১৯৭২-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি, 'অমৃত' পত্রিকায় (১১ বর্ষ, খণ্ড ৪, সংখ্যা ৪১) কবি শামসুর রাহমানের দুটি কবিতা 'জাল' ও 'কী ক'রে লুকাবে' প্রকাশিত হয়। প্রথম ছোট্ট কবিতায় কবি লিখেছিলেন –
...এখন ত বেঁচে থাকাটাই হাস্যকর ভয়ানক।
কখন যে দৃষ্টি থেকে পৃথিবীর সমস্ত আলোক
মুছে যাবে, দেহ থেকে তাপ। কাকের মতোই –
চোখ বন্ধ ক'রে জীবন গচ্ছিত রাখি ফাটলে নিছক।
(৩০.৯.১৯৭১)
দ্বিতীয় কবিতায় ছিল:
জানতে কি তোমরা
এত লাশ আপাদমস্তক মুড়ে ফেলবার জন্যে –
ক'হাজার গজ
লাগবে মার্কিন
পোড়াতে ক'মণ কাঠ? তুখোড় চাতুর্যে
ভেবেছিলে এইসব লাশ গাদাগাদি
মাটিতে পুঁতে রাখলেই
অথবা নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিলেই বেপরোয়া
তোমাদের হত্যাপরায়ণ
দিনরাত্রি মুছে যাবে বিশ্বস্মৃতি থেকে।
(২.১০.১৯৭১)
উনিশশো একাত্তরের দুঃস্বপ্নের অনুভূতি ও চিত্রের দু'পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুই বাতিস্তম্ভ – ১৯৫২ আর ১৯৭২। অনেক অপমান, অনেক ত্রাস। অনেক হত্যার ভয়ংকর সব কৃষ্ণতরঙ্গ ডিঙিয়ে নতুন পতাকা উড়েছিল রমনার ময়দানে। ভস্ম আর রক্ত থেকে জন্ম নিল নতুন দেশ, নতুন জাতি। তার পরিচয় তার ভাষা – মাতৃভাষা বাংলা। সেদিনের নিষিদ্ধ কবি রবীন্দ্রনাথের গান ধ্বনিত হল কোটি কণ্ঠে – 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'...। একথা জানিয়ে দ্যোতিত করল রবীন্দ্রনাথের চির প্রাসঙ্গিকতা। ভাষার নামে এতগুলো দুঃস্বপ্নের দশক ক'টা জাতি পেরিয়ে এসেছে? ১৯৪৮ থেকে অশান্তির আগুন; ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি আনুমানিক বিকেল চারটের সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন জব্বর, রফিক ও আব্দুল বরকত (লিখতে লিখতে কলম থেমে যায়, মনে পড়ে যায় শিলচরের কথা, রক্তঝরা উনিশে মে-র কথা)। যাই হোক অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী ভাষা-আন্দোলনের সাফল্য এল ১৯৫৬-র শাসনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে। এই শাসনতন্ত্রেই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

বরকতদের আহুতির বিশ বছর পর জন্ম নিল নব 'বাংলাদেশ'; প্রায় অর্ধশতাব্দ পর সূত্রপাত হল 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর। দীর্ঘ শোষণ ও পীড়নের সংবাদে ব্যথিত জগৎসভা একুশে ফ্রেব্রুয়ারিকে দিল আন্তর্জাতিক মর্যাদা। একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা শুধু বাংলাদেশে আবদ্ধ থাকল না, সে বিশ্ব-কবিতার শিরোনাম হল, প্রতীকী হয়ে উঠল। এর পৃষ্ঠভূমির দিকে নজর দিতে হবে একবার।
১৯৯৯-এ ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত 'ইউনেস্কো'র ত্রিংশতিতম অধিবেশনে ১৮৮টি (একশো অষ্টাশি) দেশের প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের উত্থাপিত 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর দাবি অনুমোদন করেন। কমিশনের সামনে বক্তব্য পেশ করেন ফ্রান্সস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলি। এখানে সুখকর বিস্ময় লুকিয়ে আছে – রাষ্ট্রদূত আলি সৈয়দ পরিবারের সন্তান, তাঁর আব্বাজান সৈয়দ মোস্তাফা আলি, চাচাজানের নাম স্বনামধন্য মুজতবা আলি।
ষোলোয় পা দিয়েছি, অনতিদূরে রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষ। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি, কলেজ ডাকছে 'আয় আয়'।
১৯৬০-এর ২১ ও ২২ এপ্রিল তৎকালীন অসমের রাজধানী শিলঙে অসম প্রদেশ কংগ্রেসের সভায় অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি অর্থাৎ রাজ্যভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
এর চার বছর আগে ১৯৫৬-য় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধিসূচনা অনুযায়ী বলা হয়েছিল কোনো রাজ্যে যদি সত্তর শতাংশ বা তার অধিক একভাষী মানুষ থাকে তাহলে সেই ভাষাকে একমাত্র রাজ্যভাষা রূপে গ্রহণ করতে কোনো আপত্তি থাকতে পারে না।
ওই অধিসূচনার পাঁচ বছর আগে যে জনগণনা হয়েছিল অসমে সেখানে অসমিয়াভাষীর সংখ্যা ছাপ্পান্ন দশমিক ঊনসত্তর শতাংশ।
প্রদেশ কংগ্রেসের এই প্রস্তাব দক্ষিণ অসমের কাছাড়ের প্রতিনিধিদের বিচলিত করে, তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেন।
প্রস্তাব ৫০-১০ ভোটে অগ্রাহ্য হয়ে যায়।
১৯৬০-এর ২ ও ৩ জুলাই নিখিল আসামে বঙ্গ ও অন্যান্য অনসমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় শিলচর শহরে। উত্তর ও মধ্য অসমে শুরু হল বাঙালির ওপর অত্যাচার – 'বঙাল খেদা আন্দোলন'। ৪ জুলাই ১৯৬০ থেকে আরম্ভ হল একতরফা ভয়ংকর আক্রমণ, প্রশাসন দিল তার সঙ্গ।
জন্ম নিল কাছাড় জেলা গণ-সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬১, ফেব্রুয়ারি মাসে।
আন্দোলন শাখা মেলতে থাকে, ফুঁসে ওঠে জনজোয়ার। ১৯৫২-র ন'বছর পর ১৯৬১-র ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে সত্যাগ্রহী দশ ভাই চম্পা ও একটি পারুল বোন পুলিশের গুলিতে আত্মাহুতি দিল।
রক্ত নেবে? নাও না, বুকে
রাখছি অফুরান।
তোমার বুলেট ছাপিয়ে ওঠে
উনিশে মে-র গান।
(শক্তিপদ ব্রহ্মাচারী, 'উনিশে মে')

