খেলাধুলো

ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিশ্বজয়, ২০২৫: নেপথ্যের বিজ্ঞান



ড: তমোঘ্নী মান্না


নভেম্বরের শীতল সন্ধ্যা। বিশ্বকাপের একদিনের ক্রিকেট ফাইনালে মুখোমুখি ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। লড়াই জমে উঠেছে। ভারতের মাটিতে খেলা। উত্তেজনায় সারা ভারতের সমর্থকদের হৃদস্পন্দনের গতি গেছে বেড়ে। ভারতের মেয়েরা কি পারবে? সবশেষে শক্তি, শৃঙ্খলা আর অদম্য আত্মবিশ্বাসের জোরে, ভারতের মেয়েদের ব্যাটে উঠলো ঝড়, বলে উঠলো আগুন আর ঘূর্ণি। আর ফিল্ডিংয়ে বিদ্যুতের গতি। অবশেষে ভারত জয়ী, বিশ্বজয়ী।

ভারতের এই জয়ের নেপথ্যে রয়েছে শারীরবিজ্ঞান

১. পেশির শক্তি ও সমন্বয়: আমাদের শরীরে এমন দু-ধরনের পেশি, স্লো টুইচ বা টাইপ-১ ও ফাস্ট টুইচ বা টাইপ-২ মাংসপেশি ফাইবার থাকে যাদের সঠিক সমন্বয়ে ক্রিকেট খেলায় প্রতি শট, প্রতি স্প্রিন্ট, প্রতি থ্রো নির্ভর করে। ফাস্ট টুইচ ফাইবার দেয় বিস্ফোরক শক্তি - বাউন্ডারি হাঁকানোর ক্ষমতা। স্লো টুইচ দেয় দীর্ঘক্ষণ ফিল্ডিং করার সহনশীলতা।

২. কার্ডিওভাসকুলার সহনশীলতা: সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের কার্ডিয়াক আউটপুট বাড়িয়ে অক্সিজেন চলে যায় প্রতিটি মাংসপেশিতে। "কার্ডিয়াক আউটপুট' হলো প্রতি মিনিটে হৃদয় কতটুকু রক্ত পাম্প করে তার পরিমাণ।
এটি হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতার অন্যতম প্রধান সূচক। এর একটি সুত্র আছে যেখানে, Stroke Volume (SV) = প্রতি বিটে হৃদয় থেকে বের হওয়া রক্তের পরিমাণ, এবং Heart Rate (HR) = প্রতি মিনিটে হৃদস্পন্দনের সংখ্যা।

স্বাভাবিক মান -

● কার্ডিয়াক আউটপুট: প্রায় (একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে) ৫ লিটার।
● স্ট্রোক ভলিউম: প্রায় ৭০ মিলিলিটার/বিট।
● হার্ট রেট: সাধারণত ৭০ বিট/মিনিট।

ব্যায়ামের সময় কার্ডিয়াক আউটপুট অনেক গুণ বেড়ে যায়, যেমন,

● বিশ্রামে = ৫-৬ লিটার/মিনিট।
● ভারী ব্যায়ামে = ২০-২৫ লিটার/মিনিট বা তার বেশি (খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে)।

কেন কার্ডিয়াক আউটপুট গুরুত্বপূর্ণ?

সহজ উত্তর, এটি টিস্যুকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে রক্তচাপ বজায় রাখে। ব্যায়াম ও স্ট্রেসে শরীরের চাহিদা মেটায় তাই দৌড়, ক্যাচ বা দ্রুত দিক পাল্টানোর সময়ও ক্লান্তি কম আসে।

