
১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে জয়পুরে অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জ্যোতির্ময়ী দেবী (১৮৯৪-১৯৮৮)। তাঁর পিতামহ সংসারচন্দ্র সেন ছিলেন জয়পুর রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এবং পিতা অবিনাশচন্দ্রও মন্ত্রী ছিলেন। (সুদক্ষিণা ঘোষ ২০০৮:৪৮)। মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় হুগলি জেলায়। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। দুটি নাবালক পুত্র ও কন্যাকে নিয়ে তিনি পিতৃগৃহে ফিরে আসেন। বৈধব্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তিনি সাহিত্যের আঙিনায় পা রাখেন। সমকালের পাঠকমহলে অন্তঃপুরবাসিনী এই নারীর রচনা সাড়া জাগিয়েছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস 'ছায়াপথ' (১৯৩৫), 'বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ' (১৯৪৯), 'মনের অগোচরে' (১৯৫৩) ও 'এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা' (১৯৬৮)।
নারীমুক্তির জন্য যাঁরা লিখেছেন জ্যোতির্ময়ী দেবী তাঁদের অগ্রপথিক। তাঁর উপন্যাসে লিঙ্গ বৈষম্যের প্রসঙ্গটি সুষ্পষ্ট রূপ পেয়েছে। এ থেকে উত্তরণের পথটিও তিনি নির্দেশ করেছেন। তাঁর 'ছায়াপথ' উপন্যাসে সুপ্রিয়া বিবাহ প্রস্তাবে সম্মত হয় না। কারণ তার মতে, পুরুষ নারীকে পণ্য মনে করে তাই তাকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করে না। সুপ্রিয়া পণ দিয়ে নারীকে পণ্যদ্রব্য গণ্য করার প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। বিয়ের পরেও সে চাকরি না ছেড়ে পাঞ্জাবে গুরুকুল কন্যা বিদ্যালয়ে চাকরি অব্যাহত রেখেছে। কারণ, পুরুষ নারীর ভার গ্রহণ করে বলে নারীর আর্থিক স্বাধীনতার সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতাও রোধ হয়।
'বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ' উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র বীনা নারী-পুরুষ বৈষম্যের চূড়ান্ত রূপটিকে প্রত্যক্ষ করেছে। কালো মেয়ে বীণার বিয়ের বাজারে কোনো দাম নেই। পিতৃতান্ত্রিক বিধানে একটি মেয়ের দাম নির্ধারিত হয় শুধু একজন পুরুষের চাহিদা অনুযায়ী। মানুষ হিসেবে তার আলাদা কোনো মূল্য নেই, এটা বীণা মানতে পারেনি। অনূঢ়া হয়ে ভাতৃবধূদের দয়ায় সে সংসারে পড়ে থাকতে চায়নি। এম.এ. পাস করে বীণা শিক্ষকের চাকরি নিয়েছে। বীণার সমান্তরাল আরেকটি চরিত্র টুলু। এই কালো মেয়েটি শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত। শ্বশুরবাড়িতে গৃহকর্মের মাধ্যমে সে নিজের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর চেষ্টা করেছে।
দুটি চরিত্রকে পাশাপাশি দেখিয়ে জ্যোতির্ময়ী দেবী নারীমুক্তির পথ খুঁজেছেন শিক্ষার মধ্য দিয়ে। এই শিক্ষা তার নিজের জীবনের উন্নয়নের জন্য, পুরুষের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করার জন্য নয়। নায়ক নীতীশের সঙ্গে বীনার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গান্ধীজির ডান্ডি অভিযানে তারা সঙ্গী হয়। কিন্তু সম্পর্ক পূর্ণতা পাবার পূর্বেই জেলে নীতীশের মৃত্যু হয়। জ্যোতির্ময়ীর নায়িকারা পুরুষকে চেয়েছে সখ্যে, সহমর্মিতায়, সহযোগিতায় পাশাপাশি চলার সঙ্গী হিসেবে।

নারীর কোনো ইতিহাস নেই। হেলেন সিজো এই উক্তি করেছেন। নারীর ইতিহাস নামে আমরা যা পাঠ করি তা পুরুষের ইতিহাসে নারী সম্পর্কিত অধ্যায় মাত্র, যার রচয়িতাও পুরুষ। (জোহরা পারুল ২০০৭:১১)। নারীর কথা সে ইতিহাসে বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর 'স্ত্রী পর্ব' নামক একটি অধ্যায় আছে। সেখানে ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীসহ কৌরবপক্ষীয়দের শোকজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ আছে। কিন্তু যেসব অগণিত নারী এই মহাযুদ্ধে স্বামী, সন্তান কিংবা পিতাকে হারিয়েছিল তাদের জন্য মহাভারতকার একটি শ্লোকও ব্যয় করেননি। শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা অর্জুনের চোখের সামনে থেকে দস্যুদল যেসব যাদব রমণীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল মহাকবির কলম তাদের পরবর্তী জীবন কেমন ছিল তা নিয়েও নীরব থেকেছে। (সুমনা দাস সুর ২০০৮:৪০৪-৪০৫)। পুরুষের যুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণের অনুমতি নেই। শিখণ্ডী নারী বলে যুদ্ধ করার অনুমতি পায়নি। যোদ্ধা হিসেবে নয় নারী হিসেবে তার শ্রেণি নির্ণীত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নারীর উপর নিপীড়ন নিয়ম বহির্ভূত, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হবার পর বিজিত দল তাদের উপর যথেচ্ছাচার করার অধিকার পায়। জ্যোতির্ময়ী দেবী ইতিহাসের সেই অজানা অধ্যায়কে তাঁর কলমে ব্যক্ত করতে চেয়েছেন।
৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ৪৭-এর দেশভাগের পটভূমিতে তিনি লিখেছেন 'এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা' উপন্যাসটি। যার প্রথম নাম ছিল 'ইতিহাস স্ত্রী পর্ব'। এ উপন্যাসের ভূমিকায় 'আমার কথা'তে জ্যোতির্ময়ী দেবী লিখেছেন:
[...] সে কথা লেখেননি ব্যাসদেব। কোন কালি কোন ধূর্জপত্রে সে কথা কোন পুরুষ কবি লিখবেন? সে কালি, কাগজ, লেখনীর আজও পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি। মহাকবি হলেও পুরুষ, কাপুরুষের নারীদের ওপর সেই অত্যাচারের বর্বর লাঞ্ছনার কাহিনি লিখতে পারেন না। লজ্জা ধিক্কারে তার লেখনী অভিভূত মূক স্তব্ধ হয়ে যায়। তাই পুরুষ কবি সে কথা লেখেননি। কাপুরুষ তো ইতিহাস লেখে না! নারী কবি মহাকবি নেই। থাকলেও নিজেদের মান, লজ্জা, মর্যাদা, সম্ভ্রমহানির কথা লিখতে পারতেন না। সে ভাষা আজও পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি। তাই স্ত্রী পর্বের কোন ইতিহাস নেই। (জ্যোতির্ময়ী দেবী ২০০১:ভূমিকা)
বহু সংঘর্ষ, বিরোধ, দ্বন্দ্ব, মতান্তর, রক্তপাত, ধর্ষণের পর ১৯৪৭-এ দেশভাগ, দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়। ইতিহাসের এই নিরেট তথ্যেই সবটুকু সত্য থাকে না। ইতিহাসের অন্ধকার পর্ব থেকে নারীর ইতিহাসকে আলোতে নিয়ে এসেছেন জ্যোতির্ময়ী দেবী সুতারা চরিত্রটির মাধ্যমে। নোয়াখালীর দাঙ্গায় কিশোরী সুতারার বাবা গোপালবাবু ঘাতকের ছুরির আঘাতে প্রাণ হারায়। তার মা এরপর পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। তার বিবাহিত দিদিকে ঘাতকরা তুলে নিয়ে যায়। সুতারা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, তাকে তার পিতৃবন্ধু তামিজুদ্দিন উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তমিজুদ্দিনের কন্যা সুতারার খেলার সঙ্গী, একই সঙ্গে পড়াশুনা করে। বাড়ির সবাই তাকে পরম যত্নে আগলে রাখে। কলকাতায় সুতারার দাদা ও বোন-জামাইদের কাছে তারা খবর পাঠায়। সেখান থেকে সুতারাকে কেউ নিতে না এলে তমিজুদ্দিন সাহেব নিজ দায়িত্বে তাকে কলকাতায় পৌঁছে দেন। দাদা সনতের শ্বশুরবাড়িতে সে যে অবাঞ্ছিত সবাই তাকে সেটা বুঝিয়ে দেয়। মুসলমানের বাড়িতে থেকে সে জাত খুইয়েছে। সুতারার মতো সাত ঘাটের জল খেয়ে আসা মেয়ে ঘরে থাকলে বাড়ির অন্য মেয়েদেরও বিয়ে হতে সমস্যা হবে। সব কুল ঠিক রাখতে সুতারাকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হোস্টেলে থেকে সুতারা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পার করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি হলেও সুতারাকে কেউ নিতে আসত না। ধীরে ধীরে সুতারা নিজেকেই সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেয়। পড়াশুনা শেষ করে দিল্লিতে চলে যান যাজ্ঞসেনী মহিলা কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক হয়ে। নিজের সংসারের চিন্তা তার ভাবনার পরিধিতে ঠাঁই পায় না। কলেজের স্টাফ কোয়ার্টারই হয় তার ঠিকানা। সময়ের পরিক্রমায় বাল্যসখী সাকিনার মা তাকে পুত্রবধূ করতে চাইলে তাঁর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অন্য একটি সম্প্রদায়ের