গল্প

নাইওরী বৈশাখী মেলা



নুসরাত সুলতানা


হাতে এক মগ ব্ল্যাক কফি নিয়ে জানালার দিকে নিবিষ্ট চিত্তে তাকিয়ে আছে শবমেহের। একই সাথে আকাশে সারিবদ্ধভাবে উড়ে যাওয়া নীড়ে ফিরতে উন্মুখ পাখিদের দল। বাসার সাথের লেকসাইড প্লে-গ্রাউন্ডে বাচ্চাদের ফুটবল খেলা, ছুটোছুটি এসব দেখছে আর নিজের ভেতর আরও নিমজ্জিত হচ্ছে। গোধূলি সবসময়ই শবমেহেরকে বিবশ করে দেয়। কেবলই নিজের ভেতর ডুব দিতে ইচ্ছে করে তার। যদিও ইউটিউবে ছেড়ে দিয়েছে – কেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস... আমি বলি আমার সর্বনাশ। তথাপি সে আসলে নিজের ভেতর ডুবে গিয়ে দেখছে ওই পাখিদেরই। আর ভাবছে – মানুষের মুক্তির জন্য সভ্যতা, ধর্ম, সমাজ কতকিছু বানালো মানুষ। কিন্তু সবই তো মানুষের গলায় আর পায়ে আরও শৃঙ্খলার বেড়ি পরিয়ে দিলো। মানুষ যদি বিচার না করে ভালোবাসতে শিখত! ভাবতে ভাবতেই আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় সে নিজের সত্যবোধ ও মতাদর্শে বিন্দুমাত্র ছাড় না দিতে।

এর ভেতরই চারিদিকের মাইকে বেজে ওঠে মাগরিবের আজান।

আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার/ ​আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ/ আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ/ ​আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ/ আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ/ ​হাইয়া আলাস সালাহ/ হাইয়া আলাস সালাহ...

শবমেহেরও উঠে যায় তার প্রিয় দক্ষিণমুখী জানালা ছেড়ে। এর ভেতরই লিলি বেগম বলে – "পুরাই বাপকা বেটি অইলি। যেমন উদাসী, তেমন জেদি"।

(২)

শফিক আহমেদ বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের দাপুটে ছাত্র ছিলেন, ১৯৬৮-৬৯ সেশনের। তখন দেশ আর দশের প্রয়োজনেই জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনীতিতে। ৭১ সালে মেজর জলিলের নেতৃত্বে নয় নং সেক্টরে পটুয়াখালী এলাকায় যুদ্ধ করেছেন।

লিলি ওই পটুয়াখালির মৌডুবি গ্রামেরই মেয়ে। ৭১ সালে লিলি আই.এ. পাশ করে কেবল বি.এ.তে ভর্তি হয়েছে, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজে। কলেজ বন্ধ হলে লিলি অবস্থান করছিল নিজ গ্রামে। আর তখনই রাজাকাররা পাকিস্তানি আর্মিদের খুঁচিয়ে জানিয়ে দেয় লিলির খবর। লিলিকে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। ওই ক্যাম্পে অপারেশন করে শফিক এবং তার বাহিনী, উদ্ধার করে লিলিকে।

লিলির বাবা স্থানীয় একটা মসজিদের ইমাম এবং মুয়াজ্জিন। বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতায়। এলাকার আল বদরদের অভিযোগ, হাশেম হাওলাদার মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেন বিভিন্ন ভাবে। এসব বলেই রাজাকাররা লিলিকে মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

উদ্ধারের পর শফিক যখন পৌঁছে দিতে যায় তখন মুয়াজ্জিন হাশেম মিয়া শফিকের হাত ধরে হুহু করে কেঁদে উঠে বলেন – "এই মাইয়া লইয়া আমি এহন কই যামু বাবা? ও মরলেও তো আমি বাঁচতাম, ও নিজেও বাঁচতো। অরে আমি বিয়া দিমু ক্যামনে?"

