
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কি এবার সামূহিক কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙাতে পেরেছে? কিছুমাত্র সাড়া জাগিয়েছে মনে? নাকি অধিকাংশ বাংলাভাষী ছিলেন নিস্পৃহ ও নিরুত্তাপ। আর, যে ক'জন গুনগুন করেছেন: "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি?" – সেই গুঞ্জন তাঁর বাড়ির উঠোনও পেরোতে পারেনি হয়তো। কেননা চলমান ২০২৬ সালে বাংলাভাষীদের মধ্যেও বাঙালি সত্তা নিয়ে কোনো হেলদোল নেই। তাঁরা বীরবিক্রমে 'হিন্দু' কিংবা 'মুসলমান' পরিচয় আঁকড়ে ধরে আছেন। ভাবছেন, একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কথাবার্তা চলুক বাংলাদেশে, আমাদের তাতে কী? যতই 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর দোহাই দিই, মোবাইল তাড়িত জীবনে মাতৃভাষারই কোনো বৈধতা নেই। তাই ভাষার ভিত্তিতে কোনো ঐক্যবোধ ও সংহতির ভাবনাও অপ্রাসঙ্গিক। একই কারণে একুশে ফেব্রুয়ারির মূল বার্তা উনিশে মে (১৯৬১)-র ভাষা শহিদ দিবস উদ্যাপনকারীদের কাছে পৌঁছায় না। তাই আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা অনুভব করতে পারে না কীভাবে প্রতিনিয়ত পায়ের নিচে থেকে সরে যাচ্ছে মাটি, মাথার উপর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আকাশ। খণ্ডিত ভারতের সমস্ত বাঙালি-বসতি জুড়ে সারি সারি জতুগৃহ তৈরি করে চলেছে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানপন্থী একীকরণের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রশক্তি। বাংলা ভাষাকে নানাভাবে হেয় করা হচ্ছে অথচ আমরা নির্বিকার ও প্রশ্নহীন।
বাঙালির সংকট খণ্ডিত ভারতে একরকম এবং বাংলাদেশে অন্যরকম। তেমনই পৃথিবীর নানা দেশে অভিবাসিত বাঙালিদের সংকট আরেক ধরনের। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান দাপটের পর্যায়ে অভাবনীয় জটিলতার আবর্ত সম্পর্কে সচেতনতা যত বাড়ছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য স্পষ্টতর হচ্ছে তত। এই নিবন্ধ যখন লিখছি, ঠিক তার দুদিন আগে নজরে এলো প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের সতর্কতামূলক উচ্চারণ। তিনি যা বলছেন, তাতে কেবল বাংলাভাষী নয় – সমস্ত ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষেরা অশনি সংকেত সম্পর্কে অবিলম্বে সচেতন হয়ে উঠুন। একুশে ফেব্রুয়ারি বা উনিশে মে উদ্যাপিত নয়, জাগরণের বার্তাবহ হোক বছরের প্রতিটি দিন। কেননা, অরুন্ধতীও আমাদের জেগে থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রশক্তির ব্রহ্মাস্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পথে। দু'তিন বছরের মধ্যে চিরতরে হারিয়ে যাবে স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার সামর্থ্য, সৃষ্টিশীল চৈতন্য। বাঙালি জাতি এই মুহূর্তে এমনিতেই মহাবিনাশের মুখোমুখি। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রণোদিত আত্মবিস্মৃতির দুর্নিবার অভিঘাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির উজ্জ্বল পরম্পরা। পুঁজিতন্ত্রের সেবাদাস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অচিরেই কেড়ে নেবে আমাদের নিভৃত মুহূর্তগুলি, কবিতা-গান-ছবি-ভাস্কর্য প্রভৃতি সৃজনের আলোকিত আকাঙ্ক্ষা।
