প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

বিহু, বৈশাখ এবং ভূপেন হাজরিকা



ডঃ পরমানন্দ মজুমদার


রঙালি বিহু সম্পর্কে একটি রচনায় অসমের গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছেন, "যা নেই বিহুগীতে, তা নেই অসমে। যা নেই অসমে, তা নেই বিহুগীতে। অসম এবং অসমিয়া জনমানসের নির্ভুল দর্পণ এই বিহু। অসমের পাহাড় পর্বত, পাখপাখালি, নদী-বিল, পাহাড়-সমতল, ফুল-ফল, গন্ধ-বর্ণ এবং সেগুলোর মধ্যে কর্মরত নারী-পুরুষের এমন প্যানোরমা ভারতের সংগীতে বিরল। সাহিত্যিক ভিত্তির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে অসমিয়া সংস্কৃতির উপরিসৌধ।"[১]

বিহু সম্পর্কে এই অভিব্যক্তির মধ্যেই রয়েছে বিহুর জন্ম, ঐতিহ্য এবং গূঢ়ার্থ তথা দর্শন। বিহু অসমিয়ার দর্পণ, যেখানে সমগ্র জাতিটির জীবন-প্রবাহ প্রতিফলিত হয়। প্রকৃতির আনন্দময় পরিবেশে জনজীবনের রূপরেখা প্রস্ফুটিত হওয়া বিহুর মধ্যে নেই কোনো সংকীর্ণতা। ধর্মীয় প্রভাব মুক্ত এক মুক্ত বিচরণের স্থল হলো বিহু উৎসব। মূলত কৃষি উৎসব হওয়ার জন্য এখানে ঐহিক জীবনের ছবিটিও সতত আমরা দেখতে পাই। কৃষি জীবনের হা-হুতাশ, হাসি, ক্রন্দন সবকিছুই তাই বিহুগীতগুলোতে আমরা শুনতে পাই। সেখানে যুবক-যুবতীর জাতিকুল অগ্রাহ্য করে মুক্ত প্রেমের যেমন আবেদন আছে, আছে প্রীতি-সমন্বয়ের কথা, তেমনি আছে সমাজ জীবনের রূঢ় বাস্তবের ছবিও, আছে মান্যগণ্যদের কথা – রাজবাড়ির কথা, আছে পরিবর্তনের কথা – বাণী। বিহু সবসময় নতুনকে স্বাগত জানায়। প্রকৃতি যেমন রূপ পরিবর্তন করে, বিহু তাকে স্নেহভরে গ্রহণ করে। তাই জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা বিহু উৎসবকে 'অসমিয়ার উচ্চসংস্কৃতি' বলে উল্লেখ করেছেন, সেইসঙ্গে বলেছেন, এই উৎসবে থাকে জন-সংস্কৃতির আলো। তাঁর ভাষায় – "অসমিয়া বিহু উৎসব আসলে অসমিয়ার একটি সাংস্কৃতিক মেলা যেখানে উচ্চসংস্কৃতি এবং জন-সংস্কৃতির বাৎসরিক মিলন হয়। সেই কারণেই বিহু উৎসব অসমিয়া সাংস্কৃতিক জীবনের একটি বার্ষিক সমাবেশ। প্রকৃতির নতুন রূপ নেওয়ার সময়ে অসমিয়া মানুষেরাও জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভালোর ভালোটুকু নিয়ে সেইদিন সমবেত হয় নতুন বছরকে সম্ভাষণ জানাতে, নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে। সেই কারণেই নতুন দিনের স্বপ্ন দেখা অসমিয়ার জন্য বিহু উৎসব সবচেয়ে মূল্যবান উৎসব – নতুন সংস্কৃতি গড়ার থেকে। বিহুর মধ্য দিয়ে আমাদের প্রকৃতির রূপান্তরের বাণীকেই উপলব্ধি করার চেষ্টা করতে হবে।"[২]

বিহুর রূপ অসমিয়া সমাজে একটা নয়। জাতি জনগোষ্ঠী ভেদে, ভৌগোলিক স্থানভেদে ভিন্ন। কিন্তু একটির সাথে আরেকটি বিচ্ছিন্ন নয়। পরস্পরের প্রভাব যুক্ত হয়ে সারা অসমে বিহুর বর্ণাঢ্যতা লক্ষণীয়। বিহু যে নানারূপে সৃষ্টিশীলতাকে তুলে ধরে সেটাই সত্য। বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা খুবই সুন্দর করে জনজাতীয় উপাদানের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উল্লেখ করে গেছেন। তিনি বলেছেন – "অসমিয়ার পৈত্রিক সম্পদ রঙালি বিহুর জন্য প্রত্যেক অসমিয়াই হৃদয় উজার করে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে"[৩] এবং "বরদৈচিলা (বহাগ বিহুর সময়ে হওয়া প্রবল বাতাস) যখন অসমের বুকে প্রবল বেগে হিল্লোল তুলে আসে, তখন প্রতিটি অসমিয়াই বুঝতে পারে যে বিহুর আর বেশি দিন নেই। আর তখন থেকেই মনে প্রাণে এই রঙালি বিহুকে নানারকমভাবে উদ্‌যাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নিতে আগ্রহ জাগে।"[৪]

এক সময় 'পছোয়া'র পাতায় হেম বড়ুয়া বিহু সম্পর্কে একটি গুরুগম্ভীর রচনা লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বিহুর আদিম উৎস, মুহূর্ত এবং সৃজনশীলতার কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করেছিলেন যে, "বিহুর অসমের জাতীয় জীবনের সঙ্গে সম্বন্ধ। একে প্রকৃতির পূজা বলতে পারি। প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিহু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বিহুর মাধ্যমে অসমের জনসাধারণের প্রকৃতি-স্পৃহা পরিস্ফুট হয়। অসমের জনসাধারণ প্রকৃতির সন্তান। তাই বিহু উৎসবে এত সমারোহ, এত আনন্দ।"[৫] বিহুর মধ্যে থাকা যৌন স্পৃহায় তিনি সৃষ্টিশীলতা দেখেছিলেন। এই কথাকে তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, "বিহুতলী অসমিয়া যুবক-যুবতীর মিলনভূমি। এখানেই যুবক যুবতীকে, যুবতী যুবককে দৃষ্টি দেয়।... বিহুনৃত্য প্রকৃতির সৃষ্টি-স্পৃহার রূপায়িত প্রকাশ। এটা প্রতীকধর্মী। বিহুতলীর নাচনী যুবতীটি বসন্তকালের চাষের জন্য উপযুক্ত পুষ্পিতা পৃথিবী। ঢোল বাজিয়ে পেঁপার সুরের কম্পন তুলে নাচনিকে মাতাল করা যুবকটি আকাশে স্পন্দন তোলা বর্ষার জলে পৃথিবী ভিজিয়ে দেওয়া মৌসুমী বায়ু।... বিহুনামের ভঙ্গিমা কোমর দোলানো বিভঙ্গে যৌন স্পৃহার কথা বোঝায়। মানুষ স্রষ্টা। সৃষ্টি-স্পৃহা মানুষের আদিম এবং অনন্ত। এর রচনা এবং প্রকাশ তাই বলে। যৌন জীবন এবং সৃষ্টির কথা।[৬]

