(এক)
অন্তর্গত অনুভূতি অভিব্যক্ত করার এক তীব্র তাগিদ কেবল মানুষ নয় সব রকম জীব-জন্তুর মাঝেও প্রকটভাবে বিদ্যমান। মানুষকে যদি সৃষ্টি ও বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সর্বাধিক সমাজবদ্ধ বলে সানন্দ স্বীকৃতি আমরা দেই-ই। তবে মানুষ কতোটা আসঙ্গলিপ্সু আর তার নিজ ভাব প্রকাশের তাগিদ কতটা জোরদার তা বোঝানোর জন্যে কোনো যুক্তি-ব্যাখ্যা-চাতুর্যের প্রয়োজনীয়তা নিঃসন্দেহে নেই।
এই ধরুন, এই যে আমি কিছু একটা বলতে চাইছি। আমার মনের মধ্যে উথলে ওঠা ভাব-অনুভূতি শব্দের সাযুয্যে উপস্থাপিত করতে চাইছি সর্বাত্মক সাফল্য সম্ভাবনা সন্দর্ভে। এর অন্যথা কী সত্যি সত্যি অন্য কোনো মানুষের বেলায় ঘটতে পারে? সম্ভবত না। অভিমান কিংবা নিঃসঙ্গপ্রিয়তার একটা সংশয় হয়তো কারো মনে বাঁক খাওয়া দাগের শেষে ঝুলে থাকা একটা বিচ্ছিন্ন বিন্দুর মতো প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে প্রতিভাত হতে চাইতে পারে। কিন্তু আমি বলব সেই নৈঃশব্দ্য কিংবা নিঃসঙ্গপ্রিয়তা আসলে বাঙ্ময় শব্দচয়নের চাইতেও অভিব্যক্তিময় কিছু অন্যরকম সময় মাত্র। এতে উপস্থাপিত বক্তব্যের অনির্বচনীয় সত্যতায় আপাত সত্য সমান সন্দিগ্ধতার স্থানও নেই।
ভাব প্রকাশের স্বচ্ছন্দ তাগিদ আর তার বিপরীতে একে বিঘ্নিত করার প্রয়াস-সম্ভাবনা-সংকটসমৃদ্ধ ফলাফল এসব বোধগম্যতার অপার অন্তর্গত করার প্রয়াসে সবচেয়ে সহজ ও সর্বজনীন একটা আঙ্গিক পাঠক সমীপে উপস্থাপনায় আনার চেষ্টা করা যাক।
(দুই)
ধরা যাক শিশুর কান্না। শিশুর কান্নার কোনো মানে আছে কি? কতোখানি অর্থবহ হতে পারে বিষয়টা। অর্থবহতার কড়িকাঠ খুঁজলে দেখা যাবে যত মুনি তত মত। কেউ বলবেন নিশ্চয়ই খিদে। না হয় বলবেন কোলে উঠতে চাইছে। তাতেও জুত না হলে বলবেন, মা'কে দেখছে না তো, মা'কে খুঁজছে।
আসলে শিশুর কান্নার মানে তো অনেক কিছুই হতে পারে। আমাদের আলোচ্য শিশুর কান্নার মানে খোলসা করার জন্যে বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ জনের সমভিব্যাহারে সভা-সেমিনারের আদপে কোনো প্রয়োজন নেই। তা সে শিশুটির বাবা কিংবা মা যে ভাষাভাষিরই হোক না কেন। আলোচনার শিশুটি পৃথিবীর যে ভূ-খণ্ডেরই হোক না কেন! চীনা শিশু, রুশ শিশু, আমেরিকান-জার্মান-ফ্রেঞ্চ কিংবা জাপানিজ। যে ভাষাভাষীই হোক শিশু কান্নার শব্দ-উচ্চারণ-উপস্থাপনা কোথাও কোনো তারতম্য নেই। কান্না, সে তো শুধুই কান্না। সম্ভবত যে শিশুর কান্না নিয়ে আমরা কথা বলছি – সে শিশুর মা-ই সবচাইতে ভালো বলতে পারেন তার মানে।
