
প্রাণের শিল্পী প্রিয় কমরেড জুবিনদা,
এ চিঠির উত্তর কোনোদিন আসবে না জানি, তবুও লিখছি।
কমরেড মাও-সে-তুং তাঁর একটি লেখায় চিনের প্রাচীন লেখক জুমা চিয়েনকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, "যদিও সব মানুষ মরণশীল তবুও কোনো কোনো মৃত্যু 'তাই' পাহাড়ের চেয়ে ভারি, আবার কোনো কোনো মৃত্যু পাখির পালকের চেয়ে হালকা।"...
১৯ সেপ্টেম্বর (২০২৫) আকস্মিকভাবেই তুমি না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর থেকে উপরের কথাগুলি কেন জানিনা বার বার মনে হচ্ছে। না, অসম আমার জন্মস্থান হলেও দীর্ঘদিন ধরে কলকাতায় থাকার জন্য তোমার কোনো অনুষ্ঠান শোনার সুযোগ আমার হয়নি, এমনকী কোনোদিন সাক্ষাৎও হয়নি তোমার সঙ্গে। তবে তোমায় একজন ব্যতিক্রমী শিল্পী বলে জেনে এসেছি এবং তোমার কিছু গান অবশ্যই শোনা ছিল। মনে পড়ছে সেই কবে তোমার গাওয়া 'ইয়া আলি' যখন গানের ভুবনে ঝড় তুলেছে, তখন একদিন হঠাৎ গানটি শুনে একরকম বিস্মিত হয়ে পুত্র প্রত্যয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এটা কার গান রে? উত্তরে সে মজা করেই বলেছিল, কেন জান না? এটা তোমার 'দেশের শিল্পী' জুবিনের গান। শুনে অদ্ভুত এক ভালোলাগা, সেইসঙ্গে গর্বও অনুভব করেছিলাম। আমাদের অসমের গৌরব, দেশবরেণ্য শিল্পী শ্রদ্ধেয় ভূপেন হাজরিকা চলে যাবার পর তুমি তোমার অসামান্য প্রতিভার বিচ্ছুরণে আবার নতুন করে অসমকে ভারতের বুকে প্রতিষ্ঠা করেছো। জুবিনদা তোমাকে যে কীভাবে বোঝাব, তোমার এভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছি না, খুবই কষ্ট হচ্ছে। অনেকের মতো আমার জীবনেও অনেক প্রিয়জন, আত্মীয়, বন্ধু, প্রিয় কমরেড ও ভালোলাগা-ভালোবাসার শিল্পীকে হারানোর দুঃসহ বেদনা ছায়া ফেলেছে। কিন্তু তোমার এভাবে অসময়ে চলে যাবার অভিঘাত প্রতিমুহূর্তে মনের গহনে অদ্ভুতভাবে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে! লাখো-অযুত অসমবাসী তাঁদের 'হিয়ার আমঠু' প্রাণপ্রিয় তোমাকে অকালে হারানোয় যে নিদারুণ মনোবেদনা অনুভব করছে, আমি তা দূরে থেকেও গভীরভাবে অনুভব করতে পারছি। জুবিনদা তোমাকে বলি, ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিনই তোমার সেই জননন্দিত গান 'মায়াবিনী' শুনে চলেছি। আজ পর্যন্ত একটা দিনও তার বিরতি হয়নি।
জুবিনদা, সমাজ মাধ্যমে যখন দেখেছি তোমার অন্তিমযাত্রায় লাখো লাখো যন্ত্রণাকাতর মানুষের উদ্বেলিত স্রোত, তখন আমার শারীরিক উপস্থিতি সম্ভব না হলেও আমার মন ছুটে গিয়ে মিলে গিয়েছিল সেই শোকবিহ্বল জনস্রোতে। তোমার এই অন্তিমযাত্রার বিরল দৃশ্য প্রমাণ করে অসমবাসীর হৃদয়ে তোমার স্থান ছিল কতটা গভীরে। জুবিনদা, মনে পড়ে তুমি বলেছিলে রাজার মতো চলে যাবে তুমি এবং চলে যাবার পর অসম সাত দিন স্তব্ধ হয়ে থাকবে। কী অদ্ভুত সমাপতন! তোমার কথারই যেন আক্ষরিক প্রতিফলন দেখা গেল অসমের বুকে!