১৯৬১ সালের ১৯ মে তারিখে তারাপুর রেল স্টেশনে সত্যাগ্রহীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ।
বাংলাদেশ এই মুহূর্তে চরম বিভ্রান্তির কবলে। পরিণতি কী হবে জানি না, তবে প্রাণের ভাষা, মনের ভাষার মহিমা কখনো খর্ব হবে না। অখণ্ড বাঙালির এ এক চিরকালীন গর্ব। তবে প্রশ্ন, একুশের পাশাপাশি উনিশে মে-কে ক'জন মনে রাখেন? প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষের কলম কী বলে?
"কত উনিশে মে আসে, কত উনিশে মে যায়, কিন্তু সেদিনটায় ক'জন আমাদের মনে পড়ে শিলচর - হাইলাকান্দি - করিমগঞ্জের মানুষজনের কথা, বাংলা যাদের মুখের ভাষা, আর সে-ভাষার জন্য তাদের আত্মদানের স্মৃতি? ১৯৬১ সালের সেই সময়টায় গোটা বাংলা একবার আলোড়িত হয়ে উঠেছিল ঠিকই, গোটা দেশকে ভাবতে হয়েছিল সেই ভাষা সমস্যার কথা, কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে থমকে গিয়েছে সব, আমাদের জীবনযাপনে কোনও প্রেরণাভূমি বা প্রতীকচিহ্ন হয়ে উঠতে পারেনি ওই তারিখ, কখনো আঞ্চলিকতার পেষণে, কখনো-বা সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসনে দিশা হারাতে হয়েছে সেই আন্দোলনকে, একযোগে সেখানে বড় হয়ে উঠতে পারেনি নিজেদের ভাষাপরিচয়।"
কবির বাস্তব গদ্য-ভাষের মাঝখানে কাছাড়ের কবি দিলীপকান্তি লস্করের একটি কবিতা শুনি -
আমি কোথেকে এসেছি, তার জবাবে যখন বললাম:
করিমগঞ্জ, আসাম
তিনি খুশিতে ডগমগ হয়ে বললেন: বাঃ, বেশ সুন্দর
বাংলা বলছেন তো!
একজন শিক্ষিত তথা সাহিত্যিকের যখন এই ধারণা, তখন
আমি আর কী বলতে পারি!
ওঁকে ঠিক জায়গাটা ধরিয়ে দিতে গিয়ে বললাম:
বাংলাভাষায় পঞ্চদশ শহিদের ভূমিতে আমার বাস।
তিনি তখন এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থেই আমাকে
ভিরমি খাইয়ে দিয়ে বললেন:
ও! বাংলাদেশ? তা-ই বলুন। ('অবস্থান')
অভিমান হবে না কেন বলুন?
আবার ফিরে যাচ্ছি কবি শঙ্খ ঘোষে –
"আমরা যেন না ভুলি সেই দিনটির কথা, যেদিন বাঙালিরই একটা অংশ মৃত্যুবরণ করেছিল বাংলা ভাষারই মর্যাদারক্ষার দায় কাঁধে তুলে নিয়ে। আমরা যেন কখনো না ভুলি, কিছু মানুষ সেদিন দৃপ্তভাবে বলতে পেরেছিল যে ভাষার অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। আর যদি তা ভুলে-যাই তবে কি ভাবব আমাদেরও আজ ভাষার আবেগ গেছে থেমে? না কি সমস্বরে সবাই মিলে বলব আমরা –
একুশে ফেব্রুয়ারির পাশেই জেগে থাক আজও উনিশে মে।"

পরিচিতি: বিশিষ্ট লেখক, রবীন্দ্র গবেষক, অনুবাদক, গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান ও আর্টস ফ্যাকাল্টির প্রাক্তন ডিন, গুয়াহাটি, অসম।