গল্প

গোধূলির অস্তরাগে (বড়োগল্প)



সন্দীপ দে


ডাক্তার আলোকময় চৌধুরীর চেম্বারে আজ বেশ ভিড়। তাঁর চেম্বারে ভিড় সব সময় লেগেই থাকে, তবে আজকে যেন একটু বেশিই। অর্থপেডিক সার্জেন হিসেবে তাঁর প্রচুর নামযশ। চেন্নাইর অ্যাপোলো, দিল্লির এইমস ঘুরে এখন তিনি সল্টলেকে থিতু হয়েছেন। তাঁর তিনতলা বাড়ির নিচে চেম্বার। শহরের বড়ো হাসপাতালগুলির প্রায় সবক'টিতেই তাঁর যাতায়াত। রঞ্জনের জয়েন্ট পেইন আবার বেড়েছে, তার উপর দু'দিন আগে ঘরের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় স্টেপ ভুল করে এমনভাবে আছাড় খেয়েছে যে কোমর টান করে হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। এদিকে অনেক কাজ জমে আছে। তার উপর সামনে ইলেকশন। তাই শরীরটাকে কিছুটা সচল করতে এখানে আসা।

প্রবল ঠান্ডার প্রকোপ কাটিয়ে এখন গরম ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এখানে আসার সময় তা কিছুটা মালুম হয়েছে রঞ্জনের। ডাক্তার চৌধুরীর চেম্বারটি বেশ ছিমছাম সাজানো। চারপাশে দেয়ালে টাঙানো নানা ছবি। সবগুলোই পেইন্টিং। সাঁওতাল রমনী বাচ্চা কোলে গ্রামের পথে হেঁটে যাচ্ছে, পাহাড়ের কোলে লাল পলাশের সমারোহ, বৃষ্টিস্নাত দিনে ট্রামযাত্রা, প্রবাহিত গঙ্গার উপর হাওড়া ব্রিজ - দূরে দেখা যাচ্ছে স্টিমার ও ছোট্ট পালতোলা নৌকো। প্রশস্ত লাউঞ্জের মাঝামাঝি রিসেপশন কাউন্টার। তার পিছনের দেয়ালে টাঙানো যৌবনের রবীন্দ্রনাথ। আর এক জায়গায় যামিনী রায়ের আঁকা তিন রমনীর চিত্র। ঘরের প্রতিটি কোনে সাজানো উঁচু ফুলের টব। একটি ছোট্ট কাঠের হেলানো র‍্যাকে ইংরেজি-বাংলা ম্যাগাজিন। এসি চলছে, সব মিলিয়ে মনোরম পরিবেশ। রোগী ও সঙ্গে আসা লোকজনদের জন্য তিন দিকে সার সার লম্বা স্টিলের চেয়ার। একটি সারিতে পাঁচ জন করে বসার ব্যবস্থা, হাতল দিয়ে ভাগ করা। কোথাও গেলে রঞ্জনের দু'চোখ ঘুরতে থাকে চারপাশে, এটা তার বহুদিনের অভ্যাস। বাসে, ট্রেনে যাতায়াতের সময় তো কথাই নেই। যথারীতি এখানে এসেও তার দৃষ্টি ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবার সময়ই রিসেপশন থেকে বলে দিয়েছিল হাতে সময় নিয়ে আসতে হবে। সেভাবেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে রঞ্জন। ব্যাগে বই বা ম্যাগাজিন সবসময়ই থাকে, আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরুতে হয়েছে বলে খবরের কাগজটাও সঙ্গে এনেছে। দেয়াল ঘড়িতে চোখ পড়লো, সবে দশটা পঞ্চাশ। রঞ্জন এখানে এসে রিসেপশনে ডাক্তারের ফি জমা দেবার সময় জেনেছে পৌনে বারোটা থেকে বারোটার আগে ডাক পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে একঢোক জল খেয়ে খবরের কাগজটা মেলে ধরলো। নানা খবর দেখতে দেখতে এডিট পেজের একটি উত্তর-সম্পাদকীয় নিবন্ধে চোখ আটকে গেল। 'ভালোবাসায় চূর্ণ উগ্র ধর্মান্ধতার প্রাচীর' এই শিরোনামে লিখেছেন সাহিত্যিক অনির্বাণ বসু। গতবছর কুম্ভমেলায় রুদ্রাক্ষের মালা বিক্রি করে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া মোনালিসা ভোঁসলে ও অভিনেতা ফারমান খানের বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই কলামটি লিখেছেন তিনি। গত কয়েক বছর ধরে দেশের নানা জায়গায় উগ্র ধর্মান্ধরা যেভাবে ধর্ম ও বর্ণের সীমা পেরোনো প্রাপ্তবয়স্ক যুবক যুবতীর প্রণয় ও বৈবাহিক সম্পর্ককে ভাঙতে হিংসার আশ্রয় নিয়েছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকার ও প্রশাসন মৌনভূমিকা নিয়েছে, তাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন লেখক। মোনালিসা ও ফারমানের প্রেম ও পরিণয়ের ঘটনা দু'জন পরিণত বয়সের মহিলা ও পুরুষের ব্যক্তিগত বিষয় এবং এটা উভয়েরই মৌলিক অধিকার। মোনালিসা পরিবার ও সমাজের চোখ রাঙানিকে দূরে ঠেলে ফারমানের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে আসে এবং তাঁরা তাঁদের যৌথ জীবনের সূচনার জন্য বেছে নেয় কেরালাকে। তাঁরা মনে করেছে, দেশের মধ্যে কেরালাই তাঁদের জীবনযাপনের জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ জায়গা। কারণ এখানে রয়েছে বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকার, তাদের নীতি। এই সংক্রান্ত সাম্প্রতিককালের নানা ঘটনা, তথ্য এবং যুক্তি দিয়ে সাজানো নিবন্ধটি খুবই প্রাসঙ্গিক ও চিন্তাকর্ষক মনে হয়েছে রঞ্জনের। একটানা পড়া শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে পড়ে রঞ্জন, সে হারিয়ে যায় অন্য এক জগতে। হঠাৎ করে সংবিৎ ফেরে তার, খবরের কাগজটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখে, বোতল বার করে জল খায়, দেখে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে গেছে। রঞ্জনের মধ্যে একটা ভাবনার আবেশ তৈরি হয়েছে। তখনই রিসেপশনের সুবেশা তরুণী মাইক্রোফোনে ঘোষণা করেন - রঞ্জন মিত্র...। রঞ্জন তড়িঘড়ি উঠে এগিয়ে যায় রিসেপশন কাউন্টারের পাশ দিয়ে ডাঃ চৌধুরীর রুমের দিকে।

প্রায় মিনিট পনেরো পরে সে বেরিয়ে ডাক্তারের নির্দেশ মতো প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে রিসেপশন কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালো। ডাঃ চৌধুরী দু'একটা ওষুধ লিখে দিয়েছেন, সেই সঙ্গে কয়েকটা রক্ত পরীক্ষা ও কোমরের এক্স-রে করিয়ে দিন সাতেক পর আসতে বলেছেন। সেইমতো আজই নাম লিখিয়ে যেতে হবে। না হলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট মেলা শক্ত। রঞ্জন তার নাম ঠিকানা ও ফোন নম্বর নির্দিষ্ট একটা স্লিপে লিখে রিসেপশনিস্টের কাছে জমা দেবার মুহূর্তে হঠাৎ করেই একটি ফোন বেজে উঠলো - 'মায়াবিনী রাতির বুকুত'... রিংটোনটা শুনে রঞ্জন খুবই অবাক হলো - এখানে এই রিংটোন! চেম্বারে ভিড় থাকলেও কথাবার্তা যেটুকু বলার নিচুস্বরেই বলছেন সবাই। তাই ফোনের রিংটোনটা পিছন দিক থেকে এলেও একটু যেন জোরেই শোনালো। কার ফোনে বাজলো এমন রিংটোন তা জানার ভীষণ কৌতূহল হলো রঞ্জনের, একটু পিছন ফিরে তাকাতেই চোখে পড়লো একেবারে পিছনের সারিতে বসা একজন ভদ্রমহিলা ফোনটাকে দু'হাতে আড়াল করে মাথা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে নিচুস্বরে কথা বলছেন। রঞ্জন দূর থেকেই দেখছেন ভদ্রমহিলাকে এবং ভাবছেন ইনি কি এখানেই থাকেন নাকি...। দু-তিন সেকেন্ড কথা বলে ভদ্রমহিলা যখন ফোনটা ব্যাগে রাখতে যাবেন তখনই রিসেপশনিস্ট মহিলা বলে উঠলেন - এবারে শিউলি রহমান আসবেন... নামটা শুনেই চমকে উঠলো রঞ্জন। এরপর যখন সেই মহিলাই খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ালেন, তখন তাকে দেখে রঞ্জনের শরীরে যেন আচমকা শিহরণ বয়ে গেল! ভদ্রমহিলা আস্তে আস্তে পা টেনে টেনে এগোতে লাগলেন, সে এখন রঞ্জনের অনেক কাছাকাছি, ডাক্তারের রুমের দিকে তার দৃষ্টি, অন্য কোনো দিকে খেয়াল নেই তার। সে জানতেও পারছেনা তাকে দেখার পর একজন যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে বসেছে! এ কাকে দেখছে রঞ্জন! সে নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না! কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল সংবিৎহারা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে রিসেপশন কাউন্টারের বাঁ দিকে প্রথম সারির একটি ফাঁকা সিটে বসে পড়লো। তার ভেতরে কেমন যেন একটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। এটা মিরাকেল, স্বপ্ন না অন্যকিছু? এসব ভাবতে ভাবতে নিজেকে সামলে নিল রঞ্জন। মনে মনে ছক কষতে লাগলো এখন কী করবে, কীভাবে দাঁড়াবে তার সামনে, কী বলবে তাকে, এটা তো রঞ্জনের কাছে এক বিরল সুযোগ, এই সুযোগ তো কিছুতেই হারানো যাবেনা! এসমস্ত এলোমেলো ভাবনা এখন ডানা মেলে উড়ছে তার মনের আকাশে। রঞ্জন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হিসেব করে দেখলো ডাক্তারের কাছে যাবার পর নয় মিনিট পেরিয়ে গেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার দেখিয়ে বেরিয়ে আসবেন তার মনের গভীরে আলোড়ন তোলা সেই নারী - শিউলি রহমান। তাই তার দৃষ্টি এখন নিবদ্ধ ডাক্তারের রুমের দিকে।

কিছুক্ষণ পর খুলে গেল রুমের দরজা। তিনি ডাক্তার দেখিয়ে আবারও পা টেনে টেনে রিসেপশন কাউন্টারে এসে প্রেসক্রিপশনটা তুলে দিলেন রিসেপশনিস্ট মহিলার হাতে। তার সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে প্রেসক্রিপশনটা এক্স-রে প্লেটের কভারে ঢুকিয়ে নিলেন, তারপর ভ্যানিটি ব্যাগটা বাঁ কাঁধে নিয়ে আস্তে আস্তে পা বাড়ালেন কাঁচের দরজার দিকে। এই গোটা মুহূর্ত মুভি ক্যামেরায় সিনেমার দৃশ্যগ্রহণের মতো দু'চোখের লেন্সে ধারণ করতে লাগলো রঞ্জন। তার দৃষ্টির বৃত্তে এখন কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণের মানস-প্রতিমা, এক দীর্ঘ সময়ের একান্ত ভালোলাগা-ভালোবাসার মানুষ, প্রাণের দোসর, তার পালতোলা স্বপ্নতরীর নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী - যাকে সময় ও পরিস্থিতির অনিবার্যতায় হারিয়ে ফেলেছিল বহুদিন আগে, অন্তহীন প্রতীক্ষা আর আকুল প্রত্যাশার সেই স্বপ্নসুন্দরী অপ্রত্যাশিতভাবে সীমাহীন বিস্ময়ের আবহ রচনা করে যেন অলৌকিকভাবে এখন উপস্থিত তার সামনে! কিশোরীবেলা থেকে উত্তীর্ণ জীবনে কিছু পরিবর্তন চেহারায় স্বাভাবিকভাবে এলেও, অতীতের সেই সোনালি দিনগুলিতে তাকে দেখা এবং স্মৃতিপটে যে ছবি আঁকা হয়ে আছে - তাতে তার শিউলিকে আবিষ্কার করতে ভুল হয়নি রঞ্জনের। আগের চেয়ে এখন আরও মার্জিত, রুচিসম্পন্ন একটু গাম্ভীর্যের ছাপ পড়েছে তার চেহারায়। এখন নতুন সংযোজন, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। তারসঙ্গে মানানসই হালকা রঙের হ্যান্ডলুম শাড়ি, পায়ে পাতলা খয়েরি পাম সু - এই সাজ তার মধ্যে যেন এক অনবদ্য আভিজাত্য এনে দিয়েছে। চোখে কাজল ও কপালে কালো টিপ, গলায় সরু চেন, ছোট্ট দুল দু'কানে, লম্বা কালো চুল ক্লিপ দিয়ে বাঁধা, প্রসাধনহীন মুখচ্ছবিতে এক অদ্ভুত লাবণ্য ঝরে পড়ছে। আগের একটা চিহ্ন কিন্তু এখনো বিরাজ করছে, নাকছাবি। রঞ্জনের অনুসন্ধানী চোখের নিবিড় পর্যবেক্ষণ যখন শেষের পথে, তখন শিউলি কাঁচের দরজার প্রায় কাছাকাছি, বেরোনোর মুখে। পিছনে হাত দু'য়েক দূরে রঞ্জন, সে মনের ভেতর উত্তেজনার তরঙ্গকে সামলে মৃদুস্বরে ডেকে ওঠলো - "একটু শুনবেন।" একেবারে প্রথমেই 'তুমি' বলে সম্বোধন করা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে কেমন যেন একটা দোলাচলে ছিল সে। শিউলি থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকায়, তার চোখেমুখে একরাশ বিস্ময়, যেন শান্ত-নিস্তরঙ্গ এক নদীর প্রবাহ অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে। এক লহমার নিস্তব্ধতা, তারপর উঁচু পাহাড় থেকে উৎসারিত ঝরনার মতো রঞ্জনের মনের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে - "আপনি... তুমি শি-উ-লি! আমায় কি চিনতে পারছো?" অনন্ত বিস্ময়ভরা চোখে শিউলি তাকায় রঞ্জনের দিকে, তাকিয়েই থাকে, রঞ্জনের শতজিজ্ঞাসু দৃষ্টি তার শিউলির দিকে। ঘড়ির কাঁটা যেন থমকে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। ডাক্তার চৌধুরীর চেম্বারে তখন যে ক'জন উপস্থিত এবং রিসেপশনিস্ট-স্টাফ তারা কেউই উপলব্ধিও করতে পারছেন না যে, এখানে এই মুহূর্তে একটি অনবদ্য নাট্যমুহূর্ত তৈরি হয়েছে!