(১)

ভূপেন হাজরিকার চিন্তা চেতনাতেও হেমাঙ্গ-জ্যোতি-বিষ্ণু-হেম বরুয়ার বিহুর ধারণাটিই প্রবাহিত হয়েছে। বিহুর সুর তাঁর সুরশৈলীতে এনে দিয়েছে ঐশ্বর্য। পাশ্চাত্য এবং দেশীয় সুর একত্র করে তার সঙ্গে বিহুকে যুক্ত করে তিনি অসমিয়া গানে নতুন লহর এনেছেন। এই লহরে প্রস্ফুটিত হয়েছে অসমের বর্ণময় প্রকৃতি এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ জনজীবনের কৃষ্টি-সংস্কৃতি। তাঁর গানের কথা সুরে যেভাবে কোমল অনুভূতি বাঙ্ময় হয়েছে, সেভাবে প্রোজ্জ্বল হয়েছে চিন্তার দৃঢ়তা। গানের ভাষা সুর জনজীবন থেকে সংগৃহীত। কাব্যিক প্রকাশও মাটির স্পর্শে উজ্জীবিত। বিহুর মধ্যে প্রবাহিত সময়ের পরিবর্তনের ছবিটিও সেখানে রয়েছে। কয়েকটি কলি মনে করলেই তা প্রকাশ পাবে –
বিহুৰে বিৰিণা ব্রিটিছ ৰজা উঠি গ'ল
পাতে সমনীয়া দেশৰ নেতা ৰজা হ'ল।
......
বাৰীৰে ঢাপৰে এজাৰ মোৰ চেনাই
বাৰীৰে ঢাপৰে এজাৰ
চেঙেলীয়া কালতে পীৰিতি এৰিলা
মনত দি গ'লা বেজাৰ
......
বৈ বৈ বৈ ৰঙা নৈ বৈয়েই আছে
কৈ কৈ কৈ তোৰে কথা লতায়ো নাচে
সোণ তই পুৰিলে গাভৰু মনক
কি সোৱাদ পাৱ, পুৰি আপোনজনক!
......
নিজহাতে ৰিহা বৈ লওঁ
বজৰুয়া পটলুং পিন্ধি
মাৰা ফিতাহি
চিঃ কটা লাজত মৰি যাওঁ।
......
চকুৰে বিহুৰে গীত 
এই বেলি পীত বান্ধ
এই বেলি পীত 
চতালত গছে বন
মূৰ থিয় দি
অ' বোলো নাচনী
নাচিবি তই কি?

(বিহুর আনন্দে মাতোয়ারা সবাই, ব্রিটিশরা দেশ ছাড়লো আর দেশের নেতা রাজা হলো।
......
প্রকৃতিতে, কাননে সৌন্দর্য ছড়িয়েছে, এমন সময় প্রিয় আমার, মনে দুঃখ দিয়ে তুমি প্রেমহীন হলে।
......
তির তির করে রাঙানদী বয়, যেন তার কথাতেই প্রকৃতির লতাপাতাও নাচে, সদ্য যৌবনার মন ভেঙে আপনজনকে কষ্ট দিয়ে তোমার কি লাভ!
......
নিজ হাতে রিহা (অসমিয়া মেয়েদের বুকের ওপরে জড়ানো চাদরের নিচে পরা একধরনের লম্বা আঁটসাঁট কাপড়) বুনি নিজহাতে, আর নিজে বাজারের ফিতা লাগানো পাতলুন পড়েছি, ছিঃ ছিঃ লজ্জায় মরে যাই।
......
উঠোন জুড়ে ঘাস, গাছপালা গজিয়েছে, নাচিয়ে তুমি নাচবে কোথায়?)

বিহু এবং বৈশাখ ভূপেন হাজরিকার গানের একটি কল্লোলিত প্রবাহ। বিহু তথা বৈশাখের মধ্যে তিনি খুঁজে পান সংস্কৃতির আলোড়িত অর্থ। বিহু তাঁকে দেয় নতুনের ছন্দ, নতুন গানের ভাষা। সত্তরের দশকে তাঁর গাওয়া গানটি মনে পড়ে। তাঁর রোমান্টিকতা এবং কণ্ঠের অনুভবী প্রকাশ আমাদের পলকে সম্মোহিত করে –
মিঠা মিঠা বহাগৰ
গীত এটিকে লিখো বুলি ভাবিলোঁ
এনেতে চুচুক চামাককৈ কাষ চাপিলা
মই যেন ভাষা পালোঁ।

......

লুইতত তিওৱা তোমাৰ দেহা
মাহ আৰু হালধিৰ সুবাস ঘঁহা
নিচেই কাষতে পোৱাৰ পিছত
সুৰ যেন হাততে পালোঁ।

(অপরূপ বৈশাখে গান লিখতে মন চাইলো, তুমি কাছে এলে তাই আমি ভাষা খুঁজে পেলাম।
......
লুইতের জলে সদ্যস্নাতা তোমার শরীর থেকে হলুদ, কলাইয়ের সুবাস একেবারে কাছ থেকে পেয়ে গলায় সুর এসে গেল।)

বৈশাখের ভাষা খুঁজে পাওয়া গীতিকার হারানো সুরগুলো যেমন করে হঠাৎ খুঁজে পায়, তেমনি যুবতীর হাসি এবং বক পাখির মতো উচ্ছ্বসিত বিহুর আবেগে সে যেন ঝড়কেও বুকে জড়িয়ে ধরে। কী যে প্রতীক ধর্মী স্ফুরণ! ঝড় হলো তার জন্য নতুনের দৃষ্টি –
একজাক গাভৰুৱে হঠাতে হহাঁ
এজাক বগলী বলীয়া হোৱা
বিহুৱা আৱেশে আজি মোক জোকোৱাত
মই যেন ধুমুহা হ'লোঁ।

