গল্প

উন্মোচন



রুবানা ফারাহ্ আদিবা (ঊর্মি)


সজল শাহাবুদ্দিন, বয়স ছেচল্লিশ, সুদর্শন এবং একজন সুশিক্ষিত তরুণ। হন্তদন্ত হয়ে অফিসে এলেন। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই অফিসের কাজের পাশাপাশি আরও একটি অতিরিক্ত দায়িত্বে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ভাষা ও নৃতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন গত পাঁচ বছর হলো।

রুকাইয়া হাসিন, তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী তড়িঘড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আইপ্যাডে অ্যাপয়েন্টমেন্ট শিডিউল তৈরি করে রাখা তাঁর নৈমিত্তিক কাজ। আজ সজল সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন, "আজকের দিনটা খুব প্যাকড, কিছু বদলাতে হবে কি-না বলবেন স্যার, তাহলে সকাল সকাল রিশিডিউল করে দিতে পারব।"

সজল সাহেব স্মিত হেসে বললেন, "সুপ্রভাত, রুকাইয়া। জি, একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে অবশ্যই জানিয়ে দিচ্ছি। আর সব খবর ভালো তো?"

রুকাইয়া হাসিন, তাঁর বিশ্ববিখ্যাত টোলপড়া হাসি হেসে বললেন, "ভালো আছি স্যার। সবাই ভালো।"

মোটামুটি এভাবেই দিন শুরু হয় সজল শাহাবুদ্দিনের। স্ত্রী এবং সতেরো বছরের কন্যাকে নিয়ে ঢাকা শহরে তাঁর সুখী জীবন কেটে যাচ্ছে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত সজল সাহেবের আরও একটি পরিচয় আছে। ভাষা সৈনিক ফজল শাহাবুদ্দিনের একমাত্র পুত্র তিনি। ২০১২-তে তিনি পোসথুমাস একুশে পদক লাভ করেন। সজল সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক শেষ করেন এবং ইংরেজি সাহিত্যে পোস্ট ডক্টরেট করেন বার্কলে থেকে। সেখানেই ক্যাথির সাথে পরিচয়। জড়িয়ে পড়েন প্রণয় এবং এরপর পরিণয়ে। তীক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন ক্যাথি পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই অনুসন্ধিৎসু বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে। বিবাহ-পরবর্তী তাঁদের সময়ের অধিকাংশটুকুই কেটে যেত এইসব আলোচনার মধ্যে দিয়ে। ক্যাথির ইচ্ছেতেই পোস্ট ডক শেষে দেশে ফিরে আসেন সস্ত্রীক। আজকাল ক্যাথির বাংলা শুনে কেউ বলতে পারবে না ও বাঙালি নয়। শুধু ভাষা নয়, সংস্কৃতিকেও আয়ত্ব করেছে নিপুণ পারদর্শিতায়। রবিঠাকুরের 'গীতাঞ্জলি' তাঁর বাইবেল সম। ওহো, ভুলে যাবার আগেই বলে রাখি, ওর পরিচিত মহলের সকলেই ওকে 'কেতকী' বলে ডাকে। হ্যাঁ, শেষের কবিতার 'কেতকী' ওর খুব প্রিয় চরিত্র।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট শিডিউলে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন সজল সাহেব। দুটো সেমিনার, একটা টেলিভিশন সাক্ষাৎকার। সবগুলোই দুপুর দু'টোর পর। সামলানো যাবে বলেই মনে হচ্ছে। টেলিভিশন সাক্ষাৎকারটার রেকর্ডিং বিকেলে। 'একুশে একাত্তরে' জনপ্রিয় একটি চ্যানেল, সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু, বাবা সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয়ে আলোকপাত।

হঠাৎ, মনে পড়ে গেল, রাইসুল চাচার কথা। দু'বছর আগে রাইসুল চাচা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। অভীক, রাইসুল চাচার ছেলে, সজলের থেকে বয়সে তিন চার বছরের ছোটো হবে। বর্তমানে বস্টনে স্থায়ী বসবাস করছে। রাইসুল চাচার শেষকৃত্যের সময় দেশে এসেছিল সে। চাচার ব্যবহার্য জিনিসপত্রের মধ্যে থেকে একটি ডায়েরি তাঁকে দিয়েছিল। বলেছিল, "আমি আর কী করব সজল'দা? ফজল চাচা বাবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন, কয়েক পাতা পড়েছিলাম। তাঁদের ছাত্র জীবনের কথা চোখে পড়েছে। সময় সংকট আর নানারকম ব্যস্ততায় আর পড়া হয়ে ওঠেনি। আমার কাছে হয়তোবা অপঠিতই রয়ে যাবে। তোমার কাছে থাকুক বরঞ্চ। তোমার কখনও কাজে আসতে পারে।"

সজল এক মুহূর্ত কিছু একটা ভেবে নিলেন। প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। এতক্ষণে 'একুশে একাত্তরে'র দপ্তরে জাহিদের চলে আসার কথা। জাহিদের সাথে এর আগেও সজলের বেশ কিছু ইন্টারভিউ হয়েছে। সেল ফোনের কন্ট্যাক্ট থেকে ডায়াল করলেন।

"হ্যালো সজল ভাই বলেন, ভালো আছেন?" ফোনের ওপাশ থেকে জাহিদের কণ্ঠ ভেসে এল।

– "ভালো আছি জাহিদ। তুমি?"