জন্যই সে তার স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছে আবার সেই সম্প্রদায়ের মানুষরাই তার ক্ষতস্থান পূরণ করতে সাহায্য করেছে। তবু বিয়ে হলে সেই সম্প্রদায়ের রক্তে মিশে যেতে হবে। তার বাবা, মা, দিদি সবাইকে হারানোর শোক, স্বজনবিমুখ জীবন-যাপন, দুঃসহ জীবনের গ্লানি মুছে ফেলা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। স্বগোত্রীয় প্রমোদকে নিয়ে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তার মনে। সুতারার সংকট দিয়ে এখানে ঔপন্যাসিক স্বদেশ বিভক্তির কারণে নারীর জীবনের করুণ ও অজ্ঞাত ইতিহাস রচনা করেছেন।
অ্যালেন শোয়েল্টারের 'A literature of their own: British Women Novelists from Bronte to Lessing' (১৯৭৯) গ্রন্থে ব্যবহৃত গাইনোক্রিটিক তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশের নারী ঔপন্যাসিকদের লেখাতেও তিনটি স্তর পাওয়া সম্ভব। প্রথম স্তর 'Feminine phase': এ পর্যায়ে নারী-লেখকরা পুরুষ লেখকদের লেখার অক্ষম অনুকরণ করেছেন। পুরুষের তৈরি সামাজিক নিয়ম ও নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ এই সময়ের সাহিত্যিকদের নারীচরিত্রগুলো। দ্বিতীয় স্তর 'Feminist phase': দ্বিতীয় পর্যায়ের নারী-লেখকরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তৃতীয় স্তর 'Female phase': এই সময়টিতে নারী-লেখকদের পূর্ণতা প্রাপ্তির সময়। এই সময়ের লেখকরা নারীত্বের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনে সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন। বাংলার নারী-লেখকদের উপন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদল নারী ঔপন্যাসিক পুরুষ লেখকদের প্রতিষ্ঠিত ছক থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি, অন্যদল নিজের ভিতরে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলেছে। প্রথম দলটি নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চাইতে পুরুষতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরেছেন। স্বর্ণকুমারী দেবী ও রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সৃষ্ট নারীচরিত্ররা সময়ের চাইতে প্রাগ্রসর। রোকেয়ার পরে উপন্যাস রচনা করেও অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবী, গিরিবালা দেবী পুরুষতন্ত্রের ছকের বাইরে বের হতে পারেননি। বিপরীতে, শৈলবালা ঘোষজায়া, আমোদিনী ঘোষ, আশাপূর্ণা দেবী এমন নারীচরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যারা প্রচলিত সমাজরীতিকে অগ্রাহ্য করেছে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছে, সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে একা যুদ্ধ করেছে অথবা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীর জীবনের সমস্যার চারিত্র শুধু দাম্পত্য বা প্রণয়কেন্দ্রিক থাকেনি। নারীর উপন্যাসেও রাষ্ট্রীয় অভিঘাত ছাপ ফেলেছে, একই সঙ্গে তাঁরা ঘর ও বাইরের দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করেছে। জ্যোতির্ময়ী দেবী এইসব ঔপন্যাসিকদের মধ্যে প্রথম ইতিহাসে নারীর স্বর অনুসন্ধান করেছেন। মহাভারত থেকে দেশভাগ পর্যন্ত ইতিহাসের অভিঘাত নারীদের বিপর্যস্ত করেছে। 'স্ত্রী পর্ব'-এর সেই ইতিহাস রচনাতে তিনি তাই অগ্রগণ্য। গৃহজীবী নারী নয় বরং কর্মজীবী নারীকেই তিনি সমাজমুক্তি ও নারীমুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
তথ্যসূত্র:
● জোহরা পারুল (২০০৭), নারীর ইতিহাস, সংবেদ, ঢাকা।
● জ্যোতির্ময়ী দেবী (২০০১), এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা।
● সুমনা দাস সুর (২০০৮), অবরোধবাসিনী থেকে সবলা: নারী ঔপন্যাসিকের চোখে নারীর আত্মপরিচয়ের সন্ধান, নারীবিশ্ব, (সম্পাদক: পুলক চন্দ), কলকাতা।
● সুদক্ষিণা ঘোষ (২০০৮), মেয়েদের উপন্যাসে মেয়েদের কথা, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা।

পরিচিতি: প্রাবন্ধিক, গবেষক, গ্রন্থলেখক। ঢাকা, বাংলাদেশ।