শিশুর এই নির্জলা কান্নাকে যদি আমরা রুদ্ধ করতে চাই তবে কী হতে পারে? যদি সত্যিই কোনো শিশুর কান্নাকে আমরা রুদ্ধ করে দেই। তবে কী হতে পারে অনুভূতি ব্যক্ত করার প্রয়াস বিঘ্নিত হবার ফলশ্রুতিতে। কী করে জানব আমরা সেই শিশু খেতে চাইছে! ঘুমোতে চাইছে! খেলতে চাইছে! প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার তাড়নায় উদগ্রীব হয়ে আছে! কোলে চড়তে চাইছে! কিংবা এমনই কোনো একটা দাবি-দাওয়া নিয়ে বাঙ্ময় হতে চাইছে। অধিকার বিঘ্নিত বাক্রুদ্ধ শিশুটির অসহায় দৃষ্টি তার আকাঙ্ক্ষা তো দূরের কথা অসহায়ত্বকেই বা কতটুকুন প্রকাশোম্মুখ বা উপস্থাপন করতে পারবে? আমাদের সম্ভবত ঠিক জানা নেই। সেক্ষেত্রে অনুভূতি ব্যক্ত করার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা আর অন্য সবার কাছে আমার অব্যক্ত আবেগ-অনুভূতির যথাযথ উন্মোচনের আকাঙ্ক্ষায় আমি সচেষ্ট হতে পারি ভিন্নতর এক সত্য উপস্থাপনায়। কোনো এক শিশুর অজানা গল্প হয়তো আমি বলতে পারি এখানে। যদি তা আপনাদের বোধকে, মন ও মানসকে খানিকটা বোঝাতে পারে আমার প্রকাশোম্মুখ আবেগানুভূতির অভিধা।
(তিন)
অন্তহীন প্রান্তর। আলের বিভাজনে শীর্ণ খণ্ডিত রেখাটুকুন ছাড়া নিরন্তর বাতাসের গায়ে বিলি কেটে যাবার মতোন অবারিত ধান খেত। এর বুক চিরে চার-পাঁচ হাত প্রস্থের মেটে পথ দু'পাশের জমিন থেকে দেড়-হাত উচ্চতায় সাপের মতোন এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। গোরুরগাড়ি, ঠেলাগাড়ি আর রিকশা-ভ্যান যাতায়াতের স্মৃতিচিহ্ন বুকে এঁকে একজোড়া গর্তখোদা সমান্তরাল ভূখণ্ড পথটার বুকে ক্রমঅগ্রসরমান। দু'পাশের মাটি সরে সরে মাঝখানটায় উঁচু ঢিবির মতোন একটা চলমান দেয়াল তৈরি করেছে, যার মাঝখানে থেকে থেকে এক চিলতে ঘাসের আস্তরণ। পথের দুইপাশ মাঝখানটার মতোনই খানিকটা উঁচু হয়ে আছে দাবানো জোড়া দাগের অংশটুকুর চেয়ে। জমিনের ধার থেকে পথের কিঞ্চিৎ অংশসহ পুরোটা পথই সবুজ ঘাসে মোড়ানো। গ্রামের ওই মেটে পথে সারি বেঁধে একদল মানুষ ছুটছে হন হন করে। চলমান পদযুগল সবারই ধূলি ধূসরিত। সেই ধূলি ঝেড়ে খানিকটা স্বচ্ছন্দ হতে একটু পর পরই ঘাসে ঢাকা অংশটুকুন মাড়িয়ে যাচ্ছে সব পথিক। দু'পাশের ধানখেত পথের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে খানিকটা বেড়ে উঠলেও শিষ পরিণত হয়ে ওঠেনি এখনো।
সবার সামনে দু'জন কাঁধে স্টেনগান চাপিয়ে, চোখ-কান সতর্ক রেখে ছুটছে। তাদের পেছনে পেছনে সতেরো জন নারী-পুরুষ। সবার হাতে-কাঁধে নানা আকৃতির কাপড়ের পুঁটলি। দু-একজনের হাতে বেতের ঝুড়ি। এই সতেরোর কাফেলায় পাঁচজন নারী, তিনজন কিশোর, চারজন বৃদ্ধ, দু'জন বৃদ্ধা। বাকি তিনজন সমর্থ পুরুষ। সবচেয়ে পেছনে থ্রি নট থ্রি রাইফেল কাঁধে হেলিয়ে ধরে এগোচ্ছে একজন সামনের সবার দিকে নজর রেখে।
