প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

বঙ্গ আমার, জননী আমার



সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়


শুরুর কথা

বছর কয়েক আগে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে প্রথম শিলচর যাই 'রূপম' আয়োজিত সর্বভারতীয় একাংক নাটক প্রতিযোগিতার বিচারক হিসাবে। তারপর ২০১৯-এ এবং ২০২৩ ও ২০২৪-এ। চারবার শিলচরে যাওয়ার সূত্রে পরিচয় নিবিড় হয় শিলচরের মানুষদের সঙ্গে। কারো কারো সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্কও গড়ে ওঠে। ২০১৮-এ যখন প্রথমবার শিলচর যাই তখন আসামের বরাক উপত্যকায় এনআরসি বিরোধী প্রবল আন্দোলনের জোয়ার। আমি ও সহযাত্রী বন্ধু মানস চৌধুরী আমরা দুজনেই সেই আন্দোলনে সামান্য সময়ের জন্যে হলেও জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু শিলচরকে আমরা চিনতে পেরেছিলাম। ২০১৮-র নাট্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে এনআরসি বা ডি- ভোটার বিরোধী আন্দোলনের উত্তাপ প্রতিযোগিতা মঞ্চের নাটকেও এসে পড়ে। এমনকি প্রতিবাদের অন্যতম উদাহরণ হয়ে ওঠেন শিলচরের ভাষা আন্দোলনের শহিদ কমলা ভট্টাচার্য। বিশ্বজিৎ দাশের লেখা 'কোরাস' নাট্যদলের প্রযোজনা 'কোথায় আমার দেশ' নাটকের বিভিন্ন চরিত্রেরা তাঁদের কথা শুনিয়েছেন, আর এরই পাশে ১৯ মে, ১৯৬১-তে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল শিলচরে, তারও কথা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে নাটকে। আসামের শিলচরে ১৯ মে, ১৯৬১ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে) এগারোজন শহিদের আত্মবলিদানের ইতিহাসও যুক্ত হয়ে যায় এই নাটকে। মঞ্চের আধো আলো, আধো অন্ধকারের মঞ্চে এসে দাঁড়ান কমলা ভট্টাচার্য। সবাইকে প্রতিবাদে শামিল হবার জন্য উৎসাহিত করেন। এইভাবে শিলচরের সমাজ-মানসে জড়িয়ে যায় ১৯ মে-র ভাষা আন্দোলন। আলোচনার সূত্রে জানতে পারি আশির দশকের শুরুতে নাট্যকার বিশ্বজিৎ চৌধুরী লিখেছিলেন 'শহিদ দিবস' নামে একটি নাটক। ১৯ মে তাই শিলচরের অধিবাসীদের কাছে কোনো বিশেষ একটি দিন নয়, তাঁদের আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রতীক।

কীভাবে গড়ে উঠেছিল এই আন্দোলন?

১৯ মে'র কথা

বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার অধিকারের দাবিতে বিচ্ছিন্নভাবে নানা প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হলেও ধীরে ধীরে সেই প্রতিবাদ আন্দোলন একটি সংঘবদ্ধ প্রয়াসের রূপ পায়। ১৯৬০ সালের ১ জানুয়ারি করিমগঞ্জের 'যুবশক্তি' পত্রিকায় লেখা হয়:
"কাছাড় হইতে বাংলা ভাষাকে উচ্ছেদ করিবার ষড়যন্ত্র আসাম গবর্ণমেন্ট দীর্ঘকাল যাবত নানাভাবে করিয়া আসিতেছেন... সংখ্যালঘু ভাষাভাষীগণের নিজ নিজ ভাষা রক্ষা করিবার জন্য যে সমস্ত অধিকার দেশের সংবিধানে দেওয়া আছে, তাহাকে কার্যত ব্যর্থ করিয়া দিয়া কাছাড়ের উপর অসমিয়া ভাষার সাম্রাজ্য বিস্তারের এই অপপ্রয়াসকে রোধ করিবার জন্য প্রয়োজন হইলে কাছাড়ের অধিবাসীগণ চূড়ান্ত ব্যবস্থাই গ্রহণ করিবেন... কাছাড়ের নিজের মাতৃভাষাকে রক্ষা করিবার জন্য কাছাড়ের সর্বস্ব পণ করিয়া ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে একটুও কুণ্ঠিত হইবে না।"