কাঁচের দরজা সংলগ্ন বসার জায়গা, যেখানে কিছুক্ষণ আগেই বসেছিল শিউলি, সেই জায়গা এখন একেবারে ফাঁকা, বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে ধারের সিটটাতে ধপাস করে বসে পড়ে শিউলি, এক-দু সেকেন্ডের বিরতি, তারপর চোখের ইশারায় রঞ্জনকে বলে পাশে বসতে। রঞ্জনও কোনো কথা না বলে বসে পড়ে সেখানে। এক্স-রে প্লেটটা সিটের পাশে রেখে কাঁধের ভ্যানিটি ব্যাগটাকে কোলে রাখে শিউলি, রঞ্জন নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে শিউলির দিকে। এবারে মুহূর্তের নীরবতা ভাঙে শিউলি, বলে - "রঞ্জু তুমি! এখানে! তোমার চশমা ও গালভরা দাড়ি দেখে আমি তো তোমাকে চিনতেই পারিনি। আর এখানে এভাবে যে তোমায় দেখব তাতো কল্পনাতেও আসেনি।"

শিউলির মুখে 'রঞ্জু' ডাক শুনে রঞ্জনের ভিতরটা যেন রিনরিন করে উঠলো। আবেগমথিত গলায় রঞ্জন বলে উঠলো, "আমিও তোমাকে এতদিন পর এখানে এভাবে যে দেখব তা কি কখনো কল্পনা করেছি রঞ্জনা!" এবারে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো শিউলির মুখে। যেন মেঘ সরে গিয়ে আকাশের এককোণে আবছা রামধনুর ছটা। শিউলির এই 'রঞ্জনা' নাম নিয়ে একসময় কতই না মজার কাহিনি! সে বলে, "কী হয়েছে তোমার? এখানে যে এসেছো?"

রঞ্জন মৃদু হেসে বলে, "পদস্খলন", তারপর সংক্ষেপে জানায় তার শারীরিক সমস্যার কথা, তারপর জিজ্ঞাসা করে, "তোমার পায়ে কি কোনো সমস্যা? দেখলাম পা টেনে টেনে হাঁটছো?"

"আরে বোলো না, সেদিন অটো থেকে নামতে গিয়ে ডান পা-টা মুচকে গেছে। সামান্য ফুলেছে, ব্যথাও ছিল। তাই ডাক্তার চৌধুরীর কাছে এসেছিলাম দেখাতে।"

শিউলির কথাগুলো শুনতে শুনতে রঞ্জন ভাবছিল কতদিন পর তার কণ্ঠস্বর শুনছে, যা শোনার জন্য ছিল কতদিনের প্রতীক্ষা!

– "ডাক্তার কী বললেন, গুরুতর কিছু নয়তো?"

– "না না, তেমন কিছু নয়, এক্স-রে-তেও কিছুই পাননি, একটা অয়েন্টমেন্ট দিয়েছেন লাগাতে, বলেছেন রাতে ঠান্ডা গরম জলে কিছুক্ষণ পা ডুবিয়ে রাখতে, আর দিনেরবেলা ক্রেপ ব্যান্ডেজ বেঁধে রাখতে। ব্যথা খুব বেশি হলে একটা পেইনকিলার দিয়েছেন খেতে, এই তো..." একটু থেমে শিউলি বলে, "পা টা-কে যতটা সম্ভব রেস্ট দিতে বলেছেন ডক্টর, আর দিন দশ বারো পর কেমন থাকি তা জানিয়ে যেতে বলেছেন।" খুবই মোলায়েম স্বরে কথা বলে চলেছে শিউলি।

শিউলির কথাগুলো শুনতে শুনতে রঞ্জন ভেসে চলেছে পুরোনো স্মৃতির গহীনে। তার মনে জমাট বেঁধে আছে অজস্র জিজ্ঞাসা। কত কথা জানার জন্য প্রাণটা আকুল হয়ে উঠেছে। শিউলির এই মনোরম সান্নিধ্য সে হারাতে চাইছে না কিছুতেই। ইতিমধ্যে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। চেম্বারে রোগীর সংখ্যাও প্রায় শেষের দিকে। এখানে বসে থাকাটা আর ঠিক হবে না। এসব ভাবতে ভাবতে সে শিউলিকে বললো, "তোমার যদি খুব অসুবিধে না থাকে তবে চলো না বাইরে কোথাও গিয়ে একটু বসি।"

সায় দেয় শিউলি, মুখে প্রশান্তির ছাপ, বলে - "চলো তাহলে।"

দু'জনেই উঠে দাঁড়ায়, রঞ্জন শিউলির এক্স-রে প্লেটটা তুলে নিয়ে বলে, "এটা আমি নিচ্ছি, চলো এগোও।"

সামনে শিউলি, পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে কাঁচের দরজা খুলে দেয় রঞ্জন, দু'জনেই পা বাড়ায় ভেতর থেকে বাইরে।

(দুই)

'প্রতীক্ষা'য় মুখোমুখি বসে দু'জনে। ডাক্তারের কাছে আসার সময়ই রঞ্জনের নজরে পড়েছিল এই রেস্টুরেন্টটি। ঠিক দু'টো বিল্ডিং আগে। এটি কাছাকাছি হওয়ায় একদিকে ভালোই হয়েছে শিউলিকে খুব বেশি হাঁটতে হলো না। বেশ সাজানো গোছানো রেস্টুরেন্ট, বলা যায় এলাকার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চৈত্রের মধ্যদুপুর, রাস্তাঘাটে লোকজন খুব একটা নেই, রেস্টুরেন্টও অপেক্ষাকৃত ফাঁকা। জানালার ধারের দিকে একটা টেবিলে এসে বসে দু'জনে, একটা খালি চেয়ারে শিউলি ব্যাগ ও এক্স-রে প্লেটটি রেখে বেসিনে যায় হাত-মুখ ধুতে, এসে সঙ্গে আনা সুদৃশ্য জলের বোতল থেকে খানিকটা খেয়ে আবার রেখে দেয় ব্যাগে। শিউলি এলে রঞ্জনও যায় হাত ধুতে। দু'জনের মনেই জমানো অজস্র কথা, আবেগ, বিরহযন্ত্রণা, অন্তহীন প্রতীক্ষা সব জমা হতে হতে যেন পাথর হয়ে আছে। এই দুঃসহ ভার বুকে নিয়েই চলেছে দু'জনের পৃথক পথচলা। আজ অনেকটা গল্প-সিনেমার প্লটের মতো অকস্মাৎ দু'জনের দুটি পথ যেন এক মোড়ে এসে মিলেছে! ঘটনার আকস্মিকতায় দু'জনেই বিহ্বল। দু'জনের মনেই হাজারো প্রশ্ন উথালপাথাল করছে। দু'জনের চোখে মুখে তারই আভাস ফুটে উঠছে। অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই। এভাবেই পেরিয়ে যায় কয়েকটা মুহূর্ত। শেষ পর্যন্ত মৌনতা ভাঙে শিউলি, বলে - "ইয়াত কি অকল কফি, চা পোয়া নেযায়?" হঠাৎ করে শিউলির এই কথা পরিবেশকে যেন অনেকটা সহজ করে দিল। এবারে হেসে ফেললো রঞ্জন। শিউলির মনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অজস্র ভাবনার জাল বোনা চলছিল, মনের গভীরে জমানো অব্যক্ত কথাগুলি ক্রমাগত আন্দোলিত হচ্ছিল, স্বাভাবিকভাবেই এ সবই হচ্ছিল মাতৃভাষা অসমিয়ার আবরণেই। তাই হঠাৎ করেই মাতৃভাষায় মনের কথা বেরিয়ে এসেছে শিউলির। হাসিমুখ নিয়ে রঞ্জন বলে, "তা কেন? চা-কফি সবই পাবে। দেখছো না বোর্ডে খাবারের তালিকায় চা-কফি দু'টোই লেখা আছে।" রঞ্জন গভীরভাবে লক্ষ করেছে শিউলির বাংলা বলার মধ্যে রয়ে গেছে অসমিয়া টান, মাঝেমাঝে চলে আসছে অসমিয়া শব্দ। একটা সময় গেছে, শিউলির এই ধরনের পরিস্থিতি সামলে দিয়েছে রঞ্জন। সে বলে, "তোমার বুঝি এখন বাংলা বলার সুযোগ কমে গেছে তাই না?" শিউলি বুঝতে পেরে মৃদু হাসি নিয়ে বলে, "প্রায় তেনেকুয়াই" অর্থাৎ প্রায় তাই।

"তুমি কি শুধু চা-ই খাবে? অন্য কিছু খাবেনা?" জানতে চায় রঞ্জন।

উত্তর এলো, "কিবা এটা অর্ডার দিয়া।"

শেষ পর্যন্ত স্থির হলো লিকার চা আর স্যান্ডউইচ।

রঞ্জনের অপলকদৃষ্টি শিউলির দিকে, সে চোখ দিয়ে নয় যেন হৃদয় দিয়ে দেখছে শিউলিকে, আর শিউলি রঞ্জনের চোখের দিকে তাকিয়েই আবার চোখটা সরিয়ে নিচ্ছে, মন চাইলেও পারছেনা একটানা তাকিয়ে থাকতে রঞ্জনের দিকে। এই অবস্থায় রঞ্জনই কথা শুরু করে, বলে, "জানো তো ডাক্তার চৌধুরীর চেম্বারে হঠাৎ রিংটোনে জুবিনের গান শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম। তুমি বুঝি জুবিনের ভীষণ অনুরাগী?"

এতক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসেছিল শিউলি। এবারে গাল থেকে ডান হাতটা সরিয়ে নেয়, বলে ওঠে, "জুবিনের অনুরাগী অসমের কে নয় বলতো? অমন প্রতিভাবান শিল্পীর এভাবে অসময়ে চলে যাওয়া আমি আজও অনেকের মতো মেনে নিতে পারছি না।"

"আমিও তাই, গত ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলের দিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় জুবিনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরটা পেয়ে আৎকে উঠেছিলাম। সেই থেকে আজও নিভৃত সময়ে আরও কিছুর সঙ্গে জুবিনের গান আমার সঙ্গী। তুমি আমাকে ফোন করলে শুনবে কলার টিউনে বাজছে - 'মায়াবিনী'। জুবিনকে নিয়ে আমি লিখেছিও" – কথাগুলো একটানা বলে থামলো রঞ্জন।

সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ের সুরে শিউলি বলে, "হয় নেকি! রবা"... বলে ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন বার করে রঞ্জনের কাছ থেকে নম্বরটি নিয়ে ডায়াল করে ফোনটি কানের কাছে ধরে, এদিকে রিংটোনে বেজে ওঠে - "সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল"। শিউলির চোখেমুখে এক অনাবিল উচ্ছ্বাস। সে বলে, "তুমি তো দেখছি জুবিন গার্গ-ভূপেন হাজরিকা দু'জনকে নিয়েই আছ।"

"আমি শুধু এই দু'জনকে নিয়ে নয়, গোটা অসমকেই মনের মধ্যে ধারণ করে চলেছি রঞ্জনা।" অনেকটা দার্শনিকের মতো উত্তর আসে রঞ্জনের কাছ থেকে, সে বলে চলে - "অসম যে আমার জন্মভূমি, তা কি কখনো ভোলা যায়? আমার প্রিয়জনেরা সবাই ওখানে, সেটা যেমন একটা বড়ো দিক, আরেকটি বিশেষ দিক হলো - 'তুমি'। তাই আমার পক্ষে অসমকে ভোলা কিছুতেই সম্ভব নয়।"

"তুমি আমাকে কেন মনে রেখেছো রঞ্জু? আমি তো ভীষণ অন্যায় করেছি তোমার সঙ্গে। আমি তোমার কোনো খোঁজই তো রাখতে পারিনি! পরিস্থিতি আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে তোমার কাছ থেকে!" শিউলির কথাগুলো বেদনা মিশ্রিত হয়ে ঝরনার গতির মতো বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। পরিবেশটা হঠাৎ করেই ভারি হয়ে উঠলো। ওয়েটার স্যান্ডউইচ দিয়ে গেলেও সেদিকে কারও খেয়াল নেই। শিউলির মুখটা গম্ভীর, দু'চোখ অশ্রুসিক্ত।

রঞ্জনও নির্বাক। স্যান্ডউইচের প্লেট শিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বলে, "তুমি অন্যায় করেছো তা আমি কখনো বলব না, আমিও তো তোমার ঠিকানা জোগাড় করে ছুটে যেতে পারিনি তোমার কাছে। তখন আমাদের বয়স, পরিবেশ-পরিস্থিতি কিছুই যে সায় দেয়নি। যদিও আমি এতটা বছর ধরে নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আর উত্তর খুঁজে গেছি - কেন এমন হলো? আমার মনের মধ্যে শুধু একটা কথাই তোলপাড় হয়েছে - রঞ্জনা তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে! কীভাবে খুঁজে পাব তোমাকে?"