জুবিনদা, তোমারই দেওয়া অজস্র সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে তোমার সংগীতজীবন, অনন্য সৃষ্টি, অনবদ্য সংগীত উপস্থাপনা, নির্ভীক বক্তব্য, লড়াকু-বিপ্লবী মনোভাবের পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হয়েছি। এর মধ্য দিয়ে তোমার জীবনের আরও যে ছবি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়েছে তা হলো - তুমি ছিলে প্রকৃত অর্থেই একজন মানবপ্রেমী, প্রকৃতি ও পশুপ্রেমিক। খ্যাতির শীর্ষে উঠেও খুবই সাধারণ, মাটি সংলগ্ন জীবন কাটাতে ভালোবাসতে তুমি। নীরবে তুমি মানুষের জন্য কাজ করে গেছ। চে গুয়েভারার বিপ্লবী আদর্শে, বিষ্ণু রাভার সংগ্রামী চেতনায় এবং চার্লি চ্যাপলিনের সংগ্রামময় প্রতিভাদীপ্ত জীবনের আলোকে প্রাণিত তুমি নিজেকে কখনো বলেছো, 'সোশ্যিও লেফটিস্ট', আবার কখনো 'লেফটিস্ট'। তুমি এক নির্যাতিতা মেয়েকে উদ্ধার করে নিজের কন্যারূপে বরণ করে নিয়েছো, আবার শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার এক অসহায় মেয়ের জন্য আইনি লড়াই লড়ে তাকে আলোর পথ দেখিয়েছো, সহায় সম্বলহীন শিশুদের আশ্রয় দিয়েছো, অনেকেরই পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছো, সাধ্যমতো অনেকের চিকিৎসার জন্য সাহায্য করেছো। এ সবকিছুই তুমি করেছো নীরবে নিভৃতে। আবার গুয়াহাটি শহরে দীঘলিপুখুরিতে প্রশাসনের উদ্যোগে গাছকাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত করেছো। অকুতোভয় তুমি প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার, শাসকদল এবং নিজেকে দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী বলে জাহির করা মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করে তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছো। কামাখ্যায় অনুষ্ঠান করতে গিয়ে হাজারো জনতার সামনে মধ্যযুগীয় নারকীয় পশুবলি প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছো। আবার তোমাকেই দেখা গেছে অনুষ্ঠানমঞ্চে দাঁড়িয়ে দৃপ্তকণ্ঠে বলতে, "আমি ব্রাহ্মণের সন্তান, কিন্তু আমার পইতা ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি। আমার কোনো ধর্ম নেই - আমার কোনো জাতি নেই - আমার কোনো ভগবান নেই - আমি মুক্ত - আমিই কাঞ্চনজঙ্ঘা"...। এছাড়া অসমে যখন সিএএ-এনআরসি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন তোলাপাড়, ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘুদের উপর নির্মম অত্যাচার, নিপীড়ন ও তাঁদের নির্মমভাবে নাজেহাল করছে সরকার ও প্রশাসন, তখন সংগীতের মঞ্চ ছেড়ে এসে তুমি নির্দ্বিধায় এর তীব্র বিরোধিতা করেছো এবং অত্যাচারিত-দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছো। এইসমস্ত কারণে বিভিন্ন সময়ে তোমাকে রোষের মুখে পড়তে হয়েছে, অনেক প্রতিকূলতা ও তোমাকে সামলাতে হয়েছে। তবুও তুমি নিজের সিদ্ধান্তে ছিলেন অবিচল, দৃঢ়। কোনো বাধা-হুমকি তোমাকে টলাতে পারেনি। সমস্ত রকম বিভেদ-বিসংবাদের বিরুদ্ধে তুমি মানবতার কণ্ঠ ধ্বনিত করেছো। কোভিডের ভয়াবহ সংক্রমণকালে তুমি নিজে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন মুম্বাইয়ে গৃহবন্দি