শফিক বলেছিল – "নতুন দেশে আমরা সবাই বাঁচবো। কেউ মরবে না। লিলিও সম্মান নিয়েই বাঁচবে।" শফিক নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা, তাই তাঁর অমন বিশ্বাস ছিল অটল।

এরপর আরও কয়েকবার শফিক গিয়েছে হাশেম মিয়ার বাড়িতে। লিলির পরিমিত আচরণ, ডাগর চোখ, শ্যামবর্ণা রূপ শফিককে প্রশান্তি দিয়েছে। শফিক একবার লিলিকে বলেছিল, কোনোদিন দাবি নিয়ে আসবে তার বাবার কাছে। লিলি যেন আপত্তি না করে।

লিলি কেবলই নিচে মাটির দিকে তাকিয়ে থেকেছে। কখন অজান্তেই মাটিতে টুপটাপ ঝরে পড়েছে চোখের জল সে নিজেও জানে না।

(৩)

অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করে শফিক বরিশাল হাতেম আলী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায়ই শফিক চিন্তা করেন নিজের গ্রামে একটা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন। সেই মোতাবেক শুরু করেন কাজ। ধীরে ধীরে শুরু করে স্কুল প্রতিষ্ঠার পর নাম দেন 'নাইওরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়'।

বাবা-মা'কে বলে সম্মতি নিয়ে বিয়ে করেন লিলিকে। লিলিকে বি.এ., এম.এ. পাশ করিয়ে নাইওরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

বিয়ের চার বছরের মাথায় শফিক ও লিলি দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় মেয়ে শবমেহের। শবমেহেরকে ছোটোবেলা থেকেই শফিক নজরুলগীতি শিখিয়েছেন, নাচ শিখিয়েছেন, আবৃত্তি শিখিয়েছেন। কখনো জোর করে মেয়ের ওপর চাপিয়ে দেননি কিছুই। শবমেহেরও বাবার সম্মান এবং সাংস্কৃতিক পরম্পরা ভালোভাবে ধরে রাখতে চেষ্টা করেছে বরাবর।

৭৫ সালের পর থেকেই নাইওরী গ্রামে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী। মসজিদে ফজরের ওয়াক্তে মাইকে জিকির করা, বার্ষিক পরীক্ষার সময় এলাকায় ওয়াজ-মাহফিল করা, এসব নিয়ে বিরোধ লেগেই থাকতো। শফিক নিজে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন কিন্তু ধর্মান্ধ এবং ধর্ম ব্যবসায়ীদের তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। তারপরও সব চলছিল সুন্দর। কিন্তু শবমেহের যখন আর্বান ও এনভায়রনমেন্ট অরিয়েন্টেড আর্কিটেকচারের ওপর মাস্টার্স করলো আমেরিকার ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, তখন হঠাৎ হাতেম আলী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফিক আহমেদ ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা যান।

(৪)

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার বিভাগে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে শবমেহের গিয়েছিল আমেরিকাতে পরিবেশবান্ধব আর্কিটেকচারের ওপর মাস্টার্স করতে। এর ভেতরই বাবার মৃত্যু। মাস্টার্স শেষ করে গ্রামে ফিরে সে খুলেছে একটা অনলাইন ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র ফার্ম – আমার ঘর। সেখানে ফ্রি-ল্যান্সার হিসেবে কাজ করে। এই প্ল্যাটফর্মে আরও যুক্ত আছে তিনজন আর্কিটেক্ট বন্ধু। এর সাথেই সে হাল ধরেছে নাইওরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই জড়িয়ে পড়েছিল 'উদীচী'র সাথে। গ্রামে ফিরে চেষ্টা করছে একটা পাঠচক্র এবং পাঠাগার নির্মাণের।

গ্রামের ছেলেমেয়েদেরকে নিজেই সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা হারমোনিয়াম চালিয়ে সা-রে-গা-মা শেখায়। নাইওরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির পদার্থ ও গণিত ক্লাস নেয়।

