
চৈত্রদিন শুরু হলেই, আমাদের কৈশোরে বেণীমাধব শীলের মলিন পঞ্জিকাটা শেষ পাতাগুলোয় চলে আসত। বসন্ত একটু উগ্র, খোলা রোদে ত্বক তেতে ওঠে, টের পাওয়া যায় দিন লম্বা হচ্ছে। বাতাসে হল্লা বাড়ে, ধুলো ওড়ে, মনের মধ্যে একটু বৈরাগী ভাব। বেলা চড়লেই দরজায় দরজায় 'বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লা–গে, মহাদেব!' সুর তুলে, তৈলহীন রুক্ষচুল আর হজাগজা শরীরে গেরুয়া জড়িয়ে, দূর দূর গ্রাম গাঁ থেকে প্রার্থীর ভিড়। ভিখিরি নয় এরা, মানত রক্ষা করতে বেরিয়েছে। বিশুদ্ধ বিশ্বাসে ভর করে নানা প্রকারের দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পেয়ে, সারাটা চৈত্রমাস গেরস্তের কাছে হাত পেতে, একাহারি থেকে, বাঁকে জল নিয়ে সংক্রান্তিতে পাড়ি জমাবে বাবার থানে। এদের মালসায় দুটো পয়সা, কি চাল বা একআধটা আলু বেগুন পটল ফেলে দিতে পারলে, গেরস্তরাও পুণ্যার্জনের দরুন, গোপনে কপালে আঙুল ঠেকাত, বাবার উদ্দেশে।
কোনো কোনো দিন খর দুপুরের পর, ঈশান কোণে ডম্বরুর আওয়াজে মেঘগর্জন, ক্রমশ আকাশ ছেয়ে গেলে ঝড়-বৃষ্টি। কালবৈশাখী। ডালপালা কাঁপার শব্দ, ধুলো আর শুকনো পাতার ওড়াউড়ি। আনন্দে, অচেনা কোনো মুক্তির উন্মাদনায় বাইরে ছুটে যেতাম দু'হাত ছড়িয়ে। কৈশোরে আমার অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল, এইসব ঝড়ে মেঘ ভেঙে কোনো একজন, ডানার মতো দু'হাত মেলে, দাড়ি-গোঁফ সহ, মেয়েদের মতো বেণীবাঁধা চুল নিয়ে, এই মর্ত্যে নেমে আসবেন। তাই 'ওই এলেন!' 'উনি এলেন!' বলে কৈশোরে বহুবার আমি চৈত্রের কালবৈশাখীতে চিৎকার করতে করতে পথে ছুটে গেছি 'উনি আসছেন!... উনি আসছেন!...' বলে। সেসব দিনে, ঝড়ে ইলেকট্রিক তার ছিঁড়ে পড়া, কিংবা ঘনঘন বজ্রাঘাতে মৃত্যুর রেওয়াজ ছিল না। তখন আমার বয়স ছিল ১৮। আজ অঙ্কদুটো উলটে সংখ্যাটা বদলে গেছে।
তখন সবে বিজ্ঞান নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে কলেজে ঢুকেছি। বাংলাপাঠ্যে রবীন্দ্রনাথের 'বর্ষশেষ' কবিতাটি পড়তে হতো। লম্বা কবিতা। সেদিন এর অর্থ বুঝিনি, তবু মোহগ্রস্ত ছিলাম। আজও সব পঙ্ক্তি ভুলিনি। "ঈশানের পুঞ্জমেঘ অন্ধবেগে ধেয়ে চলে আসে/ বাধাবন্ধ হারা/ গ্রামান্তের বেণুকুঞ্জে নীলাঞ্জনছায়া সঞ্চারিয়া –/ হানি দীর্ঘধারা।" হয়ত কবিতাটির এফেক্টে, অবচেতনে কালবৈশাখী জাগলেই আমি পথে পথে ছুটে, উনি আসছেন বলে দেখতাম, ডানার মতো লম্বা দু'হাত মেলে, কোনো পুরুষ মর্ত্যে নেমে আসছেন।
এভাবেই বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকার পাতা ফুরিয়ে আসত। হাজির হতো চোত সংক্রান্তি। আগের দিন নীলপুজো। গঙ্গাস্নান। আর সংক্রান্তির দিন গেরস্থরা হাঁড়ি-পাতিল বাতিল করে, নতুন বছরের জন্য নতুন হাঁড়ি বা পুরোনোকে মাজাঘষা করে 'নতুন' বানিয়ে তুলত। একেই গেরস্থরা বলত 'হাঁড়ি-পাতিল ফেলা'।
