই-ই চাই।
(মূল অসমিয়া থেকে ভাষান্তর: সন্দীপ দে)
চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: একজন প্রগতিশীল লেখক এবং পেশায় একজন চিকিৎসক। নিবাস: গুয়াহাটি, অসম।