এই যে নতুন প্রেক্ষিত রচিত হচ্ছে, তাতেই বাঙালির শরশয্যা সম্পূর্ণ। আমাদের শত্রু ঘরে বাইরে দ্রুত প্রসারণশীল। একদিকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষে যুক্তিহীন ভাবে বিভাজিত হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি পরিচয়। সেই বিভাজনের শক্তিতে বলীয়ান বাঙালি-বিদ্বেষী হিন্দি- গুজরাটি আধিপত্যবাদের তুমুল সন্ত্রাস। এদের দোসর অসমিয়া-ওড়িয়া আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদ। নাগরিক পঞ্জি নবায়নের নামে আসামে যখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, বারবার নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গীয় বৌদ্ধিকবর্গ উপভাষাভাষী আসামের বাঙালিদের উপেক্ষা করেছেন। তখন এই প্রতিবেদনের লেখক অজস্রবার বিপদ সংকেত-এর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন এই বলে: 'ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে।' এসআইআর-এর চক্রব্যুহ তৈরির পেছনে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের অভিপ্রায় সম্পর্কে কিছুমাত্র সংশয় আছে কি? এই সপ্তাহে দিল্লির ফাঁসুড়েরা বাঙালিসত্তার শ্বাসরোধ করার জন্যে যে জল্লাদ-সুলভ আয়োজন করেছে, এর পরও কি আমরা ঘুমিয়ে থাকব! ফ্যাসিবাদ কবলিত হিন্দুস্তানে-এর সূত্রপাত যে আরোপিত দেশভাগে হয়েছিল, আমরা তা কখনও বোঝার চেষ্টাই করিনি। জাতিসত্তার তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞতা একুশে ফেব্রুয়ারিকে ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছে। তেমনই উনিশে মে'র আত্মবলিদানকেও ভেবেছে নেহাত সাময়িক 'আঞ্চলিক' আবেগের বহিঃপ্রকাশ। জাতিসত্তার প্রতি এমন ঔদাসীন্য সম্ভবত একমাত্র বাঙালিরাই দেখাতে পারে।
একুশে ফেব্রুয়ারির নিষ্কর্ষ তাই বুঝে নিতে চাই ইতিহাস হননের বিপ্রতীপে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের জন্যে। একুশের বরকত-সালাম-জব্বার আর উনিশের কমলা-শচীনেরা বুঝিয়ে গেছেন, মহাবিনাশের প্রহরেও জেগে থাকে 'বাঙালি'। ইতিহাসের পর্বে পর্বান্তরে বারবার এই জেগে থাকার, জাগিয়ে রাখার দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি। এবারকার ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং কিছুদিনের মধ্যে আসন্ন ১৯শে মে এই বার্তা দিচ্ছে যে, গত বারো বছর ধরে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও আক্রোশের কার্নিভাল যেহেতু চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে, সমস্ত বাংলাভাষীকেই এই পরীক্ষা দিতে হবে তারা সত্যিই জেগে আছেন কীনা! বাঙালি হয়ে জন্মানো ও বাংলা ভাষায় কথা বলা অপরাধ কীনা সাম্প্রতিক হিন্দুস্তানে তা নির্ধারিত হোক। শুরু হয়েছিল আসামের বাঙালিদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার আয়োজনে। বিনা বাধায় চক্রান্তকে যেহেতু বাড়তে দিয়েছি আমরা, হিন্দি-গুজরাটি আধিপত্যের প্রতিক্রিয়ায় নব্য