
"তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে,
তব পুণ্য-কিরণ দিয়ে যাক মোর মোহ-কালিমা ঘুচায়ে।"
(রজনীকান্ত সেন)
'মঙ্গল' শব্দের মূল অর্থ শুভ, কল্যাণ, ভালো বা উন্নতি। আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা ইতিবাচকতা ও শুভসূচক অর্থে 'মঙ্গল' শব্দটি ব্যবহার করে থাকি।
'চারুপীঠ' নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ১৯৮৬ সালে যশোরে প্রথম বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে 'আনন্দ শোভাযাত্রা'র আয়োজন করে। সে শোভাযাত্রায় পুতুল, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরোনো বাদ্যযন্ত্রসহ আরো অনেক শিল্পকর্ম নিয়ে তারা আনন্দ যাত্রাটি সংগঠিত করেন। যশোরের সেই শোভাযাত্রা সকলের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে যশোরের শোভাযাত্রায় অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকার 'চারুকলা বিভাগ' পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রার আয়োজন করেন।
সে সময় বাংলাদেশে শাসন ক্ষমতায় ছিল স্বৈরশাসক এরশাদ।
মূলত সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ ছিল এ আনন্দ যাত্রাটির উদ্দেশ্য। আনন্দ শোভাযাত্রায় বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্য ফুটিয়ে তুলতে বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, হাতি, কুমির, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ ও শিল্পকর্ম ব্যবহার করেছিলেন চারুকলার শিল্পীরা। তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। শোভাযাত্রার মূল ভাব ছিল 'অগণতান্ত্রিক শক্তির বিনাশ'। প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার পোস্টারের প্রতিপাদ্য ছিল 'লক্ষ্মীসরা'। উদ্দেশ্য সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ।
১৯৭৫ সালে পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় সামরিক শাসক। সামরিক শাসকদের হাত ধরে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী, মৌলবাদীদের উত্থান ঘটে। সামরিক শাসক মৌলবাদীরা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে কখনও গ্রহণ করতে পারেনি।
১৯৯৬ সালে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, নতুন সূচনা আর অশুভ শক্তির বিনাশে বাঙালির প্রতীকী আয়োজন আনন্দ শোভাযাত্রার নামকরণ করে চারুকলা 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'। যেখানে নানান প্রতীক, সরাচিত্র, মুখোশ আর মোটিফে তুলে ধরা হয় আবহমান বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের উদাত্ত আহ্বান। আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য থাকে – মানব জীবনের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি।
ভাষার কোনো ধর্ম নেই। ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়ার ফল।
ইসলাম ধর্মে কোনো একক ভাষার উল্লেখ নেই। তাই যদি না হতো, তবে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হতো না। পবিত্র 'কোরান শরিফ'-এ কোথাও উল্লেখ নেই সমস্ত মুসলিমকে একটি ভাষাভাষী গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হতে হবে। বরং আমাদের নবি হযরত মোহম্মদ (সাঃ) সালাম আরবি ভাষাভাষী ছিলেন বলে পবিত্র 'কোরান শরিফ' নাজিল হয়েছিল আরবি ভাষায়। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) সালাম নিজ মাতৃভাষায় অনুধাবন করবেন বলে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় সৃষ্টিকর্তা মায়ের ভাষাকে কত মর্যাদা দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদী, স্বাধীনতা বিরোধীরা তাদের মায়ের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে, মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ 'কোরান'-এর ভাষা আরবি এবং পাকিস্তানের ভাষা উর্দুকে তারা তাদের ভাষা হিসাবে মনে করে আর 'মঙ্গল' শব্দটি হিন্দু ধর্মালম্বীদের শব্দ বলে গণ্য করে। বাংলা ভাষায় 'জল' ও 'পানি' দু'টি শব্দই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তারা জলকে হিন্দুদের, আর পানিকে মুসলমানের শব্দ বলে চিহ্নিত করে। 'মঙ্গল' শব্দটিতে তাদের যত আপত্তি।

