বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা জন্মভূমি।
গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে বয়ে
যাহার চরণ চুমি
ব্রহ্মপুত্র গেয়ে-বেড়ায়
যাহার পূণ্য গাথা
সেই যে আমার জন্মভূমি
সেই যে আমার মাতা।
(কায়কোবাদ)
আমার জন্ম রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষা আন্দোলনের দশকে, বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার আজিমপুরে। আন্দোলনের শেকড় ১৯ নং আজিমপুর।
আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বলতে মনে করি, বাহান্নর ভাষা আন্দোলনকে। কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি প্রণয়নের মাধ্যমে সঙ্ঘবদ্ধ ধারাবাহিক প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তোলাই হচ্ছে আন্দোলন।
দেশ ভাগের পূর্বে অনেকে চেয়েছিলেন বাংলা ভাষা ভারতের রাষ্ট্রভাষা হোক। সভা সমিতি, বিতর্ক, পত্রিকাতে বেশ কিছু লেখালেখি হয়। ১৯১১ সালে রংপুর শিক্ষা সম্মেলনে সৈয়দ নওয়াব আলী ভারতের অন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার গুরুত্বের কথা বলে জাতীয় পর্যায়ে ভাষা হিসেবে স্বীকার করার আহ্বান জানান। ১৯১৮ সালে বিশ্বভারতীর এক সম্মেলনে ডঃ মোহম্মদ শহিদুল্লাহ ভারতের সাধারণ ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯৩৭ সালে মৌলানা আকরাম খাঁ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে বাংলাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেন। '৪২ সালে বাংলার স্বতন্দ্রের ধ্যান - ধারণার ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি। পূর্বে একশ্রেণির বাঙালি নেতাদের উর্দুপ্রীতির মোহভঙ্গের চেষ্টা চালায় এ সোসাইটি। ১৯৪৩ সালে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে 'মাসিক মোহাম্মদী' তে আবুল মনসুর আহমেদ লেখেন - "বাংলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা হবে কি উর্দু হবে তর্ক খুব জোরেশোরে উঠেছিল। তেতাল্লিশ সালে এস. এম. হল সাহিত্য সম্মেলনে বাংলা এ অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। '৪৬ সালের ৭, ৮, ৯, এপ্রিল দিল্লিতে মুসলিম লিগের কনভেনশনে দলবলসহ শেখ মুজিব বাংলা স্লোগান দিতে দিতে সম্মেলনে উপস্থিত হন। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। শেখ মুজিব তখন মুসলিম লিগের একজন কাউন্সিলর ছিলেন। ৪৭ সালের ২৯ জুলাই আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে ডঃ মোহম্মদ শহিদুল্লাহ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিক দাবি পেশ করেন। এ জাতীয় তর্ক বিতর্কের মধ্যে দিয়েই ভাষার দাবি সীমিত থাকে।"
আন্দোলনের সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৭ দিনের মাথায় তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আবুল কাসেম ১৯ নং আজিমপুরের নিজ বাসা থেকে 'তমদ্দুন মজলিস' নামক একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য একটি ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু করেন। 'তমুদ্দিন মজলিস' ভাষা আন্দোলনের স্থপতি ও জনক সংগঠন।
'তমদ্দুন মজলিস'-এর গঠন প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল কাসেম বলেন - "পাকিস্তান লাভের সাথে সাথে বাংলাকে সরকারি ভাষা বা শিক্ষার মাধ্যম করার কথা গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকি, এ বিষয়ে প্রথম আলাপ করি বন্ধু অধ্যাপক এ. কে. এম. আহসান-এর সাথে, এরপর আলোচনা করি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সৈয়দ নজরুল ইসলাম, (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) ও শামসুল আলমের সাথে, তাঁরা সকলেই এ ব্যাপারে আমাকে সমর্থন করেন। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন করি।"
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের সাথে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি বাস্তবের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নটির সাথে সাথে আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নটি জড়িত হয়ে যায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে দেশের জনগণের উপর ষড়যন্ত্রমূলক হঠকারি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া শুরু করে। পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী মুসলিম শাসক রাজনীতিবিদরা বাংলা ভাষা তথা বাঙালি জাতিসত্তা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপপ্রয়াস চালান।
পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সহ তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করেন। কাজগুলোর মধ্যে ছিল প্রশাসনের দপ্তরগুলো পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত করা সহ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দু ও ইংরেজিতে কাজকর্ম চালু করা। এতে করে মুদ্রিত সকল টাকার ফর্ম, ডাক টিকিট, মনি অর্ডার ইত্যাদি উর্দু ও ইংরেজিতে মুদ্রিত হতে থাকে। এই সিদ্ধান্ত ছিল পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অস্তিত্বের উপর চরম আঘাত। পূর্ব বাংলার সব জায়গায় বিরাজ করছিল প্রতিকূল পরিবেশ।