শিউলির দু'চোখের কোল বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু, ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে আলতো করে মোছে, তারপর উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জানালা দিয়ে।

চা দিয়ে যায় ওয়েটার। রঞ্জন বলে, "দেখেছো কথায় কথায় খাবারের দিকে খেয়াল নেই আমাদের। চা-ও তো ঠান্ডা হয়ে যাবে। নাও খেয়ে নাও, খাবার পর আমরা কথা বলি কেমন।" পরিবেশটাকে একটু হালকা করতে চাইলো রঞ্জন। তবে ওদের কারও এখন খাবারের দিকে মন নেই, বিশেষ করে শিউলির, সে একটু মুখে দিয়ে প্লেটটাকে সরিয়ে রেখে চায়ের কাপ টেনে নেয়। রঞ্জন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে, "আজ কত বছর পর আমাদের দেখা হলো বলতে পার রঞ্জনা?"

শিউলি চায়ের কাপটা রেখে তৎক্ষণাৎ উত্তর দেয়, "কেন পারব না, আটত্রিশ বছর। এই দীর্ঘ সময় আমাকে তো একরকম যুদ্ধ করেই কাটাতে হয়েছে, নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ, বাড়ি-বাইরের জগৎ - সব জায়গাতেই তো আমাকে যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে আমি হার মানিনি রঞ্জু।"

রঞ্জন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শিউলির দিকে, সে তন্ময় হয়ে শুনছে তার কথাগুলি, ওর কথা শোনার জন্যই তো এতদিনের প্রতীক্ষা! রঞ্জনের স্মৃতির আঙিনায় সবসময়ই ভেসে বেড়ায় সেই দিনগুলো। ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে, রঞ্জন ফার্স্ট ডিভিশন এবং অঙ্ক ও বিজ্ঞানে লেটার মার্কস, শিউলি ফার্স্ট ডিডিশনের দোরগোড়ায়। আগেই ঠিক ছিল ম্যাট্রিকের পর রঞ্জন পড়তে যাবে বাইরে। শিউলি সেখানকার কলেজেই পড়বে আর্টস নিয়ে, বাড়ির সিদ্ধান্ত। যাবার আগের দিন অনেক ছুতো করে শিউলি রঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে আসে স্কুলে। এসেছে ক্লাসের কয়েকজন সহপাঠীও, তারা মশগুল নানা কথায়, মাঝে মাঝেই হাসির ফোয়ারা উঠছে। আর তাদের জটলা থেকে একটু দূরে শিউলি আর রঞ্জন বহুদিনের চেনা ক্লাসরুম সংলগ্ন বারান্দার এক কোণে বসে মগ্ন নিজেদের মধ্যে। সহপাঠীদের জটলা থেকে একটু আধটু টিপ্পনী ছুটে আসছে তাদের দিকে, কিন্তু সেদিকে তাদের মনোযোগ নেই। তিন বছর ধরে যেভাবে তাদের ভাবনার দূরত্ব, মনের দূরত্ব কমতে কমতে সহপাঠী, বন্ধুত্ব, ভালোলাগার সাঁকোগুলি পেরিয়ে তারা ভালোবাসার দেশে পৌঁছে গেছে, সেখান থেকে তারা কী করে একে অপরের কাছ থেকে সরে গিয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী হবে? এ নিয়েই ছিল তাদের সেদিনের নিবিড় আলাপচারিতা। ওই মুহূর্তে তাদের দুজনের মনের মধ্যে বিষাদের ছায়া প্রলম্বিত হলেও তারা এই সিদ্ধান্তে এসেছিল যে, এই বিচ্ছেদ তো সাময়িক। ছুটিতে এবং নানা উপলক্ষে তাদের দেখা তো হবেই। রঞ্জন হোস্টেলে থাকবে, সেখানে সুযোগ সুবিধামতো চিঠি পাঠাবে শিউলি এবং শিউলিকেও বন্ধুদের মাধ্যমে চিঠি দিয়ে যোগাযোগ রাখবে রঞ্জন। ছুটিতে বাড়ি এলে তো দেখা হবেই দু'জনের। তাদের তখন অপরিণত বয়স, বাস্তববোধেরও অনেক অভাব এবং মনের মধ্যে শুধুই আবেগ আর ভালোবাসার জোয়ার। এই অবস্থায় তাদের সেদিন উপলব্ধিতেও আসেনি যে, অলক্ষ্যে তাদের ভালোবাসার মিনারে ভাঙন শুরু হয়েছে, বেজে চলেছে চিরস্থায়ী এক বিষাদের সুর। সেদিন বিকেলের সেই মুহূর্তের সাক্ষাৎই রচনা করতে চলেছে দীর্ঘ দুঃসহ বিচ্ছেদ গাথা। শিউলি একটি উইনসাং পেন ও একটি হাল্কা গোলাপি রুমাল উপহার দেয় রঞ্জনকে, রুমালের এককোণে ছুঁচসুতো দিয়ে লেখা - 'মরমর রঞ্জুলৈ' (ভালোবাসার রঞ্জুকে), পাশে লাল গোলাপ। নাইন-টেনে কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস-এ সেলাই ছিল শিউলির সাবজেক্ট। রুমালটা হাতে নিয়ে রঞ্জন টের পেল এই বিষয়টি ভালোই রপ্ত করেছে শিউলি।

আর রঞ্জন একটি বাঁধানো খাতা, কলম ও বিদ্যাসাগর অনূদিত 'শকুন্তলা' বইয়ে নাম লিখে শিউলির হাতে দেয়। শিউলি পরম যত্নে সেই বই, খাতা ও কলমটি নিয়ে দু'হাত দিয়ে বুকের কাছে ধরে রাখে। তখন শিউলির অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রঞ্জনের অনুভব হলো তাকেই যেন জড়িয়ে আছে, কিছুতেই চোখের আড়াল করতে রাজি নয়।...

এসব ভাবনার ডানায় ভর করে রঞ্জন তখন ভেসে বেড়াচ্ছে দূর অতীতে। হঠাৎ শিউলির ফোনটা বেজে উঠলো এবং রঞ্জনের ভাবনার সুরও অকস্মাৎ কেটে গেল। শিউলি মৃদুস্বরে বললো, "হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার ডাক্তারকে দেখানো হয়ে গেছে। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি।" এই কথাগুলি অসমিয়াতেই বললো শিউলি। ফোনটা ব্যাগে রেখে শিউলি বলে, "আমার সেন্টার থেকে ফোন এসেছিল।"

তাদের আলাপচারিতায় উঠে আসে তাদের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা পর্বের জীবনপরিক্রমা। রঞ্জনের হঠাৎ মনে পড়ে গেল আজ বিকেলে লেখক শিল্পী সংঘের দপ্তরে আসন্ন নির্বাচনের প্রচার সংক্রান্ত সভা, সেখানে না গেলেই নয়। এদিকে শিউলিও কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যাবে, কিন্তু তার যে অনেক কথা বলা বাকি, অনেক কিছু শোনা বাকি রয়ে গেল! কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না! একটু ভেবে হঠাৎ করে বলে উঠলো, "তুমি কি কাল একবার দেখা করতে পারবে রঞ্জনা?"

"তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে আমার সব কিছু যে এলোমেলো হয়ে গেল রঞ্জু! আমি এরপর কী করে অন্যকাজে মন দেব ভেবে উঠতে পারছি না।" প্রবল হাওয়ার প্রকোপে লতানো ফুলগাছ যেমন এলিয়ে পড়ে, তেমনই লাগছে শিউলিকে। এক মুহূর্ত থেমে সে বললো, "আগামীকাল সকালে আমার সেন্টারে বর্ষবরণ ও রঙালি বিহুর অনুষ্ঠান। শেষ হতে হতে বেলা দু'টো হয়ে যাবে। আমি সাড়ে তিনটা-চারটার আগে যে আসতে পারব না। এব্যাপারেই সেন্টার থেকে কিছুক্ষণ আগে ফোন এসেছিল।"

রঞ্জনের খেয়ালই ছিল না যে আগামীকাল পয়লা বৈশাখ। অনেক দিন থেকেই এসব আর তার মনে কোনো রেখাপাত করে না। মনে পড়লো কলেজ স্ট্রিটে 'কথাপ্রকাশ' বই বিপণিতে বিকেলে ঘরোয়াভাবে নববর্ষের আসর, সেখান থেকে যাবার জন্য বেশ কয়েকবারই বলেছে। সেখানে শিউলিকে নিয়ে গেলে কেমন হয়, তাহলে দিনটি ভালোভাবে উদ্‌যাপন হবে। সেই ভাবনাকে সামনে রেখেই রঞ্জন বললো, "তুমি চারটা নাগাদ কলেজ স্ট্রিট মোড়ে আসতে পারবে?"

"কেন পারব না, ওখানে তো যাই মাঝেমধ্যে। কফি হাউসেও গেছি কয়েকবার।" চটজলদি উত্তর এলো শিউলির কাছ থেকে।

শুনে রঞ্জন বললো, "তা বেশ তো, আমি তাহলে ওই সময়ে কলেজ স্ট্রিট মোড়ে অপেক্ষা করব।"

এবারে তাদের বিদায় নেবার পালা। দু'জনের মনের মধ্যেই তখন একদিকে বহুদিনের লালিত স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার উচ্ছ্বাস এবং দীর্ঘদিন পর অদ্ভুত ভালোলাগার মুহূর্ত যাপন, আবার অন্যদিকে এই বিশেষ মুহূর্তকে বিদায় জানানোর বিষণ্ণতা। এমনই এক বিচিত্র সন্ধিক্ষণে তারা দাঁড়িয়ে। শিউলিকে যেতে হবে করুণাময়ীর কাছে তাদের সেন্টারে। সেখানেই দোতলায় তার আবাস। ঠিক হলো রঞ্জন শিউলিকে তাদের সেন্টারে নামিয়ে দিয়ে করুণাময়ী মেট্রোতে ধর্মতলা চলে যাবে। তারা দু'জনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, রঞ্জনের বারণ সত্ত্বেও শিউলিই রেস্টুরেন্টের বিল দেয়। বেরিয়েই একটা ফাঁকা ট্যাক্সি পেয়ে যায় তারা। ট্যাক্সি চলতে থাকে, কিন্তু কারও মুখেই কোনো কথা নেই। নেমে যাবার সময় রঞ্জন শিউলিকে বলে, "তোমার ডাক্তারের অ্যাডভাইস মনে আছে তো? সেই মতো ফলো করো কিন্তু। কাল দেখা হচ্ছে, আসছি।" শিউলি রঞ্জনের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো এবং ট্যাক্সিটা দূরে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো।

(তিন)

সকালে ডাক্তারের কাছে যাবার সময় যে রঞ্জন ছিল, রাতে বাড়ি ফেরার পর যেন সেই রঞ্জন পালটে গেছে। শ্যামবাজারে তার দু' কামরার ভাড়া ফ্ল্যাট। কাজের মাসি সকালে এসে রান্না ও ঘরের কাজ করে দিয়ে যায়। প্রয়োজনে রান্না নিজেও করে নেয় রঞ্জন। ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো চেয়ারে। সামনের টেবিলে কয়েকটি বই, একটির পাতা খোলা, ট্যাব, প্যাড, কলম ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস। গতকাল রাতে একটা লেখা শুরু করছিল, দু'একদিনের মধ্যে সেটা কমপ্লিট করে পাঠাতে হবে। কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তার উদাস মন পাড়ি দিয়েছে অন্য এক জগতে। স্কুলের ফেলে আসা দিনগুলির নানা ঘটনা ছবির মন্তাজের মতো মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। কিছুক্ষণ এভাবে বসে থাকার পর রঞ্জন বাইরের জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে আসে, মোবাইল ফোন তুলে নেয় হাতে। শিউলির নম্বরটা সেভ করে, নামের জায়গায় 'শিউলি' বা 'রঞ্জনা' নয়, লেখে 'মায়াবিনী'। ভাবতে থাকে এখন কি একবার রিং করবে? ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ন'টা পেরিয়ে গেছে। আলমারি থেকে একটা লাল ডায়েরি বার করে রঞ্জন, তাতে প্রথম পাতায় তারই লেখা একটি কবিতা 'প্রথম প্রেম'। প্রায় পঁচিশ বছর আগে সে লিখেছিল –
"অনাবিল স্রোতের মতো 
একবুক ভালোবাসা আর 
তরঙ্গায়িত স্বপ্নের ঢেউ দিয়ে গড়া 
আমার প্রথম প্রেম এনেছিল
বসন্ত সৌরভ।

নতুন দিগন্তের প্রসন্ন আবেশ আর 
উচ্ছল আনন্দের নিবিড়তা দিয়ে 
আমার প্রথম প্রেম গড়েছিল 
সৃষ্টির অনন্ত গৌরব।

সজল বর্ষার বিদীর্ণ আকাশ আর
দাবানলে দগ্ধ অরণ্যের যন্ত্রণা নিয়ে 
আমার প্রথম প্রেম সূচনা করেছিল
ভালোবাসার জীবন্ত উৎসব।"

