গল্প

দুটি পাখি ঝগড়াঝাঁটি



ময়ূরী মিত্র


পাখি – এক

গোলাপ পদ্ম – পলাশ ডালিয়া – কিছুটি নয়। আমাকে টানে বকুল। চোখ-নাক-প্রাণমন শুষে নেয়। তখন আমরা বেলগাছিয়ার ভাড়াবাড়িতে। বাড়ির কাছেই লেডিজ পার্ক – বকুল গাছে ভর্তি।

ভোর-ভোর ঠাকুরদার সঙ্গে গিয়ে রাশি রাশি বকুল জড়ো করতাম। বাড়ি ফিরে সেই বকুল দিয়ে ঠাকুরের মালা গাঁথা। ঠাকুর দেবতায় তো মনমতি নেই। কিন্তু ছেলেবয়সে বকুল-মালা গাঁথতে বসে একটা বাড়তি মনোযোগ আর নিষ্ঠা আসত। আমার এই বকুলপ্রেম দেখে কলেজজীবনে জুটে যাওয়া বান্ধবের দল কত যে হাসাহাসি করত!

একদিন। এক বন্ধু কলাপাতায় বকুল মুড়ে আমায় উপহার দিয়ে ফেললে। একদম ঝপ করে। আমার প্রেমও ছিটকালো ঝপাঝপ। বৃষ্টি পড়ছিল বলে বকুলগুলো ভিজে গিয়েছিল। ভেজা বকুল সুবাস ছড়াচ্ছিল। তার প্রতি আমার প্রেমের ঝোঁক তীব্র হচ্ছিল। গন্ধ যখন মিলাল দেখি প্রেম কখন ছুটি নিয়ে চলে গেছে। ঝপ-এর জিনিস টপ করে খসে যায়। সত্যটা চিরন্তন।

বকুলমত্ততা তুঙ্গে উঠেছিল বিয়ের বাজার করতে গিয়ে। বায়না ধরলাম বকুল রংয়েরই বেনারসি চাই। বহু খুঁজে মা বকুল রংয়ের বেনারসিতেই সাজিয়েছিলেন। উন্মাদিনী কন্যা তাঁর। মনটা আজও সেই রং ধরে আছে। বেনারসির ভেতরটা বকুল চন্দনে মাখামাখি – পাড়টা রাঙা জবা।

মানুষপ্রেমিকে তেমন ভরসা না থাকলেও বকুলে প্রেম কি সহজে যায় গো? ঠাকুরদা একটি বকুল গাছ পুঁতলেন আমাদের সল্টলেকের বাড়িতে। আঙিনার সেই গাছ বড়ো হল। বাদলে চক্কর মেরে দীর্ঘ হতে লাগল সুগন্ধী বাতাস।

গাছটি কাটাও পড়ল একদিন।

আজ দেখি – পাশের নিমগাছ থেকে ঝগড়াটে শালিকটা বকুলের গুঁড়ির গোল কাটা অংশ হাঁ করে দেখছে। ফাঁকা জায়গাটায় বড়ো এক প্যাকেট আবির ঢেলে দিয়েছি গো। মালি বলেছে – বড়ো গাছ থাকার জন্য ও জায়গায় ছোট্ট প্রাণ জন্মাবে না।

রংটা থাক।
চাঁদ এসে লাল মাখুক।
লাল চাঁদে শিশু খেলুক।
লাল খেয়ে পিঁপড়ে মরুক।

প্রাণের আশা স্বয়ং হরি।
প্রাণের আসা ঠেকাতে নারি।

পাখি – দুই 

সেবার রংয়ের খেলা শেষ হয়ে গেছে। হাটেবাজারে পড়ে নেই একটিও পিচকিরি কিংবা একথলে আবির। গা-থেকে-খসে-যাওয়া আবিরের ঢালও আর দেখা যাচ্ছে না পথেঘাটে। এতটাই তখন দূরে চলে গেছে রঙের দিন! ঠিক যেমন ভুবন সংসার থেকে হু-হু করে ফুরিয়ে যায় রংঢং, প্রণয়প্রেম।

রেলপথে চলেছি বাবার বাড়ি। দমদম জংশন থেকে উল্টোডাঙা পৌঁছোবার ঠিক আগে মাঝপথে থেমে গেল ট্রেন। লাইনের ধারের মানুষের ঘরসংসার অনেকক্ষণ ধরে দেখার নেশা আমার বরাবরই। গালাগাল দিতেই পারেন আপনারা। বলতেই পারেন – কলকাতা শহরে দু-তিনখানা বাড়ির মালকিন হয়েও রেলবস্তির ফুটোচালের ঘরে কী দেখিস এত ময়ূরা? এ হল তোর মনবিলাস। দামি বসনে পায়ের পাতাটি অব্দি ঢেকে লাইনের ধারের মানুষের সুখ-দুখে এ তোর নেকু নেকু দরদ! না – আপনাদের সাথে তক্ক করবে না ময়ূরা। আবার ওদের হাঁ করে গেলাটাও ছাড়বে না।

সেদিনও ট্রেন থামতে কামরা থেকে ঘাড়-পিঠ সব বের করে লাইনের ঢালে খুঁজছিলাম ঘর গড়ে থাকা কোনও একটি মানুষ কিংবা বহু মানুষের সংসার। যতটুকু ছেঁচে নেয়া যায়, অতটুকু সময়ে। হঠাৎ দেখি – পাশের লাইনেই শুয়ে ছটফট করছে এক বর আর এক বউ। হতভাগারা যুগলে মরবে নাকি! ওমা নাতো! ভরসন্ধেতে সবুজ আবির মাখাচ্ছে বর বউকে। আর সে আবিরে শরীর ভরিয়ে তপ্ত খিস্তি করে যাচ্ছে লাইনের বউ। কখনও "এই শালা", কখনও বা "শুয়োরের বাচ্চা মর তুই"। খিস্তি দিতে দিতেই বরের গালে-পিঠে নিজের মুখের আবির ঘষে দিলো বউটা। লালা থুতুতে ভিজল লাখ গুঁড়ো।

রং মিটেছে কবে। তবু অ-দিনে লাইনের জোড়া মানিক রং মাখে। যে কোনো মুহূর্তে ট্রেন এসে পিষতে পারে, এ হুঁশও হারিয়েছে লাইনের প্রণয়ী। এ যত গাল পাড়ে ও তত জাপটায়। তারা বর-বউ কিনা, তাও কি ছাই বুঝলাম!

তবু খেপি হল ময়ূরা। সবুজ রং-এর মেয়েপুরুষ তাকে রাঙাল প্রেমকামে। বিগ বিগ ঘরবাড়ির মালিক ময়ূরাবতীর ইচ্ছে হল একবার কাঁদে।

ট্রেন ছাড়ল। আঁধারে ঝলসায় সবুজ টিয়ে। কিচিরমিচির। মিচিরকিচির।

পরিচিতি: নাট্যশিল্পী, নাট্য গবেষক, গল্পকার এবং বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষক। নিবাস: কলকাতা।