এতবড়ো একটি জাতীয় জিজ্ঞাসার জবাব শাসককুলের সাথে লড়ার জন্য মজলিসের ছত্রছায়ায় প্রথম একত্রিত হয়েছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম (স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি), শামসুল আলম (এস. এম. হলের সমাজসেবা সম্পাদক), ফজলুর রহমান ভূঁইয়া (এস. এম. হলের প্রচার সম্পাদক), মোফাখারুল ইসলাম, প্রভাষক ডক্টর নুরুল হক ভূঁইয়া (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন) আব্দুল খালেক (এস. এম. হলের ছাত্র ক্রীড়া সম্পাদক এবং পুলিশের আইজি হিসেবে অবসর গ্রহণ)।
'তমদ্দুন মজলিস' সৃষ্টি থেকে ভাষা আন্দোলনের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে একটি জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি করতে তারা সক্ষম হয়েছিল। যদিও প্রথমে এ আন্দোলনের প্রতি অনেকের আগ্রহ ছিল না এবং একটি প্রতিকূল বৈরী অবস্থা বিরাজ করছিল; কিন্তু যে যুক্তি এবং জাতীয় মুক্তিমন্ত্রে তারা জাতিকে মন্থন শুরু করেছিলেন, তাতে একটি দীপশিখার মতোই তারা জ্বলেছেন এবং ধাপে ধাপে প্রজ্জ্বলিত দাবানলে জাতিকে দগ্ধিভূত করেছেন, ছড়িয়ে দিয়েছেন আগুন সর্বখানে। বস্তুত 'তমুদ্দুন মজলিস' অ্যাটমিক বোমার একটি স্ফুলিঙ্গের মতো ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রথম জাতিকে ধাক্কা দেয়, একটি পরমাণু স্ফুলিঙ্গ যেমন আরেকটি স্ফুলিঙ্গকে ধাক্কা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল আয়তন জায়গাটি অ্যাটমিক এনার্জিতে তপ্ত করে ফেলে, তেমনি 'তমুদ্দুন মজলিস' বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটিকে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ছড়িয়ে দিয়ে জাতিকে তাপিতমথিত করে তোলে। (সূত্র: জাতীয় পুনর্জাগরণে তমদ্দুন মজলিস, পাণ্ডুলিপি, এম. এ. বার্নিক, মাহমুদ বিন কাসেম)
'তমদ্দুন মজলিস' প্রতিষ্ঠার এক-দুই মাসের মধ্যে মজলিসের আহবানে সাড়া দিয়ে যাঁরা মহান আন্দোলনে নিজেদের জড়িত করেছেন, প্রতিটি উল্লেখযোগ্য সময়ে এ আন্দোলনে তাঁরা নিবেদিত ছিলেন। তাঁরা সকলে স্ব স্ব ক্ষেত্রে ছিলেন সুপ্রতিষ্ঠিত।
'তমুদ্দিন মজলিস' সাংগঠনিকভাবে একটি ধারাবাহিক আন্দোলনের সূচনা করে ভাষা আন্দোলনকে একটি সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ করাচিতে এক সভায় ভাষা আন্দোলনকে প্রাদেশিক বলে আখ্যা দেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ভাষার প্রশ্নে তুমুল বিতর্ক হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন - "আমি নিশ্চিত করে বলছি, আমি যা বলছি তা প্রাদেশিক চিন্তা হতে বলছি না, আমি জানি বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে বলতে গেলে বলতে হয় এটা রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগণের ভাষা। পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ লোকের ভিতর ৪ কোটি চল্লিশ লাখ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। ...স্যার তাহলে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হওয়া উচিত? রাষ্ট্রভাষা সেটাই হওয়া উচিত, যে ভাষায় রাষ্ট্রের বেশিরভাগ লোক কথা বলে। তাই আমি মনে করি বাংলা রাষ্ট্রের সাধারণ ভাষা।
কিন্তু পূর্ব বাংলার জনগণ যখন পোস্ট অফিসে মানি অর্ডার ফর্ম আনতে যায় তখন দেখেন তাতে যা লেখা আছে তা সবই হয় উর্দু না হয় ইংরেজিতে লেখা। ফলে তাঁরা এ ব্যাপারে কষ্টকর অবস্থায় পড়ে যায়। ...স্ট্যাম্পে উর্দু ও ইংরেজিতে ছাপা। ফলে সেখানে তারা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। স্যার, এসব কারণে আমি মনে করি বাংলাকে শুধু প্রাদেশিক ভাষা করে রাখলে হবে না, এটাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে হবে। তাই আমি পাকিস্তানি আইনের ২৯ নং ধারায় 'ইংরেজি'র পর 'বাংলা' শব্দটি যোগ করতে আহ্বান জানাচ্ছি।"
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাত মাস পর ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ক্ষমতাসীন মুসলিম লিগের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এলেন। এক বিশাল জনসভায় তিনি ঘোষণা দিলেন - "উর্দু শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।" সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত ছাত্র জনতা তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং তাঁর মুখের ওপরেই তারা শুনিয়ে দিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হবে। বাঙালিদের মুখের ভাষা গর্বের বস্তু, বাংলা ভাষার অধিকারের জন্য পূর্ব খণ্ড জুড়ে শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। পাকিস্তানের শাসকচক্র আন্দোলনের সামনে নতি স্বীকারে বাধ্য হলেন। উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য হয়েছিল পশ্চিমা প্রভুরা।