(এক ঝাঁক যুবতীর হঠাৎ হেসে ওঠার মতো, এক ঝাঁক সাদা বকের পাগল হয়ে ওঠার মতো, বিহুর আবেশ আমাকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে যেন আমি হয়ে উঠেছি দুরন্ত ঝড়।)

এরপর তাঁর দিদিমাকে সম্বোধন করে গাওয়া বিহু গানের মূর্চ্ছনা আমাদের আকুল করে তোলে। কিছুটা মজার ছলে গাওয়া গানটিতে যৌবন এবং প্রেমের উন্মাদনার প্রকাশভঙ্গি অতি হৃদয়স্পর্শী –
অ বিহুৰে বিৰিণা – অ' আইতা
নাচনীৰ কলাফুল লৰে
বিহুৰেনো বিৰিণা – অ আইতা
কেৰুমণি থুৰীয়া
পাতে সমনীয়া – অ' আইতা
তুমি আমাৰ যুৰীয়া
ব হাগতে পাতি যাওঁ বিয়া – অ আইতা
কেৰুমণি গেজেৰা নামাৰিবা কেতেৰা
চাইনো চাই থাকিবৰ মন।

(বিহুর আনন্দে আত্মহারা ওগো দিদিমা,
বিহু নাচের নাচিয়েদের কলাফুলে হিল্লোল, চোখের বাঁকা চাহনি 
ওগো দিদিমা তুমি মোদের সান্ত্বনা, এই বৈশাখেই আমি বিয়ে করতে চাই।
তোমার চোখের বাঁকা চাহনি আমার দিকে ছুঁড়ে দিওনা, ওগো শুধু তোমার দিকেই চেয়ে থাকার ইচ্ছে হয়।)

বিহু উৎসবে অংশগ্রহণকারী প্রেমিকের কোনো চাকরির দরকার নেই। সে মন থেকে চাওয়া বিহু-নৃত্যশিল্পী তরুণীকে তাই বলছে –
বা বাগিচাৰ চা চাকৰি
নে নেলাগে লা লাহৰী
নেলাগে তলপর ধন।
তয়ে ধানে দাবি 
ময়ে হালে বামে 
সেয়ে হ'ব জীৱনৰ ধন।

(চা বাগানের চাকরি চাইনা, চাই না সঞ্চিত ধনসম্পদ, আমি হাল বাইব তুমি ধান বুনবে, তাতেই চলবে জীবন।)

দিদিমাকে তাই নিজের পছন্দের কথা খোলাখুলি বলছে –
এনেনো ভাল লাগে আইতা 
এনেনো ভাল লাগে –
মুখলৈও কিনো চাবা – পূর্ণিমাৰে জোনে
এনেনো ভাল লাগে আইতা 
এনেনো ভাল লাগে
চকুলৈনো কিনো চাবা – সৰগৰে তৰা...

(কি যে ভালো লাগে দিদিমা কতো যে ভালো লাগে, মুখখানি যেন পূর্ণিমার চাঁদ চোখজোড়া স্বর্গের তারা।)

আশির দশকে লিখলেন আবার সেই রঙে ভরা বিহুর কথা, বিহুর কুঁড়ি এবং তার মধ্যে উন্মোচিত অসমের বৈভবের কথা শব্দচয়ন, গায়ন ভঙ্গিতে মূর্ত হলো অসমিয়া সুরের গঠনগত মাধুর্য – অসমিয়া কৃষ্টির রূপ রং –
চৰাই চিকুণ অ লীলা ৰহিলা
তেলীয়া সাৰেঙ অ লীলা ৰহিলা
মাছৰ চিকুণ মালি অ ৰহিলা
......
ৰৈয়া ৰৈ নাচিলে নাচনী নাচিলে ৰৈয়া ৰৈ
আয়ৈ দেহি কলাফুলৰ গোটে দেহি 
ৰাইজাই ৰাইজাই কৰে দেহি
তোমাকনো মই কাহানি পাম?
কেঁচা মৰম চেঁচা নৈ মুখৰ মিঠা এঠা দৈ
মিঠা মিঠা তিলৰ পিঠা
দেহাটি মোৰ চেনাই ঐ
অসমীৰে বিহুটি ঐ
বাপতি যে সাহোন ঐ
আমাৰ অতি আপোন ঐ।...

(চড়ুই পাখি সরু ডানা, লীলার ছোঁয়ায় থাকে ভরা,
তেলিয়া সারেঙ নীরব সুরে, লীলার মাঝে ঘুরেফিরে। 
মাছের দেহ কোমল আলো, লীলার রঙে ভাসে ভালো।
......
থমকি থমকি নাচছে সুন্দরী নর্তকী
গায়ে মোর জাগে হিল্লোল, দেহ মন করে আনচান, কবে তোমাকে পাবো।
কোমল প্রেম, স্নিগ্ধ নদীপাড়ের মিষ্টি ঘন দই, মিষ্টি মিষ্টি তিলের পিঠে, পরম্পরাগত অসমের বিহুর আগমনে দেহমন নেচে উঠেছে।...)

অন্য একটা গানে শোনা যায় একই আকুলতা, একই ব্যঞ্জনা –
মাছ মাৰো দিচাঙত
পানী খাওঁ কলঙত
হে মাছ মাৰোঁ দিছাঙত 
পানী খাওঁ কলঙত
টুলুঙা নাৱতে উঠি।
জীৱন লুইতত বিচাৰোঁ তোমাক জান
আমাক নিদিবা পিঠি নাজিতৰা
আমালৈ নিদিবা পিঠি।...

