
আমরা চিতায় অগ্নিসংযোগ করার সময় পর্যন্ত জুবিন গার্গের একটা শরীর ছিল। সেই শরীরটিকে আমরা দাহ করলাম সোনাপুরে — অ্যান্ড দ্য সাইট অব জুবিন গার্গ ওয়াজ লস্ট।
'রৈ রৈ বিনালে'-র একটা দৃশ্যে অন্ধ গায়ক নায়িকাকে তাঁর মা-বাবার মৃত্যুর কাহিনি বলে। নায়কের মনে হাড় কাঁপানো দুঃখ — "মা বহুত সোনকালেই মৰি গল। এতিয়াও মই মন গ'লেও মাৰ ফ'ট'খনো চাব নোৱাৰোঁ। কেতিয়াবা ভয় হয়, মই যদি মাৰ, মুখখনেই পাহৰি যাওঁ।" (মা অকালেই মরে গেলেন। এখন আমি ইচ্ছে করলেও ফটোটি দেখতে পারিনা। মাঝে মাঝে ভয় হয়, আমি যদি মা'র মুখটা ভুলে যাই)। এই দৃশ্যটি তখন কেন সেভাবে লেখা হয়েছিল, এখন আমার মনে নেই। কিন্তু এই ভয় এখনো রয়ে গেছে। দৃশ্যটি একটি অপস্রিয়মাণ সূর্যের মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ভয়।
অথচ মনে আছে জন বার্জারকে — "We never look at just one thing; we are always looking at the relation between things and ourselves."
জুবিন গার্গের শরীরটি নেই। কিন্তু ইমেজটি আছে। মানুষভেদে সেটিকে দেখার অনেক ধরন আছে। ভুলভাল নির্ধারণের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু আছে। অন্তর্ধান হওয়ার তেমন কোনো শঙ্কা নেই। অন্তত এখনও পর্যন্ত। যতদিন পর্যন্ত প্রজন্মান্তরের পরীক্ষাগারে তাঁকে দাঁড় করানো না হয়। আশা রয়েছে সেই পরীক্ষায় উড়ন্ত রঙের ডানায় উঠে পার হয়ে যাবে জুবিন গার্গ। কিন্তু আশার মধ্যেই নিরাশা রয়েছে। আমরা যখন সবাই চলে যাব, তখন নতুন অনুভূতি এবং ভাষা নিয়ে এক নতুন মানুষের দল পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে, চিনতে পারবেন কি জুবিন গার্গ নামের ধারণাটিকে?
ইতিহাস আছে, সমাজ এবং সময়ের জটিল সন্ধিক্ষণে জাতীয় সংস্কৃতিও নিজেকে পুনরুদ্ধার করে। অসম আন্দোলন আবার সজীব করে তুলেছিল জ্যোতিপ্রসাদ এবং বিষ্ণু রাভাকে। জুবিন গার্গের কণ্ঠের সেতু দিয়েই, স্বাধীনতার উদিত সূর্যের স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ার সময়ে, জাতি পুনরায় আবিষ্কার করেছিল গীতিকার অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরীকে। বিগত এক দশকে ছিন্নমূল এই প্রজন্ম নতুন করে খুঁজে পেয়েছে জয়ন্ত হাজরিকাকে। 'কি যে... মিঠা মিঠা' বলে এত আকুলভাবে কেউ কাউকে বলে না আজকাল। এই কথা শোনাতেই জয়ন্ত হাজরিকাকে নতুন আবিষ্কার। লকডাউনের পর থেকে বিশ্বসংগীতেও পরিবর্তন এসেছে। প্রায় দু' দশকের অ্যালবামের ধারণা বালির মধ্যে ঢুকে ছিল। বিগত পাঁচ বছরে সেই কাহিনিটিও নতুন করে লেখা হয়েছে।

'রৈ রৈ বিনালে' ছবির শুটিংয়ে জুবিন গার্গের সঙ্গে রাহুল।

উপমহাদেশের ধ্রুপদি সংগীত চর্চার ধারায় নুসরতের যে অবদান, আধুনিক অসমিয়া সংগীতের ইতিহাসে জুবিন গার্গের ভূমিকাও তেমন। ভূপেন হাজরিকার গীতিসাহিত্যের মধ্যে 'রূপকোঁয়রীয়' সংগীতের ধারা এক বিশ্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করেছিল। জুবিন গার্গের সুর এবং সংগীতের মধ্যে সেভাবে আধুনিক অসমিয়া গান একটা 'সাউন্ড' লাভ করলো। একই সময়ে আত্মপ্রকাশ করা এ. আর. রহমানের 'রোজা' এবং জুবিন গার্গের 'গানে কি আনে'র সুর সংযোজনা, সংগীত ব্যবস্থাপনা এবং ইন্সট্রুমেন্টালাইজেশনের দিকে লক্ষ করলে বিশ্বসংগীতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে স্থানীয় মেলোডির জন্য এক সর্বজনীন 'সাউন্ড'-এর সন্ধান করার সচেতন প্রয়াস দেখা যায়। আমরা যখন বলি — "জুবিনের গানে নিজেকে খুঁজে পাই" — তখন এই 'সাউন্ড'-টি আমাদের অবচেতনে সৃষ্টি করা জোয়ার-ভাঁটার কথাই মূলত বলে।
জুবিন গার্গ মঞ্চ থেকে নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, "তোমরা যখন বৃদ্ধ হবে, তখন এই গানগুলি তোমাদের সেই রোমান্টিসিজম ফিরিয়ে দেবে।" পৃথিবী থেকে রোমান্টিসিজম উধাও হয়ে গেছে সেই কবেই। যন্ত্রবৎ আমরা মাত্র জীবনে বেঁচে আছি। ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদিমের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে রয়েছে গোটা প্রজন্ম। বারে বারে মনে আসে মার্শাল বার্মেনের উক্তি — "It may turn out, then, that going back can be a way to go forward: that remembering the modernisms of the nineteenth century can give us the vision and courage to create the modernisms of the twenty-first."