অকস্মাৎ মেঘের গুড় গুড় শব্দের সাথে অন্যরকম শব্দের সন্দিঘ্নতায় চমকে পথ ছেড়ে ধানখেতের দিকে ছুটলো সবাই। খানিক পর চারপাশ দেখেশুনে সন্দেহের মেঘ কাটতে সবাই আবার পথে ফিরলো। আরো সাতটা গ্রাম পেরুলে এই কাফেলার নিরাপদ আশ্রয়ের গন্তব্য। এখানে পথের কতকটা অংশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আর দুঃশ্চিন্তার। এখান থেকে খানিকটা সামনেই চৌরাস্তা। আড়াআড়িভাবে এই পথটার বুক চিরে এগিয়ে গেছে এই পথটার চাইতে প্রশস্ত আর একটা পথ। ওটার কতকটা পিচ ঢালাই আর কতকটা ইট বাঁধানো। ওই পথে ভটভটিয়ে জিপ-ভ্যান-লরি হাঁকিয়ে পাক মিলিটারিরা যাওয়া-আসা করে। ঝুঁকি আর উৎকণ্ঠা তাই ওই চৌরাস্তার মোড়টাকে কেন্দ্র করে। ওখানে দু-তিনটা দোকান-পাট আছে। কিছু মানুষের আনাগোনা থাকে অধিকাংশ সময়ই। আর তাই জানাজানি হবার, এই মানুষগুলোর আসার খবর চাউর হবার শঙ্কা।
সামনের দুইজন আর পেছনের একজন। এই তিন মুক্তিযোদ্ধা সতেরো জন কাফেলাকে এগিয়ে দেবে চৌরাস্তার পর দুটো গ্রাম পর্যন্ত। ওখান থেকে এদের দায়িত্ব নেবে আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা। সতেরোর কাফেলায় আরো একজন আছে যাকে হিসেবে ধরা হয়নি। এগারো মাস বয়সি এক শিশু। সবার কোলে কাঁখে পালাবদল হয়ে ঘুরে ফিরে পথ পাড়ি দিচ্ছে সে।
শঙ্কা আর ঝুঁকির উৎস কাছাকাছি হতেই খুব ক্ষীণ একটা যান্ত্রিক শব্দ কানে এলো অগ্রপথিক সতর্ক দুই মুক্তিযোদ্ধার। শুনশান প্রান্তরের বুক চেরা রাস্তায় থমকে দাঁড়ালো সতেরো-যোগ তিনের কাফেলা। সাকুল্যে এই এক কুড়ির হিসেবের বাইরে, সবার কোলে কাঁখে ঘুরে ফিরে অগ্রসরমান একমাত্র শিশুটি চকিতে ফিরে এলো তার নিরাপদ আশ্রয়ে। মায়ের কোলে। অকস্মাৎ দীর্ঘ পথচলার লয়ে ছেদ পড়তে নৈঃশব্দ্য আরো প্রগাঢ় হতে শিশুটির সহজাত স্বতঃস্ফূর্ততার বিপরীতে তৈরি করে দিলো যেন বৈরী এক আবহাওয়ার। সন্দিঘ্ন দৃষ্টিতে মুখটা চারপাশে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেয়ে দেখে শিশুটি – অজানা অচেনা এক পরিবেশের মুখোমুখি হয়ে।
কান পেতে মিলিটারি কনভয়ের দূরত্ব-অবস্থান আন্দাজ করে মুক্তিরা ইশারা করে পথের পাশের ধানখেতের দিকে। প্রায় নিঃশব্দে সবাই পরিমরি করে ছোটে নিরাপদ দূরত্বের সন্ধানে। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাদেখি সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মাথা গুঁজে মাটিতে বসে আড়াল করে নিজেকে ধানখেতের মধ্যে। কসরত করে মাথা গুঁজে নিঃশব্দ অবস্থানের এমন ভঙ্গিমা মোটেই সুখকর লাগে না অবুঝ শিশুটির। খুব সহজেই সে প্রতিবাদ জানাতে চায় তার আপন ভাষায়। কনভয়ের শব্দ যখন শ্রুতিগোচর হতে শুরু করেছে সবার। তখনই সেই শব্দ ধানগাছে শন শন বাতাস তাড়ানো শব্দ ছাপিয়ে সবার কানে বাজে অবোধ শিশুর প্রতিবাদী কান্নার শব্দ। আঁতকে ওঠা মা তখুনি এক ঝটকায় কাপড় সরিয়ে উন্মুক্ত স্তনে চেপে ধরে শিশুর মুখ। এরকম বৈরী পরিবেশে এমনটা গ্রহণ করতে বিরোধিতা করতে চাইলে শিশুটিকে সস্নেহ আদলে শান্ত করতে চেষ্টা করে মা। তবুও মা থামাতে পারে না হতবিহ্বল শিশুর ক্রোধ ও কান্না। অসহায় মায়ের চোখে তখন এতগুলো মানুষের ধরা পড়ার, মারা পড়ার, বন্দি হবার, নির্যাতিত হবার নানারকম সম্ভাব্য চিত্র একে একে ভাসে – স্লাইড শো'র মতোন। বুকে চেপে ধরা শিশুর কান্না তার মায়ের কাছে ক্রমশ জটিল ও বোধগম্যতার অতীত কোনো একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সন্ত্রস্ত মা সজোরে শিশুর মুখ চেপে ধরে তাকে স্তনদানে সচেষ্ট থাকে। মরিয়া মায়ের প্রাণপণ চেপে ধরা চেষ্টার কাছে শিঘ্রই হার মানে শিশু। বশে আসে কান্নার শব্দ। যে যার লুকোনো অবস্থানে বসে হাঁপ ছাড়ে।
পাক মিলিটারি কনভয় পার হয়ে যায় কাফেলার সন্নিকট পথ। ক্রমশ যান্ত্রিক শব্দ দূরত্বে সরতে থাকে। সেই সাথে বার বার গুড় গুড় শব্দ সাজায় আকাশ। কনভয়ের যান্ত্রিক শব্দের কোরাস আর মেঘের শব্দরাগ মিশে যায় নৈঃশব্দ্যের অনন্ত সীমান্তে। বিকেলের আলোয় চাইনিজ রাইফেলের ডগায় বাঁধা বেয়নেটের প্রতিফলন এক সময় হারায় দৃষ্টির অন্তরালে।
কনভয়ের শব্দ বিলীন হতে ধান খেতে মিশে থাকা মনুষ্যমূর্তিগুলো প্রাণ ফিরে পেতে থাকে। শঙ্কা আর বিহ্বলতার চাদর সরতেই শিথিল হলো শিশুটিকে চেপে ধরে থাকা মায়ের হাত। ভয় ও দুঃস্বপ্নের জগৎ থেকে ক্রমশ বাস্তবে ফিরে আসতে থাকা মা আস্তে আস্তে উঠে আসে আত্মগোপনের আসন থেকে। অথচ অভিমানী শিশুটি এখন একবারও প্রতিবাদ জানায় না। একটুও নড়ে না। কাঁপে না। বাস্তবে কিছুমাত্রও ফিরে আসে না।
শিথিল হাতের গায়ে এলানো থাকে শিশুর মুখ। ঠোঁটের পাশ থেকে অবহেলায় অবলীলায় গড়িয়ে যায় মায়ের দুধ। একটা ফোঁটা দুধও তার গলা দিয়ে নামে না পাকস্থলীর পথে। শিশুটি কাঁদে না আর। হাসে না। অর্ধন্মোলিত চোখ তার একটুও নড়ে না। দ্যাখে না যেন সে কিছুই।