খাতার পাতা থেকে ছবি তুলে পাঠিয়ে দেয় শিউলির ফোনে। প্রথম দিন শিউলিকে দেখার কথা মনে পড়ে। তখন ক্লাস এইট, প্রথম পিরিয়ডে রোল কল করছেন কান্তিবাবু, কান্তিভূষণ পোদ্দার। একেবারে শেষে বিয়াল্লিশ নম্বরে এসে তিনি উচ্চারণ করলেন - "শিউলি রহমান"... মেয়েদের দিকের তৃতীয় সারির বেঞ্চের কোণে বসা একটি মেয়ে সাড়া দিল - "উপস্থিত ছার"। কান্তিবাবু তার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, "তোমাকে তো আগে দেখিনি মা, তুমি কি নতুন ভরতি হয়েছো?" কান্তিবাবুর প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি বলে, "হয় ছার, মই কেইদিনমান আগতে ভরতি হৈছোঁ।" মেয়েটির মুখে অসমিয়া কথা শুনে সকলেই অবাক। কান্তিবাবুর সঙ্গে তার স্বল্প সময়ের আলাপচারিতায় ক্লাসের সকলেই জানলো শিউলির বাবা পিডব্লিউডি'র ইঞ্জিনিয়ার, কিছুদিন আগেই বদলি হয়ে এসেছেন, শিউলি টিসি নিয়ে এসে কিছুদিন আগে এই স্কুলে ভরতি হয়েছে। কথায় কথায় সে জানালো, নিচু ক্লাসে অসমিয়া মাধ্যমে পড়াশোনা করলেও আগের জায়গায় ক্লাস এইটে তার বাংলা মিডিয়ামই ছিল। রঞ্জন ক্লাসের ফার্স্টবয়, আবার ক্যাপ্টেন। সব শুনে কান্তিবাবু রঞ্জনকে বললেন, "তুমি একটু ওকে সাহায্য করবে, দেখো ওর যেন কোনো অসুবিধা না হয়।" রঞ্জন কান্তিবাবুর কথায় উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "ঠিক আছে স্যার।" তারপর কান্তিবাবু শিউলির দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোমার যদি কোনো অসুবিধা হয় আমাকে বলবে কেমন।" সেদিন ছুটির পর শিউলি সঙ্গীতা ও অনুরাধার সঙ্গে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে মাঠে অপেক্ষা করছিল। রঞ্জন ক্লাস থেকে বেরোতেই অনুরাধা রঞ্জনকে ডাকে। রঞ্জন তাদের সামনে গেলে সঙ্গীতা বলে, "রঞ্জন, শিউলি তোর সাথে কথা বলবে, তোরা কথা বল আমরা আসি। আসি রে শিউলি কাল দেখা হবে।" শিউলি মাথা নাড়ে। ওরা চলে যায়।

শিউলিই প্রথমে কথা শুরু করে, বলে, "রঞ্জন, তুমি আমাকে একটু হেল্প করবে তো? কী কী পড়া হয়েছে তার নোটসগুলো একটু আমাকে দেবে?"

"নিশ্চয় দেবো" - উত্তর দেয় রঞ্জন। শিউলি আবার বলে, "আমি বাংলা প্রায় সবই বুঝতে পারি, কিন্তু বলতে অসুবিধা হয়।"

রঞ্জন উত্তরে বলে, "তাতে কোনো অসুবিধা হবে না, এখানে থাকতে থাকতে সব শিখে যাবে। তোমার বইপত্র সব আছে তো?"

"হ্যাঁ, আছে আগেই তো কেনা ছিল, যদি দু'একটা কিনতে হয় মা'কে বলব।" শিউলি অসমিয়াতেই বলছিল কথাগুলি। বলতে বলতে তারা স্কুলের গেটের কাছে চলে আসে। রঞ্জনের বন্ধুরা অপেক্ষা করছিল, তাদের ছিল ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাবার তাড়া। রঞ্জন বলে, "তাহলে তুমি বাড়ি যাও। কাল কথা হবে।"

ক্লাসের সহপাঠীরা একে অপরকে 'তুই' বলে সম্বোধন করাটা স্বাভাবিক হলেও শিউলি ও রঞ্জন শুরুর দিন থেকেই পরস্পরকে 'তুমি' বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। এই 'তুমি' নিয়েই বন্ধুদের কত ঠাট্টা-মশকরা! এই 'তুমি' থেকেই ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক মোড় নেয় গভীরতার দিকে।

পরদিন স্কুলে এসেই শিউলি রঞ্জনকে ডেকে বলে, "আমি কাল বাড়িতে গিয়ে মা'কে তোমার কথা বলেছি, তুমি আজকালের মধ্যে ছুটির পর একবার যেতে পারবে আমাদের কোয়ার্টারে? মা বলেছে তোমাকে নিয়ে যেতে।"

– "ঠিক আছে, আজকেই যাব তাহলে" বলে নিজের সিটে গিয়ে বসে রঞ্জন।

স্কুলের উত্তর দিকে রঞ্জনদের বাড়ি, আর দক্ষিণে স্কুলের পিছনের রাস্তা দিয়ে গেলে শিউলিদের কোয়ার্টার। তবে স্কুল থেকে দু'জনের বাড়ির দূরত্বই প্রায় সমান। অনেকদিন এদিকে আসা হয়নি রঞ্জনের। শিউলি রঞ্জনকে তাদের কোয়ার্টারে নিয়ে যায়। বারান্দা থাকা একতলা ছোট্ট বাংলোবাড়ির মতো কোয়ার্টার। বারান্দার দু'পাশটা ছেয়ে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ মাধবীলতায়। বারান্দার তিন দিকে এবং সামনের সরু লনে টবে নানা ফুল। বারান্দায় দুটো বেতের চেয়ার ও টেবিল পাতা। শিউলি রঞ্জনকে ড্রইং রুমে বসিয়ে ভেতরে যায় মা'কে ডাকতে। ড্রইংরুমটাও বেশ সাজানো গোছানো। একটা কাঠের শোকেস বিভিন্ন শো পিসে ভরতি, নিচের তাকে কিছু বইপত্র। শোকেসের ওপরে অসমের শরাই, তাতে একটা অসমিয়া গামছা ঝোলানো, পাশে একটা ফুলদানি। দু'দিকের দেয়ালে দুটো জাপি। একটু বাদেই আসেন শিউলির মা, পিছনে শিউলি। তাকে দেখেই রঞ্জন সোফা থেকে উঠে এগিয়ে যায় প্রণাম করতে, তিনি নিরস্ত করেন, পাশের সোফায় বসে বলেন, "আমি শিউলির কাছে শুনেছি তোমার কথা, তুমি তো ভালো ছাত্র, আমার মেয়েকে একটু দেখিয়ে দেবে তো বাবা।" রঞ্জন সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। একটু থেমে তিনি আবার বলে ওঠেন, "তোমাদের নিশ্চয় পড়া অনেকটা এগিয়ে গেছে তাইনা?"

"না, কাকিমা খুব একটা নয়, যতটা এগিয়েছে তা বাড়িতে পড়াশোনা করে মেকআপ করে নিতে পারবে, তাছাড়া আমার কাছে যে নোটসগুলো আছে আমি দিয়ে দেব।"

শুনে শিউলির মা বলেন, "খুব ভালো হয়, তোমার কথা শুনে আমি একটু নিশ্চিত হ'লাম।" শিউলি একটি প্লেটে রঞ্জনের জন্য মিষ্টি, কেক ও চানাচুর নিয়ে এসে টি টেবিলে রাখে। পিছনে জলের গ্লাস নিয়ে ঢোকে ছোটো ভাই। শিউলির মা ওকে দেখিয়ে বলেন, "আমার ছোটো ছেলে রিন্টি।" শিউলি পাশ থেকে বলে, "ওর ভালো নাম আয়ান, ক্লাস ফাইভে পড়ে।" একটু সময় থেকেই উধাও হয়ে যায় রিন্টি। রঞ্জনকে নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখে শিউলি'র মা বললেন, "খাও রঞ্জন, কেকটা বাড়িতে তৈরি, শিউলিই বানিয়েছে।" কিছুটা সংকোচ যেন ছেয়ে আছে রঞ্জনকে। শিউলি প্লেটটা রঞ্জনের হাতে তুলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, "তুমি চা খাবে তো?"

রঞ্জন খেতে খেতে উত্তর দেয়, "না"। সে শিউলির মা'কে দেখে যাচ্ছে, বেশ পরিপাটি বেশভূষায় কিছুটা গাম্ভীর্যপূর্ণ সম্ভ্রম জাগানো চেহারা। পরে শিউলির কাছ থেকে জেনেছে তার মা'র নাম ইশরাত রহমান। তাঁরও কথায় উচ্চারণে অসমিয়া টান। তিনি কথায় কথায় জানালেন, এখানে আসার আগে তারা ছিলেন শিলচরে। সেখানেই শিউলিকে তিনি বাংলা মিডিয়ামে ভরতি করান। তার উদ্দেশ্য অসমিয়ার পাশাপাশি বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে কিছুটা হলেও মেয়েকে পরিচয় করানো। মেয়েকে গান শেখাচ্ছেন, শিলচরে গানের স্কুলে কয়েকটি রবীন্দ্র সংগীতও শিখেছে তার মেয়ে। ছেলেকে অবশ্য তিনি অসমিয়া স্কুলে ভরতি করিয়েছেন। বেরিয়ে আসার মুখে রঞ্জনকে তিনি বললেন শিউলির জন্য একজন প্রাইভেট টিউটর ও একজন গানের টিচারের সন্ধান করে দিতে। সেইমতো শিউলির প্রাইভেট টিউটর হিসেবে স্কুলের শিক্ষক প্রণয় ঘোষ দস্তিদার এবং এলাকার সুপরিচিত সংগীত শিল্পী দীপশিখা ভৌমিকের কাছে গান শেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল রঞ্জন।

এমনই সব পুরোনো স্মৃতির দরিয়ায় সাঁতার কেটে চলেছে রঞ্জন। কিছুতেই যেন কূলের সন্ধান মিলছে না। আশ্বিন মাসে জন্ম শিউলির, তাই তার মা'র ইচ্ছেয় নাম রাখা হয়েছে শিউলি। তার নাম শিউলি, তাদের কোয়ার্টারের সামনে ছিল মাধবীলতার সমারোহ আর জুঁই ফুল ছিল ওর ভীষণ প্রিয়। তাই পরবর্তীকালে এই তিন ফুল নজরে এলেই শিউলির স্মৃতি রঞ্জনকে আবিষ্ট করেছে।

সে একবার ভাবছে শিউলিকে ফোন করবে, আবার ডুবে যাচ্ছে ভাবনার অতলে। এমনই একটা মুহূর্তে হঠাৎ করেই রঞ্জনের ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে নাম ভেসে ওঠে 'মায়াবিনী'।

– "কী করছো রঞ্জু? আমি এতক্ষণ যে তোমার ফোনের অপেক্ষা করছিলাম।"

ফোনে কথাগুলো শুনে রঞ্জনের একঝলক মনে হলো শিউলিও কি তাহলে তার মতোই পুরোনো স্মৃতিতে ডুবে আছে!

সে উত্তরে বলে, "আমি কিছুই করছিনা, বসে বসে শুধু পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে চলেছি। এত বছর পর তোমার সঙ্গে এভাবে দেখা হওয়াটা আমার স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে রঞ্জনা।"

শিউলি বলে, "তোমার কবিতাটা পড়লাম, আমাদের সম্পর্ককে তুমি এভাবে বাঁচিয়ে রেখেছো রঞ্জু! খুব ভালো লাগলো। পড়তে পড়তে আমার ভেতরটা যেন কেমন করছিল, আমি আজ নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখলাম হৃদয়ের সম্পর্ক, ভালোবাসা আসলে কী!"

রঞ্জন বলে, "ওই কবিতায় আমি শুধু আমার অনুভবটাই ব্যক্ত করেছি, কোনো আরোপিত কথা কিন্তু বলিনি। আমি যা লিখেছি, আমার কাছে ভালোবাসার মানেও তাই।" একটু থেমে রঞ্জন জিজ্ঞাসা করে, "তোমার পায়ের অবস্থা কী? ডাক্তার যা যা বলেছিলেন সেসব করেছো তো?"

– "হ্যাঁ, করেছি, এখন ব্যথাটা নেই বললেই চলে, হাঁটতেও খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না।"

– "যাক, শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। তুমি কিন্তু কাল ক্রেপ ব্যান্ডেজটা বেঁধে রেখো, আগামীকাল তোমাদের অনুষ্ঠান, সেজন্য নিশ্চয় তোমার অনেক হাঁটাহাঁটি হবে।"

রঞ্জনের কথাগুলো চুপচাপ শুনে যায় শিউলি, ভাবতে থাকে বাবা মা ভাই ছাড়াও তাকে নিয়ে ভাবার কেউ আছে তাহলে, সে বলে, "হ্যাঁ, তাই করব।" একটু থেমে সে আবার বলে, "জানো রঞ্জু, এত বছর ধরে মনের মধ্যে তোমাকে বসিয়ে পথ চলেছি, কোনোদিন ভাবিনি যে দেখা হবে। তাই আজকের দিনটা আমাদের কাছে একটা স্মরণীয় দিন, তাইনা।"

– "তা তো অবশ্যই। এখন মনে হচ্ছে আজকের মুহূর্তগুলো যেন দ্রুতই চলে গেল। তবুও আজকের মুহূর্তগুলো আমার জীবনের অমূল্য প্রাপ্তি।" কথাগুলো বলে রঞ্জন একটু থামে।

শিউলি জিজ্ঞাসা করে, "তোমার রাতের খাওয়া হয়ে গেছে? এখন তাহলে কী করবে তুমি?"