(ছোটো পানসি তরীতে চেপে দিচাং নদীতে মাছ ধরি, আর‌ জল খাই কলং নদীতে,
আমার জীবন নদীতে তোমাকে চাই, আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে থেকো না সুন্দরী।)

এবং সেই চিত্তকে ছুঁয়ে যাওয়া সেই গানের কলি কি ভুলতে পারি! গীতিকার ভালোবাসার ছিন্ন সূত্রে খুঁজে পান মধুর প্রেম, অভাবের মধ্যেও যেখানে বিহুর মর্ম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে –
চেনেহীৰ ফঁটা ৰিহা
ফুলে জকে মকে
উৰি যায় বতাহৰ আগত – বোলো আগত
নেখাই চাৰি সাঁজো থাকিব পাৰোঁ মই
ব হাগৰ লগত হে 
শশী মিলন দৈ জালুক গুটি পিপল দৈ
কেৰাসিন নহ লে চাকিটি ন জ্বলে
তথাপি গাত নাই তত।

(আদরের ছেঁড়া বস্ত্র ফুলে ফুলে সাজানো, আরো উজ্জ্বল হয়ে বাতাসে ওড়ে, চার বেলা অভুক্ত থেকে যেতে পারি বৈশাখে তোমার সাথে মিলিত হয়ে, কেরোসিন ছাড়া বাতি জ্বলে না ঠিকই, তবু দেহ মোর করে আনচান।)

বৈশাখের এমন মুহূর্তে গীতিকার ওক গাছের মৌচাক থেকে মৌ সংগ্রহ না করে মৌ খুঁজছে প্রিয়জনের মিষ্টি ঠোঁটে। ইতিমধ্যেই দু'জনের ভালোবাসার বন্ধনে দু'জনে বাঁধা পড়ে গেছে।

(২)

ভূপেন হাজারিকার মতে বৈশাখ অসমিয়ার সবকিছু। অসমিয়ার মান প্রাণ সব। অসমিয়া জাতিসত্তাকে তিনি বৈশাখের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর 'বৈশাখ শুধুমাত্র একটি ঋতু নয়' গানটিতে তাঁর এই দর্শন পরিস্ফুট। বৈশাখকে তিনি 'জাতির আয়ুরেখা' বলে অভিহিত করাই শুধু নয়, জীবনের সাহস বলেও মন্তব্য করেছেন। বৈশাখ কেবল বিহুতলী অথবা রাতে ফোটা ফুল নয়, বৈশাখ একটা সম্মিলিত গতি, বৈশাখ কোনো জাতিকুল মানে না, বৈশাখ বিভেদকে বিনাশ করে। বৈশাখ মানে শুধু মাকুর শব্দ বা কোকিলের গান নয়, একটি নতুন ভাবনা নতুন সৃষ্টিশীল চিন্তার সূচনা। অর্থাৎ সৃষ্টিশীল ভাবনা বৈশাখকে নতুন ভাষা দেয়, যা জীবনকে উজ্জ্বল করে তোলে।

কিন্তু বৈশাখ ভূপেন হাজরিকার জন্য নতুনের বাহক – নতুন সংস্কৃতির চেতনায় উদ্দীপ্ত। যেহেতু এটা মিলনের স্থল তাই তার থেকে সংগ্রামের প্রেরণাও পান পুরোনো মূল্যবোধকে নিঃশেষ করার। বৈশাখকে আঁধারের ত্রাস হিসাবে তিনি দেখতে চান। জ্যোতিপ্রসাদ বিহুর সাংস্কৃতিক উৎসবে সংস্কৃতির আলোর আকাঙ্ক্ষা করার মতো ভূপেন হাজরিকাও বিহুর মধ্যে রূপ দেখতে পান। হেম বড়ুয়ার মতো তিনি বৈশাখে সৃষ্টি খুঁজে পান। গানের শেষ দুটো পঙক্তিতে তিনি গেয়েছেন –
ব'হাগ মাথো বিহুতলী নহয়
ইনাই বিনাই গোৱা
ব'হাগ এখনি সৃষ্টি দলিল
সূর্যৰ জ্যোতিত পোৱা
ব'হাগেই এন্ধাৰৰ ত্রাস।
বহাগত জাতিয়ে স্নান কৰে
মলিয়ন বস্ত্র সলায়
সংগ্রামী জীৱনতো ৰণ প্রেৰণা 
দিয়ে বৰদৈচিলাই
ওফৰাই দুখ নাগপাশ।

(বৈশাখ কেবল বিহুর মঞ্চ নয়, বৈশাখ নানা সুরে গাওয়া এক সৃষ্টির দলিল। সূর্যতাপে পোড়া বৈশাখ আঁধারের ত্রাস। বৈশাখে জাতি স্নাত হয়, মলিন বস্ত্র ত্যাগ করে, সংগ্রামী যোদ্ধাদের জীবনেও প্রেরণা দেয় বরদৈচিলার (কালবৈশাখী) মতো করে দুঃখের নাগপাশ ছিন্ন করতে।)

এই যে বরদৈচিলা (বসন্তকালের আকস্মিক ঝঞ্ঝা, কালবৈশাখী) – এটা যেন গীতিকারের মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে থাকা এক ঝড়, বিপ্লবের এক অগ্নিশিখা। এই ঝঞ্ঝা মুহূর্তে সবকিছু তছনছ করে দেয়। সেটাই জাতিটির সাহস। কিন্তু গীতিকার বিভ্রান্ত – আজকের অসমে সত্যিই সেই কালবৈশাখী আসে কি? যেটা আসে সেটা কি বরদৈ না সরুদৈ চিলা, না অন্য কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি! সেই ভাবনায় 'বৈশাখ কেবলমাত্র একটি ঋতু নয়'র আগেই সত্তর দশকের শেষের দিকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন 'বরদৈচিলা' নামের অনুপম গীতটি –
বৰদৈচিলানে সৰুদৈ চিলানে
অসমৰ আকাশত বৰ বৰ চিলা
চিলাৰায়ৰ চিলানে কাকতৰ চিলানে
কাকতত থকা ভুৱা পৰিকল্পনা।
চিলানে শেননে ৰঙা নীলা চিলা
নে হাঁহিয়াতৰ পাত্র ধোদৰ পচলা
সৌবোৰ ঠোঁট যেন তেজহে সনা
শেন যেন লাগিছে চকুৰে নমনা
অসমীয়াই এইবোৰ ভাবি চাবৰ
ব'হাগতেই বতৰ কিজানি?
(বরদৈচিলা, সরুদৈচিলা –)

কথিত আছে অসমে বিহুর আগে বরদৈচিলা আর সরুদৈচিলা নামে দুই বোন বিহুর আগমন বার্তা পৌঁছে দিতে অসমের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। আসলে কালবৈশাখীর ঝড়-বৃষ্টি বসন্তের আগমনকে বোঝায়।তাকেই প্রতীক করা হয়েছে বরদৈচিলা ও সরুদৈচিলা বলে। 'চিলা' শব্দের অর্থ হচ্ছে ঘুড়ি।

("বরদৈচিলা না সরুদৈচিলা নাকি অসমের আকাশে বড়ো বড়ো ঘুড়ি, চিলা রায়ের চিলা না কাগজের ঘুড়ি, নাকি শুধুই কাগজে সীমিত থাকা ভুয়া পরিকল্পনা। ঘুড়ি নাকি বাজপাখি। লাল নীল ঘুড়ি নাকি হাসির খোরাক অকর্মার ঢেঁকি। ওদের ঠোঁট রক্তমাখা, দেখতে বাজপাখির মতো, এই বৈশাখ মাসই অসমিয়া মানুষের সময় ভেবে দেখার, চিনে নেবার।")

জাতিটির গতিপথের কণ্টককে যেভাবে তিনি চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন, সেভাবে আত্মবিস্মৃত জাতিটিকে ব্যঙ্গ করে জাগাতে চেয়েছিলেন গীতিকার। সহজ সরল অথচ ব্যঞ্জনাপূর্ণ কাব্য সুষমায় জনজীবনকে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন –
বাঁহতল শুৱনি কেতেকী বাৰীতে
ক'ৰবাৰ ফেঁটী সাপে বাহ ল'লে – ল'লে
কেতেকী ফুলিলে তগৰো ফুলিলে 
ফেঁটী সাপে গপাগপ তাকেই গিলিলে – গিলিলে...