অনুষ্ঠান মঞ্চে জুবিনের সহশিল্পী রাহুল।
ধারণা করা যেতে পারে, প্রজন্মান্তরের সন্ধিক্ষণে নতুন মানুষ এই রোমান্টিসিজমের সন্ধান করবেন। কারও হয়ত কাউকে সত্যি করেই ভালো লাগবে। প্রথম প্রথম ভালোলাগার পর অস্ফুটভাবে গুনগুন করবে — "তুমি চোৱা যেতিয়া দুচকু তুলি, মোৰ আকাশ ভাঙি নামে বিজুলী, ৰ'দে হাঁহে, ফুল ফুলে, কথা ক'লে, তুমি চুলেই যে বসন্ত, ধুমুহাও যে প্রশান্ত, তোমাৰ মাজতে দিগন্ত, সৃষ্টিৰ অপৰূপ অনন্ত।" (তুমি তাকাও যখন দু' চোখ তুলে, আমার আকাশ ভেঙে নামে বিজলি, রোদ হাসে, ফুল ফোটে, কথা বললে, তুমি ছুঁলেই যে বসন্ত, ঝড়ও যে প্রশান্ত, তোমার মাঝে দিগন্ত, সৃষ্টির অপরূপ অনন্ত) কোনো প্রেমিক হয়তো কাতর কণ্ঠে নিশ্চয়ই বলতে চাইবে প্রেয়সীকে — "মোৰ পৃথিৱী যেন চিৰনতুন তুমি এষাৰ মাত দিলে" (আমার পৃথিবী যেন চিরনতুন তুমি যখন আমাকে ডাকো)।
জুবিন গার্গ নামের এই ইমেজটি আমাদের বিফল অন্তঃসারশূন্যতাকেই প্রতিফলিত করে। জুবিন গার্গের প্রতি আমার অবসেশন আমি অনেক দিন ধরেই অনুভব করে আসছি। জুবিন গার্গ এই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের মতোই একজন বিফল ব্যর্থ মানুষ। অসম্পূর্ণ মানুষ। তাই, 'যি জুৰুলি-জুপুৰি হোৱা নাই শোকৰ বৰষুণত' (যে আকণ্ঠ সিক্ত হয়নি শোকের বর্ষণে), তাঁর জন্য জুবিন গার্গ অন্য অনেক নামের মতো একটা নাম। জুবিন গার্গ একটা উন্মাদনা, যে উন্মাদনা আমাদের বিষন্নতাকে উন্মাদ হওয়া থেকে রক্ষা করে — the insanity that keeps us sane at the state of ennui.
আধুনিকতার ক্ষণভঙ্গুর গতিধারা লক্ষ করে মানুষ যে ক্রমশ আজ থেকে কাল আরো ব্যর্থ বিষণ্ণ হয়ে পড়বে সেই উপপাদ্যে বিশ্বাস করার গত্যন্তর থাকে না। সেই জন্যই জুবিন গার্গের শারীরিক অবর্তমানকে জুবিন যুগের অবসান বলে ভাবতে মন সায় দেয়না। জুবিন গার্গের মৃত্যু আমাদের ব্যর্থতাগুলিকে ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা থেকে বড়ো করে নৈর্ব্যক্তিক সর্বজনীনতা দিলো। ইমেজ জুবিনের পর্বান্তর ঘটল। জুবিন যুগকে স্পষ্ট জুবিন পর্যায়ে একটা সংহত রূপ দিলো।



বহু যুগ পরেও কোনো একজন বিষণ্ণ, ব্যর্থ, বিফল যুবক থাকবে। সর্বস্বান্ত পরিপার্শ্বর মধ্যেও সেই যুবক একদিন দু'হাতে ইচ্ছে ডানা মেলে মাঝরাতে চিৎকার করে উঠবে — "মন যায়, বহুত মন যায়।" 'মায়াবিনী' কতদিন পর্যন্ত প্রার্থনা হয়ে থাকবে জানিনা। কিন্তু বহু যুগ পরেও কোনো একটা হোস্টেলে, আগুনের পাশে কিংবা আড়ষ্টতার প্রাচীর টপকে যখন কোনো উদ্দেশ্যহীন আঙুল ছুঁয়ে যাবে ই-মাইনর-ডি-সি-বি সেভেন — সেখানে থাকবে জুবিন গার্গ, সেখানেই থাকবে — Lesser than him, but greater...
অসমিয়া থেকে ভাষান্তর: সন্দীপ দে

পরিচিতি: একজন প্রতিভাবান কবি, গীতিকার, গায়ক, চিত্রনাট্যকার, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং শিল্পী জুবিন গার্গের সৃজন-বৃত্তের ঘনিষ্ঠ অনুজপ্রতিম সঙ্গী — যাঁকে জুবিন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচয় করিয়েছিলেন 'নিজের পুত্র' বলে। জুবিনের সর্বশেষ ছবি 'রৈ রৈ বিনালে'র চিত্রনাট্যকার। গুয়াহাটি।
চিত্র: অন্তর্জাল থেকে। দুটি ছবি লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত।