প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

একুশ শতকের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষা



নুসরাত সুলতানা


১৯৪৮-৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বাঙালির তথা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়।

এই আন্দোলনই বুঝিয়ে দিয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র হলেও জাতি হয় না। এই ভাষা আন্দোলনই বুঝিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারা বাঙালি, পাকিস্তানি নয়।

১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান সংসদ বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে প্রস্তাব গ্রহণ করে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি কার্যকর হতে লেগেছিল আরও দুই বছর।

এরপরে '৬২, '৬৬, '৬৮, '৬৯ এবং সবশেষে '৭১ সব আন্দোলনে একুশের চেতনা পথ দেখিয়েছে বিপ্লবী ও যোদ্ধদের। আর ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র 'বাংলাদেশ'।

'৫২-'৭১-এর চেতনায় রচিত হয় অসংখ্য কালজয়ী সাহিত্য। শওকত ওসমান, আহমদ ছফা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শহীদুল্লাহ্ কায়সার এবং আরও অনেক কবি সাহিত্যিক সমৃদ্ধ করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

বাংলা সার্বভৌম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রধান কথ্য ভাষা বাংলা। এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, ওডিশা রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলাভাষী জনগণ রয়েছে। ভারতে হিন্দির পরেই সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা বাংলা।

সারা পৃথিবী জুড়ে ২৬ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে।

বাংলাদেশ একমাত্র বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্র। বাংলাদেশের শিক্ষা এবং সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাংলা ভাষার ভূমিকা ও গুরুত্বের ওপর বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব অনেকাংশে নির্ভরশীল।

বর্তমানে দেশে চার ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত আছে। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা।

২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৬৫,৫৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৩,৫৮৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৭,৯৫৫টি মাদ্রাসা, ১২টি ক্যাডেট কলেজ আছে। দেশে মোট কলেজের সংখ্যা ৪,৪৫১টি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্যান্য বিষয়ের সাথে বাংলাও সুন্দরভাবে শেখানো হয়। কিন্তু বাংলা মাধ্যমে সাধারণত অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ঘরের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করে। তাছাড়া গ্রামে-গঞ্জে শিক্ষার মান সন্দেহাতীত নয়।

ইংরেজি মাধ্যমে বাংলা একেবারেই গুরুত্ব পায় না। হাফেজি মাদ্রাসায় 'কোরআন' মুখস্থ করানো মূল বিষয়।

কওমি মাদ্রাসায় আরবি ভাষা, সাহিত্য, 'কোরআন'-'হাদিস' এসবই গুরুত্বপূর্ণ। আলিয়া মাদ্রাসায় কোনোভাবে বাংলা পড়ানো হয়।

ইংরেজি ভার্সনে কোনোরকমে বাংলা শেখানো হয়। এভাবে একজন ছাত্র বা ছাত্রী বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে ওঠে আদৌ ভালোভাবে বাংলা না শিখেই।

এরপর আসি স্নাতক পর্যায়ের বিষয়ে। যারা ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসায়, ফলিত বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে স্নাতকে পড়াশোনা করে তাদের সাথে বাংলা ভাষার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ বাংলা ভাষার কোনো বই সহজে পাওয়া যায় না। উচ্চশিক্ষা বাংলায় কল্পনারও অতীত। ফলশ্রুতিতে না-হয় জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ, না-হয় বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা।

এরপর আসা যাক সাংস্কৃতিক ও বিনোদনের বিষয়ে। একসময় মানুষ প্রচুর বাংলা নাটক-সিনেমা দেখত। বাংলা গান শুনত। বর্তমানে বিশ্বায়ন আর আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে হিন্দি আর ইংলিশ চ্যানেলের ছড়াছড়ি। তাছাড়া মানসম্মত নাটক সিনেমাও তৈরি হয় না। আঞ্চলিক ভাষার নামে জগাখিচুড়ি সংলাপ। অশুদ্ধ উচ্চারণ, আরও যে কত কত দীনতা! সরকারি অফিস ছাড়া সব অফিসে চিঠিপত্রের মাধ্যম ইংরেজি।

অর্থাৎ সমাজের উচ্চবিত্তের সাথে বাংলার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষ বাংলা ভাষা টিকিয়ে রেখেছে শুধু মৌখিক ভাষা হিসেবে।

সেই মধ্যযুগে বাংলা ভাষার নিজ রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল তারপর ইংরেজ আমলে পড়ালেখা, দলিল, আইন, সংবাদপত্র সবকিছুর প্রয়োজনে বিকশিত হয়েছিল গদ্য, পরিভাষা, তারপর চলিত ভাষা। এই বিকাশের সাথে প্রাণের যেমন যোগাযোগ ছিল তেমনি ছিল প্রতিষ্ঠার যোগাযোগ। আবার ভাষা আন্দোলনেরও ছিল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে কোনো বাঙালি চাকরি পেত না। ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। কারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাকরির সংকট দেখা দেবে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে। কিন্তু আজ প্রতিষ্ঠা আর প্রাণ কোথাওই যেন বাংলা ভাষার শক্তিশালী বিচরণ নেই।

এমন সব প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি বলে প্রতীয়মান হয়;

১. ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিশুদ্ধ বাংলা পড়া এবং লেখা শিখতে আগ্রহী হয়ে ওঠা এবং নতুন প্রজন্মকে শুদ্ধ বাংলা শেখানো।

২. যে যেখানেই পড়াশোনা করুক, মাদ্রাসা বা ইংরেজি মাধ্যম; বাংলাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে পড়ানো বাধ্যতামূলক করা।

৩. উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা বইয়ের প্রাপ্যতা বাড়ানো। ইউজিসি এবং বাংলা একাডেমির সমন্বয়ে সেটা সম্পাদিত হতে পারে।

৪. স্নাতক পর্যায়ে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাসের ওপর ২০০ নম্বরের কোর্স চালু করা। বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি ও বাংলা একাডেমির সমন্বিত প্রচেষ্টায় তা করা যেতে পারে।

৫. আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ছাড়া সব অফিস আদালতে বাংলায় যোগাযোগে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

১৯৯৯ সালে 'ইউনেস্কো' ২১ ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর মর্যাদা দিয়েছে। বিশ্বের দরবারে এ বাঙালির বিরল অর্জন। বাংলা ভাষার রয়েছে আরও উল্লেখযোগ্য সফল অর্জন।

ভারতে সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা হলো বাংলা। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস হতে বাংলা ভাষা ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা রূপে স্বীকৃত। পাকিস্তানের করাচি শহরের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা রূপে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজন কাব্বাহ বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান করেন। কিন্তু এইসব সাফল্য ছাড়িয়ে আজ অবজ্ঞা, উপেক্ষা আর অপমান বড়ো বেশি মূর্তিমান হয়ে ওঠে।

বর্তমানে বিশ্বায়নের নামে চলছে নতুন সাম্রাজ্যবাদিতা আর তাতে সবচেয়ে হুমকির সম্মুখীন ভাষা এবং সংস্কৃতি। সুখী, সমৃদ্ধ বাঙালি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে বিচরণ করতে চাইলে প্রতিষ্ঠা ও প্রাণের সাথে বাংলার শক্তিশালী যোগাযোগ স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।


তথ্যসূত্র:

সভ্যতার চেয়ে বড় – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি – গোলাম মুরশিদ
বাঙালি কাকে বলি – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
● এবং উইকিপিডিয়া

পরিচিতি: কবি ও কথাসাহিত্যিক। নিবাস: ঢাকা, বাংলাদেশ।