এরপরের ঘটনাক্রম দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। কাছাড় সাহিত্য পরিষদ শিলচর বার অ্যাসোশিয়েশন, করিমগঞ্জ বার অ্যাসোশিয়েশন প্রভৃতি স্থানে বিপুল জনসমাবেশ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ১৫ এবং ১৬ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সংবর্ধনার উত্তরে বলেন যে, অসমিয়াকে আসামের সরকারি ভাষা বলে ঘোষণা করার জন্য বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে তিনি তা অনুমোদন করেন না। অনিচ্ছুক জনগণের ওপর জোর করে হিন্দি ভাষা চাপাবার চেষ্টার বিরুদ্ধেও তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু এরপরেও আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভায় (২১-২২ এপ্রিল, ১৯৬০) অসমিয়াকে সরকারি ভাষা হিসেবে চালু করার প্রস্তাবকে সমর্থন করা হয়। জুন মাসে শিলচর করিমগঞ্জ হাইলাকান্দির ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন দিনে হরতাল পালন করে। জুলাই মাসের ২ এবং ৩ তারিখে শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় নিখিল আসাম বঙ্গভাষা সম্মেলন। রাজ্যে সকল নাগরিকের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার সুব্যবস্থা সম্পর্কে সুচিন্তিত ও কল্যাণকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

এই সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে চিঠি পাঠান পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রীযুক্তা পদ্মজা নাইডু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহম্মদ রেজাউল করিম, অতুল্য ঘোষ, অজয় মুখার্জি, প্রফুল্ল চন্দ্র সেন প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। সম্মেলনে ভাষণ প্রদান করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কাজী আব্দুল ওদুদ। বলা যায় এই সম্মেলন থেকেই আন্দোলনের অভিমুখ তৈরি হয়ে যায়। এরই মধ্যে খাসিয়া নেতা হুভার হানিউতা, এম.পি. অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে শিলং অপেরা হলে আয়োজিত এই সভায় পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই আসামের বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন অন্য মাত্রা পায়। কিন্তু এসব প্রতিবাদ আন্দোলন সত্ত্বেও ২৪ অক্টোবর, ১৯৬০ আসাম বিধানসভায় অসমিয়াকে রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।

৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬১ করিমগঞ্জ রমনীমোহন ইনস্টিটিউটে কাছাড় জেলা জনসম্মেলনের উদ্যোগে একটি সভা হয়। প্রতিবাদ আন্দোলন ক্রমশই ছড়িয়ে পড়ে। করিমগঞ্জের ওই সভায় গঠিত কাছাড় জেলা গণসংগ্রাম পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ১২ ফেব্রুয়ারি। এরই মধ্যে নিখিলবঙ্গ আসাম বঙ্গভাষাভাষী সমিতির পক্ষ থেকে ১৪ জন সদস্য বিশিষ্ট এক প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।

এরপর টানা এপ্রিল মাস জুড়ে পদযাত্রা ও প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত হয়। কাছাড় জেলা গণসংগ্রাম পরিষদের পদযাত্রী দলের অধিনায়ক স্বাধীনতা সংগ্রামী রথীন্দ্রনাথ সেন ১৯ মে সর্বাত্মক ধর্মঘট ও পূর্ণ হরতাল ঘোষণা করেন। অন্যদিকে আসাম সরকার ১৫ মে থেকে চার মাসের জন্য সভা, শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারি করে।

১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে সত্যাগ্রহীরা জড়ো হন। তাদের হাতে ছিল পোস্টার —
১। ভাষা জননীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আত্মবলি দিতে দলে দলে এগিয়ে আসুন।
২। সংগ্রাম, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দিন, সত্যাগ্রহী তালিকায় নাম লেখান।
৩। আমাদের মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নিল যারা তাদের সঙ্গে কোনো আপোশ নয়।
৪। মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ।

এরপরই সেই বর্বরোচিত গুলিবর্ষণের ঘটনা।

১৯ মে'র ভাষা আন্দোলনে শহিদ হন এগারোজন মানুষ। তাঁরা হলেন — ১। কমলা ভট্টাচার্য, ২। শচীন্দ্র চন্দ্র পান, ৩। বীরেন্দ্র সূত্রধর, ৪। তরণীমোহন দেবনাথ, ৫। চণ্ডীচরণ সূত্রধর, ৬। হীতেশ বিশ্বাস, ৭। কুমুদরঞ্জন দাস, ৮। সত্যেন্দ্র দেব, ৯। সুনীল সরকার, ১০। কানাইলাল নিয়োগী, ১১। সুকোমল পুরকায়স্থ।

ভাষা আন্দোলনে নিহত শহিদদের মধ্যে একমাত্র কমলা ভট্টাচার্য ছিলেন মহিলা। বিশ্বের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র মহিলা যিনি ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিলেন। এই এগারোজন শহিদের কেউই নেতৃত্বে ছিলেন না। কেবল বাংলা ভাষার জন্য, প্রাণের টানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে কমলা ভট্টাচার্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এই জন্যে, নানা সময়ে এই ভাষা আন্দোলন বিষয়ক নাটকে কমলা ভট্টাচার্য একটি চিরকালীন বিদ্রোহের 'আইকন' হয়ে উঠেছেন। ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন কমলা ভট্টাচার্য। অভাবী পরিবারটি শিলচরের পেদাপট্টিতে বসবাস করতেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন কিন্তু ফল প্রকাশের আগেই তিনি শহিদ হন। ফল প্রকাশের পর দেখা যায় তিনি পাশ করেছেন। শিলচরের পেদাপট্টি আজ 'শহিদ কমলা রোড' নামে পরিচিত। ১৩ নভেম্বর, ১৯৬১ গেজেট নোটিফিকেশনে 'বাংলা' ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান করা হয়।