থাকার পর নিজের উদ্যোগে গাড়িতে গুয়াহাটিতে ফিরেই দুর্গত পীড়িত মানুষ, বৃদ্ধাবাসের অধিবাসী, অনাথ আশ্রমে থাকা শিশুদের সেবায় নীরবে অকাতরে অর্থব্যয় করেছো। যা তোমার সহমর্মিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক আদর্শের অনন্যসাধারণ নজির। তোমার তুলনা তুমি নিজেই। তুমি হয়ে উঠেছিলে সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল তারকা এবং ন্যায় ও অধিকারের সপক্ষে লড়াইয়ের এক নির্ভীক প্রতিবাদী চরিত্র।
তবে একথা বলতে দ্বিধা নেই, তোমার কিছু দুর্বিনীত আচরণ, অসংলগ্ন ও অসংযত জীবনযাপন অনেক সংগীতপ্রেমী-অনুরাগীর মতো আমাকেও বিব্রত ও ব্যথিত করেছে। সেসব মেনে নিতে পারিনি। তবুও তোমার জীবনের যে পর্বতপ্রমাণ ইতিবাচক দিক, বিস্ময় সৃষ্টিকারী সৃষ্টি ও শিল্প-প্রতিভা তাকে সাদরে কুর্নিশ জানিয়েছেন অসমবাসী। তোমার এই আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, আবার অন্যদিকে অসম তথা গোটাদেশে রাষ্টীয় মদতে হিংসাশ্রয়ী ধর্মীয় উন্মত্ততার আবহে প্রকাশ্যে ধর্মাচরণের বিরুদ্ধে নিজের অভিমত ব্যক্ত করা এবং শাসকদল ও সরকারের বিরুদ্ধে তর্জনী তোলা সত্ত্বেও তোমার অন্তিমযাত্রায় যেভাবে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, রাজনীতি নির্বিশেষে অসমের সমস্ত অংশের মানুষের দুর্বার স্রোত বয়ে যেতে দেখা গেছে, তা দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তোমার অসময়ে চলে যাবার মধ্য দিয়ে যেন প্রতিভাত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘবাণী -
"ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে"...
গানের সূত্রে দেশব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছিলে তুমি। অসমের মতো পশ্চিমবঙ্গেও ছিল তোমার বিপুল জনপ্রিয়তা। সুন্দর ঝরঝরে বাংলা বলতে তুমি। বলতে, "আমি আধা বাঙালি, আধা অসমিয়া।" তোমার গাওয়া অসংখ্য বাংলা গান জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছে। তোমার এই দুরন্ত মানসিকতা, উন্নত শিল্প-চেতনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের কথা যখন নানাস্তরে চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে, তখন পশ্চিমবঙ্গের কিছু শাসক-অনুগ্রহ প্রত্যাশী নীতি ও মেরুদণ্ডহীন তাঁবেদার 'শিল্পী'র নির্লজ্জ কুৎসিত ভূমিকা আমাদের লজ্জা দেয়। তোমার বহুমুখী প্রতিভা ও অসীম কীর্তির সামনে তাঁদের নিতান্তই ন্যুব্জ, বামন বলে মনে হয়। তোমার দৃষ্টি ছিল আকাশের দিকে। তাই হয়ত তুমি প্রায়ই বলতে ইউক্যালিপটাস হতে চাও, তোমার সাক্ষাৎকারে জেনেছি, তোমার আত্মজীবনী লেখার ভাবনা ছিল, তার শিরোনামও তুমি দিতে চেয়েছিলে 'ইউক্যালিপটাস'।
জুবিনদা, তোমার জীবনচর্যার মধ্য দিয়ে আমদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে, তুমি ছিলে একজন নির্ভীক দৃঢ়চেতা মানুষ, তোমার মধ্যে বিরাজ করত বিপ্লবী-বিদ্রোহী সত্তা। এক সাক্ষাৎকারে শুনেছি তুমি নিজের সম্পর্কে বলছো, "I am a rebel"। এর পরিচয় অসমবাসী পেয়েছেন বিভিন্ন সময়ে।