(সুন্দর বাঁশবাগান আর কেতকী ফুলের বাগানে গোখরো সাপ বাসা বেঁধেছে। কেতকী, টগর ফুল ফুটেছে, আর সেগুলো গোখরো সাপ গপাগপ গিলে খাচ্ছে...)

গোখরো সাপের উপমাটি খুবই চিত্তাকর্ষক জনজীবনের জন্য। তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি যখন জনজীবনের দুঃখ এবং চেতনাহীনতার কথা বলেন, তার অভিব্যক্তি আমাদের ছুঁয়ে যায় –
তিল তিল কত তিল তিল পিঠা নাই
কুঁহিয়াৰ আছে তাত পেৰোঁতাহে নাই
অসমী আইৰে বৰ ঘৰ মজিয়াত
বৰ খুঁটা এলাহৰ ঘূণে খাইছে
এটি ধোদৰ আলি গঢ়ি হাত সাবটি 
অসমৰ ৰণুৱাই ৰং চাইছে ৰং চাইছে...

(তিল কোথায়? তিলের পিঠেও নেই। আখ তো আছে, আখের রস করার লোক নেই। অসম মাতৃর বৃহৎ বাড়ির ঈশান কোনের খুটি ঘুণে খেয়েছে। সেই ধোদর আলি (ধোদর আলি – অসমের এক প্রান্তসীমা থেকে তৎকালীন রাজধানী পর্যন্ত রাস্তা যুদ্ধের প্রয়োজনে অতি কম সময়ে গড়ে তোলা হয়েছিল অসংখ্য মানুষের সহযোগিতায়।) গড়ে তোলার মানুষজন হাত গুটিয়ে আছে। অসমের সংগ্রামীরা অবস্থা উপভোগ করছে কেবল...)

আবার শোষণের জাল পাতা 'চিলে'র উপমাটিও জনজীবনের দৈনন্দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত –
মূৰৰ ফুলাম গামোছাখনি 
ক'ৰবাৰ শেনে আহি নিলেহি কাঢ়ি
গ'ল গ'ল – গ'ল গ'ল 
বুলি মাথোঁ চিঞৰিলে
তাকে দেখি শেনহঁতে ৰগৰ কৰিলে।

(মাথায় বাঁধা ফুলতোলা গামছা কোথাকার কোন চিলপাখি
কেড়ে নিলো, গেল গেল বলে চেঁচালো সবাই, তাই শুনে চিলেরাও আমোদ পেলো।)

বিষ্ণু প্রসাদ রাভা বরদৈচিলার ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন যে, "বোড়ো সম্প্রদায়ের মানুষেরা বরদৈচিলা নামে একজন গোসাঁনি (গুরুমাতা)-র পুজো করতেন। 'বর' মানে বাতাস, 'দৈ' মানে জল বা বৃষ্টি, 'চিখলা' মানে যুবতী বা গোসাঁনি বা অপ্সরী। সংক্ষেপে বলতে গেলে বরদৈচিলা মানে হচ্ছে ঝড় বা বৃষ্টির গোসাঁনী।"[৭]

ভূপেন হাজরিকা এই ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করে গানে বরদৈচিলার অর্থ প্রদান করেছেন। ভূপেন হাজরিকার বরদৈচিলা আরেক ধাপ চড়া – তিনি 'সাহসের বৃষ্টি নিয়ে আসা' চিলা – বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে অসমিয়াকে একটা মন দেওয়া চিলা – নানা জাতি এক করা চিলা। কিন্তু সেই চিলা গীতিকারের দৃষ্টিতে আজকাল অসমিয়ার মনে স্থায়ী হতে পারলো না। গীতিকারের ক্রোধের উদ্রেক হয়েছে, কারণ বরদৈচিলা নিয়ে আসা ঝড় বা নতুনের উদ্যম যদি জাতির মধ্যে সংস্থাপিত না হয় তাহলে জাতির অগ্রগতি হবে কীভাবে? বছরে একবার আসা যাওয়ায় কী হবে? এই নতুনের ক্ষণটি যদি বছরের প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে যদি অনুভূত না হয়, তাহলে জাতির মান থাকে না। তাই গীতিকার গেয়েছেন –
বৰদৈচিলাজনীৰ আগচুলি থপিয়াই
মাটিলৈ নমাই আনি 
অসমীয়া মনটোত সুমুৱাই দিবলৈ
ব'হাগেই বতৰ কিজানি!

(বরদৈচিলার চুলের মুঠি ধরে মাটিতে নামিয়ে এনে অসমিয়া জাতির মনের গভীরে ঢোকাতে বৈশাখই বোধহয় প্রকৃত সময়।)

বৈশাখ ভূপেন হাজারিকার জন্য 'জ্বলন্ত অরুণ' এবং 'দুরন্ত তরুণ'।পুরোনো মূল্যবোধ তাঁর দৃষ্টিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া। তাই সেই মূল্যবোধের সমাধি খুঁড়ে তার হাড়গোড় পরিষ্কার করে তিনি অস্ত্র তৈরি করতে চান। সেই অস্ত্রে তিনি শোষণকারীকে বিনাশ করতে চান। তিনি বৈশাখে খুঁজে পান মুক্ত যুক্তি, নতুনের উদ্যম –
দেশৰ মাটিত তাৰ (ব'হাগৰ) ভৰি দুটা আছে 
ক'লা ক'লা চুলিবোৰে চুইছে আকাশ 
বাহু দুটা মেলি সি বুটলিছে তৰা
কণ্ঠত যুক্তিৰ মুক্ত প্রকাশ 
আকাশে ঢালে নতুনৰ বৰষুণ
ঢোল বাই নাচে দুৰন্ত তৰুণ...

