প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত ও বর্তমান ভাষা রাজনীতি



নরেশ মণ্ডল


একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির ইতিহাসে কেবল একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার নাম। ভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন ১৯৫২ সালে রক্তাক্ত রূপ নিয়েছিল, তা পরবর্তীকালে উপমহাদেশের রাষ্ট্র চিন্তাকে আমূল বদলে দিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই অতীতের কোনো আবেগঘন অধ্যায় নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক্‌নির্দেশ।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও ভাষার প্রশ্নে প্রথম থেকেই গভীর বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রকাশ। এই সিদ্ধান্তে গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও বাস্তব জনসংখ্যাগত সত্য — তিনটিকেই অস্বীকার করা হয়েছিল। ভাষা তখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা ও পরিচয়ের প্রধান অস্ত্র।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, ভাষাকে দমন করা মানে মানুষের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। এই আন্দোলন কেবল ভাষার স্বীকৃতির লড়াই ছিল না; এটি ছিল আত্মমর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম। একুশের রক্তাক্ত পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে বিকশিত হয় বাঙালির গণতান্ত্রিক ও মুক্তিকামী চেতনা।

একুশের পরের ইতিহাস — যাকে অনেকেই 'উনিশের ধারাবাহিকতা' বলে চিহ্নিত করেন — আসলে এটাকে বলা যায় একুশের বিস্তৃত উত্তরাধিকার। ঘটনাটা আর একবার স্মরণ করা জরুরি। ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ১১ জন আত্মত্যাগ করে শহিদ হন। আসাম সরকার অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে চাপিয়ে দিলে এই আন্দোলন শুরু হয়। যার ঐতিহাসিক স্থান আসামের শিলচর রেলওয়ে স্টেশন।

১৯৫৬ সালে বাংলার রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ — সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল ভাষা থেকে জন্ম নেওয়া অধিকারবোধ। ভাষা আন্দোলনই প্রমাণ করে, সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে রূপ নেয়।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ভাষা রাজনীতির চরিত্র বদলেছে, কিন্তু সংকট মুছে যায়নি। আজ ভাষা আর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে না; বরং নীতিনির্ধারণ, প্রশাসন, শিক্ষা ও বাজারের কাঠামোর মধ্যে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিত হয়। কোন ভাষায় আইন লেখা হবে, কোন ভাষায় উচ্চশিক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হবে — এসব সিদ্ধান্ত আজও ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

সমসাময়িক ভাষা রাজনীতির একটি বড়ো দিক হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাপ। অনেক ক্ষেত্রেই একটি ভাষাকে জাতীয়তার একমাত্র প্রতীক হিসাবে তুলে ধরে বহুভাষিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বহু আঞ্চলিক ভাষা ও উপভাষা ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। ভাষার ধারণা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য যেমন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তেমনি গণতান্ত্রিক কাঠামোর পক্ষেও উদ্‌বেগজনক।

অন্যদিকে, বাজার ও বিশ্বায়নের চাপে ইংরেজি হয়ে উঠেছে ক্ষমতার নতুন ভাষা। উচ্চশিক্ষা, করপোরেট চাকরি, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার বড়ো অংশ ইংরেজি-নির্ভর হয়ে পড়ায় মাতৃভাষা কার্যত পিছিয়ে যাচ্ছে। মাতৃভাষাগুলির ব্যবহার সীমিত হচ্ছে। যা সেইসব ভাষাগুলির ভবিষ্যৎ ক্রমশ অন্ধকারের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। রাষ্ট্রের যেখানে ভাষা সুরক্ষায় সক্রিয় হওয়ার কথা, সেখানে প্রায়শই তা কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে ভাষার প্রশ্নটি আর কেবল সাংস্কৃতিক নয়, তা অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ছে। যা কখনই সমাজ সংস্কৃতির পক্ষে মঙ্গলদায়ক হয় না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো স্মৃতি ও ব্যবহার। আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করি — শহিদ মিনারে ফুল দিই, ভাষণ দিই, পোস্টার ছাপি। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার ব্যবহার ও বিকাশ আমরা নিশ্চিত করছি কী? প্রশাসনে, উচ্চশিক্ষায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মাতৃভাষার যথাযথ প্রয়োগ ঘটছে না যা একুশের চেতনাকে পূর্ণতা দেয় না। এইভাবে একুশ ক্রমে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