উত্তরাধিকার

কিন্তু ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার যখন ২০২০-এ কোনো নাটকের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে তখন বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। শিলচরের প্রবীণ নাটককার নির্দেশক অভিনেতা চিত্রভানু ভৌমিক 'শেকড়ের সন্ধানে' নামে একটি নাটক রচনা করেছেন এবং তাঁর নিজস্ব নাট্যসংস্থা 'দশরূপক সাংস্কৃতিক সংস্থা'র সদস্যদের দ্বারা মঞ্চস্থ করেন তখন অবাক না হয়ে পারা যায় না। প্রায় ৮৫টি নাটকের রচয়িতা চিত্রভানু ভৌমিক লিখলেন 'শেকড়ের সন্ধানে' নাটক। এ নাটক কখনও ইতিহাস, কখনও বা নাটক। আভিধানিক অর্থে যাকে বলে 'Docu Drama' নাটকটি সেই গোত্রের। অসামান্য দক্ষতায় তিনি এই নাটকে এই সময়ের যুবক-যুবতীদের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে মূর্ত করে তুলেছেন। এগারোটি চরিত্রের মধ্যে ন'টি চরিত্রের অভিনেতা অভিনেত্রীরা সকলেই তরুণ। অসামান্য দক্ষতায় তিনি ইতিহাস আর নাটকের যুগলবন্দি রচনা করেন। নাটকের মাঝখানের একটি অংশ:
প্রণয়: এবার আমি পড়ছি। উনিশে মে'র ঐতিহাসিক দিন সম্বন্ধে এখানে লিখেছে: 'হাজার হাজার জনতা রোজ সত্যাগ্রহী দলে নাম লেখাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার মিলিটারি দিয়ে শহর ঘিরে ফেলেছে একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি হলো। ধরপাকড় শুরু হয়ে গেল। অনেক নেতা চলে গেলেন জেলে তবু সংগ্রাম থামলো না। এগিয়ে এলো উনিশে মে এই প্রিয়া এবার তুমি পড় তুমি বরং শহিদ কমলার ইতিহাস পড়।

প্রিয়া: শহিদ কমলার ঘর। কমলার ঘরে খাবার পর্যন্ত ছিল না। ওর বন্ধুবান্ধবের বই এনে সে পড়াশোনা করত। তাঁর ছেঁড়া কাপড়। বাড়িতে ডিকশনারি নেই, স্কুলের বই নেই তবু তাঁর চোখ জুড়ে স্বপ্ন একদিন ও গ্র্যাজুয়েট হবে। তোরা ভাবতে পারিস টিউশন ছাড়া, স্কুলের বই ছাড়া, গাইড ছাড়া একটি মেয়ে পরীক্ষায় বসছে? যার মৃত্যুর পর রেজাল্ট বেরিয়েছিল সেকেন্ড ডিভিশন।

এরপরের অংশে কমলার অভিনয় করতে শুরু করে 'প্রিয়া' নামের মেয়েটি। নাটকের একেবারে শেষ পর্বে একটি চরিত্র বলে ওঠে: "আমরা এই পরিচয় নিয়ে ছড়িয়ে যাব যে, আমরা সবাই ভারতীয় কিন্তু এরই সঙ্গে আমরা কেউ বাঙালি, কেউ মণিপুরী, কেউ বিহারি, কেউ মিজো।" নাটকের শেষ হয় সমীর রায়ের লেখা একটি কবিতার গীতিরূপ (প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গীত) 'আলু বেচো, ছোলা বেচো/ বেচো বাখরখানি/ বেচো না বেচো না বন্ধু/ তোমার চোখের মণি।'
(দ্য: নাটক সংগ্রহ, চিত্রভানু ভৌমিক, সম্পাদনা: অনীত রায়, না বলা কথারা, কলকাতা- ৭০০০৬১, ২০২৬)

আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গে থাকি বাংলা ভাষায় কথা বলি, শিল্প-সাহিত্য চর্চা করি আমাদের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি সেই শ্রদ্ধা ভালোবাসা আছে কি? নেই। তার কারণ আমাদের কোনো উনিশে মে নেই। আমরা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিইনি।

পরিচিতি: সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখক। ভারত সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন (সংস্কৃতি দপ্তর) দপ্তরের প্রাক্তন সিনিয়র ফেলো। নিবাস: কলকাতা।