(দেশের মাটিতে তার (বৈশাখের) পা দুটি আছে, কালো কালো চুলগুলো আকাশ ছুঁয়েছে। দু'বাহু মেলে সে আকাশের তারা কুড়াচ্ছে। কণ্ঠে তার যুক্তির মুক্ত প্রকাশ, আকাশ নতুন বৃষ্টি ঢালে, ঢোলের তালে নাচে দুরন্ত তরুণ।)

জ্যোতিপ্রসাদ বিহুর সাংস্কৃতিক সমাবেশে নতুন সংস্কৃতি গড়ার স্বপ্ন দেখার মতো ভূপেন হাজরিকাও আজকের বিহুতলী কেমন হওয়া প্রয়োজন বলেছেন। সত্তর দশকের কথা। নাওবৈচা কেন্দ্র থেকে তিনি বিধায়ক হয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা যে তাঁকে বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল সেই কথা উল্লেখ করে তিনি বিহুর আবহে 'আমার প্রতিনিধি'-তে তিনি লিখেছিলেন – "বিহু উদ্‌যাপন করতে গেলে এক তোলা সোনার গয়না গড়ে এখন কোন অসমিয়া দেবে? গত বছর খেতে কি ভীষণ কষ্ট। গতবার থেকে এবার শতকরা ১৭ ভাগ দাম বাড়লো খাদ্যের। সাধারণ কর্মীর অর্জনের শতকরা ৬০ ভাগ ভাত ডাল কিনতেই চলে যায়। এবার বিহু কীভাবে উদ্‌যাপন করবে সাধারণ মানুষ?... এবার মানুষ সর্বজনীন বিহু মণ্ডপগুলিতে একতার ভিত্তিতে করার ওপরেও করবে লোকসমাজের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা মানুষের প্ল্যাটফর্ম রূপে।... মানুষ বিহু মণ্ডপে উঠে একসঙ্গে চিৎকার করুক এবং শাসক রাজপুরুষদের জানিয়ে দিক: জনসাধারণ এই পরিপাটি সাজে সজ্জিত প্রভুদের বাঁকানো দোলা আর বহন করতে চায় না। তারা রাজদ্বারের সামনে এলে দোলনাবাহকরা আর দোলনা পাতে না।"[৮]

লেখাটিতে নিজের স্থিতি এভাবেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন – "আমি বিশ্বাস করি মানুষকে মানুষের ভাবা শক্তির রূপান্তরের সম্ভাবনাটিকে।আমার জন্য বাস্তবনির্ভর জীবনপ্রেম বৈচিত্র্যময় এবং প্রাণবান। নগ্ন বাস্তবতার সম্মুখীন হলেই মানুষ নিজে ভাবতে শেখে, নিজেই বিচার করে, নিজেই মূল্যায়ন করতে পারে। উদ্ভব হয় যুক্তিসঙ্গতভাবে স্ব-আবিষ্কৃত মূল্যায়নের। এই মূল্যায়ন পাঠ্যপুথি বা নীতিশাস্ত্র থেকে হয়তো পেতে পারি। কিন্তু আমার কাছে তা হয়ে ওঠে শুধু কাব্যিক কিছু একটা, রোমান্টিক কিছু একটা, অপরিচিত কিছু একটা। তাই বাস্তবের জলকচুতে ভরা ভয়াবহ কাদায় গভীর রাতেই নেমে হলেও পদ্মফুল তুলে আনার উপরই আমার বিশ্বাস।"[৯]

ভূপেন হাজরিকা বিহুকে সমাজ রূপান্তরের কৃষ্টি হিসেবে দেখেছেন এবং বিহুগীত এবং বিহুর সুরে গাওয়া গানের মধ্যে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। সমাজ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে রূপান্তরের সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায় না। সংস্কৃতি যে সমাজ রূপান্তরের হাতিয়ার হতে পারে এই শিক্ষা তিনি আমেরিকায় পল রবসনের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। রবসনের অনুষ্ঠান দেখে তিনি উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে তিনি লিখেছেন – "তাঁর গান আমাদের বিদ্যুৎ প্রবাহের মতো ছুঁয়ে গেল। বিদ্যুৎ সঞ্চারে সহস্র মানুষ যেন উদ্‌বুদ্ধ হলেন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। তাঁর গাওয়া গান আমাদের নতুন সংগীত জগতের বার্তা দিল। তাঁর গান গাওয়ার ধরন ছিল অভিনব শৈলীর। গানের প্রতিটি শব্দ ছিল স্পষ্টভাবে উচ্চারিত। ফলে শব্দের সম্পূর্ণ অর্থ শ্রোতার অন্তর আত্মাকে স্পর্শ করেছিল।"[১০]

রবসন হাতে থাকা গিটারটি তুলে ধরে ভূপেন হাজরিকাকে বলেছিলেন, সেটা শুধুমাত্র বাদ্যযন্ত্র নয়, সমাজ পরিবর্তন করা যন্ত্রও ("Guitar is not a musical instrument, it is a social instrument.") আমেরিকা থেকে এসে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তাই সংযুক্ত হওয়ার যুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। সংঘের মঞ্চ থেকেই তাঁর রচিত বহু গানে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল পুরোনো সামন্তবাদী সমাজ ভেঙে সাম্যবাদী সমাজ গড়ার স্বপ্ন। প্রতিধ্বনিত হয়েছিল শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামী চেতনা জাগিয়ে তুলতে তাঁর গানের ভাষা হয়ে উঠেছিল শানিত। এই ছিল গণনাট্যের চেতনা। ষাটের দশকের উত্তাল গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের তরঙ্গ। ভূপেন হাজরিকার তেজস্বী হৃদয়ে ঝংকার তোলা গানগুলি এই সময়েই রচিত।

গণনাট্যের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি লিখেছিলেন খুব সম্ভবত জীবনের প্রথম বিহুগীত, যে গানে মুখর হয়েছিল প্রখর শ্রেণি চেতনা। এই দীর্ঘ বিহুগীতটি তাঁর জীবনের এক টার্নিং পয়েন্টও। কারণ এই গানের জন্য তাঁকে বহু গঞ্জনাও সহ্য করতে হয়েছিল। লতাশীল বিহুতলীতে তাঁকে গান গাইতে দেওয়া হয়নি। হেমাঙ্গ বিশ্বাস গানটি ছাপিয়ে পরদিন বিহুতলীতে বিতরণ করেছিলেন।