– "জি, ভালো। সময়টা ঠিক আছে সজল ভাই? সম্ভব হবে আজকে? খুব ক্যাজুয়াল ইন্টারভিউ। তেমন কিছু প্রস্তুতিও লাগবে না।"

– "আসলে জাহিদ, ভাবছিলাম, বাবাকে নিয়ে যখন হচ্ছে তখন একটু অন্যরকম করলে কেমন হয়? আমার কাছে থেকে তো সবসময়ই শোনা হচ্ছে তাঁর সম্পর্কে। বাবার বন্ধু রাইসুল চাচার একটি ডায়েরি আছে। ভাবছিলাম, ওখান থেকে যদি ক'টা স্মৃতিকথা পাঠ করা যায়, তাহলে কেমন হবে?"

– "তাহলেও খুব ভালো হবে সজল ভাই। রিশিডিউল করলে দু'দিন পর এই একই সময় করতে পারব। আপনার পক্ষে সম্ভব?"

– "একদম। তাহলে এই কথাই রইল। আমি আজ কালের মধ্যেই ডায়েরি পড়ে জানাব তোমাকে যদি কোনো মেটেরিয়াল পাই। রাখছি এখন। কথা হবে একেবারে দু'দিন পর।"

বেশ ভালোই হলো। এর মধ্যে বাবাকে আরও একটু ঘনিষ্টভাবে জানা হবে। বাবা এবং রাইসুল চাচার মধ্যে আজব একটা বন্ধুত্ব ছিল। কথায় কথায় দু'জনের তর্ক শুরু হয়ে যেতো। সেইসব তর্কের বিষয় অবশ্য সজলের জানার কথা না। রাইসুল চাচা খুব কম আসতেন তাদের বাড়িতে। অন্তত সজল যখন দেশে ছিল তখন মনে আছে বাবা এবং রাইসুল চাচা যতটা না পরস্পরের বাড়িতে যাওয়া আসা করতেন, মা এবং কঙ্কনা চাচির মধ্যে যোগাযোগ ছিল তারচে' অনেক বেশি। একসঙ্গে মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক, শিল্পকলা অ্যাকাডেমির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে নিয়ম করে দুজন একসঙ্গে যেতেন।

একুশে ফেব্রুয়ারির কাক ডাকা ভোরে, চিকন কালো পাড় সাদা শাড়িতে নিরাভরণ মা, কঙ্কনা চাচি, আর বাবার সাথে খালি পায়ে সজলের শহিদ মিনারে যাবার কথা মনে পড়ে গেল। আজকাল, একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপন না স্মরণযাপন তা নিয়ে খুব সন্দিহান হয়ে পড়েন সজল। ক্যামেরা এবং ফ্ল্যাশের আলোয় শহিদবেদিকে নাটকের মঞ্চ মনে হয় এখন। রকমারি বেশভুষা, প্রচার মাধ্যমের উচ্চকিত আওয়াজে, "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি" চাপা পড়ে যায়। মিডিয়া এবং সংবাদের ভিড়ে অবহেলিত হয় ভাষা শহিদের রক্ত।

আজ সকালে বোধহয় একটু অতিরিক্ত ভাবমেদুর হয়ে পড়েছেন সজল। রেট্রোস্পেক্টিভ পরিক্রমায় সজলের সাদা-কালো রিলে ধরা পড়েছে আরও একটা স্মৃতি। তাদের প্রভাতফেরির সঙ্গী হিসেবে কখনোই রাইসুল চাচাকে পাওয়া যায়নি। কঙ্কনা চাচির কাছ থেকে শুনেছে, বহু অনুরোধ উপরোধ সত্ত্বেও তাঁকে রাজি করানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু, কেন? এর উত্তর নিশ্চয়ই তাঁর ব্যক্তিগত লেখায় পাওয়া যাবে এবং তার জন্য ওই ডায়েরিই একমাত্র আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাতে পারে।

নতুন একটা প্রজেক্টে হাত দিয়েছেন সজল শাহাবুদ্দিন। সেটা হলো বাংলা ভাষাতে যে সব স্ল্যাং বা বিকৃত বাংলা শব্দ ঢুকে যাচ্ছে তাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নাটক, শিল্প এবং সাহিত্যে ভুলভাল সংলাপ, বাক্য প্রায় ভাষাদূষণের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। বিতর্ক উঠেছে, ভাষা বহমান বলে পরিবর্তন ঠেকানো যাবে না। একদম সত্যি কথা, এই যুক্তিতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু, মিশ্রণ হওয়া প্রয়োজন বুদ্ধিমত্তার সাথে – স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই হতে পারে না। "আমরা বাঙালি, বাঙ্গাল ভাষাই আমাদের ভাষা। আমরা কলকাতার ভাষায় কথা বলব কেন?" – এই খেলো যুক্তিতে সজল শাহাবুদ্দিন প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর মতে, "আমরা বাঙালি, বাংলা ভাষায় কথা বলি" – এটাই হওয়া উচিত প্রত্যেক বাঙালির লক্ষ্য। ভাষার মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া যারা ঠুকে দিতে চায়, তিনি তাদের বিরুদ্ধে।

