কাঁচের ওপারে স্পষ্ট হচ্ছে আলো। দু'হাতে জল মুছে বাসের জানলাটার আরো কাছাকাছি মুখ নিয়ে গেল অরীন। চারিদিকে শুধু সবুজ, দূরে বোধহয় পাহাড়ের ছায়াটাও ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে। কাঁচটা নামাতেই একটা দামাল হাওয়া বয়ে গেল ওর সারা মুখে, বুকে, শরীরে। এই শিরশিরানিতেও একটা ভীষণ চেনা গন্ধ আছে, স্পর্শ আছে। অদ্ভুত মুগ্ধতায় ভরে উঠছে ও। দশটা বছর... প্রায় এক যুগ...
জলের ওপর তখনও সর ভাঙেনি। দূরের পাহাড়ের গায়ে ইতিউতি কুয়াশা। আলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে ক'জন। ফসল তোলার ব্যস্ততা। দুটো সাইকেল চলে গেল পাশ দিয়ে। কাঁধে ব্যাগ। রাস্তার পাশের চা দোকানটায় সবে আঁচ ধরিয়েছে। ভোরের হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে নিদাঘ। পাকা পথ ছেড়ে বাসটা এবার লালমাটির রাস্তা ধরল। বাঁ দিকের মরচে ধরা রং-চটা সাইনবোর্ডে – "পিয়ালগুড়ি ০ কিমি"।
বাসের পা'দানিতে পা রেখে বুক ভরে শ্বাস নেয় অরীন। কেমন যেন একটা অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত অনুভূতি এসে ভর করে ওর শরীরে। ধীর পায়ে বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে শহরের পথ ধরে। টের পায় ভোরের বাতাসে মিশে আছে লাইলাকের তীব্র সুঘ্রাণ। ঘোর লাগা আবেশে কুয়াশা ভেঙে ভেঙে সে ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। এ শহরকে ভীষণ অচেনা মনে হয় অরীনের।
পিয়ালগুড়িতে আসবার আগে অরোরা বোরিয়ালিস নিয়ে গল্পে মেতে উঠেছিল বন্ধুদের সাথে। দেখতে যাবারও পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু অফিসে কাজের চাপে সেদিন আর সময় করে উঠতে পারেনি। আলোর ছটা চোখে লাগতেই অরীন চেয়ে দেখে ছোপ ছোপ লালচে বেগুনি আর নীলাভ রঙে ছেয়ে আছে পিয়ালগুড়ির দিগন্ত। কিন্তু, এখানে অরোরা বোরিয়ালিস? পিয়ালগুড়িতে? বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে অরীন।
এই শহরে আছে অরীনের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবন। এই শহরে রেখে গিয়েছিল সে তার প্রথম প্রেম, পিয়ালকে। পিয়ালগুড়ির নামের সাথে ওর নামের মিল নেহাতই কাকতালীয়। ওর চোখে চোখ রেখেছিল অরীন কোনো একদিন বনের পথে যেতে যেতে। সারি সারি পিয়াল, জারুল এবং পাইন বনের ছায়ায় এক কোণে বসে ছিল আনমনা পিয়াল, তার দিগন্ত বিস্তৃত দৃষ্টির সীমানা সেদিন কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল কে জানে! অরীন তখন পড়ালেখা শেষ করে সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে অন্য শহরে। কয়েকদিনের একটা ছোট্ট ছুটিতে মায়ের কাছে আসা। ঘন অরণ্যের মাঝে পিয়ালকে দেখে অরীনের মনে হয়েছিল, এলোচুলে এক বনদেবী বসে আছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, "আপনাকে ঠিক চিনলাম না তো!"
এরপর তো ভাসিয়ে নেয়ার আর ভেসে যাওয়ার ইতিহাস। কিন্তু, গোলমাল অন্য জায়গায়। পিয়াল তখন অন্য কারো ঘরের স্থায়ী বাসিন্দা। বয়সেও খানিকটা বড়ো। সামাজিক সমীকরণ অনুযায়ী পিয়াল বা অরীন কারোরই এই দৃশ্যমান সীমারেখা পেরোনো উচিত ছিল না। কিন্তু, ওরা অবাধ্য হয়েছিল, এক অদৃশ্য মায়ার টান এমন এক ভবিষ্যতের দিকে ওদের টেনে নিয়েছিল যেখানে গন্তব্য ছিল অজানা।
পিয়াল ছবি আঁকতো। ওর বিমূর্ত ছবিতে ফুটে উঠতো এক নীলকণ্ঠ পাখির কষ্ট, শেকল পরা খাঁচার পাখির চিৎকার। অরীন প্রায়ই বলতো, "পিয়াল, তোমার দুঃখের কথা আমায় বলবে?" পিয়াল ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি হেসে বলতো, "আমার তো কোনো দুঃখ নেই অরীন।" কিন্তু, ছিল। অরীন বুঝতো। চেষ্টা করেও সে পিয়ালের মনের গহিনে পৌঁছোতে পারেনি।
গুনগুন করে কেউ কি গান গাইছে?
"ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি –
কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার সে কথা যে যাই পাশরি॥"
সম্মোহিত অরীনের দু'চোখে বিস্ময় নেমে এসেছে। শীতে ঝরে পড়া জারুলের পাতার খসখসে আওয়াজে সচকিত হয় সে। পিয়াল! পিয়ালের দু'হাত রঙে মাখামাখি, সুপারনোভা পিংক বা কোয়ান্টাম ব্লুও হতে পারে। সময় যেন থমকে গেছে অলীক এবং বাস্তবতার মাঝামাঝি প্রান্তে। পিয়ালের হাসিতে আজ আর কোনো রহস্য নেই। বরং সেখানে নাচছে এক চিত্রাভ প্রজাপতি। ওর শরীর যেন চন্দ্রপ্রভা, দু'পায়ে যেন হাওয়ার নুপূর, দু'চোখের পাতায় নক্ষত্রের ধূলিকণার কাজল।
নিবিড় কুয়াশা ঠেলে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে পিয়াল। অরীন কবে কোথায় হারিয়ে ফেলেছিল পিয়ালকে মনে করতে চেষ্টা করলো। এক ছুটিতে পিয়ালগুড়িতে এসে ওকে আর খুঁজে পায়নি। মা বলেছিল, ওরা হঠাৎ করে পিয়ালগুড়ি ছেড়ে চলে গেছে। অরীন বহু চেষ্টা করেও কোনো হদিস পায়নি ওর। এরপর আর পিয়ালগুড়িতে ফেরেনি অরীন। দশ বছর পর আজ পিয়ালগুড়িতে ফিরে অরীন খাপছাড়া আগন্তুক ছাড়া নিজেকে অন্য কিছুই ভাবতে পারছে না।
কিন্তু পিয়াল? সেই পিয়াল?
খুব কাছে এসে পরম যত্নে অরীনের দু'হাত তুলে নিলো পিয়াল ওর হাতে। ওর দু'চোখ ভরা একটাই প্রশ্ন, "এতদিন পরে এলে?"
"জ্বলে উঠলো আলো পূবে পশ্চিমে" –
মুহূর্তটা এমন ছিল কি? হয়তো ছিল।
ওরা এসে বসে সেই অন্তরঙ্গ বনের কোণে যেখানে এলোচুলে বসে থাকতো আনমনা পিয়াল। শান্ত হয়ে ছবি আঁকছে সে। ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে জলরঙে স্পষ্ট হয়ে উঠছে অরীন। সেই সাথে আছে এক অসম অসমাপ্ত প্রেমের গল্প, আছে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া একটা প্যালিনড্রোম। কোথাও নীলকণ্ঠের কষ্ট নেই, নেই শেকল পরা খাঁচার পাখির চিৎকার।
এক টুকরো কাগজ দিয়ে অরীন বানিয়েছে একটা পানকৌড়ি অরিগামি। কাগজে লিখেছে শেকসপিয়রের সনেট। পিয়ালের হাতে অরিগামিটা তুলে দেয় অরীন। চোখে চোখ রেখে অরীন প্রশ্ন রাখে, "যাবে আমার সাথে পিয়াল?"
পিয়ালের চোখে তখন চকমকির আলো।
এবারে বোধহয় দু'জনের নিখোঁজ হবার পালা। পিয়ালকে হারাবার পর যে নক্ষত্ররা ঝরে পড়েছিল তারা ঘরে ফেরার আনন্দে গুঞ্জন তোলে। উড়ে যাবার সময় ওদের বলে যায় "অনন্ত জীবন"।
অরীন এবং পিয়ালের প্রেম কি এক ভ্রমময় কল্পনার প্রতিচ্ছবি? সেটা জানা যায়নি। কিন্তু, সেই কুয়াশা ঘেরা ভোরে, লালচে বেগুনি দিগন্তে জারুল পিয়ালের বনে এককোণে পড়ে ছিল রঙ মাখানো কবিতার এক পাণ্ডুলিপি আর লাইলাকের কিছু পাপড়ি।

পরিচিতি: লেখক, অনুবাদক, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়র; ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র।