সব চলছিল বেশ। এর ভেতরই গ্রামে এসে হাজির হয়েছে রাজাকার দেওয়ান সাইদুল হকের ছেলে ব্যারিস্টার ফজল হোসেন। ফজল হোসেন শুরুতে হাফেজী পাশ করে পরে জেনারেল পদ্ধতির পড়াশোনা করে। ব্যারিস্টারি পাশ করে আসে লন্ডন থেকে। নিজেকে বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ দাবি করে দিব্যি ফতোয়া দিয়ে বেড়ায় – নাইওরী গ্রামে কোনো বেদাত চলবে না। কোনো বৈশাখী র‍্যালি এবং মেলা চলবে না। কারণ গত বছর শবমেহের বৈশাখী র‍্যালি এবং মেলা করেছে গ্রামের সকলকে সাথে নিয়ে। এই নিয়ে ফজল এবং শবমেহেরের বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। শবমেহের বলে – মানুষ এবং সংস্কৃতি কখনো পরাভূত হয় না। পরাভব মানে না।

(৫)

গত দুই মাস দিন-রাত এক করে জনসংযোগ করেছে শবমেহের। প্রতিটি ছাত্রের বাড়ি গিয়ে তাদের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেছে। বুঝিয়েছে মানুষের জীবনে সংস্কৃতি কেন অনিবার্য। সংস্কৃতির সঠিক অভিযোজন ছাড়া জীবন কিভাবে ব্যর্থ হয়ে ওঠে।

পায়ে পায়ে চলে আসে পহেলা বৈশাখ। লিলিকে আগেই শাড়ি কিনে দিয়েছিল শবমেহের। আগেই বলেছিল র‍্যালির জন্য প্রস্তুত হতে। খুব সকালে উঠে নিজেও পরেছে লাল তাঁতের শাড়ি, হাতভর্তি লাল চুড়ি, লাল টিপ, গলায় রুপার মালা, পায়ে নূপুর। লিলি তার জিন্স ফতুয়া আর রিমলেস চশমা পরা মেয়ের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। আবার ভাবে শফিকের মেয়ে হারবে! তাও আবার হয়!

ধীরে ধীরে স্কুলের সকল শিক্ষক এবং ছাত্র যোগ দেয় র‍্যালিতে। র‍্যালি শুরু হয় নাইওরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে। হঠাৎ শবমেহেরের পাশে এসে দাঁড়ায় লাল পাঞ্জাবি, শাদা চুড়িদার পাজামা পরা সরফরাজ। শবমেহের ঘোর বিস্ময়ে বলে – কিভাবে! কখন! সরফরাজ জানায় গত সন্ধ্যায়ই কলকাতা থেকে বরিশাল এসেছে। লিলির সাথে কথা বলেছিল স্কুলের এক শিক্ষকের বাসায়। সেই ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়ের মতো আবারও চারচোখে বহু কথা হলো দুজনের। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো – পৃথিবীর কোনো প্রান্তে একটা ঘর বাঁধার।

ঢোল, বাদ্য আর 'এসো হে বৈশাখ'-এর সম্মিলিত গানে র‍্যালি এগোয় গ্রাম প্রদক্ষিণ করার জন্য। ফজলের বাড়ি অতিক্রম করার সময়ে সে বলে – বেদাতকারীরা ধ্বংস হবে। এই গ্রামে বেদাত আমিও দেইখা নিমু। জুলুমের শ্যাষ আছে!

র‍্যালি করে আলু ভর্তা, পান্তা, পেয়াজু, চিংড়ি ভাজি খেয়ে শবমেহের ও সরফরাজ চলে যায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। তখন বেলা এগারোটা। শবমেহের খুশিতে কেঁদে ফেলে। বহু গ্রামীণ নারী এসেছে পিঠা-পুলি, আচার, হালুয়া নিয়ে। স্কুলের শিক্ষকরা বরিশাল শহর থেকে আনিয়েছে তাঁতের শাড়ি, আনিয়েছে লেইস ফিতার দোকানদার, মালাই, আইসক্রিম আরও কত কী! সবচেয়ে অবাক হয় যখন দেখে স্কুলের গণিত শিক্ষক রফিক স্যার নিজেই একটা বুকস্টল খুলে বসেছেন। সেখানে আছে বিখ্যাত সব বই। শবমেহের, সরফরাজ একে একে ঘুরতে থাকে সব স্টল। মালপোয়া খায়, বিবিখানা, মুগপাকন খায়। হঠাৎ শবমেহেরের কনিষ্ঠ আঙুল আরেকটি আঙুলের ছোঁয়া পায়...

পরিচিতি: কথাসাহিত্যিক ও কবি। নিবাস: ঢাকা, বাংলাদেশ।