কী ছিল গানটিতে? বিহু গানের সমস্ত কলি, ব্যঞ্জনা, শব্দচয়ন ব্যবহার করে তিনি সাধারণ মানুষকে গানের মধ্য দিয়ে সমাজ বাস্তবের সঙ্গে মুখোমুখি করে দিয়েছিলেন। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শ্রেণি সংগ্রাম ছাড়া সমাজের পরিবর্তন হতে পারে না – গানের মূল উপাদান ছিল সেটাই। তাই তিনি বিহুর সুরে গেয়েছেন 'আজকের গান' –
ছাগৰ ছাল ছেলাবৰ ডবুৱা কটাৰি
পহুৰ ছাল ছেলাবৰ মিট
দেশৰ বুঢ়া মেথা দায়ে নধৰিবা
গাই যাওঁ আজিৰে গীত।...
দলদোপ দলদোপ হেন্দোলদোপ
অ' দেশৰে ৰাইজখন চা,
সমাজৰ পথাৰত চহকী খেলুৱৈয়ে
ৰাইজক সাজিছে ঢোপ, 
বোলো চাই যা, ৰংমন চাই যা –

(ছাগলের ছাল ছাড়ানোর ছুরি আর হরিণের চামড়া ছাড়ানোর ছুরি আলাদা আলাদা। সমাজের প্রবীণেরা আমার দোষ ধরোনা, আমি আজকের গান গাইবো –
দেখে যাও রংমন – দেখে যাও জনতা,
ধনী খেলোয়াড়রা কেমন জনগণকে বোকা বানাচ্ছে।)

বিহুর বিখ্যাত সুরের মধ্যেও ধনীদের দ্বারা জনগণের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা তিনি বলে যান – তিনি বলে যান দুঃখদৈন্যের কথা – মহাজনি শোষণের কথা –
ইফালেদি লথিয়াই নাজিতৰা
সিফালেদি লথিয়াই তোক
ৰঙালী বিহুটিক কঙালী কৰিলে
পেটৰে নুগুচে ভোক, নাজিতৰা
পেটৰে নুগুচে ভোক।
দুদিন বিহু কৰি এবছৰ কান্দিবি
গিলিবি দুখৰে ঢোক 
গাঁৱৰে এইগাল লোক হ'ল মহাজনৰ ঢোপ
বোলো চাই যা ৰংমন চা –

(এদিক ওদিক থেকে লাথি খাচ্ছো তুমি, রঙালি বিহুকে কাঙালি করেছে, খিদের জ্বালা কমছে না, দু'দিন বিহু করে বছরের বাকি দিনগুলো কাঁদবে আর দুঃখের ঢোক গিলে যাবে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ আজ মহাজনের টোপে, দেখে যাও রংমন – দেখে যাও –)

আবার তাঁতিনির মনের ব্যথাকেও গীতিকার বিহুতলীতে নিয়ে আসেন –
শুদা শুদা মাকোটি খট খট চলে
বোৱনীয়ে হেঁপাহেৰে চানেকী ললে
ক'লা ক'লা বজাৰত সূতাৰ দাম দেখি 
দুখুনীয়ে পাইছে শোক, ৰাইজৰ এইগাল লোক 
হ'ল কাৰোবাৰ ঢোপ 
বোলো ভদীয়া চাই যা, চাই যা, চাই যা ঐ।

(ওরে অভাগা দেখে যা – শুধু খালি মাকুর খটা খট শব্দ, সুতোর দাম এতই বেড়েছে যে তাঁত বোনা বাদ দিয়েছে লোকে।)

রবসনের গানে তিনি পেয়েছিলেন বর্ণবৈষম্যের কথা এবং এখানে তিনি দেখিয়েছেন অর্থনৈতিক বৈষম্য –
দুজন এজনে কলঘৰ সাজিছে
থানে থানে কাপোৰ ওলায় 
উৰণীয়া জাহাজত চিলিক আহিছে
আমাৰ বিহু কাপোৰ নাই।

(দুই একজন কাপড় বোনার কারখানা করেছে, থান থান কাপড় হচ্ছে, উড়োজাহাজে রেশম কাপড় আসছে, কিন্তু বিহুতে আমাদের কাপড় জোটে না।)

কিন্তু গীতিকারের চোখ কান খুবই সতর্ক। বিহু উৎসবে মেতে থাকা মানুষকে অনেক খবর দিতে চান। কারণ এই খবরগুলি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত। তা হলো যুদ্ধের খবর। যুদ্ধ যে ধ্বংস ডেকে আনে তার খবর। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই গানগুলি রচনার সময়ে পৃথিবীতে যুদ্ধের রণশিঙা বাজিয়ে ছিল সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি। অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে দেশে দেশে শান্তির উদ্যোগও গড়ে উঠেছিল। এই গানটিতে তার প্রকাশে গীতিকারের গভীর দায়বদ্ধতার নিদর্শন তুলে ধরে –
কোনোবা সমুদ্রত বোমা ফুটুৱালে 
ক'ৰবাত পৰিলে ছাই 
এগণ্ডা বোমাৰে পৃথিৱী পুৰিব
ক'ৰবাৰ ৰণ বলিয়াই।
উদযান বোমাৰে গুণগান বখানি
নকবি এনেকৈ মোক
বোলো ৰণ হ'লে খাম কি?
ৰণ হ'লে গাম কি?
মৰিব দেশৰে লোক।

(কোথাও বোমা পড়ল, কোথায় এসে পড়ছে ছাই, এক গণ্ডা বোমায় পৃথিবী পোড়াচ্ছে, কোথাকার যুদ্ধবাজ পাগল,
বোমার গুণগান বন্ধ করো, যুদ্ধ হলে খাব কি? যাবো কোথায়? মরবে দেশের সাধারণ মানুষ।)

লক্ষণীয় বিষয় এটাই যে, যুদ্ধের কথা বলার সময় প্রকাশভঙ্গিতে গ্রামীণরূপটি বিহুর মর্মকেই তুলে ধরে –
শান্তিৰে নিজৰাত নিজৰি ৰুবলৈ
আমি হ'ম বৰশীৰ টোপ 
অতিকৈ হেঁপাহৰ বহাগৰ বিহুটিও 
সুৰে-চুৰে পাবগৈ লোপ।

(শান্তিতে নিজের মতো করে থাকতে, আমরা হব বড়শির টোপ, অতি আপন বৈশাখের বিহুর সুরও পাবে লোপ।)

কিন্তু গীতিকার কেবল মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা বর্ণনা করে নিজের দায়িত্ব শেষ করেন নি, মানুষের মধ্যে দেখতে পেয়েছেন মনের দৃঢ়তা তথা সংগ্রামী চেতনাও। তিনি শুনতে পেয়েছেন –
পাহাৰে ভৈয়ামে টঙালি বান্ধি লৈ
ৰাইজে ক'লেহি মোক
জীৱনটো পণ কৰি নিজে হেনো খেদিব
সমাজৰ তেজ শোহা জোক 
অ'দেশৰে রাইজখন চা...