পরদিন নববর্ষ। ঘরে ঘরে নতুন পঞ্জিকা। পুরুতঠাকুর পাতা উলটে শোনাতেন এবার দেবীর আগমন কিসে, গমনও বা কিভাবে! এরপর পুজো, ঘরে ঘরে জোগাড়। এবং ঘরের পবিত্র স্থানগুলোয় ফুল ও চন্দনের ছোঁয়া দেওয়া। সকাল সকাল স্নান সেরে, নতুন জামাকাপড় পরিধান। হতদরিদ্রের সংসারেও নতুন একখান গামছা অন্তত ঢুকবে।
এরপর পুরুষদের বাজার-হাট করা, ভালোমন্দ রান্না। গরিব, অতিদরিদ্রের ঘরেও সেদিন মাছ হবে। অন্তত, মাছের কোনো কিছুতে ছোঁয়া থাকবেই। মধ্যবিত্তদের ঘরে পাঁঠার মাংস। সেই 'বাবা তারকনাথের চরণে'-র শুরু থেকেই, আমরা স্বপ্ন দেখতাম, নববর্ষের দিন মাংস খাব। সে-কালে, বিরিয়ানি বা চিকেন চাপ-এর প্রচলন ছিল না। তবু নববর্ষ ছিল বাঙালি জীবনের অন্যতম উৎসব।
বিকেলে, সংসারের পুরুষরা – বিশেষ একটু স্বচ্ছল পরিবারের – হালখাতার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতেন। সারা বছরের ধারে আনা মুদি-মশলা-চাল-এর মূল্য মিটিয়ে, শরবত ও এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে ফিরে আসেন। ১লা বৈশাখ থেকে নতুন খাতায় হিসেব হবে। দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা পবিত্র কলাগাছ পুঁতে, লাল রঙের খাতা উদ্বোধন করে, সিদ্ধিদাতাকে স্মরণ করে, বিকেলে এভাবে ক্রেতাদের গ্রহণ করবেন। এটাও, একপ্রকার সামাজিক সম্পর্ক। এভাবেই সারাটা দিন ধরে, খাদ্যে, পোশাকে, পুজো-আচ্চা ও পুরোনো বছরের মলিনতা মুছে, সামাজিক অনুভবে একপ্রকার প্রীতি মন-প্রাণ আচ্ছন্ন করে রাখত।
আজ ৮২ বছরে এসে, কালবৈশাখীর ঝড়ে, ছুটে যাইনা। ঝড়ের মধ্যে, মেঘফুঁড়ে কোনো অলৌকিক পুরুষের ডানা মেলে মর্ত্যে নামার কল্পছবিটি মুছে গেছে। তবু নববর্ষ আসে, যার সূচনা হয় চৈত্রের দিনশুরুর পর। 'শুভ নববর্ষ' ভেসে আসে ১লা বৈশাখ সকালে, মুঠোফোনের মধ্যদিয়ে। চৈত্র এখন আমাদের কাছে মার্চ-এপ্রিল। সংবাদপত্রে, আবহাওয়া দপ্তরের নির্দেশে টের পাই, গতকালের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি ছিল এবং আগামী সপ্তাহে তা আরও বাড়বে। কেবল চৈত্রসেলের বিজ্ঞাপনে, সোনার দোকানগুলোর ছাড় দেওয়ার বিজ্ঞপ্তিতে বাঙালি মধ্যবিত্ত টের পায়, নববর্ষ আসছে। শহর এবং প্রসারিত শহরাঞ্চলে নীল সংক্রান্তি, ঝাঁপ ইত্যাদি লুপ্ত। আর সারা চোতমাস ধরে দরজায়-দরজায় 'বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে', ভক্তিময় বিশ্বাসের কণ্ঠে কোনো মাগন-চাওয়া পুরুষ-মহিলা দেখি না।
তবু নববর্ষে সরকারি অফিস এবং ব্যাঙ্ক ছুটি থাকে। সংবাদপত্রে চুনোট ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের বিজ্ঞাপন – ছাড় দিয়ে শাড়ি-গয়না বিক্রির জন্য – আমাদের সামান্য স্মরণ করায়, ওহ! তাহলে নববর্ষ।
প্ল্যানিং হয়। কোন রেস্তোরায় বাঙালি খাবার তুলনায় বেশি বিচিত্র। আগাম বুকিং করে রাখি। অথবা অনলাইন। উচ্চমধ্যবিত্তের ঘরে ছাড় দেওয়া গয়না কেনার চল ওঠে। আর, বড়ো বড়ো দোকানে কি হয়, চৈত্রসেল-এর নামে, আগামী পুজোর জন্যও, গাদাগাদা পোশাক কিনে পুলকিত হই 'ভেরি চিপ্' ভেবে!