জুবিনদা, মনে পড়ে ২০১৩ সালে 'বিহু উৎসবে হিন্দি গান গাওয়া চলবে না' বলে উগ্রপন্থী সংগঠন আলফার একটা অংশ তোমায় হুমকি দিয়েছিল। তাদের মতে এতে নাকি Assamese culture-এ Negative influence পড়বে। তুমি তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করে বলেছিলে, এটা একটা পিছিয়ে পড়া ভাবনা । তুমি সেই নিষেধাজ্ঞাকে অগ্রাহ্য করেই বিহু উৎসবে হিন্দি গান পরিবেশন করেছিলে। এজন্য আলফা তোমায় গুলি করার হুমকি দেয়। তা সত্ত্বেও তুমি নিজের অবস্থানে অনড় ছিলে। এই আবহে অসম সরকার তোমাকে নিরাপত্তা দিতে চাইলে তুমি প্রথমে নিরাপত্তা নিতেই অস্বীকার করেছিলে, বলেছিলে, "মানুষ আমাকে বিভিন্ন স্থানে গান গাইতে ডাকে, তাঁরা আমাকে অনেক ভালোবাসে, মানুষের মাঝেই আমি নিরাপদ অনুভব করি।" পরে সেই আলফাই তোমাকে 'ভাইয়ের মতো' বলে সম্বোধন করে। তোমার মতো এমন নির্ভীক, দৃঢ়চেতা মনোভাব আর কোনো শিল্পীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
জুবিনদা, আমরা জেনেছি নিচু ক্লাসে থাকার সময়েই তোমার মধ্যে পাঠ্য বইয়ের বাইরের বিভিন্ন লেখকের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। তোমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বাবা মোহিনী মোহন বরঠাকুর 'কপিল ঠাকুর' ছদ্মনামে বেশ কিছু কবিতা ও গান রচনা করেছিলেন। বাড়িতে ছিল পড়াশোনার পরিবেশ। হয়তো বাড়ির এই পরিবেশ ছেলেবেলাতেই বইয়ের প্রতি তোমার সখ্য গড়ে দিতে সহায়ক হয়েছে। ভাবলে অবাক লাগে ক্লাস ফাইভ, সিক্স, সেভেন-এ পড়ার সময়ই তুমি ভিক্টর হুগো, মোপাসাঁ,আর. এল. স্টিভেনসন প্রমুখ বিদেশি লেখকের বই পড়ে ফেলেছিলে! তুমি পড়েছো ম্যাক্সিম গোর্কির বই। অসমিয়া, বাংলা, ইংরেজি যে কোনো ভাষার বইয়েরই তুমি ছিলে একনিষ্ঠ পাঠক। তোমার কাছের সঙ্গীদের সাক্ষাৎকার থেকেই জানা, তুমি খুব দ্রুত বই পড়তে পারতে। মাঝরাতে অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পর তুমি কোনো না কোনো বই পড়ে ঘুমোতে যেতে। বইয়ের প্রতি তোমার এই অদম্য প্রেম নিঃসন্দেহে তোমার চেতনাকে প্রস্ফুটিত করেছে। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তুমি বারবার বলেছো, "বই পড়ার অভ্যাস করুন, তাহলে আরও অনেক এগিয়ে যেতে পারবেন।" হতে পারে জীবনের অসীম অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞান তোমার মধ্যে সোশ্যালিস্ট, কমিউনিস্ট ভাবনাকে সঞ্জীবিত করেছিল। তাই তুমি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছিলে, "আমার কোনো জাতি নাই, আমার কোনো ধর্ম নাই, আমার কোনো ভগবান নাই, আমি মুক্ত।" বইয়ের প্রতি তোমার অদম্য ভালোবাসা এবং একজন নিবিড় পাঠক হিসেবে তোমার মধ্যে যে চেতনার আলোর বিচ্ছুরণ ঘটেছিল, তা থেকেই হয়তো এমন অমোঘ উচ্চারণ করতে পেরেছিলে - "কিতাব নথকা জাতিক গামোচাই বচাব নোৱাৰে" (বই না থাকা জাতিকে গামছা বাঁচাতে পারে না)।
জুবিনদা, অসমের নদী, পাহাড়, গাছগাছালি, পরিবেশের প্রতি যে তোমার দুর্বার আকর্ষণ ছিল তা আমরা জেনেছি। এই আকর্ষণেই তুমি মুম্বাইয়ে অর্জিত বিপুল খ্যাতি, যশ, প্রতিপত্তি হেলায় দূরে সরিয়ে রেখে ফিরে এসেছো তোমার প্রিয় অসমের মাটিতে। তুমি বলেছিলে, "আমার বোম্বে থেকে ঘুরে আসার কারণ হচ্ছে আমার কিছু liability আছে, liability to my people, কারণ তারাই আমাকে জন্ম দিয়েছে।" দেশে এই নজির আর কোথায়!