অফিসের কাজকাম শেষ করে, রুকাইয়াকে ইন্টারকমে জানালেন – বাড়ি চলে যেতে। আগামীকাল ছুটির দিন। অনেকেই কিছুটা আগেই বাড়ি চলে গেছে। তিনিও জরুরি কাগজপত্র, ল্যাপটপ গুছিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে গেলেন। গাড়িবারান্দায় গাড়ি রেখে বসার ঘরে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গেল। প্রতিবারের মতো এবারেও একুশের রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে। কেতকীর প্রিয় কম্পোজিশন,

"জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবি
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুনরাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।
"

যতবার ও এই গানের এই বিশেষ কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে কণ্ঠ মেলায়, অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে ওর সবুজ চোখদুটো। দেশের জন্য জীবন বাজি রাখার লড়াইটা ও বুঝতে পারে কিছুটা, কিন্তু ভাষার জন্য বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া... "এটা শুধু বাঙালিরাই পারে, সজল"। প্রতিবারই এটা ও পরম নির্ভরতার সাথে উচ্চারণ করে।

রিহার্সাল শেষে জলখাবার এবং তারপর একে একে সবাই বিদায় নিলে রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে নেয় ওরা তিনজন। কন্যা অঙ্কিতার সাথে কিছু সময় খুনসুটি শেষে স্টাডিতে এসে ডায়েরিটা হাতে নেয়। খুব সাধারণ একটা ডায়েরি, কালো চামড়ায় মোড়ানো। কখনও নীল কালি, কখনও কালো কালি দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা। অনিয়মিত এন্ট্রি। মাঝখানে কয়েকটা পাতায় লাল কালিতে লেখা কিছু কথা সজলের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

প্রায় কোনোরকম বিরতি ছাড়া পুরো ডায়েরিটাই শেষ করলেন তিনি। স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন সজল। এই মুহূর্তে তিনি ঠিক কীভাবে তাঁর হতাশা এবং ক্রোধ জানাবেন, কাকেই বা জানাবেন তিনি জানেন না। সজলের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। রাইসুল চাচা কেন বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, এটা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কেন বচসা হতো, কেন তিনি তাঁদের সাথে প্রভাতফেরিতে যেতে চাইতেন না – সব এখন স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। এতটাই স্বচ্ছ নিজেকে প্রায় নগ্ন মনে হচ্ছে। বাবা এতদিন সবাইকেই প্রতারণা করে এসেছেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সাথে কখনোই জড়িত ছিলেন না। ঢাকা মেডিক্যালের সামনে যেদিন প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ হচ্ছিল, তিনি রাইসুল চাচার রুমে সারারাত বসে ছিলেন তার কামরায়। ভোরের দিকে তিনি নিজেই নিজেকে আহত করেন আত্মঘাতি বুলেটে। ঢাকা মেডিক্যালের গেট থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করা হয়। ডান পা থেকে গুলিটা বের করতে পেরেছিল সার্জারি করে। কিন্তু এর ফলে তাকে সারাজীবনই পা টেনে টেনে হাঁটতে হয়েছে। তিনি জানতেন, ক্ষণিকের এই আঘাত পরবর্তী সময়ে তাকে অলঙ্কৃত করে তুলতে পারে। সরকারি সুবিধা প্রাপ্তিতে এটাই হবে তার ট্রাম্প কার্ড। সমস্ত জীবন তিনি এটারই চরম ফায়দা তুলেছেন। ব্যবসায় পারমিট, বড়ো অঙ্কের কন্ট্রাক্ট ইত্যাদি এই মিথ্যে সম্মানের খাতিরেই।

"আস সালাতু খাইরুল মিনাল নাউম..." বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের আওয়াজ।

বড়ো পবিত্র এই সময়। সকল তঞ্চকতা থেকে মুক্ত হবার জন্য তিনি তৈরি হয়ে নিলেন।

আপাতত ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা করবেন সজল শাহাবুদ্দিন। জাহিদকে ফোন করে 'একুশে একাত্তরে'র সাক্ষাৎকারে একান্ত পাঠে ডায়েরির কথা কনফার্ম করবেন। ধীর পায়ে হেঁটে বুকশেলফ থেকে নামিয়ে নিলেন একুশের পদক। একুশে পদকের সাথে জড়িত দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁদের সাথে যোগাযোগ করে ফিরিয়ে দেবেন এই পদক যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তিনি এর যোগ্য উত্তরসূরি নন।

মন বিক্ষিপ্ত হলেও তিনি জানেন, নিজেকে শুদ্ধ করে নিতে এতটুকু তাঁকে করতেই হবে।

পরিচিতি: লেখক, অনুবাদক, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়র। নিবাস: ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র।