আমার যখন স্কুলে যাওয়ার বয়স তখন বসন্তকাকু তাগড়া জোয়ান। সামনে তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা। বাবাকে দেখি কাকুকে ভীষণ বকাঝকা করতে। পড়া ফাঁকি দিয়ে স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়েছেন, অথচ পরীক্ষার আর বেশিদিন বাকি নেই। আমি বাবার পেছনে দাঁড়িয়ে দেখি কাকু মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর বাবা খুব করে ধমকাচ্ছেন। বাবা বকা দিয়ে চলে যেতেই বসন্তকাকু এক ঝটকায় আমাকে মাথার উপর উঠিয়ে চড়কির মতো ঘুরতে থাকে, আর আমি ভয় এবং আনন্দ দুটোই একসাথে উপভোগ করতে থাকি। কাকু আমাকে মাথা থেকে নামিয়ে বলেন, "জানো কাকু, আমার না পড়ালেখা করতে মন চায় না। মন চায় খালি পথে পথে ঘুইরা বেড়াই। নতুন নতুন জায়গায় যাব, নতুন নতুন মানুষ দেখব, দুনিয়াটা ম্যালা বড়ো, তুমি যখন বড়ো হইবা তখন বুঝবা। এই গ্রামের পরেও আরেকটা গ্রাম আছে, তারপর আরেকটা, তারপর আরও একটা..."
আমি বসন্তকাকুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, তার চোখদুটো কেমন স্বপ্নঘোরের মতো, দৃষ্টি যেন কোন সুদূরে হারিয়ে গেছে।
বসন্তকাকু ম্যাট্রিক পাশ করতে পারে না, তার অনীহা দেখে বাবাও আর তাগিদ দেন না, শুধু দাদাকে বলতে শুনতাম, বসন্ত বাপ পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়া। আমি মরে গেলেও যেন শান্তি নিয়ে মরতে পারি যে তোর প্রতি কোনো অবহেলা করিনি।
পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কাকু সংসারের সমস্ত কাজ একহাতে সামলাতে থাকেন। গোরু ছাগল থেকে শুরু করে জমিজমার হালচাষ সবই একা হাতে সামলাতেন। মোট কথা দাদা আর বসন্তকাকুই বৈষয়িক সবকিছু দেখাশোনা করতেন আর বাবা তার স্কুলের মাস্টারি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। কাকুর কারণে বাবাকে আর সংসারের কোনো কাজে মাথা ঘামাতে হতো না।
আমি তখন উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে বাড়ি এসেছি। কিছুদিন পরেই বসন্তকাকুর বিয়ে। চারিদিকে হইচই আর আনন্দ। সারা বাড়ি রঙিন নিশানে সেজে উঠেছে। কাকুর ঘরে নতুন খাট আর আলনা, সাথে একটা আলমারি তাতে আয়না বসানো, নতুন বিছানায় ফুলতোলা চাদর বালিশের কভার। আমি অতি উৎসাহ নিয়ে চারিদিকে দেখতে থাকি, নতুন কাপড়ের ঘ্রাণে কেমন যেন একটা উৎসবের আমেজ। বালিশের পাশে একটা দাগ টানা খাতা, তাতে যেন কী লেখা। আমি সেদিকে দৃষ্টি দিতেই কাকু সেটা লুকিয়ে ফেলেন। কাকু আমার সামনে কেমন যেন লজ্জা পাওয়া মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আমার কানের কাছে মুখ এনে বলেন, "কাকু তোমার একটা সুন্দর কাকিমা আসবে আর বাসর রাতে তারে আমি আমার লেখা এই কবিতাটা পইড়া শোনাব।" আমি কাকুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, তার দু'চোখে খুশি উপচে পড়ছে।
বিয়ের দিন কী কারণে যেন কাকুর বিয়েটা ভেঙে যায়। দাদা ভীষণ মুষড়ে পড়েন এই ঘটনার পরে। কাকু তিনদিন বাড়ি আসেন না, কোথায় ছিল তাও জানি না। পরে শুনেছি মেলার মাঠের বিশাল বটগাছের নিচে ছিলেন, যেখানে প্রতিবছর বৈশাখী মেলা হয় এবং দাদাই তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। কাকুর মুখটা তখন ভীষণ দুঃখী ছিল।
কাকু দাদাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন, দাদাও কাঁদতে থাকেন। কাকু বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, "আমার কী দোষ আব্বা বলেন আপনি, আমার কী দোষ? তারা আমারে বংশপরিচয়হীন বলে এত অপমান করল আপনের সামনে, আপনি না ঠেকাইলে ওদের মাথা ফাটাইয়া দিয়া আসতাম, তারা তো আমারে অপমান করে নাই, করছে আপনেরে।" দাদা এবং কাকু দুজন দুজনকে ধরে কাঁদতে থাকেন, এবং তাদের এই দৃশ্য দেখে আমার চোখও আর্দ্র হয়ে ওঠে।