জুবিনদা, সাধারণ মানুষের প্রতি ছিল তোমার হৃদয়ের সংযোগ। বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎকারে তোমায় বলতে শুনেছি, "বেশি ধনী মানুষের সঙ্গে থেকে লাভ নেই। তারা জীবনকে বুঝতে পারে না। আমি ধনী মানুষের সঙ্গে থাকি না। রিকশাওয়ালা, পান দোকানি, ঠেলাওয়ালা এরা সব আমার বন্ধু। গুয়াহাটি শহরে কয়েকজন পাগল আছে, তারা আমাকে পাগলের মতোই ভালোবাসে, আমি তাদের কখনো পাগল বলি না। তারা আমাকে দেখলেই বলে ওঠে, জয় জুবিনদা। আমি সেভাবে থাকতেই ভালোবাসি।" তোমাকে বারে বারেই বলতে শুনেছি, "ধর্মটর্ম বাদ দাও, সোশ্যালিস্ট হও, নিজের জন্য কাজ করো, মানুষের জন্য কাজ করো। নিজে ভালো থাকো এবং মানুষকেও ভালো থাকতে শেখাও। মানুষের জীবন ভঙ্গুর, আমারা বেশিদিন থাকব না, অল্প দিনের জন্য আমরা এসেছি। তাই মানুষের জন্য, অসমের জন্য কাজ করে যেতে হবে আমাদের।" আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা তুমি উচ্চারণ করেছো - "মানুষকে দুঃখ দিয়ে ঈশ্বরকে পুজো করে লাভ নেই, দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়।"
তুমি মানুষকে যেমন ভালোবাসতে, তেমনি তোমার প্রিয় মাতৃভূমি অসমের প্রতি, অসমের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি তোমার ছিল গর্বিত অহংকার এবং অনন্ত শ্রদ্ধা। তুমি চেয়েছিলে অসমের বর্ণাঢ্য সংস্কৃতিকে দেশ-বিদেশের আঙিনায় ছড়িয়ে দিতে। তোমার এই অনুভব থেকে আমার মধ্যেও মাতৃভূমি অসমের প্রতি, অসমের সংস্কৃতির প্রতি অফুরান ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ আবার নতুন করে জাগ্রত হয়েছে। তোমার কথা ভেবেই এই সংস্কৃতির গভীরে অবগাহন করার আন্তরিক বাসনা নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। বলতে পারি তোমার জীবন থেকে আমার এ এক অমূল্য অর্জন।
জুবিনদা, তোমার সৃষ্টিশীল জীবনের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তুমি নানা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী (অন্তত দশ-বারোটি) ছিলে। একেবারে ছেলেবেলায় প্রথাগতভাবে তবলা শেখা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে একজন অসামান্য গীতিকার-সুরকার-সংগীত পরিচালক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলে। হয়ে উঠেছিলে সংগীত জগতের একজন মেধাসম্পন্ন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তুমি বিগত ৩৩ বছরে চল্লিশটি ভাষায় আটত্রিশ হাজারেরও বেশি গান করেছো। যা আমাদের দেশে এক বিরল নজির। চলচ্চিত্র নির্মাণ, চিত্রনাট্য রচনা, প্রযোজনা ও অভিনয়েও তুমি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছো। তোমার সর্বশেষ ছবি 'রৈ রৈ বিনালে' তার উজ্জ্বল উদাহরণ। এই ছবিতে তোমার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি।

'রৈ রৈ বিনালে' চলচ্চিত্রের দেওয়ালচিত্র।
জুবিনদা, তোমার বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন বর্ণময় জীবনের দিকে তাকালে আমার রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে শরৎচন্দ্রের লেখা একটি লাইন মনে পড়ে। শরৎচন্দ্র বিশ্বকবির ৭০তম জন্মদিনে এক অভিনন্দন পত্রে লিখেছিলেন, "তোমার পানে চাহিয়া বিস্ময়ের সীমা নাই"।