– "আজ রাতে খাবো কিনা ঠিক নেই। ঘুমও সম্ভবত আসবেনা, পুরোনো স্মৃতিগুলো ভীষণ নাড়া দিয়ে যাচ্ছে আমাকে। তাই মনে হচ্ছে সেই স্মৃতি-যাপন করতে করতেই রাত পার হয়ে যাবে।"

– "সে কি! কিছু না খেয়ে রাত জেগে কাটাবে! শরীর খারাপ হবে যে! তোমার সেই আগের পাগলামো দেখছি এখনো যায়নি। যাও কিছু একটা খেয়ে নাও।"

– "আচ্ছা দেখছি। তুমি ঘুমোতে যাও, না হলে আমি কিন্তু কথা বলতেই থাকব, আমার কথা শেষ হবেনা, তোমারও ঘুম হবেনা। সকালে কিন্তু তোমাদের অনুষ্ঠান।"

– "আমার একটু কাজ সারা বাকি আছে, তারপর শুতে যাব। কাল আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হলে আমি তোমাকে একবার ফোন করে নেব। আশা করছি চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যে কলেজ স্ট্রিট চলে যেতে পারব। এখন তাহলে রাখছি। তুমি কিন্তু কিছু খেয়ে নিও, আর রাত জেগো না কেমন।" কথা থামিয়ে দেয় শিউলি, ফোনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

শিউলির কথাগুলো শুনতে শুনতে অনুভব করলো অনেকদিন তাকে এভাবে কেউ বলেনি, ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়েছে রঞ্জন। স্কুলের ফেলে আসা সোনালি দিনগুলো তার মনের আঙিনায় একে একে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দিকে রঞ্জনের কাছে ক্লাসের অন্য মেয়েদের মতোই ছিল শিউলি। মাঝে মাঝে পড়া দেখিয়ে দেওয়া, নোটসের খাতা দিয়ে সাহায্য করা ছাড়া এর বাইরে আলাদা কোনো অনুভূতি ছিলনা রঞ্জনের। শিউলিরও তাই। এইট থেকে নাইনে ওঠার পর পড়াশোনার বাইরে স্কুলের রবীন্দ্র জয়ন্তী, অ্যানুয়াল স্পোর্টস, তেইশে জানুয়ারি-পনেরোই আগস্টের প্রভাত ফেরি, স্কুলের সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। শিউলি খুব একটা সুন্দরী নয়, ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী ছিল সংগীতা, একেবারে দেবীপ্রতিমার মতো। এছাড়া সুন্দরীদের তালিকায় ছিল অনুরাধা, সোমা আরও দু'একজন। শিউলিকে ঠিক তাদের তালিকায় ফেলা যাবেনা। তার গায়ের রং ছিল চাপা, তবে চেহারার মধ্যে ছিল এক উজ্জ্বল শ্যামলিমা আর ছিল কোমল চোখে সজীবতার দীপ্তি, বুদ্ধির শান্ত ঝিলিক। তার সঙ্গে ছিল একধরনের প্রাণোচ্ছলতা এবং দ্রুত সবার সঙ্গে মেশার ক্ষমতা। স্বাভাবিক দক্ষতা ছিল গান, নাটক ও খেলাধুলাতেও। এসবের মধ্য দিয়ে শিক্ষকমহলে ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেশ পরিচিতি তৈরি হয় তার। আর এসব কারণেই শিউলির প্রতি রঞ্জনের একধরনের আকর্ষণবোধ তৈরি হয়। এটাই ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় একরকমের ভালোলাগায়, তবে তাকে কোনোভাবেই প্রেম বলা যাবেনা, প্রথম দিকে এটা তখন ছিল অনেকটা ইংরেজির ইনফেচুয়েশনের মতো। পড়া দেখিয়ে দেওয়া, বিভিন্ন বিষয়ে নোট তৈরি করে দেওয়া তো ছিলই, এছাড়া স্কুলের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে গান বেছে দেওয়া, নাটকের পার্ট লিখে দেওয়া, এমনকী অ্যানুয়াল স্পোর্টসে কোন ইভেন্টে অংশ নেবে সবকিছুতেই রঞ্জনের মতামত চাইত শিউলি। এসব করতে ভালোই লাগত রঞ্জনের। এভাবেই চলছিল দিনগুলি। পরিবর্তন দেখা দিতে লাগলো ক্লাস নাইনের শেষের দিকে। রঞ্জন অনুভব করলো শিউলি যেন আজকাল একটু বেশিই মনোযোগ দিচ্ছে তার প্রতি। সবার আগে স্কুলে এসে বেঞ্চে বইপত্র রেখে বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা, রঞ্জন ক্লাসে আসার পর নানা ছুতোয় একটু কথা বলার চেষ্টা, ক্লাস চলাকালীন ঘনঘন রঞ্জনের দিকে তাকানো, হঠাৎ কোনোদিন স্কুলে যেতে না পারলে রঞ্জনের কাছের বন্ধু বিভাস, শানু, ত্রিদিবদের কাছে বার বার জানতে চাওয়া, স্কুল ছুটির পর রঞ্জন একটু দেখা না দিয়ে বা কথা না বলে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে গেলে পরদিন অভিমানে মুখভার করে থাকা এসব ছেলেমানুষি দিনদিন বাড়ছিল শিউলির। একদিন সোমা রঞ্জনের কাছ থেকে সমাজবিদ্যার নোট খাতাটা নিয়েছিল। ক্লাসে হঠাৎ শিউলির চোখ পড়ে রঞ্জনের খাতা সোমার বইপত্রের মধ্যে। এটা কেন শিউলি জানলো না তা নিয়ে দু'দিন কথা বন্ধ। রঞ্জনের প্রতি একধরনের প্রচ্ছন্ন অধিকারবোধ যেন তৈরি হয়েছিল শিউলির মনে। রঞ্জনও ক্রমশ যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল শিউলির প্রতি। এভাবেই চলতে চলতে রঞ্জন একদিন আবিষ্কার করলো শিউলির ফেরত দেওয়া ইংরেজি নোটসের খাতায় একটি অসমিয়াতে লেখা চিরকুট - 'রঞ্জু, তুমি মাথোঁ মোর' (রঞ্জু, তুমি শুধু আমার)... এরপর থেকে তাদের মনের তরঙ্গ বয়ে যেতে লাগলো প্রবল বেগে। এটা তখন আর ইনফেচুয়েশনে দাঁড়িয়ে রইলো না, তা রূপান্তরিত হলো নিবিড় ভালোবাসায়। রঞ্জন খেয়াল করলো শিউলি তাকে সম্বোধন করেছে 'রঞ্জু' বলে, এতে একটা আত্মিক অনুভূতি তৈরি হলো তার। এরপর থেকে শিউলির কাছে রঞ্জন হয়ে গেল 'রঞ্জু'। আর রঞ্জন একদিন আবেগতাড়িত হয়ে শিউলিকে ডেকে বসে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে 'রঞ্জনা', এই ডাক শুনে খুশিতে ঝলমল হয়েছিল শিউলির মুখ। তাতে রঞ্জনের কাছের বন্ধুরা মজা করার রসদ খুঁজে পায়, তারা কখনো কাগজে, ব্ল্যাক বোর্ডে অথবা বেঞ্চের গায়ে লিখে রাখে রঞ্জন+রঞ্জনা।

শিউলির ভাষা, ধর্ম যে আলাদা তা কখনো অবচেতন মনেও বিন্দুমাত্র রেখাপাত করেনি রঞ্জনের মনে। একই ক্লাসে ছিল নাহিদ আফরোজ ও রফিকুল ইসলাম এবং ছিল পবন, মিলাপ, জগদীশ, অশোকের মতো মাড়োয়ারি সহপাঠীরাও। ক্লাসের কারও মনেই এসব নিয়ে সামান্যতম ভিন্ন অনুভূতি বা বিচ্ছিন্নবোধ তৈরি হয়নি কখনো। সবাই মিলে একসঙ্গে সব আনন্দানুষ্ঠানে মেতে ওঠাটাই ছিল রেওয়াজ। ইদের সময় প্রতিবারই ক্লাসের বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে রঞ্জন সেমাই খেতে যেত শিউলিদের কোয়ার্টারে, আবার পুজোয়-অনুষ্ঠানে শিউলিও যেত বন্ধুদের বাড়িতে। ইদের মতো পুজোর সময়ও শিউলির মা নতুন জামাকাপড় কিনে দিতেন ছেলে মেয়েকে।

রঞ্জনের স্মৃতিতে ভেসে আসে – ক্লাস টেন, সরস্বতী পুজোর সকাল, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, আগের দিন রাত জেগে রঞ্জন সহপাঠী বন্ধুদের সাথে মিলে ডেকোরেশন করেছে, প্রতিমা বসানো হয়ে গেছে, চলছে শেষ মুহূর্তের সাজানোর কাজ। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রছাত্রীদের আগমনে উৎসবমুখর হয়ে উঠবে স্কুল প্রাঙ্গণ। পুজোর আয়োজনের জন্য উঁচু ক্লাসের মেয়েরা আসতে শুরু করেছে। হঠাৎ রঞ্জনের চোখে পড়লো স্কুলের গেট দিয়ে প্রবেশ করছে শিউলি, পরনে লালপাড় সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ, কপালে লাল টিপ, পিঠ ছাপানো খোলা চুল, গায়ে মুগার চাদর। হালকা কুয়াশা আবৃত ভোরে শিউলিকে দেখে রঞ্জনের মনে হচ্ছিল স্বয়ং সরস্বতী বুঝি শিউলি-রূপে উদয় হয়েছে তার সামনে। সেদিনের মতো এমন মনোরম ভোর আর আসেনি রঞ্জনের জীবনে।

স্কুলের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে মেয়েরা অভিনয় করবে 'নটীর পূজা'। রাজমহিষী লোকেশ্বরীর সহচরী মল্লিকার চরিত্রে শিউলি। মল্লিকার পার্ট লিখে দিয়েছিল রঞ্জন। এখনো রঞ্জনের মনে আছে মল্লিকার সাজ – অফহোয়াইট গেরুয়া পাড় শাড়ি নাচের উপযোগী করে পরা, লাল রংয়ের ব্লাউজ, কোমরে সবুজ ও কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত আড়াআড়ি ভাবে বাঁধা ধূসর নীল রংয়ের উত্তরীয়, সরু কানের দুল ও হার, হাতে চুড়ি, ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক, খোপায় জুঁই ফুলের মালা – সেই জুঁইফুল বাড়ি থেকে এনে দিয়েছিল রঞ্জনই। সেদিন এক অপূর্ব মার্জিত রূপ ফুটে উঠেছিল শিউলির সাজে। উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে শিউলির মল্লিকা হয়ে ওঠার অনন্য মুহূর্তগুলিতে বিভোর হয়ে গিয়েছিল রঞ্জন। স্কুলে থাকতে থাকতে শিউলি বাংলা বলাটা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করে নিয়েছিল। নাটকের সংলাপ বলা বা রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের সময় মনেই হতো না যে ওর মাতৃভাষা অসমিয়া। স্কুলের শেষ বছরই রবীন্দ্র জয়ন্তীতে শিউলি গেয়েছিল – 'আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে –/ তুমি জানো না, আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে'... রঞ্জনের মনে হচ্ছিল যেন তাকে উদ্দেশ্য করেই গাইছে শিউলি।

পরবর্তীকালে অনেকবারই রঞ্জনের মনে হয়েছে 'রক্তকরবী'র নন্দিনীর মতো শিউলিও তাকে উদ্দেশ্য করে একদিন বলে উঠবে, "আমার রঞ্জনের ভালোবাসার রঙ রাঙা, সেই রঙ গলায় পরেছি, হাতে পরেছি।"

এসব ভাবতে ভাবতে খেয়াল হলো রাতে কিছুই খাওয়া হয়নি, সে এককাপ ব্ল্যাক কফি ও কয়েকটা ক্রিমক্র‍্যাকার বিস্কুট নিয়ে বসে। চোখে পড়লো ঘড়ির কাঁটা দেড়টা পেরিয়ে গেছে, শিউলি নিশ্চয় এখন ঘুমের দেশে, আবার কবিতার ডায়েরিটা খুলে বসে সে। বেশ কয়েক বছর আগে লেখা একটি কবিতায় চোখ পড়ে – 'ভালোবাসার জন্য' কবিতায় সে লিখেছিল –
"আমার নিস্পন্দ জীবনের বাঁকে বাঁকে 
খুঁজেছি ভালোবাসার মুখ
পথের ধুলায় ধূসর হয়েছে 
ঈপ্সিত স্বপ্ন-সুখ।

আমার বসন্ত বিলীন হয়েছে 
অকাল শ্রাবণ ঝরে
বারে বারে আমি ঠিকানা হারিয়েছি 
প্রলয় রুদ্র ঝড়ে।

আমার কবিতা বিদায় নিয়েছে 
প্রেমহীন শব্দের অভিঘাতে 
তবুও ভালোবাসার জন্য প্রতীক্ষা আমার 
এক সমুদ্র অভিমানে।
"

রঞ্জন এই কবিতা লেখা পাতাটিরও ছবি তোলে, আবারও পাঠিয়ে দেয় শিউলিকে। নানা ভাবনার জাল বুনতে বুনতে তার মনের ক্যানভাসে ফুটে ওঠে হৃদয় ভাঙা সেই মুহূর্তটির কথা। বাইরের কলেজে ভরতি হবার পর প্রায় দু'মাস কেটে গেছে। সামনে নানা উপলক্ষে চার-পাঁচ দিন ছুটি। রঞ্জনের মনে অপার আনন্দ, সে বাড়ি আসবে এবং তার মনের মানুষের সঙ্গে দেখা হবে, কত কথা জমে আছে তার, শিউলিরও বোধহয় তাই। কিন্তু রঞ্জনের জন্য যে দুঃসহ আঘাত অপেক্ষা করছে তা ছিল কল্পনারও বাইরে। নির্দিষ্ট দিনে বাড়ি ফিরে দুঃসংবাদটি শোনে রঞ্জন – শিউলিরা এখান থেকে চলে গেছে, কিন্তু কোথায় গেছে কেউ জানে না! বাড়ির পাশের বন্ধু অমলেন্দুর কাছেই প্রথম খবরটি শোনে। শুনে হৃদস্পন্দন একরকম রুদ্ধ হবার জোগার রঞ্জনের। ছুটে যায় সংগীতাদের বাড়ি, দেখা হয় বিভাস ত্রিদিবদের সঙ্গে, কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারেনা। রঞ্জনের চারপাশে যেন অন্ধকার নেমে আসে। দু'দিন পর গানের স্কুলের এক ছাত্রীর কাছ থেকে খবর মেলে – শিউলি গানের দিদিমণির ক্লাসে এসে জানিয়ে গেছে, বাবা বদলি হয়েছে ডিব্রুগড়ে, তাই ওদের চলে যেতে হচ্ছে। শুনে রঞ্জনের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। ডিব্রুগড় যে বহুদূর অসমের আরেক প্রান্তে! শিউলির সন্ধান করা তো তার কাছে সমুদ্রের অতল থেকে মুক্তা খোঁজার মতো! এখন কী করবে সে! কোনো দিশাই যে নেই তার সামনে!

