কবিতা

এক অন্তহীন উপমা



নরেশ মণ্ডল


চৈত্রের শেষ আলো
ধীরে ধীরে গলে পড়ে ধানের খড়ের উপর —
মাটি যেন এক প্রাচীন কবি,
তার বুকজুড়ে লেখা ক্লান্ত দিনের উপাখ্যান।

পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা 
ঝরে পড়ে অদ্ভুত নীরবতায়,
বটগাছের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হয়ে
ছুঁয়ে দেয় সময়ের পুরোনো দাগ।

দূরে চড়কের আগুন —
লেলিহান নয়, যেন অন্তরের প্রদীপ,
মানুষ ঘোরে, দেহ ভুলে,
আসলে তারা ঘোরে নিজের ভেতরেই —
অন্ধকারের গভীর গহ্বরে
উজ্জ্বল আলোর সন্ধানে।

ঢাকের প্রতিটি শব্দ
মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা বীজকে ডাকে —
"জাগো, আবার জাগো,
ধ্বংসের ভেতরেই জন্ম লুকিয়ে থাকে।"

রাত তখন এক গভীর নদী,
তার স্রোতে ভাসে হারিয়ে যাওয়া নাম,
ভাঙা স্বপ্নের টুকরো, আর
অপূরণীয় ইচ্ছের দীর্ঘশ্বাস।

তবু —
কোনো এক অদৃশ্য মুহূর্তে
আলো জন্ম নেয় নিঃশব্দে,
যেন কুয়াশার বুক চিরে
প্রথম সূর্যের স্পর্শ।

উঠোনে আঁকা আলপনা
শুধু নকশা নয়, এ এক মন্ত্র —
বেঁচে থাকার, ফিরে আসার,
পুনর্জন্মের গোপন সংকেত।

কৃষকের হাত মাটি ছুঁয়ে শোনে —
ভেতরে ভেতরে কী এক সংগীত বাজে,
যেন প্রতিটি কণা বলে ওঠে ―
"হার মেনো না, আবার শুরু করো।"

পহেলা বৈশাখ কেবল তারিখ নয়,
এ এক অন্তহীন উপমা —
মৃত্যুর ভিতর জীবন, শেষের ভিতর শুরু,
নিঃশব্দের ভিতর উচ্চারণ।

নতুন বছর আসে না কেবল,
সে জন্ম নেয় — মাটির গভীরে,
মানুষের জেদে, অদৃশ্য এক আলো হয়ে —
যা বলে যায় বারবার —
"শেষ মানেই শুরু।"

পরিচিতি: লেখক, কবি, সাংবাদিক এবং 'সব্যসাচী' পত্রিকার দীর্ঘদিনের সম্পাদক। নিবাস: কলকাতা।