হিন্দুস্তান জুড়ে বাংলাভাষী মাত্রেই বাংলাদেশি, উইপোকা, ঘুসপেটিয়া। আদানি-আম্বানির মতো সর্বগ্রাসী পুঁজিপতিদের মৃগয়াভূমিতে পরিণত নব্য হিন্দুস্তানে আমলাতন্ত্র - গণমাধ্যম - বিচারব্যবস্থা - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত প্রশাসন বাঙালিকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে চাইছে। অথচ মগজ-ধোলাইয়ের আয়োজনে শরিক হয়ে খোদ বাঙালিরাই আভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশবাদের নাগপাশে বন্দি। ২১শে ফেব্রুয়ারি বা ১৯শে মে তাৎপর্যহীন এখন। বাঙালিদের নিজস্ব ঘর নেই কোথাও, আছে তাঁবু অন্তরে বাহিরে। ঘরপোড়া ছাই প্রতিনিয়ত সর্বাঙ্গে মাখছে। স্বদেশ তার হারিয়ে গেছে ১৯৪৭-এর দেশভাগে। খণ্ডিত ভারতে বাঙালি মাত্রেই বিদেশি জাতিবিদ্বেষী শাসকের ঘৃণায়, আক্রোশে।

আবারও প্রশ্ন করি নিজেকেই: কী বার্তা দিয়েছে ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং ১৯শে মে? বাঙালি আজ লুপ্ত স্মৃতি – এর চেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে! বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে যে বিরল মহৎ পরম্পরার ঐশ্বর্যে, সেই অতুলনীয় সম্পদ সম্পর্কেই অভিনিবেশ সবচেয়ে কম। আমরা আর্যাবর্তের পিছিয়ে-পড়া অপচেতনার সন্ত্রাসে বিনা প্রশ্নে মেরুদণ্ড সঁপে দিয়েছি ঘাতকদের কাছে। রবীন্দ্রনাথ - লালন - নজরুল - জীবনানন্দ - যামিনী রায়- জয়নুল আবেদিন যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা নিভিয়ে দিয়ে আমরা উৎকট হিন্দু হচ্ছি। কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দর্শন-রিক্ত ধর্মোন্মাদনা অনুসরণ করে বিকট মুসলমান হয়ে উঠছি। নইলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত বাংলাদেশ জুড়ে কেন পুনঃপাকিস্তানিকরণের উন্মাদ তাণ্ডব? গভীর বেদনায় লক্ষ করছি, হিন্দুত্ব ও ইসলামিয়ানার চক্রব্যূহে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পিত বাঙালি ইদানীং প্রাক্-রেনেসাঁ যুগের নিকষ কালো অন্ধকারে স্বয়ং নিমজ্জিত হতে মরিয়া। এই তিমির প্রয়াণ রুখতে পারত ২১শে ফেব্রুয়ারি ও ১৯শে মে'র যথার্থ চেতনা। তা হলো না বলে যুক্তিবাদ আত্মদীপায়নের প্রেরণা ভুলে গিয়ে আজকের দিশাহীন বাঙালি জাতিসত্তার চিরশত্রুদের কাছে মেধা ও হৃদয় বন্ধক দিচ্ছে। আমাদের তবে কী শেখালেন রামমোহন ও বিদ্যাসাগর? কী শেখালেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও জগদীশ চন্দ্র বসু কিংবা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, কাজী আবদুল ওদুদ ও আহ্মদ শরীফ? ভ্রষ্টতা ও বিদ্বেষের কালো ছায়ায় কেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল শরৎচন্দ্র বসু ও আবুল হাশিমদের ঋদ্ধ পরম্পরা? ২১শে ফেব্রুয়ারি যে দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষক্রিয়ার প্রকৃত প্রতিষেধক, একথা আমরা ভুলে গেলাম কেন? তাই প্রতিদিনই এখন সত্য হয়ে উঠছে উনিশ শতকে উচ্চারিত মাইকেল মধুসূদন দত্তের সেই মর্মবিদারক আক্ষেপোক্তি:
"নিজ গৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?"