তারা অনেক সন্তর্পণে সাবধানী পা ফেলে চললেও ক্ষণিকের অসতর্কতা বিপদ ডেকে এনেছিল। শিউলির পড়ার টেবিল গোছাতে গিয়ে একদিন রঞ্জনের একটা চিঠি বইয়ের ভাঁজে আবিস্কার করেন মা। তখন টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে, ম্যাট্রিকের প্রস্তুতি চলছে। এই সময়ে শিউলিকে খুব বেশি বকাবকি না করে অল্প শাসানিতে সতর্ক করে দিয়েছিল মা। শিউলিকে দিয়ে বাড়িতে ডেকে এনে রঞ্জনকেও মৃদুস্বরে শুনিয়েছিলেন এই সতর্কবার্তা। ম্যাট্রিকের পরই নানা বিধিনিষেধ জারি হয় শিউলির ওপর। তার অবশ্য কারণও ছিল। বাড়ির কড়া নজরদারি এড়িয়ে একদিন বিকেলে নদীর পাড়ে গিয়ে কথা বলছিল তারা, এদিকে সাইকেল চালাতে গিয়ে তা নজরে পড়ে রিন্টির। সে বাড়ি ফিরে সাতপাঁচ না ভেবেই মা'র সামনে বলে ফেলে। তাতে যেন আগুনে ঘি পড়ে। তীব্র বকুনি সহ্য করতে হয় শিউলিকে। তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। সে সময়ে ছিল না মোবাইল ফোন। শিউলিদের বাড়িতে ল্যান্ডফোন থাকলেও তাতে ফোন করা ছিল রঞ্জনের কাছে নিতান্তই দুঃসাধ্য। রঞ্জনের সঙ্গে শিউলির যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। গানের ক্লাসে যাতায়াতেও চলে কড়া নজরদারি, মাঝে মাঝেই সঙ্গে থাকে মা। শিউলির পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ এবং বাবার সম্মান পদমর্যাদা – এসব নিয়েই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল তার মা। এই কড়া নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েও নানা ছুতোয় কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছে তারা। এভাবেই রঞ্জনের বাইরে পড়তে যাবার আগের দিন অনেক ঝুঁকি নিয়ে দেখা করতে এসেছিল শিউলি। রঞ্জন এবারে বুঝতে পারে শিউলির হঠাৎ করে এভাবে উধাও হয়ে যাবার রহস্য।

রঞ্জনের মনে পড়ে এরপর থেকেই তার জীবন পাল ছেঁড়া নৌকার মতো ভেসে যেতে থাকে উদ্দেশ্যহীন অজানার অভিমুখে। শিউলিকে এভাবে হারিয়ে ফেলার তীব্র অভিঘাত তার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে যেন একেবারে এলোমেলো করে দিয়েছিল। প্রবল মানসিক আঘাতে রঞ্জনের পড়াশোনা একপ্রকার বন্ধ। এমনই এক সন্ধিক্ষণে উদ্‌বিগ্ন ছাত্র নেতারা রঞ্জনের কাছে জানতে চায় তারমতো ভালো ছাত্র কেন পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে, তারা আবার পড়াশোনা শুরু করার পরামর্শ দিতে থাকে। তাদের প্রণোদনায় রঞ্জন ফেরে পড়াশোনার আবহে। শিউলিবিহীন তার স্মৃতির শহরে রঞ্জনের থাকাটা দুঃসহ মনে হয়। সে চলে আসে কলকাতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও ছাত্র আন্দোলনের প্রবাহে তার জীবন নির্দিষ্ট গতিপথে আবর্তিত হতে থাকে। তবুও নিভৃত মুহূর্তে শিউলির স্মৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শেষ হয়। এরপর ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা, এক প্রকাশনা সংস্থায় সম্পাদনার কাজ, কমিউনিস্ট পার্টি, সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট ও নিজের লেখালেখি – এসব নিয়ে তার ছোট্ট একান্ত জীবন চলতে থাকে আপন ছন্দে। এই চলার পথেই অকস্মাৎ রঞ্জনের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবের রূপে সামনে আসে, শিউলির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় অবিশ্বাস্যভাবে।

রঞ্জন শোনে শিউলির হারিয়ে যাবার কাহিনি। রঞ্জনের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হবার পর থেকেই বদলে যায় শিউলিদের বাড়ির পরিবেশ। মা-বাবার মুখ থমথমে, তাদের দুশ্চিন্তা অপরিণত বয়সে মেয়ের এই আবেগতাড়িত ভাবনা কোন বিপদ না ডেকে আনে! এছাড়া রয়েছে সামাজিক সম্মানের প্রশ্ন। এই অবস্থায় বাবা তানভীর রহমান নিজে থেকেই বদলির জন্য হেড অফিসে বিশেষভাবে তদ্বির করেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাঁর বদলির নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবার নিয়ে চলে যান গন্তব্যে। অবশ্য শিউলিকে গুয়াহাটিতে তার মাসির বাড়িতে রেখে কলেজে ভরতি করে দেওয়া হয়। শিউলি নতুন পরিবেশে পড়াশোনার বৃত্তে থাকলেও রঞ্জনের ভাবনা তার মন থেকে মুছে যায়নি, বরং গুমরে থাকা এই ভাবনা ক্রমান্বয়ে গাঢ় হয়েছে। কলেজ জীবন শেষ করে সে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স করে। পরবর্তীকালে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ প্রভাতরঞ্জন ভট্টাচার্যের কাছে 'বাংলা ও অসমিয়া সাহিত্যে সমন্বয়ী ভাবনা ও সম্প্রীতির প্রভাব' বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি সম্পন্ন করে। এর মধ্যে বিয়ের জন্য বাড়ির চাপ ও নানাদিকের প্রস্তাব ক্রমাগত আসতে শুরু করে, শিউলিও সেসব ধৈর্যের সঙ্গে নাকচ করে দিতে থাকে। এ নিয়ে মা-বাবার সঙ্গেও কিছুটা মতানৈক্য হয় তার। এদিকে পিএইচডি করার পর বাংলা ও অসমিয়া সাহিত্য সম্পর্কে আরও পড়াশোনা ও গবেষণার আগ্রহ তৈরি হয় তার। সেজন্য অসমের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপকদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা 'অসম-বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি গবেষণা পরিষদ' নামের অসরকারি প্রতিষ্ঠানে অন্যতম ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেয় এবং প্রতিনিয়ত অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ছেড়ে দিয়ে স্বতন্ত্র দায়িত্ব নিয়ে চলে আসে সল্টলেকের এই কেন্দ্রে। ভাই রিন্টি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, পোস্টিং বেঙ্গালুরুতে। বাবা এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে অবসর নেবার পর বাড়ি করে এখন মা'কে নিয়ে গুয়াহাটিতে।

* * * *

রেস্টুরেন্টে বসে আলাপচারিতায় রঞ্জন ও শিউলি দু'জনেরই উপলব্ধিতে আসে, তাদের সদ্য স্কুল পেরোনো বয়সে ওই রকম একটা পরিস্থিতিতে দু'জায়গার বিশাল দূরত্ব ঘুচিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখা কতটা দুঃসাধ্য ছিল। রঞ্জনের ভাবনার প্রবাহ চলতেই থাকে। মোবাইল ফোনে লক্ষ করে গভীর রাতেও রঞ্জনের পাঠানো কবিতাটি দেখেছে শিউলি। তবে কি তার মতো শিউলিও জেগে রয়েছে! রাতের আঁধার ফিকে হয়ে ভোরের রক্তিম আভা ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, পাখির কলরব ভোরের আগমনী বার্তা শোনাচ্ছে। আজ নববর্ষ – অনেকদিন পর রঞ্জনের জীবনে যেন বিশেষ বার্তা বয়ে এনেছে। তারই অনুষঙ্গে একটি কবিতার ভাবনা উঁকি দেয় রঞ্জনের মনে, সে লেখে –
"বিরহ বিষণ্ণতায় কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত
তবুও কিছু স্বপ্ন মেঘ হয়ে ভাসে মনের আকাশে 
প্রত্যাশার বীজ অঙ্কুরিত হয় কুয়াশাসিক্ত ভোরে
মাঘ-বৈশাখে সে আসবে মিছিলের পথ ধরে।

আমার হৃদয় ভেঙেছে অবিরত ভ্রান্ত পথের ভুলে
তবুও সাড়া দিই সেই মিছিলের মুখরিত কলতানে 
বর্ষা-আশ্বিন যায় শীত আসে পাতাঝরা বসন্তের নীরব বিলাপে
আমার দিনলিপি লেখা হয় বেদনার শিবরঞ্জনীতে।

এমনি করেই অকস্মাৎ মনের মালঞ্চে শিউলি ফোটে
আমার জীবনে নববর্ষ আসে আনন্দবসন্তসমাগমে।"

এই কবিতাটির সঙ্গে শিউলিকে লেখে – 
'নববর্ষে তোমার জীবন মুখরিত হোক আনন্দগানে।'

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রঞ্জনের ফোনে শিউলি লিখে পাঠায় –
'রঞ্জনর হৃদয় মোর মরমেরে সিক্ত হওক –
রঞ্জনলৈ বহাগ বিহুর শুভেচ্ছা।' 
(রঞ্জনের জীবন আমার ভালোবাসায় সিক্ত হোক/ রঞ্জনকে বহাগ বিহুর শুভেচ্ছা)

(চার)

আজ রঞ্জনের কাছে এক অন্যরকম সকাল। তার মনের আকাশে বিষণ্ণতার কোনো মেঘ জমে নেই, অন্যান্য দিনের মতো একঘেয়েমি আর নিরুৎসাহের রেশ নেই। তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে নতুন আশা, নতুন উদ্দীপনা। আজ বিশেষ দিনে শিউলির সঙ্গে তার দেখা হবে। কীভাবে দিনটি উদ্‌যাপন করবে তার নানা পরিকল্পনা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ কাজের মাসি ছুটি নিয়েছে। তাই দুপুরের খাবারের আয়োজন নিজেকেই করে নিতে হবে। এজন্য অবশ্য তার বাড়তি কোনো চাপ নেই, হোস্টেল জীবনেই এসব রপ্ত করে নিয়েছে রঞ্জন। মোবাইল ফোন চালিয়ে শুনছে 'আনন্দধারা বহিছে ভুবনে'... সময় এগিয়ে চলেছে আপন বেগে।

বেলা আড়াইটে, রঞ্জন বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ অনেকদিন পর প্রিয় পোশাক কাজকরা সাদা পাঞ্জাবি ও পাজামা পরেছে। কাউকে উপলক্ষ করে কি তার এই সাজ? হয়ত তাই, এমন অনুভূতি তো আগে কখনো হয়নি তার। বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরবর্তী জীবনে রাজনীতি ও সাহিত্যের অঙ্গনে অনেক নারীর সঙ্গেই তার পরিচয় হয়েছে, অনেকের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব ও সম্পৃক্ততা বেড়েছে, কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেও কারও সঙ্গেই তার হৃদয়ের সংলগ্নতা গাঢ় হয়নি। রঞ্জনই সংগোপনে নিজেকে এই পরিণতি থেকে দূরে রেখেছে, তার জীবন যে গড়ে উঠেছে এক বিশেষ ভাবনার আবর্তে।

