প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

বাংলা পড়ে কী হবে?



পবিত্র সরকার


।। ১ ।।

এই প্রশ্নটা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে যারাই সাম্মানিক বা স্নাতকোত্তর বাংলা পড়তে যায়, তাদের প্রায় সবাইকে শুনতে হয়, হয়তো এক সময় তারা নিজেদেরও নিজেরাই করে। এটা একটা বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ — পড়ে কী হবে? সে প্রশ্নটার একটা উত্তর অভিভাবকদের কাছে আছে বলেই তাঁরা ছেলেমেয়েদের ইশকুল-কলেজে পড়তে পাঠান। সে উত্তরটা এই যে, পড়ে একটা চাকরি হবে, ভালো হোক, মন্দ হোক। চাকরি পেলে বাপ-মা'কে দেখবে, সংসার করবে, একটা 'ভদ্র' জীবনযাপনের গ্যারান্টি পাওয়া যাবে। যারা পড়াশোনা করে না, বিশেষত ইংরেজি পড়ে না, তাদের তো আমরা 'ভদ্রলোক' শ্রেণিতে তুলে নিই না, অন্য কিছু বলি। কাজেই পড়াশোনা > চাকরি > ভদ্রলোকের জীবন, এই হল সিধে রাস্তা — কলকাতা - ডায়মন্ড হারবার - রানাঘাট - তিব্বতের মতো।

বলা বাহুল্য রাস্তাটা সিধে হলেও তার নানা ভাঁজ ও স্তর আছে। কিছু জিনিস (ডাক্তারি, প্রযুক্তি ও কারিগরি, বিজ্ঞান, ম্যানেজমেন্ট, আইন ইত্যাদি) পড়লে সচ্ছল স্বনিযুক্তি বা ভালো চাকরি বা উঁচু চাকরির গ্যারান্টি দেয় সমাজ ও অর্থনীতি, আবার কিছু বিষয় পড়লে তত উঁচু চাকরি বা কোনও চাকরিরই গ্যারান্টি নেই। এমন হতেই পারে। উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এই রকম একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ কথা অস্বীকার করে লাভ নেই উচ্চমেধার ছাত্রছাত্রী আর তাদের অভিভাবকেরা সাধারণভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎটাকে আগে থেকেই বাতিল করে রাখেন। অর্থাৎ শিরোনামের প্রশ্নটার একটা স্পষ্ট নেতিবাচক উত্তর তাঁদের কাছে আগেই তৈরি থাকে। এও সত্য যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে (বিশেষ করে সাহিত্যকে) ভালোবেসে উচ্চশিক্ষায় বাংলা পড়তে আসে খুবই কম ছাত্রছাত্রী। কিছু আসে না তা নয়, আমার দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে আমি তাদের দেখা পাইনি বললে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু এ কথাটাকে বাংলার ছাত্রছাত্রীদেরও স্বীকার করতে সংকোচ হওয়ার কথা নয়।

তবু এত ছেলেমেয়ে সাম্মানিক আর স্নাতকোত্তর বাংলা পড়তে আসত কেন? আসত তার কারণ, এই সমাজে মোটামুটি ভদ্রগোছের একটা চাকরি — শিক্ষকতা ও অধ্যাপনা, তা পাওয়া যেত। পশ্চিমবাংলা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের স্কুল-কলেজে চাকরি ছিল। সাম্মানিক বাংলার সঙ্গে বিএড করে নিলে স্কুলে চাকরির সুযোগ ছিল প্রায় অঢেল। সেই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও নানা কলেজে এমএ ক্লাস খোলা হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারের আমলে, এবং সেই সব এমএ ক্লাসে বাংলাতেও প্রচুর ছাত্রছাত্রী ভরতি হতো। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও তো প্রচুর বেড়েছে, সেগুলিতেও বাংলা বিষয় খোলা হয়েছে। তাতে যথেষ্ট শিক্ষক আছে কি না, শিক্ষার মান কীরকম — এ সব প্রশ্ন এ প্রবন্ধে প্রাসঙ্গিক নয়। আসল কথা হল, এই সব প্রতিষ্ঠানে সাম্মানিক ও এমএ পাশ করে যে সব ছাত্রছাত্রীরা বেরোচ্ছে, তাদের বাংলায় চাকরির সুযোগ সমানুপাতে বা বেশি হারে বেড়েছে না কমেছে। এই কথাটাও মনে রাখতে হবে যে, পরীক্ষায় নম্বরের বিষয়ে সেমেস্টার পদ্ধতিতে যে নতুন নীতি নেওয়া হয়েছে, তাতে ৭০-৮০-৯০ শতাংশ নম্বর পাওয়া কিছুই না। ফলে 'ভালো' ফল করা ('ভালো শিখেছে' এর সঙ্গে সমার্থক নয়) ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অপরিমিত সংখ্যায় বেড়ে গেছে, যাঁরা চাকরির জন্য প্রার্থী নির্বাচন করবেন তাঁদের পরিশ্রমও বেড়েছে। আমাদের সময়ে শতকরা ৬০ নম্বর পেতে গলদঘর্ম হতে হতো, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শতকের পঞ্চাশের বছরগুলিতে বেশিরভাগ বছরে ফার্স্ট ক্লাস ছিল না, শঙ্খ ঘোষ বা অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের মতো ছাত্র ফার্স্ট ক্লাস থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও। পরে ফার্স্ট ক্লাস এক-দুইয়ের মধ্যে থাকত, কদাচিৎ চার বা পাঁচে উঠেছে। এখন তো ঝুরি-ঝুরি ফার্স্ট ক্লাস। এতে ছাত্রছাত্রীদের অপরাধ নেই, অপরাধ হল শিক্ষানীতির, যাতে ফার্স্ট ক্লাসের এমন অবমূল্যায়ন ঘটেছে। এখন হাজারে হাজারে ফার্স্ট ক্লাস, কিন্তু তাদের চাকরির সুযোগ নেই।

।। ২ ।।

কেন সুযোগ নেই, তার কারণগুলি এখানে বিস্তারিত করে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। প্রথমত, যত প্রার্থী তত বা তার বেশি চাকরি রাজ্যে বা দেশে আছে — এই রকম একটা আদর্শ অবস্থা এখন আছে কি না জানি না, কখনও ছিল কি না তাও জানি না। আমরা জানি যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেও তেরোটি পাকা পদে এখন মাত্র ছয় জন অধ্যাপক কাজ করছেন। বাকি ক্লাস চলছে পার্ট টাইমদের ক্লাস অনুসারে টাকা দিয়ে। দ্বিতীয়ত যত চাকরি আছে তার সবই যদি দলের বা অদলের প্রার্থীদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা হয়, ফলাফলের তোয়াক্কা না করে, তা হলে অপেক্ষাকৃত ভালো ছেলেমেয়েদেরও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, পশ্চিমবাংলায় এখন যেমন হয়েছে।

অঙ্কনশিল্পী: মনীষ দেব


পরিচিতি: বিশিষ্ট ভাষাবিদ, লেখক, প্রাক্তন উপাচার্য - রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। নিবাস: কলকাতা।