আজকের পশ্চিমবঙ্গে তা কি লজ্জাজনকভাবে সত্য প্রমাণিত হচ্ছে না? কোনো যথার্থ বাঙালি তারই জাতিসত্তার বিনাশকদের গৃহভৃত্য হতে পারে না। অথচ এমন বিস্ময়কর ঘটনা বাঙালি-বসতি জুড়ে কার্যত সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। এরপরও কি ২১শে ফেব্রুয়ারি বা ১৯শে মে'র তাৎপর্য নিয়ে বাক্-বিস্তার করা চলে? মনে পড়ছে জাগ্রত-বিবেক কবি শঙ্খ ঘোষের 'ফাঁদ' কবিতাটির কিছু পঙ্ক্তি:
"ঘিরে ফেলছ তুমি আমায় সমস্ত দিক থেকে
জলেও নয়, জঙ্গলে নয়, শহর ফেলছ ঢেকে।
এদিকে গেলে বাঘ তাড়া দেয়, ওদিকে গেলে কুমির
সবকিছুতেই রূপ দেখছি অন্যরকম তুমির।
বুঝতে এখন পারিনা আর কোথায় তবে যাই
দশক দশক আমিই তোমায় দিয়েছি আশনাই।
ছিলে নিছক বেড়াল, আমি বাঘ বললাম তাকে
নিজের হাতেই খাল কেটে পথ দিলাম কুমিরটাকে।"
যে দানবিক শক্তি দুই থেকে দু'শ-তে পরিণত হয় তিন দশকের মধ্যে; তাকে প্রশ্রয় দেয় চোখ থাকতেও অন্ধজনেরা। এবং এর পেছনেও রয়েছে আধিপত্যবাদের কাছে আত্মসমর্পিত বাঙালির সামূহিক আত্মবিস্মৃতি। ২১শে ফেব্রুয়ারি ও ১৯শে মে'কে যখন আমরা উদ্যাপনের দিবসে পরিণত করছিলাম, আমাদের ছিন্নভিন্ন করার গিলোটিন তখনই তৈরি হচ্ছিল। নব্য-আউশভিৎসের কালোছায়া যখন ঘনীভূত হচ্ছিল, আমরা মশগুল ছিলাম "কত রবি জ্বলে রে/ কে বা আঁখি মেলে রে..." নীতিতে। ২১শে - ১৯শে প্রতি বছরই এসেছে এবং চলেও গেছে। কিন্তু তন্দ্রাছন্ন বাঙালি-সমাজ ভেবেছেন, অনেক দূরের কোনো বসতিতে আগুন যদি লেগেও থাকে, আমরা তো নিরাপদ! অতএব আগ্রাসী ফ্যাসিবাদের ঢোল-শোহরতে আমরাও সঙ্গে থাকি ক্ষতি কী? অথচ বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বঙ্গকে যখন খণ্ড-বিখণ্ড করছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি, আমাদের জাতির অভিভাবকেরা এর তাৎপর্য বোঝার চেষ্টামাত্র করেননি। দেশভাগ যে আসলে পাঞ্জাব ও বাংলাভাগ, তা সময়মতো বুঝে নিয়ে পাঞ্জাব আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মেধার গর্বে বুঁদ থেকে বাঙালি এই নির্মম সত্যকে সবচেয়ে বেশি ভুলে থেকেছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অবশ্যই পালন করা হোক। তবে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের আমরা যেন এই প্রশ্নও করি: জাতিবিদ্বেষ কবলিত দেশে বিচারের বাণী যখন নীরবে নিভৃতে কাঁদে, ন্যায়নীতি সাংবিধানিক অধিকার - সামাজিক বিবেক - সভ্যতা ও সংস্কৃতি ইত্যাদির আদৌ কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে কি? ইচ্ছামতো ইতিহাস পালটে দিয়ে ক্ষমতা দখলের পাটিগণিত অনুযায়ী নৈরাজ্যসর্বস্ব অন্ধকারের পর্যায় শুরু হলে একদিকে আদালত অন্যদিকে গণমাধ্যম নির্লজ্জভাবে একচক্ষু হরিণ হয়ে যায়। সমস্ত পক্ষেরই সবচেয়ে বড়ো শত্রু বাঙালি। তাহলে আত্মপ্রতারণার কোনো অবকাশই তো নেই রাষ্ট্রীয় মৃগয়ার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত বাঙালিদের। পশ্চিমবঙ্গে ভোট শিকারীদের দামামা বেজে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রশক্তির মুষল ছাড়া অন্যকিছু নয়। হিন্দি-গুজরাটি 'আঁতাতের' চক্ষুলজ্জা নেই, বোধ-বিবেক নেই। নামমাত্র স্বাধীনতা অর্জন করার পরে প্রদেশ পুনর্গঠনের অজুহাতে দেশভাগের কারিগরেরা সুচতুরভাবে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বঙ্গকে টুকরো টুকরো করেছিল। সুতরাং বাঙালির জন্য চিরদিনই ডাঙায় বাঘ জলে কুমির। আর ইদানীং তো খোলাখুলিভাবে এনআরসি'র মতো ব্রহ্মাস্ত্র আর এসআইআর-এর মতো পাশুপত অস্ত্র প্রয়োগ করছে চিরশত্রু বাঙালিদের সর্বস্বান্ত করার জন্যে। যে দেশে মাতৃভাষায় কথা বলা অপরাধ, তা কি কখনো 'স্বদেশ' বলে গণ্য হতে পারে?