(পাহাড় আর সমতলে মানুষ কোমর বেঁধেছে, জীবন পণ করেছে সমাজের রক্তচোষা জোঁকগুলোকে তাড়াতে, ওগো দেশবাসী তোমরা দেখে যাও।)

মৌজাদারের আঙিনা পরিষ্কার করতে করতে কোমর বাঁকা হয়ে যাওয়া কৃষকের কাস্তেটির মধ্যে গীতিকার তীক্ষ্ণ ধার দেখতে পেয়েছেন। গানের শেষে 'হে মাননীয় জনগণ' এবং 'হে গ্রামের সাহসী মানুষ' বলে সম্বোধন করে তিনি গিয়েছেন যে কেড়ে নেওয়া জমি, বন্ধকের জমি মানুষ পেলে মানুষের ক্ষুধা তৃষ্ণা চলে যাবে। তখন 'বিহুতলী মুখরিত হবে – নাচবে দেশের লোক।' তাই জনসাধারণকে তিনি বলছেন –
বোলো দেখিবি ন ন ৰূপ 
বোৱঁতী সুঁতিটো ভেটিব নোৱাৰি
ভেটা ভাঙে ঘনে ঘনে
বিদ্রোহী ৰাইজে কঢ়িয়াই লৈ যোৱা
সংগ্রামক ভেটিব কোনে?
বোলো দেশৰে ৰাইজখন আগুৱাই যা
বুকু পাতি যা 
দলদোপ দলদোপ হেন্দোলদোপ 
ধেমালি চাই যা –

(তোমরা দেখে যাও, নতুন রূপ, বহমান স্রোতকে যেমন বাধা দেওয়া যায় না, বাঁধ ভাঙে বার বার, তেমনি বিদ্রোহী জনতার সংগ্রামকে বাধা দেবে কে? দেশবাসী বুক চিতিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আন্দোলনে, তোমারা এসে দেখে যাও।)

উপসংহার

ভূপেন হাজরিকার সমগ্র গানের যে আবেদন তার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে বিহু এবং বৈশাখকে নিয়ে লেখা গানগুলিও। বিহুগীত এবং বৈশাখের গানগুলিতে বিহুর কৃষ্টির আবর্তে তাঁর গানের যে স্ফূরণ তা খুবই প্রাণস্পর্শী। অসমিয়া গীতি সাহিত্যে তার স্থান স্বতন্ত্র। বিহুগীতকে সমাজ রূপান্তরের একটি বলিষ্ঠ প্রকাশ হিসেবেই তিনি যে গ্রহণ করেছিলেন তা গানের কথায় পরিস্ফুট। কিন্তু তা রচনা করতে গিয়ে গানগুলি স্লোগানধর্মী হয়নি। তাতে গ্রাম্য অভিব্যক্তি – যেমন শব্দ চয়ন, ব্যঞ্জনা সবকিছুই জনজীবনে প্রবাহিত হয়ে থাকা। তাই শ্রোতারা গানের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান। একই ধারায় বিহুগীত বা বিহুর সুরে রচনা করা তার সমসাময়িক আরেকজন প্রখ্যাত গীতিকার হলেন কেশব মহন্ত। তিনিও যুক্ত ছিলেন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে। অর্থাৎ তাদের দু'জনের গানেই একটা সুর ও গানের মধ্যে সমাজ রূপান্তরের সাধনা।

ভূপেন হাজরিকার আরো দুটো অতিরিক্ত প্রতিভা তাঁর গানকে করে তুলেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। সেটা তাঁর সুরের লালিত্য এবং সম্মোহিনী কণ্ঠ। শ্রোতা-জনগণকে কীভাবে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে পারা যায় তা তিনি আয়ত্ত করেছিলেন বিদ্যায়তনিক শিক্ষাকালে। তিনি গণসংযোগ বিষয়ে গবেষণা করে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার মতো তিনিও মানুষের মধ্যে বিচরণ করে সুরের সন্ধান করতেন, আয়ত্ত করতেন গানের ভাষা।


উৎস:

১) পরমানন্দ মজুমদার (সম্পা.), হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনাবলী, দ্বিতীয় সংস্করণ, অসম প্রকাশন পরিষদ, ২০১৬, পৃষ্ঠা: ১৩২।
২) হীরেন গোহাঁই (সম্পা.), জ্যোতিপ্রসাদ রচনাবলী, অষ্টম সংস্করণ, অসম প্রকাশন পরিষদ, ২০১৩, পৃষ্ঠা: ৪৯৬।
৩) যোগেশ দাস (সম্পা.), বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা রচনা সম্ভার, দ্বিতীয় খণ্ড, রাভা রচনাবলী, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা: ১৩৩৩।
৪) ঐ, পৃষ্ঠা: ৪৪৩।
৫) পরমানন্দ মজুমদার (সম্পা.), পছোয়া, অসম সাহিত্য সভা, ৩০২১, পৃষ্ঠা: ৪৪২।
৬) ঐ, পৃষ্ঠা: ৪৪৩।
৭) যোগেশ দাস (সম্পা.), পূর্বোক্ত পুঁথি, পৃষ্ঠা: ১৩৩৪।
৮) পরমানন্দ মজুমদার (সম্পা.), ভূপেন হাজরিকা: গতির পরা আমার প্রতিনিধিলৈ, অসম প্রকাশন পরিষদ, ২০১২, পৃষ্ঠা: ২২৮।
৯) ঐ, পৃষ্ঠা: ২২৯।
১০) ঐ, পৃষ্ঠা: ২৫৩-৫৪।

['বিহু, ব'হাগ আৰু ভূপেন হাজৰিকা' – এই মূল প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদ করেছেন সন্দীপ দে। প্রবন্ধটিতে উল্লেখিত গানের পঙ্‌ক্তিগুলির বাংলা ভাবানুবাদ করা হয়েছে।]

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, চিন্তাশীল লেখক, গ্রন্থ প্রণেতা। নিবাস: গুয়াহাটি, অসম।