
এবারের 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'র নাম আবার বদল করে রাখা হয়েছে, 'বৈশাখী শোভাযাত্রা', এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মঙ্গল শোভাযাত্রার নামকরণ করেছিল 'আনন্দ শোভাযাত্রা'।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের আয়োজনে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে ঢাকার শাহবাগ-রমনা এলাকায় এই শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শোভাযাত্রায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্তরের ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। এছাড়াও বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ, বিভিন্ন রংয়ের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়।
এতো বছর ধরে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে রং-বেরঙের মিছিলটা বের হয় তা আমরা জানতাম 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামেই, কিন্তু এখন দেখছি আমাদের কারো কারো কাছে এই নামটি গ্রহণযোগ্য নয়! এক বিশেষ শ্রেণির কাছে নামটিতে হিন্দুয়ানি গন্ধ রয়েছে, সরাসরি বললে নামটি নাকি হিন্দু সংস্কৃতির সাথে জড়িত বা 'মঙ্গল' নামটি হিন্দু নাম, সুতরাং ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে এই নাম গ্রহণযোগ্য নয়। তাই মুসলিম নাম দিতে হবে!
আচ্ছা, 'বৈশাখী' বা 'আনন্দ' কি মুসলিম নাম, এই নামগুলো হলো বাংলা নাম। আমাদের এককালের ধর্ম-নিরপেক্ষ রাষ্ট্রটির কর্তারা এই 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামটা ধরে রাখতে পারলেন না। আমি নিশ্চিত রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব অর্পিত কর্তাদের ওপর অনেক চাপ ছিল নাম পরিবর্তনের, তারা সেটা মেনে নিয়েছেন।

শুধু যে নতুন নামে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা' হচ্ছে তাতেও কেউ কেউ সন্তুষ্ট নন, দেখলাম হাইকোর্টে রিট পিটিশন করা হয়েছে, এই 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না, এটাকে চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
আমাদের মাঝে এই শ্রেণির মানুষেরা প্রচণ্ড রকম ধর্মীয় সংকীর্ণতায় বিশ্বাসী। ধর্মীয় চেতনার চাপে তারা বাংলা সংস্কৃতির সাথে হিন্দুয়ানাকে গুলিয়ে ফেলে। আমাদের দেশের বিভিন্ন মানুষের, স্থানের, নদীর, গাছের, ফুলের সহ যেদিকেই তাকান বাংলা নাম ছড়িয়ে আছে, এখন কি এই সকল নাম বদল করে মুসলিম নাম দিতে হবে। পক্ষান্তরে কারো কারো পছন্দের বিকল্প মুসলিম নামগুলি হলো আরবীয় নাম। যেহেতু আমরা বাঙালি মুসলিম আমাদের বাংলা নাম রাখা যাবে না, রাখতে হবে আরবীয় নাম। এটা কোথায় বলা আছে? আরেকটি কথা আমাদের দেশে মুসলমান ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষও আছেন সেই আদিকাল থেকেই। দেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল তখন জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ ছিল হিন্দু, ২০২৬ সালে এসে তা কমে এসেছে ৮-১০ শতাংশে। কেন এই সংখ্যা কমে যাচ্ছে সেই আলোচনায় না-ই বা গেলাম, কিন্তু হিন্দুরা আমাদের দেশের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেটা আমরা মানি বা না মানি, আমাদের দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রসারে হিন্দুদের অবদান মুসলমানদের চেয়ে বেশি।
এখন ধরুন 'মঙ্গল' নামটি বদল করছেন, এরপর কোন নামটা পরিবর্তন করবেন! আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা, বড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত – বুড়িগঙ্গা নিশ্চয়ই মুসলমান নাম না, তো এখন বুড়িগঙ্গার মুসলমান নাম খুঁজতে হবে! আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা, পাখি দোয়েল, ফল কাঁঠাল – সবই বাংলা নাম। সুতরাং এই সকলকিছুর জন্য মুসলিম নাম বের করতে হবে। এত হাজার হাজার বাংলা নাম আমাদের দেশে – সবগুলির জন্য এখন মুসলমান নাম দিতে হবে। নামের যে ধর্ম হয়, একমাত্র বাংলাদেশেই তার প্রমাণ আছে! বলতে দ্বিধা নেই, এই চলটি ভারতেও আছে!
আমার বন্ধু মহলে যারা টরন্টোতে থাকে তাদের মধ্যেও এক শ্রেণির মানুষ এই পরিবর্তনকে সমর্থন করে। আমার দুই ছেলে, একজনের নাম সৌমিক, অন্যজনের নাম শ্রেয়ান। আমার বন্ধুদের অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কেন ছেলেদের হিন্দু নাম রেখেছি। যতই বলি এগুলো বাংলা নাম, নামের আবার হিন্দু মুসলমান হয় নাকি।
আমার এই শ্রেণির বন্ধুরা টরন্টোতে আসবে তাদের কাজের জায়গায় নামাজের নিদৃষ্ট স্থান নেই, নিজেরা পেট পর্যন্ত দাড়ি রাখবে, আলখাল্লা পরে কাজে যাবে, তাদের স্ত্রীরা বা মেয়েরা নিকাব বা হিজাব পড়বে এবং তাদেরকে কানাডাতে নিজস্ব ধর্মচর্চা করার অধিকার দিতে হবে, কিন্তু দেশে হিন্দু (যেটা আসলে বাংলা নাম) নাম রাখা চলবে না। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার আমি দেখেছি, বেশ কিছু দেশে যেমন ফ্রান্স, সুইডেন, অস্ট্রিয়া, এমনকী কানাডার কুইবেকে কমন স্পেসে নামাজ পরা নিষিদ্ধ করেছে, সেই সাথে পাবলিক প্লেসে মেয়েদের নিকাব নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সেখানকার মুসলমান সমাজ এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার পর একজন মুসলমানকেও দেখিনি একসকল দেশ ত্যাগ করতে।
আবার নাম পরিবর্তনের আলোচনায় ফিরে আসি, আজ না হয় জোর খাটিয়ে 'মঙ্গল'কে 'বৈশাখী' করলেন, কিন্তু আমাদের বাংলা বছরের মাসগুলি, সপ্তাহের দিনগুলি, গ্রহ নক্ষত্রের সব নামগুলি বাংলা নাম। আমি দেখার অপেক্ষায় রইলাম এই সকল মুসলমান নামে বিশ্বাসী ভাইয়েরা কি করে এইসব নামগুলি পরিবর্তন করেন!
আমি আগে বাংলাদেশি, তারপর পরিচয় বাঙালি, শেষে আসে আমি মুসলমান। যে কোনো দেশে যান, ধরুন আমেরিকাতে যেভাবে ডেসক্রাইব করা হয় জনগোষ্ঠীকে – প্রথমে আসে তার এথনিসিটি যেমন নেটিভ আমেরিকান, ব্ল্যাক আমেরিকান, হিস্পানিক আমেরিকান, চাইনিজ আমেরিকান, কিংবা হোয়াইট আমেরিকান। ভারতের ক্ষেত্রেও একই ভাবে জনগোষ্ঠীকে ডেসক্রাইব করা হয়।
শেষ কথা, 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' যা কেবল একটি নাম নয় বরং আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বাঙালির সর্বজনীন ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক। তাকে বারবার পরিবর্তনের এই প্রবণতা আমাদের সংস্কৃতির ওপর এক ধরনের অযাচিত ও অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ।

পরিচিতি: শিক্ষক, গবেষক ও লেখক। বাংলাদেশ।