এই মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা না করে কোন্ আত্মপ্রতারক দিবস উদ্যাপন করব আমরা? 'উইপোকা' বাঙালিদের আসাম ও ত্রিপুরা থেকে নয় কেবল, উত্তর প্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওডিশা, আন্দামান থেকে বিতাড়িত করার নীল নকশা তৈরি হয়ে গেছে। খোদ পশ্চিমবঙ্গেই বাঙালির বুকের উপর বসে যারা চুল দাড়ি উপরে নিচ্ছে, তাদের উদ্দেশেই কি বলতে থাকব: 'মেরেছিস কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না!' খণ্ডিত ভারতের সমস্ত প্রান্ত থেকে বাংলাভাষীদের উৎখাত করার বিষাক্ত বক্তব্য যখন দানবিক আস্ফালনের সঙ্গে সর্বত্র বারবার প্রচারিত হচ্ছে, একুশে ফেব্রুয়ারি বা উনিশে মে কোন বার্তা নিয়ে আসে? হিন্দি-গুজরাটি আধিপত্যবাদ আর মধ্যযুগীয় কুসংস্কার-সর্বস্ব ইসলামি মৌলবাদ ও হিন্দুত্ববাদের কাছে বাঙালিরা আত্মসমর্পণ করার আগে একবার অন্তত রবীন্দ্রনাথ ও লালনকে স্মরণ করুক।
কাঁঠালের আমসত্ত্ব যেমন হয় না, হতে পারেনা – খাঁটি বাঙালি না হিন্দু না মুসলমান; বাঙালি না জাত্যাভিমানী না জন্মসূত্রে আরোপিত হীনমন্যতার শিকার। এমন বাঙালি কখনও তারই জাতিসত্তার চিরশত্রু ও ঘাতক, অন্ধকারজীবী পিশাচদের ভৃত্য হতে পারেনা। একুশে ফেব্রুয়ারি ও উনিশে মে আমাদের পাঠ দেয়, তীব্র তিক্ত অসহিষ্ণুতার কালব্যাধিকে শনাক্ত করে সর্বপ্রযত্নে প্রতিহত করো। পরম্পরাবাহিত দর্শনে আস্থা রেখে অন্তর্ঘাতকদের দৌরাত্ম্য পর্যুদস্ত করো। বাঙালির চির বহমান লোকপরম্পরা থেকে এখনো তো উঠে আসছে চিরকালীন তাৎপর্যবহ স্বর: "কে জাগে রে কে জাগে? লাল কমল না নীল কমল?" আর প্রত্যয়-দৃঢ় উচ্চারণ নিয়ে ফিরে আসে প্রতিধ্বনি: "জেগে আছে লালকমল, জেগে আছে নীলকমলও।" লালকমল যদি রবীন্দ্রনাথ, নীলকমল তবে নজরুল। একুশে ফেব্রুয়ারি বলছে, বলছে উনিশে মে, বাঙালি লালকমল এবং বাঙালি নীলকমল পর্বে-পর্বান্তরে জেগে ছিল, জেগে আছে, জেগে থাকবে।
শিল্পী: মণীষ দেব

পরিচিতি: জন্ম: ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৯। কবি ও প্রাবন্ধিক। আসাম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য। নিবাস: শিলচর, অসম।