প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রা, ১৯৮৯ (বৈশাখ ১৩৯৬)।
পহেলা বৈশাখে চারুকলার উদ্যোগে আয়োজিত 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'টি বর্ণাঢ্য উৎসব, যা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানুষের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজনীন স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর, ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর আন্তঃসরকার কমিটির ১১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' (Mangal Shobhajatra) 'অপরিমেয় বা অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' (Intangible Cultural Heritage of Humanity) হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
মৌলবাদী স্বাধীনতা বিরোধীরা আওয়ামি লিগের শাসনামলে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'র বিরোধিতা করে আসছিল। আওয়ামি লিগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই বিরোধিতা আরো জোরালো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে 'মঙ্গল' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা'।
২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরী বলেন, "সরকার সমাজে কোনো ধরনের বিভাজন বা অনৈক্য চায় না। নাম নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাই তারা বিতর্কের অবসান করতে চায়। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – 'আনন্দ শোভাযাত্রা' নয়, 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'ও নয়। শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে, যেখানে সব সংস্কৃতির প্রদর্শন থাকবে। যার যার মতো ঢোল-বাদ্য, পোশাক-আশাক নিয়ে একটি আনন্দঘন শোভাযাত্রা হবে। এই শোভাযাত্রার নাম হবে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা'।"
ইসলামি সংস্কৃতি, পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়ে ওঠা এক উন্নত জীবনধারা, যা তাওহীদ, নৈতিকতা এবং মানবিক প্রগতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এটি কেবল প্রথা নয়, বরং ইমানভিত্তিক এমন এক সংস্কৃতি যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনে এবং নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত রাখে।
নিজ মাতৃভাষাকে অস্বীকার করা, মায়ের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা কি নৈতিকতায় পড়ে, ইমানের অঙ্গ হয়? যার যার মাতৃভাষাকে স্বীকার করা, সম্মান জানানো ইমানের অঙ্গ।
মওলানা ইউসুফ জাই বলেছেন, "সংস্কৃতি মানুষকে একত্র করে, বিভাজন নয়।"
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, "নিজস্ব সংস্কৃতির গৌরব যিনি বোঝেন, তিনিই প্রকৃত নাগরিক।"
বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবক্ষয় শুরু হয়েছে মৌলবাদীদের তোষণের মধ্যে দিয়ে। আমাদের সংস্কৃতি যেমন - বাউল, মুরশিদি গান, যাত্রা, পালা গ্রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ওয়াজের নামে ভণ্ড মৌলানাদের মিথ্যাচার। ওয়াজের নায়করা কুৎসিত ভাষায় নোংরা অঙ্গভঙ্গি করে, মিথ্যাচার করে বেহেশতের ট্যাবলেট বিক্রি করে। আমরা মুসলিম ঘরে জন্মগ্রহণ করে মুসলিম। কিন্তু গ্রাম বা শহরে আমাদের ধর্মগ্রন্থ নিয়ে চর্চা হয় না। কিছু মুখস্ত শব্দ আমরা আওড়ে যাই, যার অর্থ কারো বোধগম্য নয়। সেই সুযোগ নিচ্ছে আমাদের ধর্ম ব্যবসায়ীরা। এই অবক্ষয় রুখতে হলে আমাদের সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প নেই। সবার আগে প্রয়োজন একটি সংস্কৃতি আন্দোলন।

পরিচিতি: কাজী ফেরদৌসী হক লিনু লেখালেখি করেন 'লিনু হক' নামে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। বাসস্থান: ঢাকা, বাংলাদেশ। প্রকাশিত গ্রন্থ: 'মেয়ে বিচ্ছু', 'অবরুদ্ধ নগরের গেরিলা ৭১', 'প্রথম পুরুষ', 'মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্রে বাংলার নারী'।