এরপর বাবা সালিশ ডাকেন, সালিশে মেয়েপক্ষ তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা চায় এবং বিয়েতে আবার সম্মত হয়, কিন্তু কাকু আর বিয়ে করলেন না, দাদা অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু তিনি মাথা পাতেননি। চুপচাপ সংসারের যাবতীয় কাজ করতেন, সন্ধ্যায় যেতেন জারিগানের আসরে আর অনেক রাত করে বাড়ি ফিরতেন। বাবা বা দাদাকে এই নিয়ে কাকুকে আর বকতে দেখিনি।
দাদা তাঁর মৃত্যুর আগে বসন্তকাকু এবং বাবার নামে সমান ভাগে সম্পত্তি ভাগবাঁটোয়ারা করে দিয়ে যান, যদিও এ নিয়ে গ্রামের অনেকেই অনেক কথা বলেছে, কিন্তু বাবা এই বিষয়ে সামান্য আপত্তিও করেননি, কারণ কাকুর ওপর ছিল বাবার অগাধ বিশ্বাস। দাদার মৃত্যুর কিছুদিন আগে আমি জানতে পারি যে বসন্তকাকুকে দাদা মেলায় কুড়িয়ে পেয়েছে।
সেদিন ছিল বৈশাখী মেলার প্রথম দিন, আমাদের গ্রামে তিনদিন ধরে মেলা হয়। দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে মেলা দেখতে লোক আসে। কাকু বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, তখন সন্ধ্যা হয় হয় ভাব, চারদিকে আকাশ অন্ধকার হয়ে কালবোশেখী বাতাস ছুটেছে। মানুষ দিক্বিদিক ছুটাছুটি করছে, দোকানিরা তাদের পসরা গুটিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে। কাকু অসহায়ের মতো চিৎকার করে আম্মা আম্মা বলে কাঁদছিল। গাছের নিচে সন্ন্যাসীরা যারা ছিল তারা কাকুকে নাম ধাম জিজ্ঞেস করছিল, কিন্তু তিন বছরের বাচ্চা নিজের নামটাই তো ঠিকমতো বলতে পারে না। দাদা দেখতে পেয়ে সেই প্রচণ্ড ঝড়ের ভেতর কাকুকে নিয়ে পুরো মেলায় ঘুরেছে, যদি ওর বাবা-মায়ের খোঁজ পাওয়া যায়। ঘাটে তখন আর কোনো নৌকাও ছিল না, সবাই যাত্রী নিয়ে তড়িঘড়ি করে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। তাই সেখানেও দাদা কাউকে খুঁজে পেলেন না। প্রচণ্ডবেগে ঝড় শুরু হলে দাদা কাকুকে নিয়ে বাড়ি চলে আসেন, মেলার মাঠ ছিল আমাদের বাড়ির খুব কাছেই। শোনা যায় যে ওইদিন ঝড়ে নৌকাডুবি হয় এবং কিছু লোক মারা যায় – যাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দাদা বাকি দু'দিনের প্রত্যেক দিন কাকুকে নিয়ে মেলায় যেতেন যদি তার বাবা-মা তাঁকে খুঁজতে আসে এই আশায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে কাকুকে খুঁজতে আর কোনোদিনই কেউ আসেনি। দাদার ধারণা যে ওই নৌকাডুবিতে হয়তো কাকুর বাবা-মা দুজনেই মারা গিয়েছিলেন, নাহলে তো ছেলেকে খুঁজতে আসার কথা।
এরপর থেকে কাকু আমাদের বাড়িতেই থেকে যান, দাদা কাকুর নাম দেন বসন্ত, দাদিও নিজের ছেলের মতোই যত্ন করতেন। কাকু একসময় ভুলে যান যে তিনি মেলায় কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। কিন্তু দাদা প্রতিবছর কাকুকে নিয়ে মেলায় যেতে ভুলতেন না, যদি ওর বাবা-মা ওকে খুঁজতে আসে এই আশায়। বসন্তকাকু যখন বেশ কিছুটা বড়ো হয় তখন একাই যেতেন মেলায়, কিন্তু ততদিনে স্মৃতির পাতা থেকে তার বাবা-মায়ের মুখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল, তবুও কোনো মেলার দিন সেখানে না গিয়ে থাকতেন না। আমি যখন কিছুটা বড়ো হলাম তখন আমাকেও নিয়ে যেতেন সাথে করে। বাঁশি ডুগডুগি, চিনির হাতি ঘোড়া, কতকিছুই না কিনে দিতেন! শুধু একটা দোকানের কাছে কখনোই যেতেন না – মাটির খেলনার দোকানে। অথচ কত সুন্দর সুন্দর খেলনা থাকত সেই দোকানে! মাটির চাকাওয়ালা খেলনা ঘোড়া, গোরুর গাড়ি, হাতি, হাঁস, মুরগি, পাখি, পুতুল আরও যে কতকিছু! কিন্তু বসন্তকাকু ভুলেও সেই দোকানে নিয়ে যেতেন না, জিজ্ঞেস করলে চুপ করে থাকতেন আর আক্রোশ নিয়ে সেই দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