বাজার-হাট খাঁ খাঁ করে। কারা পাঁঠা খাবে? 'ভজহরি মান্না' থেকে 'ভূতের রাজা দিল বর' এবং এ-জাতীয় অসংখ্যর হাতছানিতে, নববর্ষের বাঙালি পরিবার সেদিন কিচেনমুখো হয় না। অথচ বাঙালি অস্মিতায় এই নববর্ষের দিনে, একটু সেন্ট-পাউডার ছিটিয়ে শ্লাঘা বোধ করে। একটু রবীন্দ্র-স্মরণ, একটু বাংলা গান বা বিকেলে অর্ধগ্লাস কোল্ডড্রিংকস-এ চুমুক দিয়ে, ডিজে শুনে বাড়ি ফেরা। জো়ম্যাটো-বয়দের ঘন ঘন ছোটাছুটি।
এই কর্পোরেট নববর্ষে বুদ্ধিজীবীর একটি ক্ষুদ্র অংশ কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশনালয়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত উপস্থিত থেকে লেখকসত্তার তৃপ্তি ঘটায়। বাংলা বইয়ের পাঠক কমল, বাড়ল কি শুন্যপথে উধাও – কোনো বেদনা নেই।
এখন কালবৈশাখী নেই। শুধু আছে নিম্নচাপ, বাতাসে জলীয় বাষ্প এবং বিহার, ঝাড়খণ্ড ধরে পশ্চিমবাংলার বুকে একটি অক্ষরেখার চিহ্ন।
একদা ভিসুভিয়াস থেকে উদ্গত লাভায় পম্পাই শহর চাপা পড়েছিল। আমাদের সবকিছুই – উৎসব, আনন্দ, জাতির ইতিহাস – সবই কর্পোরেট সংস্কৃতির পুরু আস্তরণে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। তবু আমরা নববর্ষের দিন একটু 'বাংলা' 'বাংলা' চিন্তায় হৃদয়ে সুবাতাস বয়ে আনার চেষ্টা করি। চৈত্রসেল এখন আমাদের আর্থিক ক্যালেন্ডারে জাতীয় উৎসব। আমরা কি লাভার চাপে সময়কে স্তব্ধ বানিয়ে মমি হয়ে গেছি?
এটা সম্ভবত, আমার নববর্ষ নিয়ে একটু আধটু নিহিলিস্ট ভাবনা। যৌবনের সেই দিনগুলোর কল্পনার দরজায় অর্গল পড়ে গেছে বলে। তবে, 'বর্ষশেষ' কবিতাটার কিছু অংশ জীবনের শেষ ধাপেও ভুলতে পারিনি – "বিদ্যুৎবিদীর্ণ শূন্যে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলে যায়/ উৎকণ্ঠিত পাখি।"... এবং "উড়ে যাক, দূরে যাক বিবর্ণ বিশীর্ণ জীর্ণ পাতা/ বিপুল নিশ্বাসে।"
এরই নাম কি জীবন? যা পরাজিত হয়, কিন্তু ধ্বংস হয়ে না? 'নববর্ষ' কোনো বিশেষ দিন নয়, চিরকালীন কল্পশক্তির কোনো ঝড়ের বুক চিরে মধ্যে নেমে আসা।

পরিচিতি: বাংলার অন্যতম কথাসাহিত্যিক। নিবাস: দক্ষিণ পানশিলা, কলকাতা-১১২।