৩. স্নায়ুতন্ত্রের তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া: ক্রিকেটে প্রতি মুহূর্তে বল কখন সুইং করবে, স্পিন কতটা হবে তার জন্য চোখ, মস্তিষ্ক ও পেশির মধ্যে দ্রুত সংকেত আদান-প্রদান জরুরি। যে কোনও খেলায় একজন খেলোয়াড়ের তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া (reaction time) যতো কম সময়ের হবে, ততো তার দক্ষতা হবে বেশী। বোলারের হাত থেকে বল ছাড়ার ০.৩-০.৪ সেকেন্ডের মধ্যে বল সম্পর্কে ধারণা নিয়ে, একজন ভালো ব্যাটারকে বল খেলতে হয়। এর জন্য দীর্ঘ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। যা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের তীক্ষ্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৪. হরমোনাল ব্যালান্স ও মানসিক দৃঢ়তা: চাপের সময় শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোন বেড়ে যায়। স্ট্রেস বা চাপের সময় অ্যাড্রিনালিন বা এপিনেফ্রিন হলো "লড়াই করো অথবা পালিয়ে যাও" (Fight-or-Flight) প্রতিক্রিয়ার মূল হরমোন, যা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে বার  হয়। অ্যাড্রিনালিন হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়িয়ে, পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে। শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে শরীরকে তাৎক্ষণিক বিপদ মোকাবিলা বা পালানোর জন্য প্রস্তুত করে তোলে। এটি শরীরকে সতর্ক ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করে, যা বিপদের মুহূর্তে জরুরি শক্তি জোগায়।

আমাদের শরীরের যেকোনো কাজের মতো খেলাধুলাতেও আরও তিনটে হরমোন, শেরোটোনিন, ডোপামিন এবং কর্টিজল বিশেষভাবে কার্যকারী। এর মধ্যে শেরোটোনিনকে আমরা 'হ্যাপি হরমোন' বলে থাকি। কারণ, এই হরমোন আমাদের মনের অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে, যা অবশ্যই খেলাধুলায় ভীষণভাবে প্রয়োজন। মনের দুশ্চিন্তায় খেলাধুলায় চাপ বাড়ে। দ্বিতীয় হরমোন, ডোপামিন। একে বলা হয় 'রিওয়ার্ড হরমোন' বা পুরস্কারের হরমোন। কোনো খেলোয়াড় যখন ভালো বল করে, ব্যাট করে বা ফিল্ডিং করে তখন তার মন খুশিতে ভরে  যায়। বেড়ে যায় ডোপামিন। যা খেলায় আরও উৎসাহ বাড়ায়, অনুপ্রাণিত করে। আর তৃতীয় হরমনটি হলো, কর্টিজল বা 'স্ট্রেস হরমোন'। নাম শুনে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কারণ, এটা সব সময় খারাপ নয়। কারণ এটি ট্রেস ম্যানেজমেন্টের কাজ করে।

৫. শক্তির বিপাক বা এনার্জি মেটাবোলিজম: দ্রত দৌড়ের সময় কাজ করে ATP-PC সিস্টেম, লম্বা ইনিংস ধরে রাখতে অ্যারোবিক মেটাবোলিজম, আর পাওয়ার শর্টের সময় অ্যানায়রোবিক গ্লাইকোলাইসিস - এই তিনটি শক্তি-ব্যবস্থার সমন্বয়ই ভারতীয় মেয়েদের মাঠে করেছে অপরাজেয়।

শেষ ওভারের শ্বাসরুদ্ধ মুহূর্তে আমাদের দেশের মেয়েরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তুলে আনল জয়ের পতাকা। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের নভেম্বর ২০২৫-এর এই জয় শুধু দক্ষতার নয়, বরং মানবদেহের শারীরবিজ্ঞানের এক অসাধারণ উপস্থাপনা। দেহ, মন, শক্তি, বিজ্ঞান - সব মিলে লেখা হয়েছে বিজয়ের মহাকাব্য।

ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল শুধু ম্যাচ জেতেনি, জিতেছে কোটি হৃদয় এবং প্রমাণ করেছে - নারীরাও শক্তি, নারীরাও প্রেরণা, নারীরাও ভারতের গৌরব।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ক্রীড়া বিজ্ঞানী। কলকাতা।