শুনেছি সেদিন কোনো এক কুক্ষণে মায়ের হাত ছেড়ে দিয়ে এই মাটির খেলনার দোকানে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ইচ্ছে ছিল চাকাওয়ালা ঘোড়ার গাড়ি কিনবেন কিন্তু খেলনা হাতে নিয়ে মা'কে ডাকতেই সে দেখে তার বাবা-মা তার পাশে নেই, আর ঝড় শুরু হওয়ায় সবাই ছোটাছুটি করছিল, উনি তখন আশ্রয় নেওয়ার জন্য বটগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকেন, আর তখনই আমার দাদার নজরে পড়ে। সন্ন্যাসীরা দাদাকে চিনতেন, তাদের বলাছিল যে যদি কেউ খুঁজতে আসে তবে আমাদের বাড়ি দেখিয়ে দিতে।
এভাবে কেটে গেছে অনেক বছর, দাদা মারা গেলেন, তার আগে আমার জন্মের কিছুদিন পরেই দাদি গত হয়েছিলেন। বাবাও স্কুল থেকে অবসরে গেলেন। আমি আমার স্ত্রী-পুত্রদের নিয়ে শহরে থাকি। বছরে দু-একবার বাড়িতে যাই। বসন্তকাকু আগের চেয়েও এখন ভীষণ চুপচাপ, বেশিরভাগ সময় ওই বটগাছের নিচেই থাকেন। আর মেলার সময় এলেই ভীষণ চঞ্চল হয়ে পড়েন। চোখে মোটা কাচের চশমা উঠেছে। বিছানায় বালিশের কাছে একটা খাতা আর কলম, খাতার পাতা জুড়ে কবিতার পঙ্ক্তি আর জারি গান।
বাবার মৃত্যুর পরে মা'কে নিয়ে আসি শহরে। মা'কে নিয়ে আসার পরে সারা বাড়িতে বসন্তকাকু ভীষণ একা। আমি বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু কাকু এলেন না। তার বিশ্বাস, একদিন বাবা-মাকে ঠিক খুঁজে পাবেন।
শেষবার আমি আমার ছোটো ছেলেকে নিয়ে গ্রামে যাই, বসন্তকাকু সমস্ত দলিল-পত্র আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে ভারমুক্ত হন। দু'দিন পরে বৈশাখী মেলা। বসন্তকাকু এখন লাঠি ভর করে হাঁটেন, তার কোমরে সমস্যা। তবুও তার চোখেমুখে ভীষণ চঞ্চলতা। কোনোকিছু ফিরে পাবার চঞ্চলতা।
আমি ছেলেকে নিয়ে মেলায় যাওয়ার আগেই বসন্তকাকু মেলায় চলে যান। তার সেই পুরোনো আস্তানা, সেই জটাধারী বটগাছ যার শাখায় শাখায় ঝুলে আছে রঙিন সুতো কাপড়, মানুষ ভক্তিভরে গাছের গায়ে সিঁদুর জল ফুল দিয়ে যায়। বসন্তকাকুর সাথে পাল্লা দিয়ে সেও যেন কিছুটা বুড়িয়ে গেছে। চুলের মতো জটাগুলো মাটি স্পর্শ করেছে। নদীর দিকের পাড় ভেঙে কঙ্কালের মতো শেকড় বেরিয়ে আছে, যেন সেও বেশ ক্লান্ত! নদীর ঘাটে ছইওয়ালা নৌকা, সাথে কিছু ইঞ্জিন চালিত নৌকাও। আগে এত শব্দদূষণ হতো না, একটা নিরিবিলি পরিবেশ বিরাজ করত। এখন ইঞ্জিনের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।
আমি ছেলেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেলা দেখাই, গুড়ের গরম গরম জিলাপি কিনে দিই, বেতফল, ঢ্যাপের খই, মোয়া, গজা, আর চিনির তৈরি হাতি ঘোড়া। ছেলে বাঁশি দেখে পাগল হয়ে যায়, বসন্তকাকু ছেলেকে বাঁশি, ডুগডুগি, খেলনা ঢোল, টেমটেমি আর কাগজের চরকা কিনে দেন, একটা কাপড়ের ঝালর দেয়া সুতার নকশা করা হাতপাখা কিনে দিয়ে বলেন, "এটা বৌমারে দিও।" তারপর একটা প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বলেন, "এটা ভাবিমা'কে দিও, তিলের খাজা তার খুব পছন্দ।" কাকু আমার মা'কে ভাবিমা বলে ডাকতেন। কাকু আমাদের সাথে সাথে ঘুরতে থাকেন, ছেলে হঠাৎ হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে একটা মাটির খেলনার দোকানের দিকে ছুটে যায়। আর বসন্তকাকু অস্থির হয়ে আমার ছেলের পেছন পেছন ছুটে যান আর আমাকে বলতে থাকেন, "ছেলের হাত শক্ত কইরা ধইরা রাখো, না হইলে আরেকটা বসন্তের জন্ম হইব।"

পরিচিতি: কবি ও লেখক। নিবাস: ঢাকা, বাংলাদেশ।