জুবিনদা, তোমার না থাকার অনুভব এখন নানভাবে উপলব্ধি করছি। ক্ষমতামত্ত সংকীর্ণতাবাদী ও বিভেদকামী মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বকবিরই অনন্য সৃষ্টি "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি" গানটি গাওয়ার জন্য করিমগঞ্জের একজন প্রবীণ কংগ্রেস কর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। 'বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত' গাওয়ার 'অপরাধে' রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। এর বিরুদ্ধে অবশ্য নানা স্তরে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়েছে। আমি নিশ্চিত, তুমি থাকলে অর্বাচীন মুখ্যমন্ত্রীর এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে গর্জে উঠতে।
প্রিয় জুবিনদা, তোমার এভাবে অসময়ে চলে যাওয়াটা কেবল অসমের নয়, গোটা দেশের অপূরণীয় ক্ষতি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় 'চে গুয়েভারার প্রতি' কবিতায় লিখেছিলেন, "চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।" তুমি চলে যাবার পর থেকে কেন জানিনা এই পঙ্ক্তিটি আমার মধ্যে বারে বারে অনুরণিত হচ্ছে। আমার কেবলই মনে হচ্ছে, তোমার এভাবে অকস্মাৎ চলে যাবার দায় কি কিছুটা হলেও আমাদের নেই? তোমার আত্মীয়-পরিজন, সংগীত জীবনের সহযাত্রী, অসমের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং প্রগতি সংস্কৃতির অভিযাত্রীরা একটু সজাগ ও সতর্ক থাকলে তোমার মতো একজন অনন্যসাধারণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে কি এভাবে অকালে হারাতে হতো? এসব প্রশ্ন আরও অনেকের মতোই এখন আমার মনের অন্দরে প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে।
জুবিনদা, তুমি জীবনের অনন্ত অভিজ্ঞতা, শিক্ষা এবং প্রগতি চেতনায় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে মানুষের সংলগ্নতায় নিবিষ্ট মনে সৃষ্টির কাজে মগ্ন থেকেছো, সমাজের নানা অন্যায়-অপহ্নবের বিরুদ্ধে নিজের তাগিদেই প্রতিবাদের লড়াইয়ে পথে নেমেছো। তোমার জীবনচর্যা থেকে আমরা এই উপলব্ধিতেই পৌঁছেছি যে, তোমার জীবনে অবাস্তবতা ও ভাববাদের কোনো স্থান নেই। কিন্তু আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করছি, কিছু মানুষ যাঁদের মধ্যে তোমার একনিষ্ঠ অনুরাগীও রয়েছেন, তাঁরা জেনে বা না জেনে তোমাকে 'ঈশ্বরপুত্র' সাজিয়ে, তোমার মন্দির গড়তে সচেষ্ট হয়েছেন। তোমার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায়, তোমাকে আকস্মিকভাবে হারানোর বেদনায় আবেগ তাড়িত হয়ে তোমার কিছু গুণমুগ্ধ শ্রোতা, অনুরাগীদের পাশাপাশি অগণিত সাধারণ মানুষ হয়ত এই উদ্যোগে শামিল হয়েছেন। কিন্তু তোমার জীবন থেকে যে শিক্ষা আমরা পেয়েছি তাতে মনে হয়, এই উদ্যোগ তোমার বিপ্লবী চরিত্র, চেতনাদীপ্ত জীবনকে কোনোভাবেই মহিমান্বিত করবে না। বরং তোমার সৃষ্টিকে তুলে ধরার পাশাপাশি যাবতীয় অন্যায়, অনৈতিকতা, সরকারের অপশাসন এবং বিভেদ-বিসংবাদের বিরুদ্ধে তোমার দৃঢ় ভূমিকা ও প্রতিবাদী চেতনাকে ছড়িয়ে দেবার মধ্য দিয়েই হবে তোমার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং সমাজের কল্যাণ।
জুবিনদা, তুমি ছিলে প্রকৃত অর্থেই একজন বলিষ্ঠ, দৃঢ়চেতা ও বিপ্লবী মনের মানুষ। যে কোনো প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়াই ছিল তোমার জীবনের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। সাময়িকভাবে তুমি থেমে গেলেও শেষ পর্যন্ত তুমি অগ্রসর হবেই - এই দৃঢ় প্রত্যয় জাগরূক ছিল তোমার মধ্যে। এই ভাবনা থেকেই সম্ভবত তুমি তোমার ডান বাহুর উল্কিতে লিখে রেখেছিলে তোমার অন্যতম প্রিয় শিল্পী চার্লি চ্যাপলিনের বিখ্যাত উক্তি - "I can fall, but never fail"...