১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে পল্টনে জনসভায় ঘোষণা করেন, "উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।" উল্লেখ্য, খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হবে বলে ছাত্রদের সাথে চুক্তি করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসমাজ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা কমিটির তখন আহ্বায়ক ছিলেন আব্দুল মতিন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় ২৯ জানুয়ারি সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হবে। ধর্মঘট শেষে ছাত্ররা এক বিরাট মিছিল সহকারে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় এবং সেখানে পৌঁছে মিছিল সমাপ্ত করে। সে মিছিলের প্রতি আশপাশের জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানায়।
ভাষা বিতর্ক নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করে, সেই সূত্রে ৩১ জানুয়ারি (১৯৫২) ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে আওয়ামি লিগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যর একটি সর্বদলীয় কর্মপরিষদ গঠন করা হয়। সেখানে বক্তব্য রাখেন আবুর হাশিম, খালেক নেওয়াজ খান, হামিদুল হক চৌধুরী, অলি আহাদ, আবদুল মতিন প্রমুখ।
সভায় নিখিল পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলিগ, তমদ্দুন মজলিস, ইসলামি ব্রাদারহুড, যুবলিগ, পূর্ব পাক মোহাজের সমিতি ইত্যাদি সংগঠন ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, মিটফোর্ড মেডিক্যাল কলেজ, জগন্নাথ কলেজ প্রভৃতি শিক্ষায়তনের ছাত্রনেতা ও কর্মীরা ছিলেন। এই সভায় ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট, ২১ ফেব্রুয়ারি 'রাষ্ট্রভাষা দিবস' পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় শেখ মুজিব, ছাত্র নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বন্দি মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন।
নুরুল আমিন সরকার ছাত্র আন্দোলনের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি বিকাল তিনটায় ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র-ছাত্রীরা সংগঠিতভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে এবং "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" স্লোগান দিতে দিতে প্রাদেশিক পরিষদ অভিমুখে অগ্রসর হয়। পুলিশ উপস্থিত ছাত্র ও জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করলে সংঘর্ষ বাঁধে। এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে জব্বার, রফিক, বরকত, সালাম সহ অনেকে শহিদ হন, আহত হন ছাত্র জনতার অনেকেই। এই হত্যাকাণ্ডের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং এর প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি একটি বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। পুলিশ শোভাযাত্রার উপর গুলি চালায়, নিহত হন শফিকুর রহমান।

'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ সহ সমস্ত বাংলা ভাষী অঞ্চলে পালিত একটি বিশেষ দিবস, যা ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়। ২০০২ সালে ৫৬/২৬২ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এটি 'শহিদ দিবস' হিসাবেও পরিচিত। এ দিনটি বাঙালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি চরম অবক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে - এর মূলে রয়েছে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। ব্যক্তি বা জাতির অস্তিত্ব নির্ভর করে তার শেকড়ের উপর। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রধান কারণ পারিবারিক বন্ধন শিথিল, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া এবং কর্মব্যস্ততার কারণে অভিভাবকদের সাথে সন্তানদের দূরত্ব তৈরি, নৈতিক শিক্ষার অভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার, সাইবার বুলিং, গুজব ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করার প্রবণতা, আকাশচুম্বী ভোগবাদী মানসিকতা, নিজস্ব ঐতিহ্য মূল্যবোধের চর্চা নেই বলেই মানুষ সুস্থ সামাজিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। এর জন্য প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে জাতীয় জাগরণের।
গ্রন্থ ঋণ:
● আজিমপুরে ভাষা - আন্দোলন, এম. আর. মাহবুব।
● ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তাৎপর্য, আবদুল মতিন, আহমদ রফিক।
● সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
● ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু, ডাঃ মাহফুজুর রহমান।

পরিচিতি: কাজী ফেরদৌসী হক লিনু লেখালেখি করেন 'লিনু হক' নামে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। বাসস্থান: ঢাকা, বাংলাদেশ। প্রকাশিত গ্রন্থ: 'মেয়ে বিচ্ছু', 'অবরুদ্ধ নগরের গেরিলা ৭১', 'প্রথম পুরুষ', 'মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে বাংলার নারী'।