আজ অনেকদিন পর বিশেষ কারও জন্য প্রতীক্ষায় মন উতলা হচ্ছে। এই বয়সে এসে সে কি স্কুল জীবনে ফিরে গেছে? তখন যেমন শিউলি একদিন স্কুলে না এলে মনটা কেমন করত! মনে হতো 'বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা'। আজ শিউলির কথা ভেবে তার অবিন্যস্ত জীবনে একটু সাজগোজের ভাবনা জেগেছে। এসব ভেবে নিজের মনেই হেসে যাচ্ছে রঞ্জন। পাজামা পাঞ্জাবির সঙ্গে শান্তিনিকেতনের সুতোর কাজকরা কাপড়ের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে সে রওনা দেয়। কলেজ স্ট্রিট পোঁছে সে শিউলির জন্য নিজের পছন্দের কিছু বই কেনে। প্রথমেই কেনে বিশ্বভারতী থেকে 'গীতবিতান', যা রঞ্জনের নিভৃত সময়ের সঙ্গী, হয়ত এটা শিউলির রয়েছে, তবুও নিজের অন্যতম ভালোলাগা বইটি আজকের দিনে উপহার দেবে মনের মানুষকে। এরপর সে এনবিএ থেকে কেনে তার দেখা অন্যতম বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসুর আত্মজীবনী 'যতদূর মনে পড়ে', ম্যাক্সিম গোর্কির 'মা', বরিস পলেভয় রচিত 'মানুষের মতো মানুষ' এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অনূদিত গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস 'বিপন্ন জাহাজের এক নাবিকের গল্প'। এই বইগুলো কেনার সময় রঞ্জনের মনে সদ্য প্রয়াত রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি জেগে উঠলো, তার স্মৃতি মাঝেমাঝেই যে উতলা করে তোলে। কয়েকদিন থেকেই অসময়ে হারানো জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী জুবিন গার্গের মতোই অনন্য প্রতিভাধর অভিনেতা, অনবদ্য লেখক ও সমাজশিল্পী রাহুলের জন্য যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হচ্ছে মন। তাই প্রিয় মানুষের জন্য রঞ্জন কিনলো অকাল প্রয়াত রাহুল অরুণোদয়ের বই 'কলকাতা ক্যাকোফোনি', 'কলোনি কল্লোলিনী', 'জলের বায়োস্কোপ', 'লেখাপত্তর' এবং 'সহজ কথা'।

বই কেনা শেষ হলে রঞ্জন এসে দাঁড়ায় কলেজ স্ট্রিট মোড়ে। ঘড়িতে তখন চারটে বাজতে দশ মিনিট। অনুষ্ঠান শেষে ফোন এসেছিল শিউলির, সে জানিয়েছে সময় মতোই চলে আসবে। রঞ্জন ইচ্ছে করেই তার আগে ফোন করেনি, প্রথমত শিউলি অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, আর দ্বিতীয়ত রঞ্জন তার যাবতীয় জিজ্ঞাসা, কৌতূহল সব জমিয়ে রাখতে চেয়েছে শিউলির আসার অপেক্ষায়।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না রঞ্জনকে। শিউলি যখন উবের থেকে নামলো তখন রঞ্জনের ঘড়িতে চারটে বাজতে পাঁচ। রঞ্জনের দৃষ্টি শিউলির দিকে। সে আজ মেখলায় সেজেছে। মুগা রঙের মেখলা জুড়ে লাল, খয়েরি ও গাঢ় নীল সুতোর কাজ, লাল ব্লাউজ, হালকা লিপস্টিক, চোখে কাজলের রেখা, লাল রঙের টিপ – অসমের আধুনিক নারীর এক অপরূপ প্রতিমূর্তি যেন এই মুহূর্তে রঞ্জনের সামনে উপস্থিত। পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ, তাই আজ পিছনে বেল্ট দেওয়া স্ট্র্যাপ স্যান্ডেল পরে এসেছে শিউলি। সে তার হাতের প্যাকেটটি রঞ্জনের হাতে দিয়ে বললো, "এইটো লোয়া", তারপর একটু থেমেই জিজ্ঞাসা করলো, "এতিয়া আমি ক'ত যাম?" (এখন আমরা কোথায় যাব?)

– "চলো এই সামনে" বলে শিউলিকে নিয়ে 'কথাপ্রকাশ' বই বিপণিতে ঢোকে। সেখানে তখন উপস্থিত পরিচিত অপরিচিত মিলিয়ে বেশ কয়েকজন। যাবার সাথে সাথে বিপণির দায়িত্বপ্রাপ্ত সদা হাস্যময় অনুজপ্রতিম পলাশ ও তার সঙ্গী প্রদীপ সাদর অভ্যর্থনা জানালো।

গাঁদা ও রজনীগন্ধা ফুল, মালায় সুন্দর করে সাজানো হয়েছে ঘরটি। ঢোকার দরজার জায়গাটি বাদ দিলে চারদিকে রংবেরংয়ের মলাটের থরে থরে সাজানো বই, একটা ছোট্ট বইয়ের ভুবন। তার মাঝে বসার জায়গা। একেবারে ঘরোয়া আয়োজনে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। পলাশের ছোট্ট মুখবন্ধের পর 'আলোকের এই ঝর্নাধারায়' গাইলেন লেখক ও সংগীত শিল্পী নন্দিতা নাগ। এরপর একে একে স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন কবি উদয়াংশু ভট্টাচার্য, আনন্দ অধিকারী এবং তনিমা চক্রবর্তী। বরিষ্ঠ সাহিত্যিক স্বাধীন চট্টোপাধ্যায় 'বই পাড়ায় নববর্ষ – একাল সেকাল' শীর্ষক একটি অনবদ্য স্মৃতিচারণা করলেন। রঞ্জনের লেখক বন্ধু অধ্যাপক সিদ্ধার্থ সেনগুপ্ত পর পর গাইলেন অতুল প্রসাদের 'মোদের গরব মোদের আশা' এবং রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে'। লেখক প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায় 'নববর্ষে নতুন বই' নিয়ে চমৎকার আলোচনা করলেন। অধ্যাপক বরুণেন্দু মণ্ডল 'নববর্ষে লিটল ম্যাগাজিন' শীর্ষক ছোট্ট তথ্যবহুল রচনা পাঠ করলেন। ই-পত্রিকা সম্পাদক গৌরব চট্টোপাধ্যায় 'ই-পত্রিকার সমস্যা সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ' সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করলেন। রঞ্জন বছর দুই আগে এমনই এক নববর্ষে শিউলিকে ভেবে লিখেছিল কবিতা 'আশার চরাচর', সেটা পড়ে শোনালো। রঞ্জনের কবিতা পড়া শেষ হতে না হতেই সিদ্ধার্থ বলে উঠলেন, "রঞ্জন, আমরা তোমার বান্ধবীর গান শুনব না?" রঞ্জন এখানে আসার পর শিউলিকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বলেছিল সে গানও করে। তাই সিদ্ধার্থর পাশাপাশি আরও কয়েকজনের থেকে একই অনুরোধ এলো। হঠাৎ করে এমন অনুরোধ আসায় শিউলি কিছুটা হতচকিত হয়ে তাকালো রঞ্জনের দিকে, জিজ্ঞাসা করলো, "কী গাইব?" রঞ্জন বললো, "রবীন্দ্রনাথের গানই গাও।" শিউলির গাওয়া বেশকিছু রবীন্দ্রসংগীতের স্মৃতি যে রঞ্জনের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। শিউলি গাইলো, 'নব আনন্দে জাগো আজি নবরবিকিরণে'। রঞ্জন লক্ষ্য করলো সবাই শুনছে তন্ময় হয়ে, সে নিজেও কত বছর পর শিউলির কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান শুনলো, শুনে মুগ্ধ। সেই গানের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও সিদ্ধার্থর অনুরোধ, "একটা অসমিয়া গান হবেনা?" কোনো দ্বিধা না করেই শিউলি গাইলো জুবিন গার্গের সেই বিখ্যাত গান - 'মায়াবিনী'। গান শেষ হতেই সকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাততালি দিয়ে উঠলেন। এবারে অনুরোধ এলো বর্ষীয়ান স্বাধীন চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। তিনি বলে উঠলেন, "অসমের শিল্পীর কাছ থেকে একটা বিহু গান না শুনলে যে আয়োজন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।" শিউলি পরিবেশের সাথে এরমধ্যে অনেকটাই একাত্ম হয়ে উঠেছে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে ভেবে নেবার পর পরিস্কার বাংলায় বললো, "আপনাদের অনুরোধে শিল্পী জুবিনদার একটা বিহুগান গাইবার চেষ্টা করছি। জানিনা কেমন হবে।" তারপর সে গাইলো – 'সঁচা মরম নহয় যদি, মরম কিয় দিছিলা/ সঁচা সপোন নহয় যদি, সপোন কিয় সজালা'... যার বাংলা অর্থ – 'সত্যি ভালোবাসা না হয় যদি, ভালোবাসা কেন দিলে/ সত্যি স্বপ্ন না হয় যদি, স্বপ্ন কেন সাজালে'... গানটির চলনে যখন বিহুর সেই চিরাচরিত তাল এলো তখন শিউলি তালি দিতে দিতে গানটি পরিবেশন করতে লাগলো, ওর তালি দেওয়া দেখে অনেকেই সেই ছন্দে তালি দিতে লাগলেন। বোঝা গেল সকলেই খুব উপভোগ করছেন গানটি। গান শেষ হলে প্রায় সকলেই হাততালি দিয়ে শিউলিকে অভিনন্দন জানালেন। 'কথাপ্রকাশ'-এর ঘরোয়া আসরে সবার মনোযোগ যেন কেড়ে নিয়েছে শিউলি। এজন্য ভেতরে ভেতরে গর্ব অনুভব করলো রঞ্জন। অনুষ্ঠান শেষ হলো, এবার মিষ্টিমুখের পালা। অনেকেই এসে শিউলির সঙ্গে পরিচিত হলেন। মাঝেমধ্যে এখানে আসার অনুরোধ জানালো পলাশ, সায় দিলেন অনেকেই। রঞ্জন এখান থেকে শিউলির জন্য সংগ্রহ করলো শহীদ কাদরীর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা' এবং সেলিনা হোসেনের রবীন্দ্রজীবন-নির্ভর উপন্যাস 'পূর্ণ ছবির মগ্নতা' এবং 'হাঙর নদী গ্রেনেড'। সকলের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে রঞ্জন-শিউলি পা বাড়ালো রাস্তায়।

শিউলির মুখে উজ্জ্বল প্রশান্তির আভাস। রঞ্জন জিজ্ঞাসা করলো, "এখানে কেমন লাগলো?"

শিউলি বললো, "খুব ভালো, অনেকদিন পর এমন একটা সুন্দর পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেলাম। এজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।"

রঞ্জন হেসে উত্তর দিল, "আমি যে তোমার সঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে পারলাম তার জন্যও তোমাকে অভিনন্দন।"

রঞ্জনের ইচ্ছে ছিল কফি হাউসে একান্তে কিছুসময় কাটাবে। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হলো না। অসম্ভব ভিড়, কোনোমতে একটা কোণে দু'জন বসার সু্যোগ পেল। কফি হাউসে যেভাবে বিভিন্ন টেবিল থেকে কথার ঝড় বইছে, তাতে একান্তে বসে কথা বলা তো দূরের কথা, বসে থাকতেই অস্বস্তি হচ্ছে। শিউলির চোখে মুখেও তা ফুটে উঠছে। কফি খাওয়া শেষ হলে রঞ্জন বললো, "চলো এখান থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও যাই"। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে রঞ্জন ঠিক করে নিল, প্রিন্সেপ ঘাট যাবে, ওখানে অল্পবিস্তর ভিড় থাকলেও জায়গাটা বেশ মনোরম। রঞ্জনকে উবের ডাকতে দেখে শিউলি আবার জানতে চাইলো, "কোথায় যাচ্ছি আমরা?"

– "চলোই না, জায়গাটা খারাপ লাগবে না, এটুকু বলতে পারি।" রঞ্জনের কথা শেষ হতে না হতেই গাড়ি চলে এলো। দু'জনের হাতেই জিনিসপত্র। সেগুলি সামলে তারা সিটে বসলো। গাড়ি মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে শিয়ালদহ ব্রিজে উঠে ডানদিকে টার্ন নিল। গাড়িতে যেতে যেতে শিউলি বইগুলো বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখার পর বললো, "বইগুলো খুবই সুন্দর হয়েছে। এগুলোতে আমার নাম লিখে দিও কেমন, তাহলে তোমার সুন্দর হাতের লেখা থেকে যাবে আমার কাছে।"

– "তুমি শুধু আমার হাতের লেখাই রাখবে রঞ্জনা?" আবেগ ঝরে পড়ে রঞ্জনের কথায়। শিউলি একবার রঞ্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে উদাস নয়নে দৃষ্টি মেললো বাইরে। তার মধ্যেও যে অনেক কথা জমে আছে, কিন্তু বলতে যে পারছে না।

গাড়ি প্রিন্সেপ ঘাটের কাছে এসে থামলো। রঞ্জন গাড়ির টাকা মিটিয়ে সবগুলো প্যাকেট হাতে নেয়, শিউলি গাড়ি থেকে নামার পর তারা এগোতে থাকে মূল স্থাপত্যের দিকে। একটা প্রশস্ত লন পেরিয়ে স্থাপত্যটি। এটা হুগলি নদীর তীরে ব্রিটিশ আমলে তৈরি একটি ঘাট। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ইতিহাসবিদ জেমস প্রিন্সেপের স্মৃতিতে ১৮৪১ সালে তৈরি হয়েছিল। প্রথম দিকে ব্রিটিশদের যাত্রীবাহী জাহাজের যাত্রী ওঠানামার কাজে ব্যবহৃত হতো এই ঘাটটি। এই ইতিহাস লেখা আছে একটি ফলকে। রঞ্জন এর আগে এখানে এসেছে, তাই জায়গাটি তার পরিচিত। এই স্থাপত্যের ঠিক পিছনে দেখা যাচ্ছে নদীর ওপর বিদ্যাসাগর সেতু। স্থাপত্যটির সামনে দাঁড়িয়ে অবাক নয়নে দেখে যাচ্ছে শিউলি। জায়গাটি যে শিউলির খুব ভালো লেগেছে তা তার অভিব্যক্তিতেই বোঝা যাচ্ছে। রঞ্জন হাতের প্যাকেটগুলো লনে রাখে, তারপর মোবাইল ফোন বার করে বেশ কয়েকটা ছবি তোলে শিউলির। দেখে মৃদু হেসে শিউলি বলে, "রঞ্জু, তুমি অকল মোর ফটোয়েই তুলিছা, রবা, তোমার ফটো উঠাই দিওঁ।" (রঞ্জু, তুমি শুধু আমার ছবিই তুলছো, দাঁড়াও তোমার ছবি তুলে দিই)