জুবিনদা, সম্প্রতি সমাজ মাধ্যমে তোমার একটা সাক্ষাৎকার শুনলাম। সেখানে তোমায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, তোমার প্রিয় শব্দ কী? উত্তরে তুমি বলেছিলে, "আমার প্রিয় শব্দ 'স্বপ্ন', আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। I am a dreamer. 'dreamer'-এর থেকেও বড়ো একটা শব্দ আছে 'visionary' - এটা বেশি creative - এই শব্দটিও আমার ভালো লাগে।" স্বপ্নদর্শী তুমি অনেক স্বপ্ন নিয়ে পথ চলেছিলে। হঠাৎ করেই তোমার সেই পথচলা থেমে গেল যাদের তুমি বিশ্বাস করতে, তাদের মধ্যে কয়েকজনের কপট ষড়যন্ত্রে। তোমার মতো একজন বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন, হৃদয়বান শিল্পীর এভাবে চলে যাওয়া যেমন আমাদের কাছে হৃদয়বিদারক, তেমনি তোমার চলে যাওয়া নিয়ে যে ধোঁয়াশা ও সংশয় তৈরি হয়েছে, তা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। তাই অসমের লাখো-অযুত জুবিন-অনুরাগী এবং প্রগতিশীল মানুষের সঙ্গে আমিও কণ্ঠ মিলিয়ে তোমার এই আকস্মিক প্রস্থান-রহস্যের প্রকৃত তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছি।
তোমার সহধর্মিনী শ্রীমতী গরিমা গার্গ সহ দীর্ঘদিনের সহকর্মী, কাছের মানুষ, লড়াইয়ের সাথি ও শুভানুধ্যায়ীরা নিশ্চয় তোমার সৃষ্টিগুলি সংরক্ষণ করার কাজে এবং তোমার তৈরি 'কলাগুরু ফাউন্ডেশন'কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তোমার অসমাপ্ত কাজ পূর্ণ করার কাজে উদ্যোগী হবেন - সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, অসংখ্য জুবিন-অনুরাগীর মতো এটা আমারও বিনম্র প্রত্যাশা।
পরিশেষে জানাই, দেশ-বিদেশের অগণ্য সংগীতপ্রেমী এবং তোমার লাখো-অযুত অনুরাগীর মতো আমিও বিগত কয়েকদিন ধরে তোমার গান শুনেই হৃদয়-যন্ত্রণায় কিছুটা প্রলেপ দিতে চেয়েছি। তোমার একটি অনবদ্য সৃষ্টি 'মায়াবিনী' অজস্রবার শুনে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি, অনুপম শব্দচয়নে, অমলিন প্রেমের প্রতীক রূপে গানটির ভাবসৃষ্টিতে এবং অসাধারণ সুর সংযোজনা ও অনুপম কণ্ঠমাধুর্যে গানটিকে তুমি কোন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছো! কোনো সন্দেহ নেই, তোমার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে এই গানটি বিশ্বসংগীতের তালিকায় উপরের দিকেই স্থান পাবে বলে আমার বিশ্বাস। ইতিমধ্যেই গানটির একটি বাংলা ভার্সন সহ হিন্দি, ইংরেজি ও অন্যান্য বহু ভাষায় পরিবেশিত হচ্ছে। বাংলা ভার্সনে মূল সুরটাকে অটুট রেখে গানের বাণী অন্যভাবে লেখা হয়েছে । সন্দেহ নেই, এটিও একটি অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। আমি প্রাণের আবেগে তোমার এই গানটি মূল অসমিয়া ভাষা থেকে বাংলায় আক্ষরিক অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। আমার সীমিত জ্ঞানে নিশ্চিতভাবেই এটা একটি অক্ষম প্রয়াস। তবুও বাংলা গানের শিল্পী এবং পাঠকদের কথা ভেবে আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো - এই বিনীত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে জনমানুষের প্রাণপ্রিয় অনন্যসাধারণ শিল্পী হিসেবে তোমার প্রতি, তোমার অনন্ত সৃষ্টির প্রতি আমার অন্তরের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে চেয়েছি। আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় বন্ধু, প্রিয় পাঠক, বিশেষকরে তোমার অনুরাগী সংগীতপ্রেমীদের কিঞ্চিৎ সাড়া পেলে চিরঞ্জীব শিল্পী জুবিন গার্গের প্রতি আমার অন্তরের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ কিছুটা হলেও সার্থক হবে।
"মায়াবিনী রাতের বুকে
দেখা পেলাম তোমার ছবি
ধরা দিলে গোপনে এসে
হিয়ার কোণে...
তুমি যে আমার শুষ্ক মনে
হিমের শীতল বিন্দু
নেমে এসো রোদের নদী
আমার দেহে প্রতি প্রভাতে
ঝড়ের সাথে আমার
বহু যুগের নাচন
আঁধারও সত্য আমার
বহু দিনেরই আপন
নির্জনের গান আমার
শেষ হবে
ভাবি তোমার বুকে।
প্রতি শরতের প্রভাতী ফুল
বলবে তোমাকেই আমার কথা
প্রতি মেঘলা রাতের চাঁদ
বলবে তোমাকেই আমার ব্যথা
ঝড়ের সাথে আমার
বহু যুগেরই নাচন
আঁধারও সত্য আমার
বহুদিনেরই আপন
নির্জনের গান আমার
শেষ হবে
ভাবি তোমার বুকে।
দু'চোখে তোমার তাকালে
স্বপ্ন সরে গিয়ে বাস্তব নামে
ছুঁতে গেলেই আমার দু'হাতে
বাস্তব সরে গিয়ে স্বপ্ন আসে
ঝড়ের সাথে আমার
বহু যুগেরই নাচন
আঁধারও সত্য আমার
বহুদিনেরই আপন
নির্জনের গান আমার
শেষ হবে
ভাবি তোমার বুকে।
মায়াবিনী রাতের বুকে
দেখা পেলাম তোমার ছবি
ধরা দিলে গোপনে এসে
হিয়ার কোণে...