পা ফেলতেই শিশু কোলে থমকে যায় মা। বড়ো বেশি নিঃশব্দ হয়ে আছে শিশুটি। গুড় গুড় শব্দ তোলা মেঘ তখন সবে গলতে শুরু করেছে। শিশুকে কোল থেকে সরিয়ে শেষ বিকেলের আলোয় চোখের সামনে তুলে ধরে মা। একজোড়া অর্ধোম্মেলিত চোখে সেই শিশু তখন নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। উদ্বিগ্ন মা'কে সে দ্যাখে না। মায়ের চোখে বৃষ্টি সে দ্যাখে না। আকাশ জুড়ে কান্নার প্রস্তুতি, তাও সে দ্যাখে না। তার অপলক দৃষ্টি তখন কেবলই দেখছে আকাশের অপার আকাশ। নিঃসীম নীলিমায় অপেক্ষাতুর মানব উৎস ও অন্তিম আবাস দ্যাখে শুধু সে। এক ফোঁটা বৃষ্টি টুপ করে মায়ের গাল গড়িয়ে নোনা মেখে নেমে আসে সম্প্রদান অপেক্ষাতুর স্তনে। মিশে যায় অবহেলায় উপেক্ষিত মাতৃদুগ্ধ স্রোতে।
(চার)
পুরানা পল্টন লাইনে সাদামাটা বাঙালি পরিবার। মা অপেক্ষায় থিতু হয়ে আছেন। ছেলে আজ জানি আবার কতো দেরি করে আসে। কতক্ষণ আগলে রাখে আর মা তার দুপুরের খাবার।
গত কয়েকটা মাস ধরে সারাটা শহর উন্মাতাল। দিনে দিনে বেড়েছে অস্থিরতা। গত কয়দিন একদল ছুটেছে গোপন সংবাদ নিয়ে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায়। তাই সব ছেলে-মেয়েরাই যেন পেয়ে গেছে আজ পথে নামবার ডাক। আজ সকাল থেকে মিছিলে, মানুষে, পতাকায়, ব্যানারে, ফেস্টুনে, প্ল্যাকার্ডে রাজপথ-ফুটপাথ একাকার। মিছিল এপথে গেছে। মিছিল ওপথে গেছে। স্লোগানে স্লোগানে তাবৎ নিঃশব্দ তারুণ্যে হারিয়েছে।
কিশোর - প্রৌঢ় - তরুণ - যুবক - পুরুষ - মহিলা - ছেলে - মেয়ে। আপামর আবালবৃদ্ধবণিতা। পথের টানে পথেই গড়েছে ঘর। বিপ্লবের চরাচর। সেই উন্মাতাল আবেগপ্রবণ অপ্রতিরোধ্য জনতার ভয়ে শাসক শঙ্কায়। ছুটেছে পুলিশ-মিলিটারি-লাঠিচার্জ-কাঁদানে গ্যাস। অতঃপর গুলি। নির্বিচারে। নির্বিবাদে। নিরীহ নিরপরাধ নিরস্ত্র প্রতিবাদীর নির্মম নির্মূল প্রয়াস সন্ধানে।
পথে পথে অকাতরে রক্তস্নানে শোয় সাহসী মানুষ। প্রতিবাদী ত্যাগী অপ্রতিরোধ্য অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার বাঙালির আবেগানুভূতি নিষ্কলুষ। মেডিক্যাল হোস্টেল ব্যারাকের পাশে এক ফোঁটা পানির খোঁজে শুকনো ঠোঁট চাটে যে মানুষ। তলপেটে অগোচরে রক্তের কল ছোটে তাঁর। সেই বরকতের ঘরে তখনো খাবার অপেক্ষায় মরে।
ক্রোধে কান্নারত একদল মানুষ যখন তাকে এনে মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে শোয়ায়। তখন রফিকের মাথার খুলিতে তাঁর দৃষ্টি সবার অগোচরে চিরকালের জন্য বাঁধা যায়। স্বর্গের সাথিরে পেয়ে যেন সে সাত তাড়াতাড়ি সাত আসমানের পথে ধায়!

পরিচিতি: কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রকাশক। নিবাস: ঢাকা, বাংলাদেশ।