– "আমার আলাদা করে ছবি তুলতে হবেনা, দাঁড়াও দু'জনের একসঙ্গে ছবি তোলার ব্যবস্থা করি।" এক অষ্টাদশী একটু দূরে দাঁড়িয়ে একের পর এক সেলফি তুলে যাচ্ছিল। রঞ্জনের অনুরোধে সে তাদের বেশ কয়েকটি ছবি তুলে দিল। ওরা হাঁটতে হাঁটতে স্থাপত্যটির পিছনের লনে একটি ফাঁকা হেলানো বেঞ্চে গিয়ে বসলো। দু'জনের মাঝখানে ওদের জিনিসপত্র। রঞ্জন শিউলির আনা প্যাকেটটি খুললো। শিউলি ওর জন্য একটা ছোটো শরাই, দুটো জাপি ও একটা অসমের গামছা এনেছে। জিনিসগুলো পেয়ে ভীষণ খুশি রঞ্জন। সে বললো, "তুমি তো দেখছি অসমের সংস্কৃতির অন্যতম স্মারকগুলোই এনেছো আমার জন্য। কতদিন পরে এসমস্ত জিনিস দেখলাম। খুব ভালো হয়েছে।" একটু থেমে সে আবার বললো, "আমার মধ্যে অনেক অপূর্ণতা রয়ে গেছে রঞ্জনা। অসমে আমার জন্ম, কিন্তু অসমকে ভালো করে দেখাই হলোনা, সেখানকার কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কেও সেভাবে কিছুই জানা হলো না। স্কুলে থাকার সময়ে অসমের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্বদের মধ্যে শ্রীমন্ত শংকরদেব, লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া, অম্বিকাগিরি রায়চৌধুরী, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভাদের মতো যুগন্ধর মানুষদের নাম জেনেছিলাম। পরবর্তীকালে শুনেছি ভবেন্দ্রনাথ শইকিয়া, বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য, হোমেন বরগোহাঁই, ইন্দিরা গোস্বামী, নীলমণি ফুকন, নবকান্ত বরুয়া, হীরেন ভট্টাচার্য থেকে অমলেন্দু গুহ, হীরেন গোহাঁইদের মতো বিশিষ্ট মানুষদের নাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জান রঞ্জনা, তাঁদের জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে এখনো অনেক কিছুই জানা বাকি। আমার মনে হয় অন্তত সেটুকু জানা থাকলে অসমের সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে হয়তো একটা ধারণা জন্মাত।"

শিউলি এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে শুনছিল রঞ্জনের কথাগুলো। সে বললো, "তুমি তো এখনো ইচ্ছে করলে পার এই মানুষদের সম্পর্কে জানতে। তবে তোমার আগ্রহ, ধৈর্যের সাথে সময়ও বার করে নিতে হবে।"

– "তা আমি জানি, কিন্তু আমার মনে হয় তারজন্য প্রপার গাইডেন্সেরও প্রয়োজন। আমি কাল রাতে এসব নিয়ে অনেক ভেবেছি। তুমি কি পারনা এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে?" রঞ্জনের কথায় আকুলতা ফুটে উঠলো। শিউলি কি বলে তা শোনার অপেক্ষা।

– "আমি কি আর সব জানি, তবে পড়াশোনা, গবেষণার কাজ ও আমাদের সেন্টারের কাজের সূত্রে যেটুকু জানার সুযোগ হয়েছে, তাতে তোমাকে কিছুটা সাহায্য করতে পারব বলেই আশা রাখি।" এই কথাক'টি বলার পর শিউলি একটু থামলো, তারপর মৃদু হেসে একটু মজা করেই বললো, "তুমি একটা কাজ করতে পার, আমাদের সেন্টারে ভরতি হয়ে যাও, তাহলেই তোমার ইচ্ছা অনেকটাই পূর্ণ হয়ে যাবে। তুমি রাজি থাকলে বলো।"

– "ভালোই বলেছো! এই বয়সে এসে আমি এখন বাচ্চা ছেলেমেয়েদের সাথে বসে ক্লাস করি, সেখানে আবার টিচার তুমি! এ কোনোদিনই সম্ভব নয়।" রঞ্জনও হেসেই উত্তর দেয়। এরপর ব্যাগ থেকে একটা কলম বার করে শিউলির হাতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, "দেখ তো এটার কথা কি মনে পড়ে তোমার?" কলমটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর হঠাৎ করেই শিউলির চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সে কিছুটা উচ্ছ্বাসের সুরেই বলে, "তুমি এটা এখনো এত যত্নে রেখে দিয়েছো রঞ্জু?"

– "কেন রাখব না রঞ্জনা, এটাই তো তোমার দেওয়া শেষ স্মৃতিচিহ্ন, তোমার দেওয়া সেই রুমালটিও যত্নেই রাখা আছে। মাঝে মাঝে এই দুটো জিনিস বার করে দেখি, আর তোমার স্পর্শ অনুভব করি। আমি যে তোমাকে একমুহূর্তের জন্যও ভুলে থাকতে পারিনা রঞ্জনা!" মনের গভীরে বহুদিনের সঞ্চিত ভালোবাসা আবেগ সব যেন রঞ্জনের কথার মধ্য দিয়ে ঝরে পড়লো। কলমটা এখনো শিউলির হাতে। সে বাক্‌রুদ্ধ, রঞ্জনও নিশ্চুপ, মুহূর্তের নীরবতা যেন দু'জনকেই আচ্ছন্ন করেছে। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর রঞ্জনের কথায় নীরবতা ভাঙে। সে শিউলির দিকে তাকিয়ে বলে যায়, "গতকাল তোমাকে দেখার পর থেকে আমি অনেক ভেবেছি। আমার কী মনে হয়েছে জানো রঞ্জনা, সময় ও পরিস্থিতি একদিন যেমন আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল, তেমনি আজ আমাদের সামনে এক অসামান্য সুযোগও এনে দিয়েছে। আমরা ইচ্ছে করলে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করতে পারি, আমাদের ভালোবাসাকে মর্যাদা দিতে আমরা একসঙ্গে পথচলার কথা ভাবতে পারি। এখন আমাদের সামনে সেই আগের মতো কড়া বিধিনিষেধ ও প্রতিবন্ধকতা নেই। এ ব্যাপারে তোমার কী অভিমত রঞ্জনা?" একটানা কথাগুলো বলে রঞ্জন একটু থামে, শিউলির দিকে তাকায়, শিউলি সামনের দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখের ভাষা বুঝিয়ে দিচ্ছে মনের মধ্যে তীব্র আলোড়ন শুরু হয়েছে, সে কিছুই বলতে পারছে না।

এদিকে রঞ্জনেরও যে অনেক জমানো কথা বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে আবার বলতে শুরু করে, "রঞ্জনা, আমার মনে হয়েছে আগামীদিনে আমরা যদি একসঙ্গে চলার সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে আমাদের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন, ঈপ্সিত আকাঙ্ক্ষাই শুধু পূর্ণতা পাবেনা, সেইসঙ্গে আমরা একটা বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনেরও শরিক হতে পারব। আমরা যে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, বিভেদ-বিসংবাদের বিরুদ্ধে মানবতা ও মানবিক সম্পর্কের কথা বলি, তা নিজেদের জীবনের উদাহরণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পাব। তবে জানি এই পথটা সহজ নয়।"

একটু থেমে সে আবার বলতে থাকে, "তুমি আমি সবাই দেখছি, আজকে দেশের নানা প্রান্তে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে উগ্রধর্মের কারবারিরা কীভাবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের নিজেদের ইচ্ছেমতো জীবন বেছে নেবার অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে, চিরন্তন মানবিক সম্পর্ক, অনুভূতি, মূল্যবোধ, খাদ্যাভ্যাস – সবকিছুকেই নস্যাৎ করে দিতে হিংসার আশ্রয় নিচ্ছে। তারা চাইছে জ্ঞান, যুক্তিবোধ, বিজ্ঞানচেতনাকে দূরে সরিয়ে মধ্যযুগীয় ভ্রান্ত ধারণাকে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে। তাই আমার মনে হয়েছে, আমরা যদি যৌথভাবে আমাদের জীবনের সূচনা করতে পারি, তাহলে এই সমস্ত অন্যায়-অপহ্নবের বিরুদ্ধে আমাদের একটা প্রতিবাদ ধ্বনিত করতে পারব। আমি নিশ্চিত, তোমাকে সঙ্গে পেলে আমরা তা পারব, সেইসঙ্গে কিছু সৃষ্টি ও চর্চার কাজেও মগ্ন হতে পারব। সবচেয়ে বড়ো দিক হলো, আমাদের এই যৌথ সিদ্ধান্ত সমাজ প্রগতির অভিযাত্রায় শরিক হবার সুযোগ এনে দেবে। এই ভাবনায় কি আমরা সহমত হতে পারি না রঞ্জনা?"

রঞ্জনের মনের গভীরে জমে থাকা কথাগুলো যেন বাঁধ ভাঙা বন্যার স্রোতের মতো বেরিয়ে এলো। চিন্তার গভীরতার সঙ্গে আবগের মিশ্রণে সে এখন নিশ্চল, তার দৃষ্টি শিউলির দিকে। কথায় কথায় পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। প্রিন্সেপ ঘাটের স্থাপত্যের আলো, লনের নানা জায়গায় ছড়ানো ফুট লাইট জ্বলে উঠেছে। উঁচু থামের গা বেয়ে নেমে আসা আলোর পরশ যেন এক মায়াবী মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে। শিউলির দৃষ্টি সামনের দিকে। গোধূলির অস্তরাগ হুগলি নদীর বুকে মোহময়ী রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে পালতোলা নৌকো। গাছের ফাঁক দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যাসাগর সেতু। পাখিরা ফিরে এসে আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছে চারপাশে ছড়ানো গাছের শাখায়, কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চারপাশ। এমনই এক আপাত শান্ত, মনোরম পরিবেশে দু'জনের নীরবতায় যেন রচিত হচ্ছে এক নৈঃশব্দ্য প্রেমের কাব্য। হঠাৎই সংবিৎ ফেরে রঞ্জনের। সে অনুভব করে শিউলির স্পর্শ। সে রঞ্জনের ডান হাতটা তার কোলের কাছে নিয়ে দু'হাতে চেপে ধরে। রঞ্জনের মনে পড়ে যায় স্কুলের একটি ঘটনার কথা। ক্লাস টেন, রবীন্দ্র জয়ন্তীর রিহার্সাল শুরু হবে, তার আগে অনুষ্ঠানের নাচের তালিকায় এক ছাত্রীর নাম দিতে সংগীতাকে নিয়ে তার কাছে আসে শিউলি। রঞ্জনের হঠাৎ কেন যেন ইচ্ছে হলো, শিউলির কাছ থেকে কলম নেবার ছুতোয় তার হাতটা একটু ছোঁয়ার, কিন্তু সংগীতার উপস্থিতির জন্য শিউলি হাতটা দ্রুত সরিয়ে নেওয়ায় রঞ্জনের উদ্দেশ্য সফল হলোনা। পরে কোনোদিন রঞ্জনের এই সুযোগ আর আসেনি, বাসনাও জাগেনি। আজ শিউলি নিজে থেকেই রঞ্জনের হাতটা দু'হাতে ধরে আছে, তার দু'হাতের বেষ্টনী ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে। সে যেন রঞ্জনকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে। রঞ্জন অনুভব করছে শিউলির এই প্রথম হাত ধরা ক্ষণিকের নয়, আগামী জীবনের জন্য। প্রিন্সেপ ঘাটে সন্ধ্যা নামছে। আলো আঁধারের ফাঁকে রঞ্জন দেখলো শিউলির দু'চোখ অশ্রুসিক্ত। এই অশ্রু কি আনন্দের, ভালোবাসার? এভাবে পেরিয়ে যায় কিছুটা সময়। কিছুক্ষণ পর তারা উঠে দাঁড়ায়, এবারে ফেরার পালা, রঞ্জন কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে সবগুলো প্যাকেট তুলে নেয়। শিউলি রঞ্জনের বাঁহাত ধরে আছে, তার আঙুলগুলো রঞ্জনের আঙুলগুলোর মধ্যে নিবিষ্ট। তারা এগোয় সামনের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে শিউলি আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে উচ্চারণ করে, "মই তোমাক আরু হেরাব নিবিচারোঁ রঞ্জু, মই থাকিম তোমার কাষত।" (আমি তোমাকে আর হারাতে চাইনা রঞ্জু, আমি থাকব তোমার পাশে।)

রঞ্জন অনুভব করে, শিউলির এই কাছে থাকার অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গে তার ধরে থাকা হাতের মুঠো আরও দৃঢ় হচ্ছে। শিউলির এই প্রাণের উচ্চারণে রঞ্জনের হৃদয়তন্ত্রী ঝংকৃত হচ্ছে, তার চারপাশে যেন বেজে উঠেছে জীবনের অন্তহীন তরঙ্গধ্বনি –
"বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল তরঙ্গ রে।
সব গগন উদ্‌বেলিয়া – মগন করি অতীত অনাগত 
আলোকে-উজ্জ্বল জীবনে-চঞ্চল একি আনন্দ-তরঙ্গ।
"...

পরিচিতি: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক। নিবাস: হাওড়া।