তুমি যে আমার শুষ্ক মনে
হিমের শীতল বিন্দু
নেমে এসো রোদের নদী
আমার দেহে প্রতি প্রভাতে।"
জুবিনদা, জীবনের প্রতি পদক্ষেপে, প্রতিক্ষণে, অসামান্য সব সৃষ্টিতে তুমি ব্যক্ত করেছো চিরন্তন আশাবাদ। তারই একটি উজ্জ্বল প্রতিভাস যেন মূর্ত হয়েছে তোমারই একটি বিখ্যাত গানে -
"যদি জীবনের রংগুলি লুকোচুরি খেলে
যদি আশার প্রদীপটি নিভু নিভু জ্বলে
তথাপি বন্ধু এগিয়ে যাবে
তথাপি বন্ধু এগিয়ে যাবে
পিছনে ঘুরে চাইবে না
যদি চাঁদ সূর্য তারাও মুখ ঢাকে
যদি মুক্ত আকাশের রোদও না হাসে
তথাপি বন্ধু মনোবল রাখবে
তথাপি বন্ধু মনোবল রাখবে
শেষে সবই পাবে
শেষে সবই পাবে...
জীবন পথে আছে ঘাত প্রতিঘাত
রাতের শেষে আছে প্রভাত"...
(অসমিয়া থেকে অনূদিত)
জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, "মানুষের মৃত্যু হ'লে তবুও মানব থেকে যায়।" আমাদের প্রিয় শিল্পী তুমি জুবিন গার্গ চলে গেছো সুরের জগৎ ছেড়ে না ফেরার দেশে, কিন্তু তোমার বর্ণিল স্মৃতি, তোমার অনন্য সৃষ্টি অগণিত সংগীতপ্রেমী এবং অসমবাসীর হৃদয়ে জাগরূক থাকবে বহুদিন।
গত ১৮ নভেম্বর, ২০২৫ তোমার ৫৩তম জন্মদিনে তোমার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে 'তোমার প্রতীক্ষায়' শীর্ষক যে কবিতাটি রচনা করেছিলাম, সেটি এখানে তুলে ধরে এই চিঠির সমাপ্তির রেখা টানছি -
"আজ এই মায়াবিনী রাতে
শুধু তোমাকেই মনে পড়ছে
এই বিষণ্ণ পল অনুপলে
তোমার গানই ভেসে আসছে।
এখন প্রতি প্রভাতের ফোটা ফুল
আমাদের তোমার কথাই বলছে
রাতের আকাশের চাঁদ তারাগুলি
তোমার শূন্যতায় যেন মুখ ঢাকছে।
তুমি বলেছিলে ঝড়ের সাথে
তোমার বহু যুগের নাচন
এখন আমাদের মনে উথালপাথাল ঝড়
তুমি ছাড়া আর কে থামাবে এই প্রলয় কাঁপন?
দু'চোখের দৃষ্টি থেকে আমাদের স্বপ্ন সরে যায়
বেদনায় ভাঙে বুক বাস্তবের কঠিন ছোঁয়ায়
এখন চারপাশে হিংসা বিভেদের প্রলম্বিত ছায়া
আমরা রয়েছি তোমার দৃপ্তকণ্ঠের অনন্ত প্রতীক্ষায়।
জুবিন, তুমি আমাদের শুষ্ক অশান্ত মনে
ভোরের শীতল শিশির বিন্দু
যত অপহ্নবের আঁধার ঘোচাতে এসো তুমি
পেরিয়ে গানের অপার সিন্ধু।"
লাল সেলাম প্রিয় কমরেড জুবিন গার্গ।
ইতি তোমার একান্ত গুণমুগ্ধ -
সন্দীপ দে
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫
চিত্র: অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী। কলকাতা।