একুশে ফেব্রুয়ারির মূল শিক্ষা আজও স্পষ্ট — ভাষা মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন, এবং মর্যাদা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র মজবুত হতে পারে না। ভাষা রাজনীতি যদি মানুষের বৈচিত্র্য ও অধিকারকে স্বীকার করে, তবেই তা গণতান্ত্রিক হয়। না হলে ভাষা হয়ে ওঠে বর্জনের হাতিয়ার।

আজকের বাস্তবতায় একুশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ভাষাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র নয় — মানুষকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র গড়তে হয়। ভাষার বহুত্ব, ব্যবহারিক মর্যাদা ও ন্যায়সঙ্গত বিকাশ নিশ্চিত করাই একুশের প্রকৃত উত্তরাধিকার রক্ষা। একুশ তখনই জীবিত থাকবে, যখন ভাষা কেবল স্মৃতির বিষয় না হয়ে বরং সমান অধিকারের বাস্তব ভিত্তি হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, মাতৃভাষা নিয়ে রাজনীতিও কম জটিল নয়। কোথাও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার নামে ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ভাষা তখন ভালোবাসার বিষয় না হয়ে ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এতে ভাষার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং ভাষা নিয়ে নতুন সংঘাত সৃষ্টি হয়। মাতৃভাষা কখনোই জোর করে প্রতিষ্ঠা করা যায় না — ভাষা বাঁচে মানুষের ব্যবহার, সৃষ্টিশীলতা ও ভালোবাসায়।

ভাষা নিয়ে রাজনীতিতে কার ক্ষতি

ভাষা মানুষের পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও সংস্কৃতির বাহন। কিন্তু যখন ভাষা রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তার ক্ষতি বহুমুখী — এবং সেই ক্ষতির বোঝা মূলত পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

সাধারণ মানুষের ক্ষতি

ভাষা নিয়ে রাজনীতি সমাজে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে। একই অঞ্চলের মানুষ ভাষার ভিত্তিতে 'আমরা-ওরা'তে ভাগ হয় যায়। কাজ, শিক্ষা, সরকারি পরিষেবা — সব জায়গাতেই সন্দেহ ও বৈষম্য ঢুকে পড়ে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমশ জটিল হয়, অথচ তাদের কোনো লাভ হয় না।

ভাষা-রাজনীতির সবচেয়ে বড়ো শিকার হন শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষ। ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে ভাষার কারণে তারা হেনস্তা, বঞ্চনা ও সহিংসতার মুখে পড়েন। ভাষা এখানে জীবিকা হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার রাজনীতিকরণ ভাষাকে সরল স্বাভাবিক বিকাশ থেকে সরিয়ে দেয়। ভাষা তখন সৃজনের মাধ্যম না হয়ে শাসনের অস্ত্র হয়। বহু ভাষা ও উপভাষা অবহেলিত হয়ে পড়ে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংকুচিত হয়।

ভাষা নিয়ে রাজনীতি আসলে ক্ষমতার রাজনীতি। প্রকৃত সমস্যা — দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য — এসব আড়াল করতে ভাষাকে সামনে আনা হয়। ফলে গণতান্ত্রিক প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায় এটা গণতন্ত্রের ক্ষতি।

একুশে ফেব্রুয়ারি তখনই জীবিত থাকবে, যখন ভাষা শুধু স্মৃতিস্তম্ভে নয়, জীবনের সর্বস্তরে সমান মর্যাদা পাবে। ভাষার বহুত্ব, ব্যবহারিক অধিকার ও ন্যায়সঙ্গত বিকাশ নিশ্চিত করাই একুশের প্রকৃত উত্তরাধিকার। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে — ভাষাকে অস্বীকার করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়, আর ভাষাকে সম্মান করলে সমাজ শক্তিশালী হয়। একুশের এই সত্য আজও অমোঘ।

পরিচিতি: লেখক, কবি, সাংবাদিক এবং 'সব্যসাচী' পত্রিকার দীর্ঘদিনের সম্পাদক। নিবাস: কলকাতা।